admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ৬ নভেম্বর, ২০২১ ৮:৪৪ পূর্বাহ্ণ
নোটে আর বাবুদের কোটেই কি শুধু টিকে থাকবেন ভারতের জাতির জনক গান্ধী? মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ভারতের জাতির জনক হলেও তাঁর কদর দুই জায়গায় রয়ে গেছে। স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে জাতির জনকের মর্যাদা পেয়েছেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী – সারা বিশ্বেই যিনি অহিংসা ও সত্যাগ্রহের পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত।কিন্তু আজকের ভারতে, বিশেষ করে গত সাড়ে সাত বছরের বিজেপি আমলে মি. গান্ধীর মতাদর্শ ও ভাবধারা সে দেশে আদৌ কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে সে প্রশ্ন বারে বারে উঠেছে।সম্প্রতি খানিকটা দায়সারা করেই শেষ হয়েছে জাতির জনকের দেড়শো বছর পূর্তি উৎসব – অন্যদিকে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর আততায়ী নাথুরাম গোডসের পূজা ও প্রশস্তি চলছে প্রকাশ্যেই। বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী শক্তি, এমন কী বিজেপি-র এমপিরাও গোডসে-বন্দনায় সামিল হচ্ছেন। ভারতে জাতির জনক হিসেবে আজ মোহনদাস গান্ধী কি তাহলে ক্রমেই বিস্মৃত হচ্ছেন?
এবছরের গান্ধী জন্মজয়ন্তীতে গোডসের বায়োপিক তৈরির কথা পর্যন্ত ঘোষণা করেছে বলিউড।
গোডসে পূজার ধূমঃ গান্ধী-হত্যার ষড়যন্ত্রকারীরা যে সংগঠনের সদস্য ছিলেন, সেই হিন্দু মহাসভা মধ্য ভারতের গোয়ালিয়রে এখনও বেশ সক্রিয়। ওই অঞ্চলে তাদের বেশ প্রভাবও রয়েছে। বছরতিনেক আগে গোয়ালিয়রে সেই অফিসেই তার আততায়ী নাথুরাম গোডসের মূর্তি স্থাপনা করে চলছিল পূজাপাঠ ও আরতি। ১৯৪৯ সালের ১৫ নভেম্বর আম্বালা সেন্ট্রাল জেলে ফাঁসি হয়েছিল গান্ধী হত্যার দায়ে অভিযুক্ত নারায়ণ আপ্তে ও নাথুরাম গোডসের। ওই দিনটিকে হিন্দু মহাসভা প্রতি বছরই বলিদান দিবস হিসেবে পালন করে থাকে – সেবার তার সঙ্গে যোগ হয়েছিল মন্দির স্থাপনা। দুধ-ঘি ঢেলে ধুইয়ে দেওয়া হচ্ছিল ওই দুজন মারাঠি সন্তানের মূর্তি। তাদের ভাষায় শহীদ নারায়ণ আপ্তে ও শহীদ নাথুরাম গোডসের মন্দির তৈরি করে তা মানুষের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য উন্মুক্ত করে দিতে পেরে তারা যে গর্বিত, সে দিন মিডিয়াকে ডেকে সে কথা জানাতেও ভোলেনি হিন্দু মহাসভা। গোডসের প্রশস্তি ভারতে কোনও শাস্তিযোগ্য অপরাধ না-হলেও জাতির জনকের হত্যাকারীকে এভাবে প্রকাশ্যে শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন ভারতে বছরকয়েক আগেও অকল্পনীয় ছিল। কিন্তু এখন দেশের নানা প্রান্তে একই ধরনের ঘটনা আখছার ঘটছে, প্রকাশ্যে বলা হচ্ছে গোডসে দেশের কত বড় উপকার করে গিয়েছিলেন।
