অ্যাডভোকেট এম এ মজিদ,ঢাকা || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ১৬ জুন, ২০২৬ ৩:২৮ অপরাহ্ণ
ছোটবেলা থেকে কলেজজীবন পর্যন্ত আমি কখনোই ধীরস্থির প্রকৃতির মানুষ ছিলাম না। বরং অস্থিরতা, দুরন্তপনা, জেদ আর আত্মবিশ্বাস – এই চারটি শব্দ দিয়েই আমার শৈশব ও কৈশোরকে পরিচালনা করেছি। আমার স্বভাবের বৈশিষ্ট্যগুলো এতটাই প্রকট ছিল যে, আমাদের পরিবারের বিভিন্ন সদস্য আমাকে নানা রকম উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।
আমার ছোট খালাম্মা ছিলেন খুবই সৃজনশীল। তিনি আমাকে দু’টি বিশেষ উপাধি দিয়েছিলেন; প্রথমটি ‘ধার’ এবং দ্বিতীয়টি খান। ধার নামটির পেছনে ছিল আমার দুর্বার গতি ও অস্থিরতা। আমি যেন এক মুহূর্তও স্থির থাকতে পারতাম না। ঘরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে যেতাম এমন বেগে যে, পথে যা কিছু পেতাম, তা কখনো ধাক্কায় সরে যেত, কখনো ভেঙে পড়ত, কখনো বা উল্টে যেত। খালাম্মার ভাষায়, আমি যেন ক্ষুরধার কোনো অস্ত্র – যে পথ দিয়ে যেতাম, চারপাশের সবকিছুকে কেটে-ছেঁটে নিজের উপস্থিতির চিহ্ন রেখে যেতাম বলেই তিনি আদর করে আমাকে ধার’ বলে ডাকতেন।
আর খান উপাধির কারণ ছিল আমার অসাধারণ খাদ্যরুচি। আমার খাওয়ার পরিমাণ দেখে খালাম্মা প্রায়ই বিস্মিত হতেন। তাঁর মনে হতো, আমি যেন একাই কয়েকজনের খাবার সাবাড় করে দিতে পারতাম। মজা করে তিনি আমাকে ‘নর খাদক’ শব্দ দু’টির সংক্ষেপে নখা এর উল্টো শব্দ হিসেবে ‘খান’ বলে ডাকতেন। তাঁর এই ডাকের মধ্যে যেমন ছিল হাস্যরস, তেমনি ছিল অফুরন্ত স্নেহ ও মমতায় ভরা।
আমার আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল প্রবল জেদ। কোনো কাজ অন্য কেউ করতে পারলে, আমি মনে মনে প্রশ্ন তুলতাম, “সে পারলে আমি কেন পারব না? শুধু পারাই নয়, আমি প্রমাণ করতে চাইতাম যে, আমি সেটি তার চাইতে আরও বেশি ভালোভাবে করতে সক্ষম। এই জেদের সবচেয়ে মজার উদাহরণ আমার অগ্রজ মতিউর রহমান ভাইকে কেন্দ্র করে।
মতিউর ভাই ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত শান্তশিষ্ট ও মেধাবী ছিলেন। তিনি কবিতা, গল্প ও ছড়া লিখতেন। সপ্তম শ্রেণিতে পড়াকালেই তার লেখা স্কুলের দেয়াল পত্রিকায় প্রকাশিত হতো। শুধু তাই নয়, দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকাসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও সাহিত্যপত্রিকায়ও তাঁর লেখা ছাপা হতো। পরিবারসহ স্কুল ও পাড়াপ্রতিবেশি সকলেই তার সাহিত্য প্রতিভার প্রশংসা করতেন।
কিন্তু আমার ছিল অন্য অবস্থা। কবিতা লেখার চেষ্টা করলেই শব্দগুলো যেন আমার সঙ্গে লুকোচুরি খেলত। ফলে মনে এক ধরনের প্রতিযোগিতার মনোভাব জন্ম নিল। আমি দৃঢ় সংকল্প করলাম – যেভাবেই হোক, এমন একটি কবিতা লিখব, যা মতিউর ভাইয়ের কবিতাকেও হার মানাবে। সেই সংকল্পে আমি এক রাতে দিস্তার পর দিস্তা সাদা কাগজ নষ্ট করলাম। রাতভর শব্দ খুঁজলাম, ছন্দ মিলালাম, লাইন কাটলাম, আবার লিখলাম। অবশেষে এমন একটি কবিতা লিখে ফেললাম, যার শব্দচয়ন, বর্ণের মাধুর্য এবং ছন্দ দেখে আমি নিজেই বিস্মিত হয়ে গেলাম। মনে হলো, এ যেন আমার নিজের লেখা নয়! ভুলে যাওয়ার ভয় থেকে রক্ষার জন্য সুন্দর একটি খাতায় কবিতাটি যত্ন করে লিখে রাখলাম।
