admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ২৬ অক্টোবর, ২০২১ ৮:৪৭ পূর্বাহ্ণ
বাংলাদেশের কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাকের ভাত কম খাওয়ার পরামর্শ নিয়ে সমালোচনা। তিনি বলেছেন বিশ্বের যেসব দেশের মানুষজন ভাত খায় সেই তুলনায় বাংলাদেশের মানুষ দ্বিগুণ ভাত খায়। তিনি চালের চাহিদা কমাতে ভাত কম খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে রোববার তিনি এসব মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জনপ্রতি গড়ে প্রায় ২০০ গ্রাম চাল খায়। কিন্তু বাংলাদেশে জনপ্রতি গড়ে চাল খাওয়ার পরিমাণ প্রায় ৪০০ গ্রাম।
বক্তব্যের যেসব সমালোচনা হচ্ছেঃ কৃষিমন্ত্রী অবশ্য আরও বলেছেন, বাংলাদেশকে পুষ্টিসমৃদ্ধ নিরাপদ খাদ্য দেয়াটাই বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু ভাত বাংলাদেশের মানুষের প্রধান খাবার, প্রিয় খাবার। তাই তার এই বক্তব্যের ‘ভাত কম খান’ অংশটির দিকেই বেশিরভাগের মনোযোগ চলে গেছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে অনেকেই হাস্যরস করেছেন। আবার অনেকে তার সমালোচনা করছেন। দেশের প্রথম সারির একটি বাংলা দৈনিকের ফেসবুক পাতায় এই খবরটির নিচে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কমেন্ট পড়েছে। সেখানে ঠাট্টা করে একজন লিখেছেন, “চালের দাম আর একটু বাড়াইয়া দেন এমনিতেই মানুষ কিনতে পারবে না। আর একজনের মন্তব্য, “ধনী ব্যক্তিরা ভাত কম খেয়ে, কাজুবাদাম, খেজুর, আপেল, মাল্টাসহ বিভিন্ন বিদেশি ফল খায়। আর গরু, খাসি, ভেড়ার মাংসতো আছেই। গরীবের ভাত, রুটি সম্বল। এটাও যদি খেতে না দেন তাহলে বেঁচে থাকাই কষ্ট। একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের ফেসবুক পাতায় একজন লিখেছেন, ক্ষেত খামারে কাজ করে দেখেন যে কৃষি কাজ কত কঠিন। কষ্টের কাজ তাই ভাত খাই বেশি। আর একজন লিখেছেন, “আপনারা বাসমতীর কোরমা পোলাও খান। সাধারণ মানুষের ডাল-ভাতও খাওয়া বন্ধ করে দিন। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, এমন বক্তব্য দেয়ার আগে কৃষিমন্ত্রীর সংবেদনশীল হওয়া উচিৎ ছিল কি না।
যেসব কারণে বাংলাদেশের মানুষ ভাত বেশি খায়ঃ পুষ্টিবিদ সৈয়দা শারমিন আক্তার বলছেন, একটি এলাকার মানুষের প্রধান খাবার কি হবে তা নির্ভর করে ওই অঞ্চলের আবহাওয়াগত কারণে যে খাদ্য বেশি উৎপাদন হয় তার উপর। আবহাওয়া ও ভৌগলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবেই ধান চাষের জন্য খুব উৎকৃষ্ট জায়গা। পুরো বাংলাদেশ জুড়ে ধান চাষ হয়। সারা বছর জুড়ে নানা জাতের ধান হয়। তাই বাংলাদেশের মানুষ ভাত বেশি খাবে সেটাই স্বাভাবিক। তিনি বলছেন, একসময় পুরোটাই কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশে খাবারের অভ্যাস কৃষকের দ্বারাই তৈরি হয়েছে।
তার ভাষায়, কৃষকেরা কাজে যাওয়ার আগে দেখবেন সকালে ভরপেট ভাত বা পান্তা ভাত খায়। তাকে সারাদিন রোদে বৃষ্টিতে কাজ করতে হয়। ভাত শরীরে প্রচুর এনার্জি দেয়। বেশিক্ষণ পেট ভরা থাকে। গরমে শরীর ঠাণ্ডা রাখে। ভাতকে বলা হয় ‘সুপার ফুড’। যারা প্রচুর কায়িক পরিশ্রম করে তাদের ভাত দরকার হয়। চালের প্রতিটি অংশ ব্যবহারযোগ্য। চাল দিয়ে ভাত ছাড়াও খিচুড়ি, বিরিয়ানি, পোলাও, পায়েস, ক্ষীর এরকম নানাবিধ খাবার তৈরি করা যায়। চালের গুড়া দিয়ে হরেকরকম পিঠা তৈরি করা যায়। এমন বৈচিত্র্য বেশিরভাগ খাদ্য দ্রব্যের নেই।
