ইব্রাহিম আলম সবুজ, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৮:০৭ অপরাহ্ণ
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার নাজিমখাঁন ইউনিয়নের ঝাড়িঝাড় গ্রামে সরকারি অনুদানভুক্ত একটি স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসা দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, জরাজীর্ণ টিনের ভবন, দরজাহীন কক্ষ, পানিতে ডুবে থাকা মাঠ এবং সেই মাঠেই মাছ চাষের ব্যবস্থা। অথচ সরকারি নথিতে প্রতিষ্ঠানটির চারজন শিক্ষক নিয়মিত অনুদান পাচ্ছেন।
শুধু ঝাড়িঝাড় স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসাই নয়, উপজেলার আরও তিনটি স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসার ক্ষেত্রেও একই ধরনের অনুদানভুক্ত শিক্ষক থাকার তথ্য মিলেছে। চারটি প্রতিষ্ঠানে মোট ১৬ জন শিক্ষকের নামে প্রতি মাসে ৫৩ হাজার ৬০০ টাকা এবং বছরে ৬ লাখ ৪৩ হাজার ২০০ টাকা সরকারি অনুদান বরাদ্দ রয়েছে।
সরেজমিনে ঝাড়িঝাড় স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসায় গিয়ে নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষক বা শিক্ষার্থীর উপস্থিতির কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। পাঁচ কক্ষের টিনের ভবনের একটি কক্ষের দরজা নেই, অন্য কক্ষগুলোও পরিত্যক্ত ও ব্যবহার অনুপযোগী। মাদ্রাসার মাঠ পানিতে তলিয়ে রয়েছে। সেখানে জলজ উদ্ভিদ, আগাছা ও বাঁশের মাচা দেখা গেছে। স্থানীয়দের দাবি, ওই পানিতে মাছ চাষ করা হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটির সামনে ঝুলছে ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠার উল্লেখ থাকা একটি বিবর্ণ সাইনবোর্ড। তবে দীর্ঘদিন ধরে সেখানে শিক্ষা কার্যক্রম চালু নেই বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী।সরকারি নথি অনুযায়ী, ঝাড়িঝাড় স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসার শিক্ষকের তালিকায় রয়েছেন জেসমিন আরা পারভীন, মো. ফিরোজ মাহমুদ, মো. আলতাফ হোসেন সরকার ও সালমা বেগম।
একইভাবে অনুদানভুক্ত অন্য তিনটি প্রতিষ্ঠান হলো— উমর মজিদ বসুনিয়া পাড়া স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসা, বোতলার পাড় কেরামতিয়া স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসা এবং মীরের বাড়ী স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসা। নথি অনুযায়ী, চারটি প্রতিষ্ঠানে চারজন প্রধান শিক্ষক ও ১২ জন সহকারী শিক্ষক রয়েছেন। প্রধান শিক্ষক মাসে ৩ হাজার ৫০০ টাকা এবং সহকারী শিক্ষক ৩ হাজার ৩০০ টাকা করে অনুদান পান। ফলে চার প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের নামে মাসিক মোট ৫৩ হাজার ৬০০ টাকা এবং বার্ষিক ৬ লাখ ৪৩ হাজার ২০০ টাকা সরকারি অর্থ ছাড় হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা কামরুল হাসান বলেন, অনেক বছর থেকে মাদ্রাসা এভাবেই পড়ে আছে। লিটন মিয়া বলেন, বছরের শুরুতে কয়েকজনকে ডেকে শুধু বই দেয়। এরপর আর কোনো কার্যক্রম দেখা যায় না। লতিফুর রহমান বলেন, প্রতি মাসে অনুদানের টাকা দেওয়া হয়—এটা আমরা জানতাম না। তবে শুনি, মাঝে মাঝে তারা ঢাকায় সরকারি করার দাবিতে আন্দোলনে যায়।
একাধিকবার সরেজমিনে গেলেও প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক বা অন্য কোনো শিক্ষককে পাওয়া যায়নি। প্রতিবারই মাদ্রাসাটি বন্ধ অবস্থায় থাকায় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (দাখিল ও এবতেদায়ী) ইবাদত হোসেন বলেন, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ১ হাজার ৩৩৩টি স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসাকে অনুদান দেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের শুরু থেকে এ হারে অনুদান পাচ্ছে তারা। তালিকার বাইরে কাউকে অনুদান দেওয়ার সুযোগ নেই। অনেক প্রতিষ্ঠান দাখিলে উন্নীত হয়েছে, আবার নানা কারণে কিছু প্রতিষ্ঠানের খোঁজও মেলেনি।
মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের পরিদর্শক মো. নুরুল ইসলাম বলেন, অনেক স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসা নিয়ম অনুযায়ী তথ্য হালনাগাদ করেনি। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের আইডি বা পাসওয়ার্ড নিষ্ক্রিয় রয়েছে। আবার আর্থিক সংকটসহ বিভিন্ন কারণে কিছু প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে গেছে। স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসা শিক্ষক ঐক্য পরিষদের সদস্যসচিব মো. তাজুল ইসলাম ফারাজী বলেন,
১৯৯৪ সালের তালিকা অনুযায়ী এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের অনুদান দেওয়া হচ্ছে। তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার পার্থক্য অবশ্যই যাচাই করা প্রয়োজন। রাজারহাট উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারি তালিকায় অনুদানভুক্ত প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকের নাম থাকলেও মাঠপর্যায়ে একটি মাদ্রাসা দীর্ঘদিন বন্ধ, নিয়মিত পাঠদানের চিহ্ন নেই এবং মাঠে মাছ চাষের অভিযোগ উঠেছে। তবে অনুদানের অর্থ আত্মসাৎ বা কোনো ধরনের অনিয়ম হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সরকারি নথি, ব্যাংক লেনদেন, অর্থ উত্তোলনের তথ্য, শিক্ষক উপস্থিতির রেকর্ড ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রয়োজন।