হোম
নাগরিক ভাবনা

নাগরিক ভাবনা: রাষ্ট্র কি জনগণের জন্য, নাকি আমলাতন্ত্রের জন্য?

অ্যাডভোকেট এম এ মজিদ || মুক্ত কলম সংবাদ

প্রকাশিত: ২৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:০১ পূর্বাহ্ণ

ফাইল ছবি

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশেও মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে সরকারি কর্মচারীদের বেতন গত বছরে কোনো কিছুই বৃদ্ধি করেনি, চলতি বছরে মাত্র একভাগ বৃদ্ধি করেছে। অথচ বাংলাদেশের মতো একটি দড়িদ্র-পীড়িত ও অস্থিতিশীল দেশের সরকারি কর্মচারীদের চলতি বছরে বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির পরিমান ১০০ ভাগেরও বেশি। সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে সরকারগুলোকে যতটা তৎপর দেখা যায়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং জনজীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নে ততটা আন্তরিকতা সচরাচর চোখে পড়ে না। এখানেই আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার অগ্রাধিকার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। রাষ্ট্র কি জনগণের কল্যাণে পরিচালিত হবে, নাকি রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার ভাগীদার একটি বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষাই হয়ে উঠবে তার প্রধান দায়িত্ব?

বেতন বাড়ে সরকারি কর্মচারীদের, বাড়তি বোঝা বহন করে জনগণ যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি কর্মচারীদের বেতনবৃদ্ধির হার নিয়ে চলমান বিতর্কের সঙ্গে বাংলাদেশের বাস্তবতার তুলনা করলে সরকারি বেতননীতি, সুযোগ-সুবিধা এবং অর্থনৈতিক ন্যায্যতার প্রশ্নটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কর্মচারীদের চলতি বছরে বেতনবৃদ্ধি যেখানে মাত্র ১ শতাংশ। অথচ সেখানে জ্বালানির দাম ৪০ শতাংশ এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেড়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। অর্থাৎ, মূল্যবৃদ্ধির চাপের তুলনায় বেতনবৃদ্ধি অত্যন্ত নগণ্য। এতদসত্বেও যুক্তরাষ্ট্রে কোনো সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য সরকারি গাড়ি, সার্বক্ষণিক গাড়িচালক, জ্বালানি, ব্যক্তিগত সহকারী, দেহরক্ষী, নৈশপ্রহরী কিংবা ব্যক্তিগত পিয়ন-চাপরাসির কোনো বিধান বা প্রচলন একবারেই নেই।

অন্যদিকে, বাংলাদেশে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা একাধিকবার বাড়িয়ে এমন পর্যায়ে নেওয়া হয়েছে যে, চলতি বছরেই মূল বেতনের বৃদ্ধির হার ১০০ শতাংশও ছাড়িয়েছে। এর পাশাপাশি সরকারি আমলাদের একটি অংশের জন্য রয়েছে সরকারি বাসভবন, গাড়ি, গাড়িচালক, জ্বালানি, ব্যক্তিগত সহকারী, পিয়ন ও পিশনস নানা প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা। ফলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক – জনগণের করের টাকায় পরিচালিত রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে বেতন ও সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা, মিতব্যয়িতা এবং জনস্বার্থের বিষয়গুলো কতটুকু গুরুত্ব পাচ্ছে?

আমাদের দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন সীমিত আয়ের মানুষ। চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, ওষুধ, বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ এবং যাতায়াতের ব্যয় মেটাতে গিয়ে তাদের নাভিশ্বাস ওঠে। গাড়ির জ্বালানির দাম বাড়লে শুধু ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকের ব্যয় বাড়ে না; পরিবহন, পণ্য সরবরাহ ও উৎপাদন খরচের মাধ্যমেও তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে। ফলে বাজারে মূল্যবৃদ্ধির বোঝা শেষ পর্যন্ত এসে পড়ে সাধারণ ভোক্তার কাঁধে।
এমন পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত যদি যথাযথ অর্থনৈতিক মূল্যায়ন, রাজস্ব সক্ষমতা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা ছাড়া নেওয়া হয়, তাহলে তার আর্থিক চাপ সামাল দিতে গিয়ে সরকারকে অতিরিক্ত ব্যয়, ঋণ কিংবা অন্য কোনো রাজস্বব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হবে। যার সম্ভাব্য প্রভাব পড়তে পারে পুরো অর্থনীতিতে। অর্থাৎ, এক শ্রেণির মানুষের আয় বাড়ানোর সিদ্ধান্তের সুফল যদি সীমিত থাকে, অথচ তার ব্যয়ের বোঝা সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে বহন করতে হয়, তাহলে সেই নীতির ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা নাগরিকের অধিকার।

