অ্যাডভোকেট এম এ মজিদ,ঢাকা || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ৫ জুন, ২০২৬ ১২:৪৪ পূর্বাহ্ণ
১৯৭১ সালের সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোতে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতায় বাংলার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল আর জনপদের পর জনপদ রক্তে রঞ্জিত হচ্ছিল, তখন বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে একদল তরুণ, যুবক, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র ও দেশপ্রেমিক মানুষ মৃত্যুকে উপেক্ষা করে বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। তাঁদের অধিকাংশই জানতেন, এই যাত্রা ফিরে আসার যাত্রা নয়। তাঁরা নিশ্চিত ছিলেন বিজয়ের কিন্তু নিশ্চিত ছিলেন না তাঁরা জীবন নিয়ে ফিরে আসতে পারবেন কি-না! তবু তাঁরা ক্ষিপ্র পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তাঁদের কাছে নিজের জীবনের চেয়েও বড় ছিল একটি স্বপ্ন – একটি স্বাধীন, সার্বভৌম, শোষণমুক্ত, মর্যাদাসম্পন্ন বাংলাদেশ।
তাঁরা জীবনকে শতভাগ বাজি রেখেছিলেন। কেউ মায়ের কোল ছেড়েছিলেন, কেউ নববধূকে, কেউবা শিশু সন্তানের মুখ। বুকভরা স্বপ্ন আর হাতে একটি রাইফেল নিয়ে তাঁরা ছুটে গিয়েছিলেন যুদ্ধক্ষেত্রে। অনেকেই ফিরেছেন বিজয়ের পতাকা নিয়ে, অনেকেই ফিরেছেন ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়ে, আর অসংখ্যজন ফিরেছেন শহীদের রক্তাক্ত ইতিহাস হয়ে।
আজ স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে এক বেদনাময় প্রশ্ন বারবার সামনে এসে দাঁড়ায় – সেই বীর মুক্তিযোদ্ধারা কি তাঁদের আত্মত্যাগের যথার্থ সম্মান ও মূল্যায়ন পেয়েছেন?
প্রশ্নটির উত্তর দিতে গেলে হৃদয় ভারী হয়ে আসে।
স্বাধীনতার স্বপক্ষের দাবিদার বিভিন্ন সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে অসংখ্য ভাষণ দিয়েছে, প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, নানা অনুষ্ঠান, সেমিনার, সেম্পুজিয়াম করেছে। কিন্তু বাস্তব জীবনে তাঁদের সামাজিক মর্যাদা ও জীবনমান উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় অনেক কার্যকর উদ্যোগ আজও অপূর্ণ রয়ে গেছে। বরং কখনো কখনো অতিরিক্ত রাজনৈতিক প্রচার ও ব্যবহার তাঁদের একটি অংশকে সাধারণ মানুষের ঈর্ষা, বিরূপ সমালোচনা কিংবা অযাচিত বিদ্বেষের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক হলো, দেশের অধিকাংশ প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধার জন্য আজও এমন কোনো সর্বজনীন মর্যাদাপূর্ণ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি, যা তাঁদের জীবনের শেষ প্রহরে সামান্য স্বস্তি এনে দিতে পারে। বিশ্বের বহু উন্নত দেশে কেবল সিনিয়র সিটিজেন হওয়ার কারণেই প্রবীণ নাগরিকরা গণপরিবহনে ভাড়া ছাড়, অগ্রাধিকারমূলক সেবা এবং বিশেষ সামাজিক সুবিধা পেয়ে থাকেন। অথচ বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা শুধু প্রবীণ নন; তাঁরা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান এবং এই স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্মদাতা।
কিন্তু বাস্তবতা অনেক সময় নির্মম। দেখা যায়, সত্তর কিংবা আশি বছরের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা চিকিৎসকের চেম্বারের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন। তাঁর বয়সের জন্য নেই কোনো বিশেষ বিবেচনা বা অগ্রাধিকার। তাঁদের যুদ্ধজয়ের ইতিহাসের জন্য নেই কোনো অগ্রাধিকার। তিনি হয়তো দুর্বল শরীরে বেঞ্চে বসে আছেন, কিন্তু তাঁর সামনে কেউ সেই মানুষটিকে দেখতে পায় না, যিনি একদিন বুক পেতে দাঁড়িয়েছিলেন শত্রুর গুলির সামনে।
আরও কষ্ট লাগে যখন দেখা যায়, যে মানুষটি একদিন কাঁধে রাইফেল তুলে দেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিলেন, আজ তিনি একটি বাসের আসনের জন্য দাঁড়িয়ে আছেন। কেউ তাঁকে চেনে না, কেউ তাঁর ত্যাগের ইতিহাস জানে না, কেউ তাঁর বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা যুদ্ধের ভয়াবহ দিনের স্মৃতিগুলো অনুভব করে না। হয়তো তাঁর শরীরে এখনো রয়েছে গুলির দাগ, হয়তো তাঁর হৃদয়ে এখনো জেগে আছে রণাঙ্গনের বিভীষিকা। কিন্তু সমাজের ব্যস্ততার ভিড়ে তিনি যেন আর বিশেষ কেউ নন – একজন সাধারণ অবহেলিত বৃদ্ধ মাত্র।
এখন হৃদয়ের গভীর থেকে প্রশ্ন জেগে ওঠে – এই কি সেই বাংলাদেশ, যার জন্য তাঁরা জীবন বিসর্জনের শপথ নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে দেশটিকে স্বাধীন করেছিলেন? এই কি সেই স্বাধীনতার স্বপ্ন, যার জন্য তাঁরা মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন? যে তরুণরা একদিন মৃত্যুকে তুচ্ছ করে লাল-সবুজের পতাকা ছিনিয়ে এনেছিলেন – তাঁদের কি আজকের এই অবহেলা, এই উপেক্ষা, এই অসম্মান, আর এই অনাদরের জন্য মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন?
মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি প্রকৃত সম্মান কেবল স্মৃতিসৌধে ফুল দেওয়া নয়; জাতীয় দিবসে আবেগঘন বক্তৃতা করাও নয়; আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনা বা স্মারক প্রদানও নয়। প্রকৃত সম্মান তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হাসপাতাল, ব্যাংক, সরকারি, বেসরকারি অফিস, গণপরিবহনসহ সমাজের প্রতিটি স্তরে তাঁরা তাঁদের প্রাপ্য মর্যাদা, সম্মান ও অগ্রাধিকারটুকু বুঝে পাবেন। বিশেষ করে বার্ধক্যের দুর্বল ও অসুস্থ সময়ে অর্থের বিনিময়ে চিকিৎসার জন্য তাঁকে পাঁচ-সাত ঘণ্টা চেম্বারের সামনে অপেক্ষা করতে হবে না; যখন তাঁকে তাঁর পরিচয় প্রমাণ করতে হবে না; যখন সমাজ নিজেই তাঁর অবদানের প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নত করবে।
কারণ ইতিহাসের নির্মম সত্য হলো – স্বাধীনতার গল্প আমরা যতদিন বলব, ততদিন মুক্তিযোদ্ধাদের ঋণ শোধ হবে না।
আমরা কি পারি না- তাঁদের জীবনের শেষ অধ্যায়টুকু আমরা সম্মান, নিরাপত্তা ও স্বস্তিতে ভরিয়ে দিতে!
আমরা এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে পারি, যেখানে কোনো বীর মুক্তিযোদ্ধাকে আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে না হয়, “দেশের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত ছিলাম; কিন্তু বার্ধক্যে এসে কি এইটুকু সম্মানও পাওয়ার যোগ্য আমরা নই? স্বাধীনতার প্রকৃত মর্যাদা তখনই রক্ষা পাবে, যখন জাতি তার সূর্যসন্তানদের শুধু মুখে নয়, বাস্তব জীবনেও সর্বোচ্চ সম্মান, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতায় বরণ করে নেবে।
সেদিন হয়তো কোনো বৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধার চোখে অপমানের অশ্রু ঝরবে না। ঝরবে তৃপ্তির অশ্রু – এই বিশ্বাসে যে, তাঁর আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি; তাঁর রক্তে রাঙানো স্বাধীনতার বাংলাদেশ তাঁকে ভুলে যায়নি। এই লেখাটি কোনো কল্পনার ফসল নয়। দিনাজপুরের একটি জাতীয়ভিত্তিক ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ৩ জুন ২০২৬ তারিখ বিকেল ৫টা থেকে অপেক্ষা করছি। ঘড়ির কাঁটা এখন রাত ১০টা ৫২ মিনিট ছুঁয়েছে। এখনো জানি না, কখন চিকিৎসকের চেম্বারে ডাক পড়বে। তবে চেম্বারে ডাক পড়েছিল রাত ১১:১৫ মিনিটে।
দীর্ঘ প্রায় ছয় ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করতে করতে বারবার ফিরে যাচ্ছিলাম সেই একাত্তরে – সেই রণাঙ্গনে, সেই স্বপ্নে, সেই আত্মত্যাগে। আর তখনই মনে হলো – স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রাখা মানুষগুলোর বার্ধক্য কি এমনই হওয়ার কথা ছিল?
দীর্ঘ ছয় ঘন্টারও অধিক সময় ধরে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলাম, কিন্তু কোনো সদুত্তর খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তবে হৃদয়ে বুকফাটা কান্না আর প্রচন্ড হতাশা অনুভব করছিলাম।
লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট এবং জাতীয় সাংবাদিক সোসাইটি ও ওয়ার্ল্ড পীছ অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস সোসাইটির চেয়ারম্যান।