বিজেপি নেত্রীর সার্টিফিকেটঃ বিগত সাধারণ নির্বাচনের সময় ভোপালে বিজেপির প্রার্থী প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর তো গোডসে-কে চিরন্তন এক দেশভক্ত বলতেও দ্বিধা করেননি। নিজেই একটি সন্ত্রাসের মামলায় জামিনে থাকা ওই নেত্রী এরপর জিতে এমপি হয়েছেন, সদস্য হয়েছেন প্রতিরক্ষা বিষয়ক পার্লামেন্টারি কমিটিরও। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, গোডসে নিয়ে ওই উক্তির জন্য তিনি প্রজ্ঞা ঠাকুরকে কখনো ক্ষমা করতে পারবেন না – কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি।বহাল তবিয়তে এমপি থাকা ওই গেরুয়াধারী নেত্রী পরে পার্লামেন্টে দাঁড়িয়েও মি. গোডসে-কে দেশভক্তির সার্টিফিকেট দিয়েছেন। নাথুরাম গোডসে কত মহান, বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি কীভাবে গান্ধী-হত্যার হয়ে সাফাই দিয়েছিলেন সে সব পোস্টও অনবরত ঘুরছে ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপে। আর হিন্দু মহাসভার নেতা বিনায়ক দামোদর সাভারকার তো বিজেপি আমলে দেশনায়কেরই মর্যাদা পাচ্ছেন। দুশক আগে অটলবিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন আর একটি বিজেপি সরকারও আন্দামানে পোর্ট ব্লেয়ার বিমানবন্দরের নামকরণ করেছিল বীর সাভারকার – এর নামে।
গোডসে ভক্তরা মেইনস্ট্রিম নয়ঃ বিজেপির পলিসি রিসার্চ সেলের সদস্য ও তাত্ত্বিক নেতা অনির্বাণ গাঙ্গুলি অবশ্য দাবি করছেন গোডসে-ভজনার সঙ্গে বিজেপির মূল ধারার কোনও সম্পর্ক নেই। তিনি বলছিলেন, গোডসের একটা গ্রহণযোগ্যতা বা আকর্ষণ চিরকালই একটা শ্রেণির মধ্যে ছিল। তিনি কেন গান্ধীকে হত্যা করেছেন, গোডসে নিজেও তার যুক্তি দিয়েছিলেন – কেউ তার সঙ্গে একমত হতে পারেন, কেউ বিরোধিতাও করতে পারেন। মি. গাঙ্গুলি বলছেন, গোডসে-কে কেউ যদি নমস্য ব্যক্তি মনে করেন সেটা তার ব্যাপার। তবে আজকাল সোশ্যাল মিডিয়া এসেছে বলে এসব নিয়ে চর্চা হচ্ছে, আগে লোকে সেভাবে জানতেও পারত না। কিন্তু তাই বলে এগুলোকে কি কখনোই ‘মেইনস্ট্রিম’ বা মূল ধারা বলা যাবে? যাবে না। বিজেপি তো আর গোডসের পূজা করছে না, করছে কিছু ফ্রিঞ্জ এলিমেন্ট। আর গোডসে নিজেও তো তার জীবদ্দশাতেই হিন্দু মহাসভা বা সাভারকারকে পর্যন্ত অস্বীকার করেছিলেন,বলছেন তিনি।
বিজেপির ডিএনএ-ই গোডসে-পন্থীঃ কিন্তু ভারতের সাবেক শীর্ষস্থানীয় আমলা ও বর্তমানে তৃণমূল কংগ্রেসের পার্লামেন্টারিয়ান জহর সরকার বলছেন, বিজেপি-আরএসএস-জনসঙ্ঘ-হিন্দু মহাসভা এবং গোডসে-সাভারকারের দর্শন আসলে একই সূত্রে গাঁথা। তিনি জানাচ্ছেন, গোডসে প্রথম জীবনে তো আরএসএসের সদস্য ছিলেন, পরে চলে যান তখন আরও উগ্র হিন্দু মহাসভায়। মি. সরকার বলেন, “সাভারকার নিজেই তখন হিন্দু মহাসভা