admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ১৬ নভেম্বর, ২০১৯ ৭:৩৩ পূর্বাহ্ণ
সগিরা মোর্শেদ সালাম এবং তিন মেয়ের সঙ্গে তার ছবি। প্রায় ত্রিশ বছর পর নাটকীয়ভাবে উন্মোচিত হয়েছে সগিরা মোর্শেদ সালাম নামে এক নারীর হত্যা রহস্য। ঢাকার ভিকারুননিসা নূন স্কুলের সামনে ১৯৮৯ সালের ২৫শে জুলাই বিকেলে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।সেদিন দৃশ্যত রিকশায় করে যাবার পথে এক মহিলার অলংকার ছিনতাইয়ের চেষ্টার সময় বাধা পেয়ে তাকে গুলি করে দু’জন লোক । কিন্তু আসলে এটা ছিনতাই ছিল না, ছিল এক পরিকল্পিত হত্যাকান্ড – যার পেছনে ছিল পারিবারিক দ্বন্দ্ব। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের এক দীর্ঘ তদন্তে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। সঠিক তথ্য প্রমাণ এবং নানা চাপের মুখে বছরের পর বছর ঝুলে ছিল এই মামলার তদন্ত কাজ। তবে পিবিআই এর জিজ্ঞাসাবাদের মুখে অবশেষে প্রায় তিন দশক পর হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন চার ব্যক্তি।
ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন নিহতের ভাসুর ডা. হাসান আলী চৌধুরী, তার স্ত্রী সায়েদাতুল মাহমুদা শাহীন, মিসেস শাহীনের ভাই আনাস মাহমুদ রেজওয়ান, মারুফ রেজা। তারা চারজনই এখন কারাগারে। পারিবারিক প্রতিহিংসার শিকার হবার কারণেই মিসেস সালামকে হত্যা করা হয়েছিল জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। আঠাশ বছর ধরে ফাইলবন্দি থাকার পর চলতি বছরের ২৬ জুন মামলার উপর স্থগিতাদেশ তুলে নেয় হাইকোর্ট। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের বেঞ্চ এই নির্দেশ দেন। অধিকতর তদন্তের জন্য ১১ জুলাই আদালত মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন পিবিআইকে দায়িত্ব দেন । ৬০ দিনের মধ্যে মামলাটির অধিকতর তদন্ত শেষ করতে একইসঙ্গে তদন্ত শেষ হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে বিচারকাজ শেষ করতে পিবিআইকে নির্দেশ দেয় আদালত। শুরু থেকে পুরো তদন্ত তদারকির দায়িত্বে ছিলেন পিবিআই এর পুলিশ সুপার মোঃশাহাদাত হোসেন তিনি জানিয়েছেন তদন্তের আদ্যোপান্ত।

পিবিআই এর লোগো।
ঘটনার ত্রিশ বছর পর মূল প্রত্যক্ষদর্শীকে খুঁজে বের করা
আদালতের নির্দেশ পাওয়ার পর পিবিআই এর তদন্ত দল পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ থেকে মামলার ফাইলটি নিয়ে আসেন। পুরো ঘটনা বিশ্লেষণে তদন্ত কর্মকর্তাদের মনে প্রশ্ন জাগে, ছিনতাইয়ের জন্য প্রকাশ্য দিবালোকে এভাবে কি কোন খুন হতে পারে? এরপর ঘটনাস্থল একাধিকবার পরিদর্শন করে এবং খোঁজ খবর নিয়ে তারা জানতে পারেন যে এই এলাকায় বহুবার চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু কখনও কাউকে হত্যা করা হয়নি। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার একমাত্র উপায় ছিল ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সেই রিকসা চালক আবদুস সালামতে খুঁজে বের করা। যার বয়স বর্তমানে ৫৫ বছর। মামলার ফাইলে তার ঠিকানা দেয়া ছিল জামালপুর জেলায়। সেটার সূত্র ধরে পুলিশ তার অবস্থান নির্ণয়ের করতে গিয়ে জানতে পারেন যে তিনি বর্তমানে ঢাকায় আছেন। কিন্তু তার কোন ঠিকানা বা ফোন নম্বর পাওয়া যায়নি।
এরপর পুলিশ টানা কয়েক মাস ভিকারুন্নেসা নূন স্কুলের আশেপাশের রিকশা গ্যারেজগুলোয় প্রবীণ রিকশা চালকদের কাছ থেকে খোঁজ খবর নিতে শুরু করেন। এক পর্যায়ে এক প্রবীণ রিকশা চালক আবদুস সালামের খোঁজ দেন। তবে তিনি তার কোন ঠিকানা দিতে পারেননি। আবদুস সালাম প্রতিদিন একটি দোকানে আসেন, পুলিশকে ওই রিকশাচালক সেই দোকানের ফোন নম্বরটি দেন। পরে ওই নম্বরে তদন্ত কর্মকর্তারা যোগাযোগ করলে দোকান কর্মকর্তা জানান আবদুস সালাম তার পাশেই রয়েছে। পরে ফোনে তার কাছে জানতে চাওয়া হয় এই ১৯৮৯ সালের ঘটনা সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন কিনা। আবদুস সালাম বলেন যে তিনি এ বিষয়ে জানেন। পরে তাকে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
