অ্যাডভোকের এম এ মজিদ || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ৬ অক্টোবর, ২০২৬ ৯:৩৮ পূর্বাহ্ণ
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেছে। এই দীর্ঘ সময়ে দেশের অবকাঠামো, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ নানা ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু যাঁদের আত্মত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে এই স্বাধীন বাংলাদেশ – সেই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকের জীবন আজও নানা সীমাবদ্ধতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটছে। তাঁদের জন্য রাষ্ট্রীয় সম্মান ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা রয়েছে, এটি নিঃসন্দেহে স্বস্তির বিষয়। তবে তাঁদের জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনগুলোর একটি হলো – উন্নত ও সহজলভ্য চিকিৎসাসেবা নিয়ে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার সময় এসেছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও বক্তব্য অনুসারে ১ লাখ ৯৮ হাজার ৩৭ জন। কিন্তু এখন পর্যন্ত জীবিত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা’ নির্ধারণ করা হয় নাই। কারণ ভাতা পাওয়া ব্যক্তির সংখ্যা আর বর্তমানে জীবিত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা এক নয়। ২০২৬ সালের জুলাই মাসের তথ্য অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ১ লাখ ৭৮ হাজার ৩৭ জন বলে যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, সেটিও মোট স্বীকৃত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা। এর মধ্যে বর্তমানে কতজন জীবিত—তার নির্ভুল, হালনাগাদ ও সর্বজনগ্রাহ্য হিসাব থাকা অত্যন্ত জরুরি। অথচ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কাছেও যদি এ বিষয়ে নির্ভুল তথ্য না থাকে, তবে বিষয়টি নিঃসন্দেহে উদ্বেগের। একজন নাগরিকের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তিনি জীবিত আছেন কি-না, বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে – সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
ধরে নেওয়া যাক, কোনো কারণে মোট মুক্তিযোদ্ধার প্রায় অর্ধেক ইতিমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন। সে হিসাবে জীবিত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা আনুমানিক ৮৯ হাজারের কাছাকাছি হতে পারে। এটি অবশ্য কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নয়; একটি অনুমানমাত্র। এই অনুমানের ভিত্তিতে বলা যায়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এখনো বিপুলসংখ্যক বীর মুক্তিযোদ্ধা জীবিত আছেন এবং তাঁদের একটি বড় অংশ বয়সজনিত নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত।
এখানে আরেকটি বাস্তবতার কথাও বিবেচনা করা প্রয়োজন। জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের সবাই আর্থিকভাবে অসচ্ছল নন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই স্বচ্ছল ও নিজের চিকিৎসার ব্যয় বহনে সক্ষম। আবার এমন একটি বড় অংশও রয়েছেন, যাঁদের সীমিত আয় বা আর্থিক সামর্থ্যের কারণে জটিল ও ব্যয়বহুল চিকিৎসা নেওয়া কঠিন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হৃদরোগ, কিডনি, ডায়াবেটিস, ক্যানসার, চোখের সমস্যা, হাড়-জোড়ের সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপসহ নানা রোগের চিকিৎসা ও নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হয়। এসব চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি এবং ব্যয়বহুলও হতে পারে।
সরকারি চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন
বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালগুলো সাধারণ মানুষের চিকিৎসার প্রধান আশ্রয়স্থল হওয়ার কথা। বাস্তবে এসব হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, পরিচ্ছন্নতা, শয্যা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে নানা অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অনেক চিকিৎসক সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও আন্তরিকতার সঙ্গে রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
তবে সরকারি হাসপাতালের সেবার মান নিয়ে সাধারণ মানুষের যে অসন্তোষ রয়েছে, সেটিও অস্বীকার করার উপায় নেই। চিকিৎসকের কর্মঘণ্টা, সরকারি হাসপাতালের বাইরে ব্যক্তিগত চেম্বার বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসাসেবা দেওয়া, রোগীর সঙ্গে আচরণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ ও হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা – এসব বিষয়ে কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহি প্রয়োজন।
সরকারি হাসপাতালের পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি নষ্ট থাকা কিংবা দীর্ঘদিন অচল পড়ে থাকার অভিযোগও প্রায়ই শোনা যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগীদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা করাতে যেতে হয়। এসব অভিযোগের সত্যতা থাকলে তা অত্যন্ত গুরুতর বিষয় এবং স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে কারণ ও দায় নির্ধারণ করা প্রয়োজন। তবে কোনো প্রমাণ ছাড়া কমিশন বা আর্থিক স্বার্থের কারণে যন্ত্রপাতি অচল রাখা হয় – এমন অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়।
কারণ একটি বিষয় স্পষ্ট – সরকারি হাসপাতাল যদি জনগণের আস্থা হারায়, তাহলে চিকিৎসার ব্যয়ভার ক্রমেই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে।
বেসরকারি চিকিৎসায় মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিশেষ সুবিধা কেন নয়?
এই বাস্তবতার মধ্যেই একটি মানবিক ও বাস্তবসম্মত প্রস্তাব বিবেচনা করা যেতে পারে। দেশের বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানগুলো যদি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় অন্তত ৫০ শতাংশ ছাড় দেয়, তাহলে কেমন হয়?
বাংলাদেশে বেসরকারি চিকিৎসাব্যবস্থা এখন স্বাস্থ্যসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শহর থেকে জেলা-উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত অসংখ্য বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠান মূলত বাণিজ্যিক কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হয় – এটি বাস্তবতা। ফলে সব চিকিৎসা বিনা মূল্যে দেওয়ার দাবি বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে। কিন্তু ৫০ শতাংশ ছাড়ের একটি জাতীয় উদ্যোগ কি অসম্ভব?