দেখতেন। ফলে গোডসে-র মধ্যে আরএসএস আর হিন্দু মহাসভা, দুটো খানদান বা ঘরানাই আছে। আর বিজেপির ডিএনএ-ই যে সাভারকারপন্থী বা গোডসে-পন্থী তাতে কোনও সন্দেহই নেই – যে কারণে সাভারকারের মূর্তি দেখলেই মোদী হাঁটু গেড়ে পুজো করতে বসে যান। জহর সরকারের মতে, সাভারকারের লেখালেখি, উক্তি পড়লেই তো বোঝা যায় তিনি আপাদমস্তক গান্ধী-বিরোধী, শান্তি-বিরোধী একটি মানুষ। স্বাধীন ভারতের রাজনীতিতে এরা তো প্রথমে সামিলও হতে চাননি। পরে তিপান্নতে জনসঙ্ঘ গড়লেন। আর রাজনীতিতে থাকতে গেলে কিছু লৌকিকতা, লোকদেখানো করতে হয় – এদের গান্ধী-বন্দনাও সেরকম। পাশাপাশি গোডসে বা সাভারকারকে নিয়ে মাতামাতি এরা কিন্তু চিরকাল চালিয়ে যাবে, বলছিলেন জহর সরকার।
গান্ধী আছেন কৃষক আন্দোলনেঃ কিন্তু নাথুরাম গোডসের প্রশস্তি সামাজিকভাবে গ্রহণীয় হয়ে উঠছে মানেই কি ভারত মোহনদাস গান্ধীকেও বিস্মৃত হচ্ছে? দেশের নামী ইতিহাসবিদ এবং নেহরু স্মারক সংগ্রহশালার সাবেক প্রধান মৃদুলা মুখার্জির স্পষ্ট জবাব, দেশের সাধারণ মানুষ গান্ধীকে না-ভুললেও শাসক শ্রেণি কিন্তু তাঁকে মুছে ফেলতে চাইছে বলেই মনে হচ্ছে।
এই যে দেশের কৃষকরা যে গত এক বছর ধরে গান্ধীর দেখানো সত্যাগ্রহ ও অহিংস প্রতিরোধের পথে আন্দোলন করে যাচ্ছেন, সেটাই বলে দেয় তারা গান্ধীকে মনে রেখেছেন।
গান্ধীর আদর্শ কারও মনঃপূত না-হতেই পারে, কিন্তু তার খুনী যেভাবে আজ গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছেন ড. মুখার্জি সেটা কিছুতেই মেনে নিতে রাজি নন। তিনি বলছেন, এই গোটা বিষয়টাই আসলে অবাস্তব, দু:খজনক ও ক্ষমার অযোগ্য। আদালতে ফাঁসির সাজা পাওয়া হত্যাকারীকে কীভাবে আপনি বীরপূজা করতে পারেন? তাহলে তো গান্ধীর হত্যাকেই জাস্টিফাই করা হয়, তাই না? আর গোডসেকে ঘিরে যারা এই একটা কাল্ট তৈরি করছেন, তাদের বিরুদ্ধে কি আদৌ কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?” প্রশ্ন তার। আসলে সারা ভারতে কোথাও এনিয়ে কোনও এফআইআর পর্যন্তও হয়নি – আর তাতে এতটুকুও অবাক নন গান্ধীর প্রপৌত্র ও লেখক-গবেষক তুষার গান্ধী।মহাত্মা গান্ধী ফাউন্ডেশনে’র প্রেসিডেন্ট মি. গান্ধী বলছিলেন, যারা জানেন প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর ও নরেন্দ্র মোদীর জন্ম আসলে একই আদর্শ ও ভাবধারা থেকে, তাদের আসলে এতে বিস্মিত হওয়ার কিছুই নেই। আগে গোডসের পুজোআচ্চা হত লুকিয়ে-চুরিয়ে, কিন্তু তারা যখন দেখছে দেশের সরকারও একই আদর্শে বিশ্বাস করে তারা সেটাই এখন করছে বুক ফুলিয়ে। কাপুরুষরা আসলে চিরকাল এভাবেই কাজকর্ম করে, বলন তুষার গান্ধী।
