অ্যাডভোকেট এম এ মজিদ,ঢাকা || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ১৫ জুন, ২০২৬ ২:৩০ অপরাহ্ণ
২০২৬ সালের ১ এপ্রিল বুধবার সকালে সুপ্রিম কোর্টের দশজন ভ্রমণপিপাসু আমরা একত্রে বেরিয়েছিলাম পাঁচ দিন চার রাতের এক আনন্দভ্রমণে। তখন কে জানত, সেই ভ্রমণের মাঝেই আমার জন্য অপেক্ষা করছে জীবন-মৃত্যুর এক কঠিন সন্ধিক্ষণ!
আমাদের যাত্রার প্রথম গন্তব্য ছিল ফরিদপুরে পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি। বাংলার মাটির গন্ধমাখা সেই পরিবেশ যেন কবির অমর পঙ্ক্তিগুলোকেই জীবন্ত করে তুলেছিল। সেখান থেকে রাজবাড়ি জেলার কয়েকটি দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন শেষে সন্ধ্যায় আমরা পৌঁছাই কুষ্টিয়ায়।
কুষ্টিয়ায় জাতীয় সাংবাদিক সোসাইটির জেলা শাখার সভাপতি তাজুল ইসলামের নেতৃত্বে একঝাঁক সাংবাদিক আমাদের যে আন্তরিক অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন, তা আজও হৃদয়ে অমলিন হয়ে আছে। তাদের সান্নিধ্যে আমরা ঘুরে দেখি বাংলার প্রথম মুসলিম ঔপন্যাসিক মীর মশাররফ হোসেনের স্মৃতিধন্য বাড়ি ও জাদুঘর। এরপর যাই বাউল সম্রাট লালন শাহের মাজারে।
সেখানে আমাদের জন্য আয়োজন করা হয়েছিল এক অনন্য লালনসঙ্গীত সন্ধ্যার। এক ডজনেরও বেশি শিল্পী ও গবেষকের অংশগ্রহণে সেই অনুষ্ঠান আমাদের মনোজগতে এমন এক আবেশ সৃষ্টি করেছিল, যা আজও স্মৃতির আকাশে জ্বলজ্বল করে। মনে হয়েছিল, লালনের দর্শন যেন সুর হয়ে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে, আর আমরা তারই মুগ্ধ শ্রোতা।
রাতের খাবারের পর কুষ্টিয়ার সাংবাদিক বন্ধুরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে আমাদের রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা করেন। পরদিন সকালে তারা আমাদের নিয়ে যান বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সিলাইদহ কুঠিবাড়িতে। সেখানে অপেক্ষা করছিল আরেক অনন্য অভিজ্ঞতা। এক শিল্পী ও তাঁর পুত্র আমাদেরকে নিয়ে গেলেন সেই ঐতিহাসিক পুকুরঘাটে, যেখানে বসে রবীন্দ্রনাথ তাঁর বহু কালজয়ী গান ও কবিতা রচনা করেছিলেন। সেই ঘাটে বসেই তাঁরা আমাদের শোনালেন রবীন্দ্রসংগীত। মুহূর্তটির আবেশ ছিল এমন যে, মনে হচ্ছিল – রবীন্দ্রনাথ যেন স্বয়ং আমাদের সামনে বসে গানগুলো রচনা করে তিনিই গাইছেন, আর আমরা তন্ময় হয়ে তাঁর কণ্ঠসুধা পান করছি।
কুঠিবাড়ির প্রতিটি কক্ষ, প্রতিটি বারান্দা, প্রতিটি স্মারক ঘুরে দেখতে দেখতে গাইড এমন প্রাণবন্তভাবে কবিগুরুর জীবনকথা তুলে ধরছিলেন যে, মনে হচ্ছিল আমরা যেন সময়ের স্রোত পেরিয়ে তাঁর জীবদ্দশাতেই পৌঁছে গেছি। ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতার পটভূমি থেকে শুরু করে নানা অজানা তথ্য আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়েছিল একে একে।
সিলাইদহের স্মৃতিময় কুঠিবাড়ির পরিবেশ থেকে ইতি টেনে আমরা কুষ্টিয়ার সাংবাদিক বন্ধুদের কাছ থেকে বিদায় নেই। এরপর মেহেরপুরের ঐতিহাসিক মুজিবনগর পরিদর্শনের জন্য যাত্রা শুরু করি। মুজিবনগর সেই পবিত্র ভূমি -যেখানে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়েছিল এবং যেখানে জাতির মুক্তির অঙ্গীকারকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিয়ে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
কিন্তু ইতিহাসের সেই গৌরবময় স্মৃতিবিজড়িত স্থানটির বর্তমান অবস্থা দেখে মন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। চারদিকে অবহেলা ও অযত্নের যে চিত্র চোখে পড়ে, তা একজন দেশপ্রেমিক মানুষের হৃদয়কে গভীরভাবে ব্যথিত না করে পারে না। যে মাটিতে স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবতার পথে প্রথম দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়েছিল, যে প্রাঙ্গণে একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্মলগ্নের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছিল, সেই স্থানটির আজকের করুণ দশা দেখে চোখের পানি সংবরণ করা কঠিন। ইতিহাসের প্রতি আমাদের দায়িত্ববোধ ও শ্রদ্ধার অভাব যেন সেখানে নীরবে সাক্ষ্য দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ভারাক্রান্ত হৃদয়ে মুজিবনগর ত্যাগ করে আমরা সাতক্ষীরার পথে যাত্রা শুরু করি। দর্শনায় পৌঁছে হঠাৎ আমাদের গাড়ির জ্বালানি শেষ হয়ে যায়। বহু চেষ্টা করেও জ্বালানি যোগাড় করা সম্ভব হলো না। বাধ্য হয়ে আমাদের বাকি ভ্রমণসূচি বাতিল করি। শেষ পর্যন্ত অনেক কষ্টে “রয়েল পরিবহন” এর একটি এসি কোচের দশটি টিকিট সংগ্রহ করে ৩ এপ্রিল রাত ১১টায় ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা হই। ভোরের আলো ফুটতেই আমরা নিরাপদে ঢাকায় পৌঁছে যাই। কিন্তু সেই যাত্রাই হয়ে উঠেছিল আমার জীবনের এক ভয়াবহ অধ্যায়ের সূচনা।
আমার আসনের ঠিক উপরে এসির খোলস খোলা থাকায় সারা রাত তীব্র শীতল বাতাস সরাসরি মাথা ও শরীরে আঘাত করতে থাকে। ঢাকায় পৌঁছার পর থেকেই শ্বাস নিতে কষ্ট অনুভব করি। স্থানীয় একটি ঔষুধের দোকানের পরামর্শে ওষুধ সেবন করলেও গভীর রাতে অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। রাত তিনটায় বাধ্য হয়ে বারডেম হাসপাতালে যাই। বিভিন্ন পরীক্ষার ফল দেখে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে আমাকে অবিলম্বে ধানমন্ডির পপুলার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন। এমনকি তিনি সেখানে যোগাযোগ করে আমার চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্যসহ আমার নাম এবং মোবাইল ফোন নাম্বারও পাঠিয়ে দেন।
কিন্তু অদ্ভুত এক টানে আমি ঢাকায় না থেকে দিনাজপুরে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। বিমানযোগে সৈয়দপুর হয়ে দিনাজপুর পৌঁছে জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালের সেক্রেটারি এ. ক.এম আজাদ এবং আমার স্ত্রী জেসমিনকে মোবাইল ফোনে জানিয়ে দিয়ে আমি সরাসরি জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালে যাই। আমার শারীরিক অবস্থা দেখে জরুরি বিভাগের চিকিৎসকগণ আমাকে দ্রুত আই.সি.ইউ’তে ভর্তি করেন। অক্সিজেনসহ শুরু হয় নিবিড় চিকিৎসা। দিন-রাত চলতে থাকে অসংখ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং চিকিৎসকদের নিরলস প্রচেষ্টা।
সে সময় আমার স্ত্রী এবং ভাইয়ের স্ত্রীরা আমার জন্য যে ভালোবাসা, মমতা ও ত্যাগের পরিচয় দিয়েছেন, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। সে-সময় চিকিৎসার ব্যাপারে তাদের করার তেমন কিছুই ছিল না – তবুও উদ্বেগ, উৎকন্ঠা আর মমতার টানে তারা হাসপাতালের মেঝেতে বসে, মশার কামড় সহ্য করে রাতের পর রাত কাটিয়েছে। সেই ঘটনা আজও আমার হৃদয়ের গভীরে নীরব অশ্রু বইয়ে দেয়।
দীর্ঘ দুই মাস দশ দিনের চিকিৎসা, বিশ্রাম এবং জীবন-সংগ্রামের পর চিকিৎসক, আত্মীয়স্বজন, শুভানুধ্যায়ী, স্ত্রী ও সন্তানের সকল নিষেধ উপেক্ষা করে আবার ঢাকায় ফিরে এলাম। কারণ হৃদয়ের গভীরে এক অদম্য আকুলতা কাজ করছিল – প্রিয় বন্ধুদের কাছে ফিরে যাওয়ার, পরিচিত মুখগুলোর হাসি দেখার, আপনজনের সান্নিধ্যে আবার জীবনকে নতুন করে অনুভব করার।
আজ, ১৪ জুন ২০২৬ রবিবার। সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে এসে যখন সেই প্রিয় সহকর্মী ও বন্ধুদের সঙ্গে আবার দেখা হলো, যখন তাঁদের আলিঙ্গনে নিজেকে সঁপে দিলাম, তখন মনে হলো – আমি যেন মৃত্যুর দুয়ার ছুঁয়ে ফিরে এসে আবার নতুন জীবন লাভ করেছি।
তাঁদের ভালোবাসার উষ্ণতা, আন্তরিকতার স্পর্শ এবং অকৃত্রিম স্নেহ আমার ক্লান্ত হৃদয়ে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে। মনে হয়েছে, হারিয়ে যাওয়া প্রাণশক্তি যেন আবার ফিরে পেয়েছি – নিজের মানুষদের মাঝেই, আপনজনের স্নেহমাখা আলিঙ্গনে।
জীবনের এই পরম উপলব্ধি আমাকে নতুন করে শিখিয়েছে – মানুষ শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকে মানুষের ভালোবাসাতেই। হায়াত থাকলে ওষুধ জীবন বাঁচাতে পারে, কিন্তু হৃদয়ে প্রাণের সঞ্চার করে প্রিয়জনের সান্নিধ্য, বন্ধুদের ভালোবাসা এবং আপন মানুষের স্পর্শ।
লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট এবং জাতীয় সাংবাদিক সোসাইটি ও ওয়ার্ল্ড পীছ অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস সোসাইটির চেয়ারম্যান।