বরং এটিকে বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতের সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
ধরা যাক, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যয় ৫ হাজার টাকা। ৫০ শতাংশ ছাড় পেলে তাঁকে দিতে হবে ২ হাজার ৫০০ টাকা। কোনো বড় অস্ত্রোপচার বা দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ক্ষেত্রে এই ছাড়ের পরিমাণ আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একজন প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধার পরিবারের জন্য এই সাশ্রয় হয়তো চিকিৎসা নেওয়া এবং চিকিৎসা না নেওয়ার মধ্যে পার্থক্য তৈরি করতে পারে।
আর বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর জন্যও এর একটি ইতিবাচক দিক রয়েছে। তাঁরা শুধু একজন রোগীকে সেবা দেবেন না; একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি নিজেদের সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রকাশ ঘটাবেন। একটি হাসপাতালের প্রবেশদ্বারে যদি লেখা থাকে – “বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ৫০ শতাংশ ছাড়” – তাহলে সেটি নিছক একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের পরিচয় বহন করবে না; বরং প্রতিষ্ঠানটির সামাজিক মর্যাদাও বাড়াবে।
সরকার কি প্রণোদনা দিতে পারে না?
এ ক্ষেত্রে সরকারও একটি সমন্বিত নীতি গ্রহণ করতে পারে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং বেসরকারি হাসপাতাল মালিকদের সংগঠনগুলো যৌথভাবে একটি জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে। দেশের যেসব বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার এই কর্মসূচিতে যুক্ত হবে, তাদের একটি সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া যেতে পারে।
এমনকি সরকার চাইলে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দিষ্ট কিছু কর-সুবিধা, সনদ বা অন্যান্য প্রণোদনার আওতায় আনতে পারে। এতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর পুরো ব্যয়ের বোঝা পড়বে না, আবার মুক্তিযোদ্ধারাও বাস্তব সুবিধা পাবেন।
আরও একটি বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে – একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়পত্র বা যাচাইকৃত ডাটাবেজের মাধ্যমে এই সুবিধা দেওয়া। এতে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে সুবিধা নেওয়ার সুযোগ কমবে এবং প্রকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধারা সহজেই দেশের যেকোনো অংশে সুবিধাটি গ্রহণ করতে পারবেন।
এটি করুণা নয়, রাষ্ট্রীয় সম্মানের একটি বহিঃপ্রকাশ
বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসায় ছাড় দেওয়ার প্রস্তাবকে ‘দয়া’ বা ‘করুণা’ হিসেবে দেখার কোনো কারণ নেই। এটি তাঁদের প্রতি জাতির ঋণ স্বীকারের একটি সামান্য প্রয়াস।
একজন মুক্তিযোদ্ধা যখন হাসপাতালের কাউন্টারে গিয়ে তাঁর পরিচয়পত্র দেখাবেন, তখন তাঁকে যেন কোনো বিশেষ অনুগ্রহ চাইতে না হয়। তাঁর জন্য একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকবে – তিনি দেশের একজন স্বীকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা; তাই চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তিনি নির্ধারিত সুবিধা পাবেন। এতে তাঁর আত্মমর্যাদাও অক্ষুণ্ন থাকবে।
স্বাধীনতার জন্য যাঁরা জীবন বাজি রেখেছিলেন, তাঁদের জীবনের শেষ অধ্যায়টি যেন অর্থাভাবে চিকিৎসাবঞ্চিত হয়ে না কাটে – এটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়েরই নৈতিক দায়িত্ব।
এখনই উদ্যোগ নেওয়া দরকার
তাই ২০২৬ সালের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে সরকারের কাছে প্রথম দাবি হওয়া উচিত – দেশে বর্তমানে কতজন বীর মুক্তিযোদ্ধা জীবিত আছেন, তার একটি নির্ভুল ও হালনাগাদ তালিকা দ্রুত প্রকাশ করা। এরপর তাঁদের চিকিৎসা-সুবিধা নিয়ে একটি বাস্তবসম্মত জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন করা যেতে পারে।
একই সঙ্গে দেশের বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো যেতে পারে—তারা যেন স্বেচ্ছায় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় অন্তত ৫০ শতাংশ ছাড় দেওয়ার উদ্যোগ নেন। আর যদি স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ যথেষ্ট না হয়, তাহলে সরকার সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে একটি জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে।
যাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা স্বাধীন দেশে বসবাস করছি, তাঁদের জন্য ৫০ শতাংশ চিকিৎসা-ছাড়ের ব্যবস্থা করা কোনো বড় দাবি নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত – যাঁরা নিজেদের জীবনকে শতভাগ বাজি রেখে যুদ্ধ করে দেশটিকে স্বাধীন করে দিয়েছেন, তাঁদের জীবনের শেষ বয়সে আমরা তাঁদের জন্য আর কতটুকু করতে পারি?
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা শুধু বক্তৃতা, স্লোগান কিংবা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সেই চেতনার সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ হতে পারে একজন প্রবীণ বীর মুক্তিযোদ্ধার হাসপাতালের দরজায় গিয়ে চিকিৎসা পাওয়ার নিশ্চয়তা।
স্বাধীনতার জন্য যাঁরা যুদ্ধ করেছেন, তাঁদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে অন্তত ৫০ শতাংশ ছাড় নিশ্চিত করা তাই কোনো অনুগ্রহ নয় – এটি হতে পারে একটি স্বাধীন জাতির পক্ষ থেকে তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি ন্যূনতম কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন। বিষয়টি অনেক বিলম্ব হয়ে গেছে। এখন আর বিলম্ব নয, এটি দ্রুত কার্যকর করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এখনই সময়।
লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট, জাতীয় সাংবাদিক সোসাইটি এবং ওয়ার্ল্ড পীছ অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস সোসাইটির চেয়ারম্যান।