গান্ধী, গোডসে আর বলিউডঃ মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর দেড়শো বছর পূর্তিতে প্রধানমন্ত্রী মি. মোদী বলিউড তারকাদের সঙ্গে এক জমকালো বৈঠকে বসেছিলেন। আমির খান-শাহরুখ খান থেকে শুরু করে কঙ্গনা রানাউত-আলিয়া ভাট-সোনম কাপুর সে দিন সবাই এক ছাদের তলায় এসেছিলেন প্রধানমন্ত্রীর ডাকে। উৎসবের সরকারি বিজ্ঞাপনে গলাও দিয়েছিলেন এই তারকাদের অনেকে। বলিউড যাতে গান্ধী’র ভাবধারা নিয়ে ছবি বানায় সেদিন তারও ডাক দিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদী – কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল তেমন ছবি একটিও হয়নি। বরং উল্টে এবছরের গান্ধী জয়ন্তীতে বলিউড নির্মাতা মহেশ মঞ্জরেকর গোডসের জীবন নিয়ে একটি ছবি বানাবেন বলে ঘোষণা করা হয়েছে – যে ছবির প্রযোজকরা এর আগে মি. সাভারকারেরও বায়োপিক বানিয়েছেন। মহেশ মঞ্জরেকর এক বিবৃতিতে বলেছেন, নাথুরাম গোডসের কাহিনি চিরকালই তার খুব প্রিয় – এবং গোডসে ”ঠিক ছিলেন না ভুল, তিনি চান তার সিনেমা দেখে দর্শকরাই সেটা স্থির করবেন।
গোডসে বায়োপিক লঞ্চ করতে গিয়ে তিনি পোস্ট করেছেন মি. গান্ধীর প্রিয় গান ”রঘুপতি রাঘব রাজা রাম। তবে ছবিতে গান্ধী না গোডসে, কার দৃষ্টিভঙ্গী থেকে কাহিনি বলার চেষ্টা হবে তা বুঝতে কোনও কষ্টই হয় না। নরেন্দ্র মোদী ও গান্ধীর গুজরাটি পরিচয় ভারতের প্রাক্তন সংস্কৃতি সচিব ও প্রসার ভারতী বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান জহর সরকার আবার মনে করেন, মোহনদাস গান্ধীর গুজরাটি পরিচয়-টুকু ছাড়া নরেন্দ্র মোদীর কাছে আসলে তার কানাকড়িও দাম নেই। তার কথায়, গান্ধীকে এরা পুরোপুরি ফেলতে পারছে না কারণ গান্ধীকে টিঁকিয়ে রাখলে একটা রাজনৈতিক ফায়দা আছে – সেটাতে স্বার্থ আছে সবারই। দ্বিতীয় কারণটা হল, গুজরাট নিয়ে মোদীর একচোখামি। দেশের প্রধানমন্ত্রী হলেও তিনি অতি নির্লজ্জভাবে গুজরাট-পন্থী, ওই রাজ্যের যেন সবই ভাল। আর গান্ধীও গুজরাটি বলে তিনি তাকে একেবারে বর্জন করছেন না। গান্ধীও গুজরাটি ছিলেন, আমিও তাই – ব্যাস এটুকুই!
মি. সরকারের মন্তব্যঃ গান্ধীর দেড়শো বছর-পূর্তি উৎসবও এরা করল একেবারে নমো নমো করে …আমি সংস্কৃতি মন্ত্রকে থাকাকালীন সরকার রবীন্দ্রনাথ-বিবেকানন্দর বার্ষিকীও করেছে মহাসমারোহে, তার এক শতাংশও এরা গান্ধীর বেলায় করেনি।”
গান্ধীকে মর্যাদা দিয়েছে বিজেপি-ইঃ কিন্তু গত সাড়ে সাত বছরে তাহলে মি. গান্ধীর আদর্শ বাস্তবায়নে মোদী সরকার কি কিছুই করেনি? বিজেপি নেতা অনির্বাণ গাঙ্গুলির বক্তব্য, নিন্দুকরা যা-ই বলুন – তারা আসলে বিগত কংগ্রেস সরকারগুলোর চেয়ে মোহনদাস গান্ধীর প্রতি অনেক বেশি সম্মান দেখিয়েছেন। তিনি বলছিলেন, ‘দেশে গান্ধী যে সব জায়গায় গেছেন বা থেকেছেন সেগুলোর সংরক্ষণের জন্য কংগ্রেস কী করেছে? গান্ধী তো কংগ্রেস দলটাকেই উঠিয়ে দেওয়ার কথা বলেছিলেন।
জাতির জনক জিনিসটাই বোগাস?