১৬ লাখ কর্মচারীর স্বার্থ, ২০ কোটি মানুষের দায়! বাংলাদেশে সরকারি কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ১৬ লাখ এবং জনসংখ্যা প্রায় ২০ কোটি – এমন প্রচলিত হিসাবের ভিত্তিতে প্রশ্নটি তোলা যায়: রাষ্ট্রীয় বেতন কাঠামো নির্ধারণের সময় এই বিপুল জনগোষ্ঠীর স্বার্থ কীভাবে বিবেচিত হচ্ছে? সরকারি কর্মচারীরা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। তাদের ন্যায্য বেতন, চাকরির নিরাপত্তা, পেনশন এবং সম্মানজনক জীবনযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। তাদের সবাইকে সুবিধাভোগী বা জনগণের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখার কোনো যুক্তি নেই। বরং দক্ষ, সৎ ও আর্থিকভাবে নিরাপদ সরকারি কর্মচারী একটি কার্যকর রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে গিয়ে সাধারণ জনগণের ন্যায্য অধিকারকে উপেক্ষা করা হবে কেন?
যে দেশের বহু মানুষ ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খান, যে দেশের শ্রমিকেরা কম মজুরিতে দীর্ঘ সময় কাজ করেন, যে দেশের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী উৎপাদন ব্যয় ও বাজারের অনিশ্চয়তায় বিপর্যস্ত হন, যে দেশের বেকার তরুণেরা কাজের সন্ধানে দ্বারে দ্বারে ঘোরেন – সেই দেশে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণে সর্বস্তরের মানুষের স্বার্থ বিবেচনা করা কি অপরিহার্য নয়?
সরকারি কর্মচারীদের বেতনবৃদ্ধির সঙ্গে যদি সাধারণ মানুষের আয়বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের কার্যকর উদ্যোগের সমন্বয় না থাকে, তাহলে অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর অধিকার আছে; কিন্তু জনগণের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করার দায়িত্বও সরকারের। একটিকে গুরুত্ব দিয়ে অন্যটিকে বিসর্জন দেওয়া কোনো দায়িত্বশীল অর্থনৈতিক নীতি হতে পারে না।

বেসরকারি খাতের সংকট: বেতন বাড়ানোর দাবি অযৌক্তিক নয় সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়লে বেসরকারি খাতের কর্মচারীরাও স্বাভাবিকভাবেই তাদের আয় বাড়ানোর দাবি তুলবেন। জীবনযাত্রার ব্যয় যখন বাড়ে, তখন একজন শ্রমিক, পোশাককর্মী, দোকানকর্মী কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাধারণ কর্মচারীরও সংসার চালানোর জন্য বাড়তি আয়ের প্রয়োজন হয়। তাদের এই দাবি অযৌক্তিক নয়; বরং মানবিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কিন্তু বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পরিস্থিতি সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো নয়। অনেক প্রতিষ্ঠানকে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যয়, ঋণের সুদ, পরিবহন খরচ, বাজারের প্রতিযোগিতা এবং রপ্তানি আদেশের অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়তে হয়। উৎপাদনশীলতা ও আয় না বাড়িয়ে হঠাৎ বিপুল পরিমাণে মজুরি বাড়ানোর চাপ তৈরি হলে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক সংকটে পড়তে পারে। কিছু প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাই করতে পারে, এমনকি বন্ধও হয়ে যেতে পারে। তাহলে সমাধান কী? শ্রমিকের মজুরি আটকে রাখা, নাকি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা? সমাধান অবশ্যই দ্বিতীয়টি। সরকারকে এমন অর্থনৈতিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন বাড়াতে পারে, বিনিয়োগ উৎসাহিত হয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং শ্রমিকেরা তাদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য পান। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পর্যায়ক্রমে মজুরি পুনর্নির্ধারণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে সহায়তা এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি বেতনবৃদ্ধির সিদ্ধান্তও হতে হবে রাজস্ব সক্ষমতা ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।
রাষ্ট্র যদি একটি খাতের আয় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তবে অন্য খাতের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও কর্মসংস্থানের ঝুঁকিও বিবেচনায় নিতে হবে। নইলে একদিকে সুবিধা বাড়বে, অন্যদিকে বাড়বে অসন্তোষ, বৈষম্য ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা।

