অ্যাডভেকেট এম এ মজিদ || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ১২ অক্টোবর, ২০২৬ ১:৪৭ অপরাহ্ণ
নচিকেতার সেই তীক্ষ্ণ প্রশ্ন -ও ডাক্তার, ও ডাক্তার- শুধু একটি গানের আবেদন নয়, এটি চিকিৎসাব্যবস্থার বিবেকের দরজায় কড়া নাড়া। যে চিকিৎসকের হাতে মানুষ জীবন ফিরে পাওয়ার আশা নিয়ে আসে, সেই হাতই যদি অর্থলোভ, অবহেলা ও অনৈতিকতার অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তবে মানুষ আস্থা রাখবে কোথায়? ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে একজন শিক্ষার্থী বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করেন। তাঁর পরিবার আশা করে, সন্তান মানুষের জীবন বাঁচাবে, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াবে। সমাজও চিকিৎসককে শ্রদ্ধা করে, কারণ তাঁর কাছে মানুষ শুধু চিকিৎসা নয়, জীবনের শেষ আশাটুকুও নিয়ে যায়। কিন্তু সেই আস্থাকে পুঁজি করে কেউ যদি রোগীর অসহায়ত্বকে মুনাফার সুযোগ মনে করেন, তাহলে তাঁর ডিগ্রি আছে – কিন্তু মানবিকতা কোথায়?
রোগী, নাকি টাকার মেশিন?
রোগীর প্রয়োজনের বাইরে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা, অযৌক্তিক ওষুধের তালিকা, নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানোর বিনিময়ে কমিশন এবং ওষুধ কোম্পানির আর্থিক প্রলোভনে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগ – এসব সত্য হলে তা নিছক অনিয়ম নয়; রোগীর বিশ্বাসের সঙ্গে প্রতারণা।
অবশ্য প্রতিটি পরীক্ষা বা ওষুধের সুপারিশকে অনৈতিক বলা যায় না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কোনো পরীক্ষা কি সত্যিই রোগীর প্রয়োজনে, নাকি কারও আর্থিক স্বার্থে? কোনো ওষুধ কি চিকিৎসার জন্য, নাকি কমিশনের আকর্ষণে?
রোগীর শরীরকে চিকিৎসার ক্ষেত্র বানান, ব্যবসার বাজার নয়। তাঁর অসুস্থতাকে আয়ের সুযোগ এবং তাঁর আতঙ্ককে মুনাফার হাতিয়ার বানাবেন না।
একজন দরিদ্র বাবা সন্তানের চিকিৎসার জন্য শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করেন। একজন মা নিজের চিকিৎসা বন্ধ রেখে সন্তানের ওষুধ কেনেন। একজন দিনমজুর হাসপাতালের বিল দিতে গিয়ে পরিবারের খাবারের টাকা হারান। তাঁদের কাছে কয়েক হাজার টাকা নিছক সংখ্যা নয় – সেটি বেঁচে থাকার সংগ্রাম।
অথচ চিকিৎসার নামে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় চাপানো হলে, অর্থ দিতে না পারায় রোগীকে অবজ্ঞা করা হলে, কিংবা সামর্থ্যের বাইরে চিকিৎসার চাপে পরিবারটি নিঃস্ব হয়ে পড়লে প্রশ্ন উঠবেই – চিকিৎসা কি মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য, নাকি মানুষের অসহায়ত্ব থেকে অর্থ আদায়ের জন্য?
সাদা অ্যাপ্রন পরলেই কি বিবেক সাদা হয়?
কিছু চিকিৎসকের বিরুদ্ধে রোগীর কথা না শোনা, প্রশ্ন করলে বিরক্ত হওয়া, রোগীকে অপমান করা, দায়িত্বে অবহেলা করা এবং ভুল আড়াল করার অভিযোগ ওঠে। চিকিৎসকের সময়ের মূল্য আছে, কাজের চাপ আছে – কিন্তু রোগীকে মানুষ হিসেবে সম্মান দেওয়ার সময়টুকুও কি নেই?
রোগী আপনার অধস্তন কর্মচারী নন। তিনি আপনার কাছে এসেছেন, কারণ আপনি চিকিৎসাবিজ্ঞানে দক্ষ। তাঁর প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, রোগের অবস্থা বোঝানো এবং প্রয়োজনীয় তথ্য জানানো আপনার পেশাগত দায়িত্বের অংশ।
আপনার ডিগ্রি আপনাকে চিকিৎসা করার যোগ্যতা দিয়েছে, রোগীকে অপমান করার লাইসেন্স দেয়নি। আপনার জ্ঞান আপনাকে সম্মান এনে দিতে পারে, কিন্তু অহংকার সেই সম্মান ধ্বংস করতে পারে।
আর অবহেলার অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্ত হতে হবে। চিকিৎসায় প্রতিটি মৃত্যু ভুলের প্রমাণ নয়, প্রতিটি জটিলতাও অবহেলা নয়। কিন্তু দায়িত্বে অবহেলা, জরুরি চিকিৎসায় অযৌক্তিক বিলম্ব কিংবা ভুল আড়াল করার প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের জবাবদিহি করতে হবে। চিকিৎসক বলে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন।
হাসপাতাল কি সেবাকেন্দ্র, নাকি বিল তৈরির কারখানা?