যেভাবে হত্যা করা হয়েছিল মিসেস সগিরাকে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে রিকশাচালক আবদুস সালাম জানান, ঘটনার দিন বিকেলে ভিকারুন্নেসা স্কুলের কাছে মোটর সাইকেলে করে আসা দুই যুবক তাদের রিকশার পথ আটকে দাঁড়ায়। ওই দুই যুবক সে সময় দেখতে কেমন ছিলেন তার শারীরিক গড়নের বর্ণনা দেন আবদুস সালাম। যা পরবর্তীতে পুলিশের কাজে লাগে। প্রথমে তারা মিসেস সালামের হাতব্যাগটি ছিনিয়ে নেয় এবং তার পরনে থাকা স্বর্ণের বালা ধরে টানাটানি শুরু করে। এসময় মিসেস সগিরা তাদের একজনকে দেখে বলেন, ‘আমি আপনাকে চিনি এবং তার নামটিও বলেন। এই কথা বলার পরই অপর যুবক পিস্তল বের করে মিসেস সগিরাকে লক্ষ্য করে দুটি গুলি ছোঁড়েন। এ সময় আশেপাশে লোকজন জড়ো হতে শুরু করলে তারা আরও কয়েকটি ফাঁকা গুলি করে মৌচাকের দিকে পালিয়ে যায়। রিকশাচালক তাদেরকে তাড়া করলেও রাস্তার কোন মানুষ অভিযুক্ত দুজনকে থামাতে আসেনি বলে জানান মি. শাহাদাত। এদিকে ঘটনাস্থল অতিক্রম করার সময় এক ব্যক্তি মিসেস সগিরাকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে পেয়ে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

বাংলাদেশ পুলিশ।
বাংলাদেশ পুলিশ।
ছিনতাই নয়, পরিকল্পিত খুন মিসেস সগিরা যেহেতু ছিনতাইকারীকে চিনতে পেরেছেন এবং তার পরপরই তাকে হত্যা করা হয়েছে, এর অর্থ খুনিদের কেউ তার পরিচিত হবেন। এবং তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।বলেন মি.শাহাদাত। এ বিষয়টি খতিয়ে দেখতে গত তিন মাসে বিভিন্ন সাক্ষ্য গ্রহণ করার পর পারিবারিক কলহের বিষয়টি সামনে আসে। এরপর রিকশাচালক হত্যাকাণ্ডে জড়িত দু’জনের যে শারীরিক বর্ণনা দিয়েছিলেন। তার সঙ্গে মিসেস শাহীনের ভাই আনাস মাহমুদ রেজওয়ান ও মারুফ রেজার মিল পান। চলতি মাসের ১০ তারিখ মি. রেজওয়ানকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ১২ নভেম্বর ধানমন্ডির বাসা থেকে গ্রেপ্তার হন ডা. হাসান আলী চৌধুরী ও তার স্ত্রী সায়েদাতুল মাহমুদা শাহিন। ১৩ নভেম্বর গ্রেপ্তার হন মারুফ রেজা। পরদিন খুনে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন তারা। পুলিশের কাছে জবানবন্দিতে মি. রেজওয়ানকে বলেন,বোন শাহিন ও ভগ্নীপতি হাসানের পরিকল্পনায় তিনি ও মারুফ রেজা হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়ন করেছেন।
পারিবারিক কলহের কারণ উদঘাটন হয় যেভাবে পারিবারিক কলহের জেরে এই হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছে বলে পিবিআই এর তদন্তে বেরিয়ে এসেছে।
ঘটনার সূত্রপাত ১৯৮৫ সাল থেকে। নিহতের স্বামী এবং বাদী সালাম চৌধুরী তার তিন ভাইয়ের মধ্য সবার কনিষ্ঠ। চাকরি সূত্রে মি. সালাম তার পরিবারকে নিয়ে ইরাকে থাকলেও ১৯৮৪ সালে ইরাক-ইরান যুদ্ধের কারণে তাদেরকে বাংলাদেশে ফিরে আসতে হয়। তখন থেকে তিনি ঢাকায় রাজারবাগ পেট্রোল পাম্পের পৈত্রিক বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। দোতালা বাসার নীচতলায় বড় ভাই সামসুল আলম চৌধুরীর থাকতেন। ওপরের তলায় থাকতেন সালাম দম্পতি ও তাদের তিন মেয়ে। মেঝ ভাই ডা.হাসান আলী চৌধুরী স্ত্রী-সন্তানসহ লিবিয়ায় থাকলেও ১৯৮৫ সালে তারাও দেশে ফিরে আসেন।
| Sun | Mon | Tue | Wed | Thu | Fri | Sat |
|---|---|---|---|---|---|---|
| 1 | 2 | |||||
| 3 | 4 | 5 | 6 | 7 | 8 | 9 |
| 10 | 11 | 12 | 13 | 14 | 15 | 16 |
| 17 | 18 | 19 | 20 | 21 | 22 | 23 |
| 24 | 25 | 26 | 27 | 28 | 29 | 30 |
| 31 | ||||||