অ্যাডভোকেট এম এ মজিদ,ঢাকা || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ৩১ মে, ২০২৬ ৩:৪৯ অপরাহ্ণ
কোনো জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে। একটি দেশের শ্রেণিকক্ষে যে মূল্যবোধ, যে জ্ঞান, যে নাগরিক চেতনা এবং যে সামাজিক দর্শনের বীজ রোপণ করা হয়, ভবিষ্যতের রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সমাজকাঠামো তারই প্রতিফলন হয়ে ওঠে। এ কারণেই পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো শিক্ষাকে শুধু একটি খাত হিসেবে দেখে না; তারা এটিকে জাতীয় উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে আজ শিক্ষা ক্রমশ একটি শ্রেণিভিত্তিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে, যেখানে একজন শিশুর ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ধারিত হচ্ছে তার পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যের ওপর।
বর্তমান বাংলাদেশে একই দেশের নাগরিক হয়েও শিশুরা বিভিন্ন ধরনের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে বিভক্ত। বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি মাধ্যম, ইংরেজি ভার্সন, মাদ্রাসা শিক্ষা, আন্তর্জাতিক কারিকুলাম – সব মিলিয়ে শিক্ষার একটি বহুমাত্রিক কাঠামো গড়ে উঠেছে। শুধু তাই নয়, একই শিক্ষাধারার মধ্যেও রয়েছে বিস্তর বৈষম্য। রাজধানী ঢাকার কিছু অভিজাত বিদ্যালয়ে মাসিক বেতন ১০ হাজার, ২০ হাজার, এমনকি ৫০ হাজার টাকারও বেশি। অন্যদিকে দেশের হাজার হাজার সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় এখনও শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং নানা ধরনের সমস্যার সঙ্গে সংগ্রাম করছে।
প্রশ্ন হলো, একটি রাষ্ট্রে কি এমন হওয়া উচিত যে একজন শিল্পপতি, ব্যবসায়ী বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সন্তান আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত, আন্তর্জাতিক মানের পরিবেশে পড়াশোনা করবে, আর একজন কৃষক, শ্রমিক বা নিম্ন আয়ের কর্মজীবী মানুষের সন্তান ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত থাকবে? জন্মগত অর্থনৈতিক অবস্থানের কারণে শিক্ষার সুযোগে এমন বৈষম্য কি একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
বাংলাদেশের সংবিধান এই প্রশ্নের উত্তর বহু আগেই দিয়ে দিয়েছে। সংবিধানের ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে “একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা” প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সংবিধান প্রণেতাদের উপলব্ধি ছিল স্পষ্ট – একটি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ, বৈষম্যহীন ও আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে হলে শিক্ষার সুযোগ সবার জন্য সমান হতে হবে। কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর আমরা এখনও সেই সাংবিধানিক আদর্শ বাস্তবায়ন করতে পারিনি।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য অত্যন্ত শিক্ষণীয়। ফিনল্যান্ডকে আজ বিশ্বের অন্যতম সফল শিক্ষাব্যবস্থার দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেখানে সরকারি বিদ্যালয়গুলো এতটাই মানসম্পন্ন যে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বিদ্যালয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায় না। একজন মন্ত্রী, একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, একজন ডাক্তার কিংবা একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী।
সবার সন্তান একই ধরনের সরকারি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে পারে। ফলে শিক্ষার মান উন্নয়নের দাবি সমাজের সব স্তর থেকেই সমানভাবে উঠে আসে। নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক এবং আইসল্যান্ডের মতো নর্ডিক দেশগুলোতেও একই চিত্র দেখা যায়। এসব দেশে শিক্ষাকে ব্যবসা হিসেবে নয়, মৌলিক নাগরিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। রাষ্ট্র বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে সরকারি বিদ্যালয়গুলোকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যেখানে বেসরকারি শিক্ষার প্রতি নির্ভরশীলতা অত্যন্ত সীমিত।