পরদিন সকালে মতিউর ভাইকে ডেকে বললাম,
– দ্যাখ, তোর কবিতার চেয়ে আমার কবিতার মান আর ছন্দ অনেক ভালো।
স্বাভাবিকভাবেই তিনি তা মানতে রাজি হলেন না।
শুরু হলো তর্ক। তর্ক থেকে কথা কাটাকাটি। কথা কাটাকাটি থেকে ধাক্কাধাক্কি। আর আমার স্বভাবসিদ্ধ জেদের কারণে একসময় শুরু হয়ে গেল কিল-ঘুষি, চড়-থাপ্পড় এবং লাথিগুতা।
মতিউর ভাই একসময় চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন। তাঁর কান্না শুনে বাবা ছুটে এলেন। দরজা খুলতেই তিনি দৃশ্য দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন। শুরু হলো আমার ওপর বাবার চড়-থাপ্পড়, লাথি আর কঠোর গালাগালি। আমাকে বাঁচাতে মা এগিয়ে এলে বাবার এলোপাতাড়ি চড় গিয়ে মায়ের নাকে ও মুখে লাগার কারণে মা সামান্য রক্তাক্ত হয়ে পড়েন। মায়ের নাকে ও মুখে রক্ত দেখে বাবার রাগ আরও বেড়ে গেল। ফলে আমার ওপর
শাস্তির মাত্রাও কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেল।
কিন্তু গল্পের আসল রহস্য এখানেই।
বাস্তবে এসবের কিছুই ঘটেনি!
সারারাত যে কবিতা লিখেছিলাম, মতিউর ভাইকে শুনিয়েছিলাম, তার সঙ্গে তর্ক করেছি, মারামারি করেছি – সবই ছিল আমার স্বপ্ন। স্বপ্নের ভেতর আমি এতটাই ডুবে গিয়েছিলাম যে, ঘুমের ঘোরে সত্যিই হাত-পা চালাতে শুরু করেছিলাম। স্বপ্নে আমি মতিউর ভাইকে চড়-থাপ্পড় আর লাথিগুতা মারছিলাম, কিন্তু বাস্তবে সেই আঘাতগুলো গিয়ে পড়ছিল তাঁর গায়েই।
ফলাফল যা হওয়ার তাই হলো। ঘুম ভাঙার পর আবিষ্কার করলাম, স্বপ্নের যুদ্ধের জন্য বাস্তবেই আমাকে বাবার চড়-থাপ্পড়, লাথিগুতা এবং গালাগালির মুখোমুখি হতে হয়েছে।
আজ এত বছর পরে সেই ঘটনাটি স্মরণ করলে আমার মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে ওঠে। জীবনের অসংখ্য স্মৃতির ভিড়ে সেই রাতটি আজও আলাদা হয়ে আছে তার অদ্ভুত রস, সরলতা ও কৌতুকময় পরিণতির জন্য। সেদিন আমি স্বপ্নে একজন সফল কবি হয়েছিলাম, নিজের প্রতিভার জয়ধ্বনি শুনেছিলাম এবং স্বপ্নের ময়দানে মতিউর ভাইয়ের ওপর বিজয়ের পতাকাও উড়িয়েছিলাম। কিন্তু নিয়তির কী নির্মম পরিহাস! স্বপ্নের সেই বীরত্বগাথার মূল্য আমাকে দিতে হয়েছিল বাস্তবের কঠিন শাস্তির মাধ্যমে। স্বপ্নের যুদ্ধে আমি জয়ী হয়েছিলাম বটে, কিন্তু ঘুম ভাঙার পর বাস্তবের আদালতে আমিই ছিলাম একমাত্র আসামি এবং অপরাধী। কবিতার গৌরব, বিজয়ের আনন্দ আর শাস্তির তীব্রতা – সব মিলিয়ে সেই রাতটি আমার জীবনের এক বিরল অভিজ্ঞতা হয়ে আছে; যে রাতে আমি স্বপ্নে কবি হয়েছিলাম, স্বপ্নে জয়ী হয়েছিলাম, কিন্তু বাস্তবে চরমভাবে পরাজিত হয়েছিলাম।
লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট এবং জাতীয় সাংবাদিক সোসাইটি ও ওয়ার্ল্ড পীছ অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস সোসাইটির চেয়ারম্যান।