দারিদ্র এবং ভাতঃ বাংলাদেশে এখন ধানের পাশাপাশি প্রচুর সবজি, রবি শস্য উৎপাদন হয়, মাছ চাষ হয়। দেশে প্রচুর মুরগির খামার রয়েছে। বাণিজ্যিকভাবে মাংস বিক্রির জন্য খামারে গরু লালনপালন করা হয়। কিন্তু তারপরও দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে এখনও দুই কোটি ১০ লাখ মানুষ অর্থাৎ প্রতি আটজনের মধ্যে একজনের পুষ্টিকর খাবার জোগাড়ের ক্ষমতা নেই। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি এবং বাংলাদেশ সরকারের করা এক যৌথ সমীক্ষায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। অর্থনীতিবিদ নাজনীন আহমেদ বলছেন, বাংলাদেশের মানুষ কেন বেশি ভাত খায় এর সাথে অবশ্যই দারিদ্রের সম্পর্ক রয়েছে।
বেশি কম খাওয়াটা বিষয় নয়। যে জিনিসটা সবচেয়ে সহজে কাছেই পাওয়া যায়, অল্প খরচে বেশি পরিমাণে পাওয়া যায় সেটিই মানুষ খাবে। ভাত বাংলাদেশে সবচেয়ে সহজলভ্য খাবার। সেজন্যেই এখানকার মানুষ এটা খায়। আর্থিক সঙ্গতি না থাকার কারণে পুষ্টিকর সুসম খাদ্য খাওয়ার সামর্থ্য সবার থাকে না। পেট ভরার জন্য বিকল্প খাবার যদি সে কিনতে পারতো তাহলে সে নিশ্চয়ই খেত। তিনি বলছেন, গ্রামে টাকা থাকলেও অনেক সময় পুষ্টিকর খাবার পাওয়া সহজ নয়। কারণ তা বেশি দামে বিক্রির জন্য শহরে চলে আসে। তার ভাষায়, যেকোনো একটি খাবারের উপরে নির্ভরশীলতা হয়ে গেলে দাম যদি অনেক বেড়েও যায় তবুও অভ্যাসগত কারণে সেই খাবারটিই মানুষ কেনে। চালের ক্ষেত্রে সেটি হয়েছে। বাংলাদেশে সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে অনেক খাবার নষ্ট হয়। তাছাড়া বাংলাদেশে যাদের সামর্থ্য রয়েছে তাদের পরিবারে প্রচুর খাবার অপচয় হয়। ভাতের বিকল্প তৈরি করতে হলে সঠিকভাবে সংরক্ষণ এবং অপচয় রোধের উপর জোর দিয়েছেন নাজনীন আহমেদ।
ভাতের যত গুনঃ গুড ফুড সম্প্রতি ভাতের গুনাগুণ নিয়ে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছে। যাতে পুষ্টিবিদ কেরি টরেন্স লিখেছেন, সাদা চালের ভাত শরীরের হজম ব্যবস্থার জন্য উপকারী। সাদা ভাতে যে শর্করা থাকে তা ভাল হজম উপযোগী। সঠিকভাবে রান্না করা হলে এতে দরকারি ফাইবার বা আঁশ জাতীয় উপাদান ভাল পরিমাণে পাওয়া যায়। পাকস্থলীর জন্য সাদা ভাত কোন সমস্যা তৈরি করে না। কেরি টরেন্স লিখেছেন, খেলোয়াড়েরা প্রায়শই ব্যায়ামের পর সাদা চালের ভাত খেয়ে থাকেন। কারণ সাদা ভাতে গ্লাইকোজেন নামের একটি উপাদান রয়েছে যা শরীরে শর্করা সংরক্ষণ করে, গ্লুকোজ তৈরি করে। তাই শারীরিক পরিশ্রমের পর সাদা ভাত খেলে দ্রুত এনার্জি বা কর্মশক্তি তৈরি হয়।
লাল চালের ভাত ওজন কমাতে সাহায্য করতে পারে। কারণ এটির এনার্জি বা কর্মশক্তি তৈরির প্রক্রিয়া সাদা ভাতের চেয়ে ধীর গতির। লাল চাল রক্তে চিনি কমাতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে লাল চাল হৃদযন্ত্রের সমস্যা, কিছু ক্যান্সার বিশেষ করে পাকস্থলী ও অগ্নাশয়ের ক্যান্সার এবং টাইপ-টু ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমায়। অপরিশোধিত চাল সবচেয়ে বেশি পুষ্টিকর। সৈয়দা শারমিন আক্তার বলছেন, সাধারণ ভাতের তুলনায় পান্তাভাতের পুষ্টিগুণ অনেক বেশি। পানিতে ভিজিয়ে রাখার পর ভাতে আয়রন, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাসিয়াম, জিংক, ফসফরাস, ভিটামিন-বি ইত্যাদি পুষ্টিকর খনিজ পদার্থের পরিমাণ বেড়ে যায়। অন্যদিকে শর্করা কমে যায়। হয়ত এসব কারণেই বাংলাদেশের কৃষক, শ্রমিকেরা ভাত বেশি খায়।