অ্যাডভোকেট এম এ মজিদ,ঢাকা || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ২২ আগস্ট, ২০২৬ ৯:৩০ পূর্বাহ্ণ
বাংলাদেশ ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করেছে। সরকারি-বেসরকারি বহু প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল সেবার কথা বলছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন। ওয়েবসাইট আছে, অনলাইন আবেদন আছে, ডিজিটাল রেকর্ডও আছে – তবু একটি সাধারণ সেবা নিতে নাগরিককে দিনের পর দিন, এমনকি মাসের পর মাস অফিসে ঘুরতে হয়, নানা কাগজপত্র জোগাড় করতে হয়।
আজ বাংলাদেশের সব সরকারি প্রতিষ্ঠানের কথা নয়; শুধু মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডগুলোর নাগরিকসেবা নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই।
শিক্ষা বোর্ডের নিয়োগ, বদলি, পদায়ন কিংবা অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক দুর্নীতির বিষয় আজ থাক। আজ প্রশ্ন হলো – একজন শিক্ষার্থী বা অভিভাবক শিক্ষা বোর্ডে একটি প্রয়োজনীয় সেবা নিতে গিয়ে কেন ঘুষ, হয়রানি, দীর্ঘসূত্রিতা ও অযথা দৌড়ঝাঁপের শিকার হবেন?
একটি নাম সংশোধনেও মাসের পর মাস!
ধরা যাক, একজন শিক্ষার্থীর এসএসসি সনদে নামের বানান ভুল হয়েছে। বিদ্যালয়ের মূল রেজিস্টার আছে, প্রধান শিক্ষক তা যাচাই করে প্রত্যয়ন করেছেন এবং শিক্ষা বোর্ডের কাছেও ট্যাবুলেশন শিটসহ প্রয়োজনীয় রেকর্ড সংরক্ষিত আছে। তাহলে এসব তথ্য মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে এত সময় লাগার কারণ কী?
অনেক ক্ষেত্রেই আবেদন মাসের একটি নির্দিষ্ট সভায় উপস্থাপন করতে হয়। সভা মাসে একবার হলে পরবর্তী সভা পর্যন্ত অপেক্ষা; কোরাম না হলে আরও অপেক্ষা। এভাবে একটি সাধারণ সংশোধনের কাজও দীর্ঘায়িত হয়।
প্রশ্ন হলো – একটি নামের বানান সংশোধনের জন্য কি এত বড় সভার প্রয়োজন আছে?
সহজ আবেদনকে সহজভাবে নিষ্পত্তি করা এবং সন্দেহজনক আবেদনকে বিশেষ যাচাইয়ের আওতায় নেওয়াই আধুনিক প্রশাসনের নিয়ম হওয়া উচিত।
ঘুষের অভিযোগ কেন উঠবে? সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো – শিক্ষা বোর্ডের বিভিন্ন সেবা নিয়ে ঘুষ বা অনৈতিক অর্থ দাবির অভিযোগও রয়েছে। কেরানি, পিয়ন, সংশ্লিষ্ট শাখা কিংবা বিভিন্ন পর্যায়ে ফাইল এগিয়ে নেওয়া দ্রুত কাজ করে দেওয়া কিংবা নানা অজুহাতে অতিরিক্ত অর্থ দাবির অভিযোগ রয়েছে।
এটা যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে তা অত্যন্ত ভয়াবহ। সরকার নির্ধারিত ফি দেওয়ার পর একজন নাগরিককে আবার কেন অতিরিক্ত অর্থ দিতে হবে? আর যদি কোথাও এমন সংস্কৃতি তৈরি হয়ে থাকে যে ঘুষ দিলে কাজ দ্রুত হয়, আর না দিলে ফাইল পড়ে থাকে, তাহলে সেটি শুধু দুর্নীতি নয় – রাষ্ট্রীয় সেবার প্রতি মানুষের আস্থার ওপরও আঘাত।
অবশ্য কোনো ব্যক্তি বা কর্মকর্তাকে শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে দোষী বলা যায় না। অভিযোগের যথাযথ তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতেই ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু অভিযোগ যদি নিয়মিতভাবে আসে, তাহলে কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হলো তার সত্যতা যাচাই করা।
পরিদর্শনেও অনিয়মের অভিযোগ নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শাখা অনুমোদন বা বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমে পরিদর্শনের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠান যদি নির্ধারিত নীতিমালা পূরণ করেও কেবল অনৈতিক অর্থ না দেওয়ার কারণে নেতিবাচক প্রতিবেদন পাওয়ার আশঙ্কায় থাকে, তাহলে সেটি অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ।
