অ্যাডভোকেট এম এ মজিদ,ঢাকা || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ২০ জুন, ২০২৬ ৭:৫১ পূর্বাহ্ণ
গতকাল ১৯ জুন। এই দিনটি এলেই বুকের গভীরে এক অদৃশ্য শূন্যতা হাহাকার করে ওঠে। পৃথিবীতে এমন কিছু ক্ষত আছে, যা কখনো শুকাতে পারে না। মায়ের মৃত্যু সেই রকমই এক অনন্ত বেদনার নাম। দেখতে দেখতে আজ আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় গর্ভধারিণী মা হাফিজা বেগমের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী।
১৯৮২ সালের ১৯ জুন, রাত ১২টা ৩৯ মিনিটে ঢাকার হলি ফ্যামিলি রেডক্রিসেন্ট হাসপাতালের একটি কেবিনে আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়, সবচেয়ে নিরাপদ ছায়াটুকু চিরদিনের জন্য নিভে গিয়েছিল। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ৫৪ বছর। তখনও তাঁর আট পুত্র ও চার কন্যা – বারোটি সন্তানই জীবিত ও সুস্থ ছিলেন। অথচ সন্তানদের ভরা সংসার রেখে মা চলে গেলেন এমন এক দেশে, যেখান থেকে আর কেউ ফিরে আসে না।
কত স্বপ্ন নিয়েই না তিনি ঢাকায় এসেছিলেন! ১৯৮২ সালের মে মাসের ২০ তারিখে তিনি প্রায় সুস্থ শরীরেই হাসিমুখে ঢাকায় আসেন। টেলিফোনে আমার সঙ্গে কথা হওয়ার পরই তিনি আসতে সম্মত হয়েছিলেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল, ঢাকায় থাকা ছেলে-মেয়ে, আপন ভাই ও আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে দেখা করবেন। তারপর যাবেন তৎকালীন গোপালগঞ্জ মহকুমার কাশিয়ানীতে – নিজের বাবা-মার বাড়ি, ভাই-বোন ও আত্মীয়স্বজনদের কাছে এবং শ্বশুরবাড়ির মানুষদের সঙ্গে দেখা করতে। কে জানত – তাঁর সেই ইচ্ছা পূরণ হবে না!
মেঝ বোনের একান্ত ইচ্চায় মাকে নিয়ে উঠেছিলেন আমাদের মেজ বোন সুফিয়া ইসলামের ঢাকার তেজকুনিপাড়ার বাসায়। মেজ দুলাভাই ইঞ্জি. মোজাদ্দেদুল ইসলাম সেলিম তখন পেট্রোবাংলার কনস্ট্রাকশন ডিভিশনের প্রধান প্রকৌশলী। কয়েকদিন আনন্দেই কাটছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই ডায়াবেটিসসহ অন্যান্য শারীরিক জটিলতা মারাত্মক আকার ধারণ করে। ২ জুন ১৯৮২ মাকে ভর্তি করা হয় মগবাজারের হলি ফ্যামিলি রেডক্রিসেন্ট হাসপাতালের ভিআইপি ডাবল কেবিনে।
সেই সময় আমাদের বড় দুলাভাই কর্নেল ডা. হামিদুর রহমান হাসপাতালটির পরিচালক হিসেবে ডেপুটেশনে দায়িত্ব পালন করছিলেন। চিকিৎসা, সেবা, আন্তরিকতা – কোনো কিছুরই অভাব ছিল না। দেশের সেরা চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও নিয়তির লিখন কেউ পরিবর্তন করতে পারে না। মানুষ যতই চেষ্টা করুক, আল্লাহর নির্ধারিত সময়ের এক মুহূর্তও আগে বা পরে কেউ থাকতে পারে না।
মৃত্যুর কয়েকদিন আগে মায়ের কথা বলার শক্তি সম্পূর্ণ হারিয়ে যায়। কিন্তু তাঁর শ্রবণশক্তি তখনও অটুট ছিল। আমরা তাঁকে একের পর এক প্রশ্ন করছিলাম – মা, কিছু খেতে ইচ্ছে করছে? কাউকে দেখতে চাও? কোনো কিছু বলবে?
প্রতিটি প্রশ্নের উত্তরে তিনি শুধু মাথা নেড়ে “না” জানাতেন।
শেষে প্রশ্ন করলাম – “মা, তোমার কি বাবাকে দেখতে ইচ্ছে করছে?”