জনগণের নিরাপত্তা কোথায়, জবাবদিহি কোথায়?
বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো – সরকারি সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে যে প্রশাসনিক তৎপরতা দেখা যায়, জনগণের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি সেবার মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে সেই তৎপরতা সব সময় দৃশ্যমান হয় না কেন?
সাধারণ মানুষ কর দেন, পণ্য ও সেবা কেনার সময় কর পরিশোধ করেন, শ্রম দিয়ে অর্থনীতিকে সচল রাখেন এবং তাদের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করেন। সেই জনগণ যখন নিরাপদ সড়ক, মানসম্মত চিকিৎসা, সাশ্রয়ী শিক্ষা, ন্যায়বিচার কিংবা দুর্নীতিমুক্ত সরকারি সেবা চান, তখন তাদের কতটা কার্যকরভাবে সেই অধিকার দেওয়া হয়? সরকারি দপ্তরে সেবা পেতে হয়রানি, অনিয়ম, দীর্ঘসূত্রতা কিংবা দুর্নীতির অভিযোগ যদি বছরের পর বছর মানুষের অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে থাকে, তবে কেবল বেতন-ভাতা বাড়িয়ে রাষ্ট্রীয় সেবার মান উন্নত করা সম্ভব নয়। কর্মচারীদের আর্থিক সুবিধার পাশাপাশি তাদের কর্মদক্ষতা, দায়িত্বশীলতা, সততা এবং জনগণের প্রতি জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
বেতন বাড়বে, কিন্তু সেবার মান বাড়বে না; সুযোগ-সুবিধা বাড়বে, কিন্তু দায়িত্ব পালনে অবহেলার প্রতিকার হবে না; রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় হবে, কিন্তু সেই ব্যয়ের ফলাফল জনগণ দেখতে পাবে না – এমন ব্যবস্থা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
সরকারি চাকরি জনগণের অর্থে পরিচালিত একটি জনসেবা, ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা ভোগের অবাধ লাইসেন্স নয়।
অবশ্যই সব সরকারি কর্মচারীকে একই দৃষ্টিতে বিচার করা অন্যায়। বহু কর্মকর্তা-কর্মচারী নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন এবং সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও জনগণকে সেবা দেন। তাদের যথাযথ মূল্যায়ন ও পুরস্কৃত করা উচিত। কিন্তু যারা দায়িত্বে অবহেলা করেন, দুর্নীতিতে জড়ান কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার করেন, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।