একজন কর্মকর্তার একটি প্রতিবেদন একটি প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ আটকে দিতে পারে। তাই পরিদর্শন হতে হবে নিরপেক্ষ, প্রমাণভিত্তিক এবং স্বচ্ছ – কোনোভাবেই ব্যক্তিগত লেনদেনের ওপর নির্ভরশীল নয়।
শিক্ষা বোর্ড থেকে সনদ সংশোধন করার জন্য প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের কাছ থেকে এফিডেভিট করাটা আবেদনকারীর জন্য বাধ্যবাদকতামূলক। এফিডাফিট কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের প্রধান উৎস নয়। এটির তথ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মূল রেকর্ড, শিক্ষা বোর্ডের সংরক্ষিত তথ্য এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য দলিল। শুধু এফিডেভিট করলেই তো ঘোষিত তথ্য সত্য হয়ে যায় না।
তারপর এফিডেভিট করতে আইনজীবীর কাছে যেতে হয়, অর্থ দিতে হয়, ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে যেতে হয় – ফলে একজন সাধারণ নাগরিকের ওপর আবারও সময় ও অর্থের চাপ পড়ে।
আর যদি কোথাও এফিডেভিটের নাম্বার, তারিখ, সিল বা অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতার জন্য পেস্কারকে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার অভিযোগ এখন চির সত্য ও চরম বাস্তব নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। সনদ তুলতে বা সংশোধন করতে প্রথম শ্রেণির ম্যাজিট্রেটের এফিডাফিটের কি আদৌ প্রয়োজন আছে? আসলেই নেই। এগুলো শুধু জটিলতা এবং হয়রানির একটি ধাপ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়াও সরকারি সেবার প্রতিটি ধাপে অনানুষ্ঠানিক অর্থ লেনদেনের সুযোগ তো রয়েছেই। কিন্তু এসব অনভিপ্রেত দুর্নীতি বন্ধের কোনো ব্যবস্থা কি আদৌ পরিলক্ষিত হয়?
এফিডেভিট ও অপ্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা
নাম বা তথ্য সংশোধনের মতো বিষয়ে প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের এফিডেভিটের বিষয়টি এখন বাতিল করা উচিত।
আবেদনকারীর ঘোষণার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো – শিক্ষা বোর্ডের সংরক্ষিত তথ্য। সেগুলো যদি পরস্পরের সঙ্গে মিলে যায়, তাহলে অপ্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও আনুষ্ঠানিকতা কমানো উচিত। একইভাবে, সরকারি ফি অনলাইনে জমা দেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নাগরিককে ব্যাংক কিংবা অফিসে ঘুরতে হলে সেটি কোন ধরনের ডিজিটাল সেবা?
এসব সমস্যার সমাধান কিন্তু মোটেও কঠিন নয়।
শিক্ষা বোর্ডের সেবাকে সত্যিকার অর্থে নাগরিকবান্ধব
করতে হলে: অধিকাংশ সেবা সম্পূর্ণ অনলাইনে নিতে হবে,অনলাইনে ফি জমা ও ডিজিটাল রসিদের ব্যবস্থা করতে হবে,প্রতিটি আবেদনের ট্র্যাকিং নম্বর দিতে হবে,
আবেদন কোন কর্মকর্তার কাছে কতদিন ধরে আছে, তা অনলাইনে দেখার সুযোগ দিতে হবে, প্রতিটি সেবার সর্বোচ্চ সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে,সনদ সংশোধনে মাসিক সভা ও অনুমোদন নিয়ম বাতিল করতে হবে,
ঘুষ ও হয়রানির অভিযোগ তদন্তের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা রাখতে হবে, এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তৎক্ষনাৎ আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে শুধু দুর্নীতিবাজকে খুঁজলেই হবে না; দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি করে এমন ব্যবস্থাটিও পরিবর্তন করতে হবে। এসব অনিয়মের পিছনে ভূতটা কোথায়?
শিক্ষা বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রশাসনে অভিজ্ঞ ও যোগ্য কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভাব নেই। প্রযুক্তিও আছে, প্রয়োজনীয় রেকর্ডও আছে। তাহলে একটি সাধারণ নাগরিকসেবা পেতে এত সময়, অর্থ ও শ্রম কেন ব্যয় হবে?