এই প্রথম তাঁর নিস্তেজ চোখে এক অদ্ভুত আলো জ্বলে উঠল। তিনি অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে মাথা নেড়ে “হ্যাঁ” জানালেন।
আমরা সেদিনই দিনাজপুরে বাবার কাছে খবর পাঠালাম। বাবা যেন ভোরের প্রথম কোচে ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা দেন। পরদিন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আরএনকো কোচে বাবা রাতে ঢাকায় পৌঁছালেন। আমি তাঁকে মগবাজারের আরএনকো কোচস্ট্যান্ড থেকে সরাসরি হাসপাতালে নিয়ে এলাম।
তারপর যে দৃশ্যটি ঘটেছিল, তা আজও আমার চোখে ভাসে।
মাকে ওই অবস্থায় দেখে আমার দৃঢ়চেতা বাবা শিশুর মতো ভেঙে পড়লেন। তাঁর চোখ থেকে অবিরাম অশ্রু ঝরছিল। তিনি কাঁদতে কাঁদতে মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন।
কিন্তু মায়ের চোখে তখন যেন অন্য এক আকুতি।
তিনি যেন কিছু শুনতে চাইছিলেন।
বাবা বুঝতে পারলেন।
কাঁপা কণ্ঠে তিনি বললেন –
“তোমাকে আমি নয় বছর বয়সে বিয়ে করে সংসার শুরু করেছি। তুমি আমার বাবা-মা, ছোট ভাই এবং আমাদের এতগুলো সন্তানকে অক্লান্ত পরিশ্রমে মানুষ করেছ। আমি হয়তো তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। আমাকে তুমি মাফ করে দিও।”
কিন্তু মা তখনও যেন অপেক্ষা করছিলেন।
বাবা আবার বললেন –
“তুমি যদি জেনে, না জেনে, অজ্ঞানে বা সজ্ঞানে কখনো কোনো ভুল করে থাকো, আমি আল্লাহর ওয়াস্তে তোমাকে মাফ করে দিলাম। তুমিও আমাকে মাফ করে দিও।”
বাক্যগুলো শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এক অলৌকিক প্রশান্তি নেমে এল মায়ের মুখে।
তিনি ধীরে ধীরে তাঁর মুখ পশ্চিম দিকে ফিরিয়ে নিলেন।
তারপর বহুদিন বন্ধ থাকা কণ্ঠে ভাঙা ভাঙা স্বরে উচ্চারণ করলেন পবিত্র কালিমা তাইয়্যিবা।
বাবা দুই হাতে তাঁর মুখখানি আগলে রাখলেন।
একটি দীর্ঘশ্বাস…
একটি শেষ দৃষ্টি…
তারপর সমস্ত সংসারের মায়া ছিন্ন করে মা চিরদিনের জন্য চলে গেলেন মহান রবের ডাকে।
আমি তখন কেবিনের দেয়ালে ঝোলানো ঘড়ির দিকে তাকালাম। সময় তখন রাত ১২টা ৩৯ মিনিট।
সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, শুধু একজন মানুষ নন – আমাদের পুরো পৃথিবীটাই যেন থেমে গেছে।
আজও মনে হয়, পৃথিবীতে সন্তানের জন্য মায়ের ভালোবাসার মতো নির্মল ভালোবাসা আর নেই। মা চলে যাওয়ার পর মানুষ বুঝতে পারে – একটি শব্দ, একটি স্পর্শ, একটি দোয়া, একটি ছায়া কত অমূল্য ছিল। মায়ের কবরের মাটি আজ শুকিয়ে শক্ত হয়ে গেছে, কিন্তু তাঁর স্মৃতি আমাদের হৃদয়ে আজও অশ্রুসজল। যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিন এই শেষ রাতের প্রতিটি মুহূর্ত, বাবার কান্না, মায়ের চোখের অশ্রু আর শেষবারের মতো উচ্চারিত কালিমার ধ্বনি আমার হৃদয়ে অনন্তকাল প্রতিধ্বনিত হবে।
হে আল্লাহ, আমাদের প্রিয় মাকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন। তাঁর কবরকে নূরে পরিপূর্ণ করুন, সকল গুনাহ ক্ষমা করুন এবং কিয়ামতের দিন তাঁকে আপনার প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন, আমীন!
গতকা ১৯ জুন ২০২৬ শুক্রবার আমাদের গর্ভধারিণী মার ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে দিনাজপুরে আমাদের মহল্লার “পাক-পাহাড়পুর জামে মসজিদে” বাদ জুম্মা দোয়া-খায়ের এবং জুম্মার নামাজ শেষে দিনাজপুর শহরের শেখ জাহাঙ্গীর কবরস্থানে মার কবর জিয়ারত ও বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়েছে।
লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট এবং জাতীয় সাংবাদিক সোসাইটির ও ওয়ার্ল্ড পীছ অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস সোসাইটির চেয়ারম্যান।