জাপানের কথাও উল্লেখ করা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়ানো দেশটি শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছিল। আজ জাপানের সরকারি বিদ্যালয়গুলো বিশ্বের অন্যতম সেরা হিসেবে স্বীকৃত। দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক বিস্ময়ের পেছনেও রয়েছে সর্বজনীন ও মানসম্পন্ন শিক্ষার শক্ত ভিত্তি।
অনেকে যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ দেন। সেখানে বেসরকারি বিদ্যালয় থাকলেও অধিকাংশ শিক্ষার্থী সরকারি স্কুলেই পড়াশোনা করে। স্থানীয় সরকার, অভিভাবক এবং নাগরিক সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে পাবলিক স্কুল ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা হয়েছে। একজন ধনী পরিবারের সন্তানও প্রায়শই তার আবাসিক এলাকার সরকারি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। কারণ সেই বিদ্যালয়ের মান নিয়ে সমাজের প্রভাবশালী অংশও সমানভাবে উদ্বিগ্ন থাকে।
বাংলাদেশে বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে সমাজের বিত্তশালী ও প্রভাবশালী অংশের একটি বড় অংশ সরকারি বিদ্যালয় ব্যবস্থার বাইরে অবস্থান করছে। ফলে সরকারি বিদ্যালয়ের মানোন্নয়নের জন্য যে সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপ থাকা প্রয়োজন, তা অনেক ক্ষেত্রে তৈরি হয় না। যাদের হাতে নীতিনির্ধারণের ক্ষমতা, তাদের সন্তানরা যদি একই শিক্ষাব্যবস্থার অংশ না হয়, তাহলে সেই ব্যবস্থার দুর্বলতা অনেক সময় তাদের কাছে সরাসরি অনুভূত হয় না।
তবে একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা বলতে সব বেসরকারি বিদ্যালয় রাতারাতি বন্ধ করে দেওয়াকে বোঝায় না। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রনৈতিক লক্ষ্য। এর অর্থ হলো – দেশের প্রতিটি শিশুর জন্য এমন মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা, যাতে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে শিক্ষাগত সুযোগের ব্যবধান ক্রমশ কমে আসে। সরকারি বিদ্যালয়গুলোকে এমন পর্যায়ে উন্নীত করতে হবে, যেখানে অভিভাবকরা বাধ্য হয়ে নয়, আস্থা ও সন্তুষ্টি নিয়ে তাদের সন্তানদের ভর্তি করাবেন।
এ জন্য প্রথমত শিক্ষাখাতে জাতীয় বাজেটের বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে। বহু উন্নত দেশে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) উল্লেখযোগ্য অংশ শিক্ষাখাতে ব্যয় করা হয়। বাংলাদেশেও শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের মান উন্নত করতে হবে। বিশ্বের কোনো শিক্ষাব্যবস্থা তার শিক্ষকের মানের চেয়ে উন্নত হতে পারে না। তৃতীয়ত, শহর ও গ্রামের বিদ্যালয়ের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করতে হবে। চতুর্থত, শিক্ষা প্রশাসনে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমাদের সমাজকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে – আমরা কি শিক্ষা ব্যবস্থাকে সামাজিক বিভাজনের হাতিয়ার হিসেবে রাখব, নাকি জাতীয় ঐক্য ও সমতার ভিত্তি হিসেবে গড়ে তুলব? যদি আমরা সত্যিই বৈষম্যহীন, উন্নত ও মানবিক বাংলাদেশ চাই, তাহলে শিক্ষাক্ষেত্রে বিদ্যমান বৈষম্য কমানোর কোনো বিকল্প নেই।
একটি শিশু যখন বিদ্যালয়ের দরজায় প্রবেশ করে, তখন তার পরিচয় হওয়া উচিত শুধু একজন শিক্ষার্থী হিসেবে; ধনী বা দরিদ্র হিসেবে নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সেই শিশুর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। কারণ আজকের শ্রেণিকক্ষেই আগামী দিনের বাংলাদেশ নির্মিত হচ্ছে। সেখানে যদি বৈষম্যের দেয়াল তৈরি হয়, তবে ভবিষ্যতের সমাজেও সেই বিভাজন থেকে যাবে। আর যদি সমতার ভিত্তি নির্মিত হয়,তবে বাংলাদেশও একদিন এমন একটি রাষ্ট্রে পরিণত হবে, যেখানে মানুষের ভাগ্য নির্ধারিত হবে তার মেধা, শ্রম ও সততার দ্বারা – তার পিতার ব্যাংক হিসাবের আকার দ্বারা নয়।
লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের এ্যাডভোকেট এবং জাতীয় সাংবাদিক সোসাইটি ও ওয়ার্ল্ড পীছ অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস সোসাইটি চেয়ারম্যান।
| Sun | Mon | Tue | Wed | Thu | Fri | Sat |
|---|---|---|---|---|---|---|
| 1 | 2 | 3 | 4 | 5 | 6 | |
| 7 | 8 | 9 | 10 | 11 | 12 | 13 |
| 14 | 15 | 16 | 17 | 18 | 19 | 20 |
| 21 | 22 | 23 | 24 | 25 | 26 | 27 |
| 28 | 29 | 30 | ||||