জরুরি বিভাগে রোগী যখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে, তখন পরিবারের প্রথম প্রয়োজন দ্রুত চিকিৎসা ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত। সেই মুহূর্তে যদি রোগীর প্রয়োজনের চেয়ে কাগজপত্র, অর্থ আদায় ও প্রশাসনিক জটিলতা প্রাধান্য পায়, তবে তা গুরুতর মানবিক প্রশ্ন তৈরি করে।
হাসপাতাল চালাতে অর্থ লাগে, চিকিৎসকের ন্যায্য পারিশ্রমিক প্রয়োজন – এ সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু ন্যায্য পারিশ্রমিক আর সীমাহীন অর্থলোভ এক নয়। ভালো আয় করা অন্যায় নয়; অন্যায় হলো সেই আয় করতে গিয়ে রোগীর স্বার্থকে বিসর্জন দেওয়া।
চিকিৎসককে সম্মান করা মানে তাঁর সব কাজকে প্রশ্নাতীত মনে করা নয়। আর চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা মানেই সব চিকিৎসককে অপরাধী বলা নয়। অসংখ্য চিকিৎসক নিষ্ঠা, ত্যাগ ও মানবিকতা দিয়ে মানুষের জীবন বাঁচাচ্ছেন। তাঁদের অবদান শ্রদ্ধার যোগ্য। কিন্তু সেই শ্রদ্ধার আড়ালে অনৈতিকতার অভিযোগ চাপা দেওয়াও চলতে পারে না।
প্রয়োজন চিকিৎসার খরচে স্বচ্ছতা, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও কমিশনবাণিজ্যের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, রোগীর অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণিত অবহেলার জন্য উপযুক্ত শাস্তি। একই সঙ্গে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা, ন্যায্য পারিশ্রমিক ও ভালো কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।
নচিকেতার প্রশ্ন, চিকিৎসকের বিবেকের কাছে
ও ডাক্তার, ও ডাক্তার – আপনি কি মানুষের জীবন বাঁচানোর শপথ নিয়েছিলেন, নাকি মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করার সুযোগ খুঁজেছিলেন?
আপনার হাতে স্টেথোস্কোপ – শুধু হৃদস্পন্দন শুনবেন, নাকি মানুষের আর্তনাদও শুনবেন? আপনার হাতে প্রেসক্রিপশনের কলম – শুধু ওষুধের নাম লিখবেন, নাকি রোগীর সামর্থ্য ও প্রয়োজনের কথাও ভাববেন?
মনে রাখবেন, রোগী আপনার কাছে কোনো ফাইল নম্বর নয়, কোনো বিল নয়, কোনো কমিশনের হিসাব নয়। তিনি একজন মানুষ। তাঁর পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একগুচ্ছ স্বপ্ন, বেঁচে থাকার আকুতি।
যে চিকিৎসক নিজের স্বার্থের আগে রোগীর কল্যাণকে রাখেন, তিনি প্রকৃত শ্রদ্ধার যোগ্য। আর যিনি পেশাগত ক্ষমতার অপব্যবহার করেন, অনৈতিক আর্থিক সুবিধা নেন কিংবা দায়িত্বে অবহেলা করেন, তাঁর বিরুদ্ধে প্রশ্ন উঠবেই, তদন্ত হবে এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নিতে হবে।
ডাক্তার সাহেব, মনে রাখবেন – ডিগ্রি আপনাকে চিকিৎসক বানায়, কিন্তু মানবিকতা আপনাকে মানুষের শ্রদ্ধার যোগ্য করে। সাদা অ্যাপ্রন শরীরে পরা যায়; তার শুভ্রতা ধারণ করতে হয় বিবেকে।
নচিকেতার গানের প্রশ্ন তাই আজও প্রাসঙ্গিক। চিকিৎসক, নিজের বিবেককে একবার জিজ্ঞাসা করুন – আপনি কি সত্যিই মানুষের জীবন বাঁচাচ্ছেন, নাকি কোথাও কোথাও মানুষের মৃত্যুভয়, অসহায়ত্ব ও শেষ সম্বলকে ব্যবসার পণ্যে পরিণত করছেন?
কারণ চিকিৎসা যখন মানবিকতা হারায়, তখন প্রেসক্রিপশন কাগজ হয়ে যায়, হাসপাতাল ব্যবসার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, আর সাদা অ্যাপ্রনের আড়ালে বিবেকের কালিমা লুকিয়ে রাখা যায় না।
লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, জাতীয় সাংবাদিক সোসাইটি এবং ওয়ার্ল্ড পীছ অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস সোসাইটির চেয়ারম্যান।