কিন্তু গান্ধীর নামাঙ্কিত উন্নয়ন কর্মসূচি এক জিনিস, আর তার সব জাতি-ধর্মকে নিয়ে চলার আদর্শ থেকে একশো আশি ডিগ্রি বিপরীতে ঘুরে রাষ্ট্র পরিচালনা সম্পূর্ণ আর একটা জিনিস – মনে করেন তুষার গান্ধী।তিনি বলছিলেন, “এই যে গান্ধীকে জাতির জনক বলা হয়, এই জিনিসটাই আসলে সম্পূর্ণ অর্থহীন। ভারতে কেউই প্রায় গান্ধীকে সে চোখে দেখে না, সেভাবে অনুসরণও করে না – আর এটা যে আজই প্রথম শুরু হল তাও নয়। কিন্তু এখন সেই জায়গাটা আরও নড়বড়ে হয়ে গেছে বলাই বাহুল্য।
গান্ধী তার গুজরাটি শিকড় নিয়ে গর্বিত ছিলেন ঠিকই, কিন্তু সেই পরিচয় ছাপিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সমগ্র বিশ্ব মানবতার, বলেন তুষার গান্ধী। আজ প্রধানমন্ত্রী একদিকে গর্ব করে বলবেন তিনিও গান্ধীর মতো গুজরাটি – অন্যদিকে তার সরকার দেশের একটা শ্রেণির নাগরিকত্ব পর্যন্ত কাড়তে উঠে পড়ে লাগবেন। এর চেয়ে বড় গান্ধী-বিরোধী পদক্ষেপ আর কিছু হতে পারে বলে আমি মনে করি না, সাফ কথা তুষার গান্ধীর।
ভারতের নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের নেত্রী ও গান্ধীবাদী মেধা পাটকরও মনে করেন, এই সরকারের পথ অহিংসা ও সত্যাগ্রহের রাস্তা থেকে অনেক দূরে! তিনি মনে করেন ভারতে সব সময় এখন যেন একটা মোদী বনাম গান্ধী লড়াই চলছে। এই সরকারের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা সামাজিক – সব মডেলগুলোই গান্ধীর আদর্শের পরিপন্থী। তাদের দল গোডসে জিন্দাবাদ বলে ভোটের প্রচার পর্যন্ত চালায়। কী করে এদের গান্ধীপন্থী বলব যখন অহিংসার বদলে এরা তো সহিংসতাকেই বেছে নিয়েছে, সত্যের বদলে সব সময় মিথ্যার কারবার চালাচ্ছে?
আক্রান্ত গান্ধীর ধর্মনিরপেক্ষতাঃ তবে জহর সরকার মনে করেন, বিজেপি জাতির জনকের সঙ্গে সবচেয়ে বড় প্রতারণা যেটা করেছে সেটা হল তাদের ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতি। ধর্মকে সাথে রেখেও দেশকে ধর্মনিরপেক্ষ রাখার যে মন্ত্র গান্ধী দিয়েছিলেন, সেটাই আজকের ভারত হারাতে বসেছে বলে তার অভিমত। মি সরকার বলছিলেন, “মৌলবাদের বিরুদ্ধে এদেশে সবচেয়ে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন গান্ধী, তাতে এতটুকুও সন্দেহ নেই। নেহরু ধর্ম থেকে দূরত্ব বজায় রাখতেন, কিন্তু গান্ধী দেখিয়েছেন ধর্ম রেখেও কিন্তু আমি ধর্মনিরপেক্ষ হতে পারি। এই যে একটা অদ্ভুত ভারতীয় চরিত্র যাকে বলা যায় মানে বিদেশে ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মকে বর্জন করা, কিন্তু ভারতে সেটার অর্থ হল নিজের ধর্মে বিশ্বাস রেখেও অন্য ধর্মের প্রতি সহনশীলতা দেখানো। মি. সরকারের ব্যাখ্যায়: নেহরু ছিলেন ওয়েস্টার্ন সেকুলার, অ্যান্টি-রিলিজিয়ন – যেটা করলে ভারতে টেকা সম্ভব নয়। কিন্তু ভারতের যেটা সেন্ট্রালিটি বা কেন্দ্রীয় দর্শন – ধার্মিক হয়েও অসাম্প্রদায়িক না-হওয়া এবং সবাইকে নিয়ে চলা – এটা গান্ধীরই অবদান। তিনি রঘুপতি রাঘব গান গাইলেও রামের নামে মসজিদ ভাঙাকে কখনো সমর্থন করতেন না।
আজ সেই রামও নেই, অযোধ্যাও আর নেই আগের মতো। সামগ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায়, ভারতের রাজনীতি-সমাজ-অর্থনীতিতে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী দিন-কে-দিন ক্রমশ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছেন সেটা বোঝাই যাচ্ছে – অন্যদিকে ক্রমশ সরব ও প্রকাশ্য হয়ে উঠছেন নাথুরাম গোডসে-সাভারকারের অনুগামীরা। সেদিনও বোধহয় খুব দূরে নয় – যখন ভারতের জাতির জনক শুধু সরকারি অফিসের দেওয়ালে, বাবুদের কোটপিনে বা কারেন্সি নোটের ছবিতেই শুধু শোভা পাবেন।