অ্যাডভোকেট এম এ মজিদ,ঢাকা || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ২৫ জুন, ২০২৬ ৩:২৯ অপরাহ্ণ
নাগরিক ভাবনা: কৌতুক বলে উড়িয়ে দিবেন না,ঘটনাটি শতভাগ সত্য।
“বড় মাঠের আগে ছোট মাঠে গোল নিষেধ!
এক ফুটবল-রসিকের অবিস্মরণীয় কাহিনি”
আজ ২৫ জুন ২০২৬, বৃহস্পতিবার।
সকাল থেকেই আকাশের মুখ ভার। ঝিরঝির বৃষ্টি, তার সঙ্গে ঘন ঘন বজ্রপাত। এমন আবহাওয়ায় অনেকেই ঘরের বিছানাকেই সবচেয়ে আকর্ষণীয় বন্ধু মনে করছেন। কিন্তু আমার সহধর্মিণী সেই প্রকৃতির ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে আমাকে অনেকটা জোর করেই নিয়ে গেলেন দিনাজপুর শিশুপার্কে।
শিশুপার্কে লোকসমাগমও নেহাত কম ছিল না। তবে শুভ সকাল ব্যায়াম কেন্দ্রের প্রাণপুরুষ ক্যাপ্টেন তরিকুল ইসলাম সবাইকে দেখে মুচকি হেসে ঘোষণা করলেন, “আজ আর যৌথ ব্যায়াম নয়। প্রকৃতি যখন ফ্রি-তে সাউন্ড সিস্টেম (বজ্রপাত) চালু করেছে, তখন আমরা শুধু হাঁটাহাঁটি করব, গল্প করব, আড্ডা দেব!”
আমরাও সানন্দে সেই সিদ্ধান্ত মেনে নিলাম।
শিশুপার্কে গেলে কয়েকজন প্রিয় মুখের সঙ্গে দেখা না হলে যেন সকালটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাংদের মধ্যে অন্যতম আমার অত্যন্ত আপনজন মনোয়ার হোসেন (ছদ্মনাম)।
হাঁটাহাঁটি শেষে আমরা দু’জন এক কোণে বসে পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণায় ডুবে গেলাম। গল্পের ঝুলি খুলতেই একসময় মনোয়ার ভাই এমন একটি ঘটনা শোনালেন যে, আমার অবস্থা হলো – হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যাওয়ার উপক্রম! আমি এমন অট্টহাসি শুরু করলাম যে আশপাশের সবাই হাঁটাহাঁটি থামিয়ে জানতে চাইলেন, “কী হয়েছে? এত হাসছেন কেন?”
কিন্তু বিপদ হলো, হাসির কারণ বলতে গেলেই আবার নতুন করে হাসি পেয়ে যাচ্ছিল। ফলে ঘটনা বলার বদলে আমি শুধু হেসেই চললাম। মানুষ তখন ভাবছে, লোকটার মাথায়, মুখে ও পেটে বুঝি হাসির বজ্রপাত পড়েছে! অবশেষে সেই হাসির আসল কারণটি এখন আপনাদেরকে না বলে পারছি না।
ঘটনাটি সত্তুরের দশকের। সৈয়দপুরে অনুষ্ঠিত হবে দিনাজপুর বনাম রংপুর জেলার মধ্যকার ফাইনাল ফুটবল ম্যাচ। উত্তেজনা তখন তুঙ্গে। দিনাজপুর দলের অধিনায়ক ছিলেন মনোয়ার ভাইয়ের খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
খেলার আগের দিন তিনি মনোয়ার ভাইয়ের বাড়িতে এলেন। খানিক গল্প-গুজবের পর তিনি গম্ভীর মুখে মনোয়ার ভাইয়ের স্ত্রীকে উদ্দেশ করে বললেন, “ভাবী, আগামীকাল কিন্তু সৈয়দপুরের বড়মাঠে ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত হবে। দিনাজপুর জেলার লক্ষ লক্ষ মানুষের আশা-ভরসা এখন আপনার স্বামী মনোয়ারের ওপরে। তাই আজ সারাদিন, বিশেষ করে আজ রাতে এমন কিছু করবেন না, যাতে কাল মাঠে গিয়ে ওর খেলা খারাপ হয়ে যায়!”
ভাবী প্রথমে কিছুই বুঝতে পারলেন না। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। ক্যাপ্টেন সাহেব তখন আরও কাছে এসে গলা নিচু করে যেন অনেকটা রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁস করার ভঙ্গিতে বললেন, “ভাবি, আর একটা কথা, খুব ভালো করে মনে রাখবেন। কাল সৈয়দপুরের বড় মাঠে খেলা শুরুর আগে কোনো অবস্থাতেই মনোয়ারকে আজ রাতে ছোট মাঠে খেলতে এবং গোল দিতে দেবেন না!
ভাবী তো আরও হতবাক!
ক্যাপ্টেন সাহেব আবার কথাটি ব্যাখ্যা করলেন,দেখুন ভাবী, বড় ম্যাচের আগে মনোয়ার যদি ছোট মাঠেই গোল দিয়ে দেয়, তাহলে কাল বড় মাঠে গিয়ে গোল দেওয়ার শক্তি কমে যাবে! তখন কিন্তু দিনাজপুর হেরে যেতে পারে। এ কথা শুনার পর লজ্জায় ভাবীর মুখ লাল হয়ে গেল, আর মনোয়ার ভাই মাথা নিচু করে বসে রইলেন, আর ক্যাপ্টেন সাহেব এমন ভাব করছেন যেন জাতীয় দলের ফিটনেস পরিকল্পনা বুঝিয়ে দিচ্ছেন!
আজ সকালে গল্পগুজবের এক পর্যায়ে মনোয়ার ভাই আমাকে এ কথাটি বললেন। খেলার আগে ডায়েট চার্ট, বিশ্রাম, অনুশীলন – এসবের কথা তো শুনেছি, কিন্তু বড় মাঠে গোল দেওয়ার স্বার্থে ছোট মাঠে গোল নিষিদ্ধ- এমন অভিনব কোচিং দর্শন সত্যিই বিরল!
জীবনের এমন নির্দোষ, সরল অথচ বুদ্ধিদীপ্ত রসিকতাই বন্ধুদের আড্ডাকে আজ সকালটা অমলিন করে তুলেছে। কিছু গল্প থাকে, যা শুধু হাসায় না – একটি সময়, একটি প্রজন্মের সহজ-সরল রসাত্মবোধকেও জীবন্ত করে তোলে। আজকের এই গল্পটি ঠিক তেমনই।