সরকার কি জনগণের, নাকি জনগণই সরকারের বোঝা?
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো জনগণের সম্মতি, জনগণের অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি। সরকার জনগণের ওপরে প্রতিষ্ঠিত কোনো স্বতন্ত্র ক্ষমতাকেন্দ্র নয়; সরকার জনগণের পক্ষ থেকে দায়িত্ব পালনের একটি ব্যবস্থা। অথচ বাস্তবে যখন রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দাবি দ্রুত গুরুত্ব পায়, আর সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ দীর্ঘদিন অমীমাংসিত থাকে, তখন রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার নিয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। জনগণ তখন প্রশ্ন করেন – রাষ্ট্রীয় নীতির সুফল কারা পাচ্ছেন, আর তার মূল্যই বা কারা দিচ্ছেন? সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর জন্য অর্থের সংস্থান করতে হবে; কিন্তু সেই সংস্থানের পথ কী? উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে, করব্যবস্থায় ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করে, কর ফাঁকি রোধ করে, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করে অর্থ সংগ্রহ করা হবে, নাকি শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপরই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ব্যয়ের চাপ বাড়বে? এই প্রশ্নগুলোর জবাব ছাড়া বেতনবৃদ্ধির সিদ্ধান্তের পূর্ণ ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। সরকারের উচিত শুধু কত শতাংশ বেতন বাড়ানো হলো, সেই হিসাব প্রকাশ করা নয়; বরং বেতনবৃদ্ধির অর্থ কোথা থেকে আসবে, মূল্যস্ফীতির ওপর তার সম্ভাব্য প্রভাব কী, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কী সুরক্ষাব্যবস্থা থাকবে এবং সরকারি সেবার মান কতটা উন্নত হবে – এসব বিষয়ও স্পষ্ট করা।

জনগণকে অন্ধকারে রেখে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, কিন্তু তাতে জনগণের আস্থা অর্জন করা যায় না। প্রয়োজন জনবান্ধব রাষ্ট্রনীতি, গোষ্ঠীবান্ধব সুবিধা নয় সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর বিরোধিতা করাই এ আলোচনার উদ্দেশ্য নয়। উদ্দেশ্য হলো, বেতনবৃদ্ধির নীতিকে আরও ন্যায়সংগত, ভারসাম্যপূর্ণ ও জনবান্ধব করার দাবি জানানো। সরকারের উচিত কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া। প্রথমত, সরকারি কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণে মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, রাজস্ব আয় এবং অর্থনীতির বাস্তব সক্ষমতার ভিত্তিতে স্বচ্ছ নীতি অনুসরণ করা। দ্বিতীয়ত, নিম্ন আয়ের মানুষকে মূল্যস্ফীতির অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে খাদ্যসহায়তা, সামাজিক নিরাপত্তা, সাশ্রয়ী চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যবস্থা শক্তিশালী করা।

তৃতীয়ত, বেসরকারি খাতের শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে কার্যকর সহায়তা দেওয়া।
চতুর্থত, সরকারি কর্মচারীদের বেতনবৃদ্ধির সঙ্গে সেবার মান, কর্মদক্ষতা, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং জবাবদিহির সুস্পষ্ট ব্যবস্থা যুক্ত করা।
পঞ্চমত, রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণে জনগণের নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু সরকারি কর্মচারীদের বেতন কত বাড়ল, কিংবা জাতীয় বাজেটের আকার কত বড় হলো – এসব দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। উন্নয়নের প্রকৃত মাপকাঠি হলো, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদে বাঁচছেন, তাদের আয় দিয়ে কতটা প্রয়োজন মেটাতে পারছেন, সন্তানদের ভবিষ্যৎ কতটা নিশ্চিত করতে পারছেন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থেকে কতটা ন্যায়সংগত সেবা পাচ্ছেন।

শেষ কথা: জনগণ প্রজা নয়, রাষ্ট্রের মালিক সরকারকে মনে রাখতে হবে, সরকারি কর্মচারীরা রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালন করেন জনগণের অর্থে, জনগণের জন্য। তাদের ন্যায্য বেতন নিশ্চিত করা যেমন সরকারের কর্তব্য, তেমনি জনগণের জীবনযাত্রার মান, ক্রয়ক্ষমতা, নিরাপত্তা এবং মৌলিক অধিকার রক্ষা করাও সরকারের অবিচ্ছেদ্য দায়িত্ব। এই দুই দায়িত্বের মধ্যে কৃত্রিম বিরোধ সৃষ্টি করার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন এমন একটি নীতিব্যবস্থা, যেখানে সরকারি কর্মচারীরা সম্মানজনক জীবনযাপন করবেন, বেসরকারি খাতের শ্রমিকেরা ন্যায্য মজুরি পাবেন, শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকার সুযোগ পাবে এবং সাধারণ মানুষ দ্রব্যমূল্যের চাপে নিঃস্ব হয়ে পড়বেন না।
যে রাষ্ট্রে সরকারি সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ দৃশ্যমান, কিন্তু জনগণের দুর্ভোগ লাঘবের কার্যকর উদ্যোগ দুর্বল; যে রাষ্ট্রে দায়িত্বের চেয়ে পদমর্যাদা বেশি গুরুত্ব পায়, আর জবাবদিহির চেয়ে ক্ষমতার দাপট বড় হয়ে ওঠে – সেই রাষ্ট্রকে তার নীতিগত অগ্রাধিকার নতুন করে নির্ধারণ করতেই হবে।
সরকার জনগণের প্রভু নয়, জনগণের সেবক। সরকারি কর্মচারীরাও জনগণের ওপর বসে থাকা কোনো বিশেষ শ্রেণি নন; তারা জনগণের সেবায় নিয়োজিত রাষ্ট্রীয় কর্মী।
এই সত্য ভুলে গেলে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা যতই বাড়ুক, জনগণের আস্থা বাড়বে না। বরং রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে দূরত্ব বাড়বে, বৈষম্য গভীর হবে এবং অসন্তোষ জমতে থাকবে।
অতএব, সময় এসেছে স্পষ্ট করে বলার – সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ুক, কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা যেন আরও দুর্বিষহ না হয়। রাষ্ট্রীয় ব্যয় বাড়ুক, কিন্তু তার সুফল যেন কেবল একটি গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। প্রশাসনের সুযোগ-সুবিধা বাড়ুক, কিন্তু তার সঙ্গে বাড়ুক দায়িত্ববোধ, দক্ষতা ও জবাবদিহিতা। কারণ রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার ক্ষমতাবান কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধায় নয়; রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার সাধারণ নাগরিকের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বস্তিদায়ক জীবনে।

লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট, জাতীয় সাংবাদিক সোসাইটি এবং ওয়ার্ল্ড পীছ অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস সোসাইটির চেয়ারম্যান।

ফেসবুক মন্তব্য

মতামত জানান :

সর্বশেষ খবর

নাগরিক ভাবনা: রাষ্ট্র কি জনগণের জন্য, নাকি আমলাতন্ত্রের জন্য?
নাগরিক ভাবনা 3 hours আগে

প্রত্যাশার আলোয় কাটুক শৈশব: দিনাজপুর জেলা কারাগারে শিশুদের জন্য মানবিক
রংপুর 1 day আগে

রাজশাহীতে দুই ব্যক্তিকে আটক,জানতে চাওয়ায় সাংবাদিককে ধমক দিলো এসআই আসরাফুল।
অপরাধ 1 day আগে

বগুড়ায় নবজাতককে কোলে নিয়ে ইয়াবা পাচারকালে স্বামী-স্ত্রী গ্রেপ্তার।
অপরাধ 1 day আগে

দিনাজপুরের চিরিরবন্দর সোনাপুকুর গ্রাম থেকে মৃত দেহ উদ্ধার।
অপরাধ 2 days আগে

দিনাজপুরের পার্বতীপুরে প্রধান শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার ১ জন।
অপরাধ 2 days আগে

নাগরিক ভাবনা: পশ্চিম ভার্জিনিয়ার সেনেকা রকস ও কাস সিনিক রেলওয়ে।
নাগরিক ভাবনা 2 days আগে

দিনাজপুরে পুর্ণভবা নদীতে নৌকা ডুবে এক কৃষকের মৃত্যু।
দুর্ঘটনা 2 days আগে

পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় যান্ত্রিক মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন করায় ইউএনওর অভিযান।
আইন-বিচার 2 days আগে

সিরাজগঞ্জের কাজিপুরে মাদকবিরোধী অভিযানে ৩ মাদক ব্যবসায়ী আটক,উদ্ধার ইয়াবা-হেরোইন।
অপরাধ 2 days আগে

পাঠকপ্রিয়

শিরোনাম :

কুড়িগ্রামে ঐতিহাসিক আসনে কঠিন চ্যালেঞ্জে জাপা,মাঠ গরম এনসিপি-বিএনপির। হাদীর ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনায় দিনাজপুর সীমান্ত ৪২ বিজিবির রেড অ্যালার্ট জারি। রোহিঙ্গা মেয়েরা পাচার ছাড়াও বিদেশীদের দ্বারা যৌন কাজে ব্যবহারের টার্গেট হয়ে উঠছে ঠাকুরগাঁওয়ে নানা কর্মসূচিতে হানাদার মুক্ত দিবস উদযাপিত। ঠাকুরগাঁও জেলায় অনুষ্ঠিত হয়েছে ৪র্থ জেলা রোভার মুট-২০২৫। কুড়িগ্রামের রাজারহাটে প্রাণিসম্পদ সপ্তাহের প্রদর্শনী ও সমাপনী অনুষ্ঠিত। পার্বতীপুরে জাতীয় প্রাণি সম্পদ ও ডেইরি প্রকল্পের উদ্বোধন। রাণীশংকৈলে জাতীয় প্রাণীসম্পদ সপ্তাহ ও প্রাণিসম্পদ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত পলাতক শেখ হাসিনার অগ্রণী ব্যাংকের লকার ভেঙে ৮৩২ ভরি স্বর্ণ জব্দ রাজশাহীতে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে আহত ১০ জন ৩ ডিসেম্বর রংপুরে বিভাগীয় মহাসমাবেশ সফল করতে দিনাজপুরে ৮ ইসলামী দলের সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত। দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিতে সব বাহিনী প্রস্তুত: সিইসি পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ৬ হাজার কৃষক পাচ্ছে বিনামূল্যে গম বীজ ও সার। মাত্র চার মাসের শিশু সুমাইয়া বাঁচতে চায়! পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় হেফাজতে ইসলামের নতুন কমিটি গঠন। ভূমিকম্পে সম্ভাব্য ক্ষতি কমাতে এখনই শক্তিশালী ও সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে: সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান রাজধানীতে  আজ থেকে ঘরে বসেই মেট্রোরেলের কার্ড রিচার্জ করবেন? নীলফামারীতে পাটবীজ উৎপাদনকারী চাষীদের প্রশিক্ষণ। আর কোনো পরিস্থিতি নেই যে নির্বাচন ব্যাহত হবে-ঠাকুরগাঁওয়ে মির্জা ফখরুল  ৫-বছরেও শেষ হয়নি ওয়াশব্লকের নির্মাণ কাজ-জনস্বাস্থ্য অফিস বলছেন বাদ দেন চা খাওয়ার জন্য কিছু নেন। পার্বতীপুরে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকারের দাবীতে কর্মী সভা। পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় নদী বাঁচাও আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নাগরিক সমাবেশ। পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া ইউএনও এক গৃহহীন ভারসাম্যহীন নারীর পাশে দাঁড়ালো। ৮ দফা দাবিতে প্রধান উপদেষ্টা বরাবর নার্সিং এসোসিয়েশন দিনাজপুর জেলা শাখার স্মারকলিপি ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুরে ইউনিয়ন সিএসওর লাইভস্টক সংলাপ সভা অনুষ্ঠিত বগুড়ায় প্রেম করে বিয়ে অতপর ভাড়া বাসায় স্ত্রীকে হত্যা করল স্বামী। দিনাজপুরে ৩ দিনব্যাপী উদ্যোক্তা মেলা ও পিঠা উৎসবের সমাপনী। দিনাজপুরের বিরলে শতাধিক নেতা-কর্মীর মামলা থেকে বাঁচতে ফ্যাসিস্ট আ,লীগ থেকে পদত্যাগ! অভিযোগ দিয়ে ও কাজ বন্ধ হচ্ছে না আদমদিঘীতে সরকারি জায়গা দখল করে করা হচ্ছে অবকাঠামো নির্মাণ! বগুড়ার কইপাড়ায় নববধূ শম্পা হত্যার অভিযোগ, যৌতুক দাবির জেরে স্বামী আটক