হোম
ঢাকা

মৃত্যুর আগে শেষবারও কেউ ডাকেনি-মা তুমি কেমন আছো?

অ্যাডভোকেট এম এ মজিদ,ঢাকা || মুক্ত কলম সংবাদ

প্রকাশিত: ১৫ জুন, ২০২৬ ২:৫২ অপরাহ্ণ

ফাইল ছবি

মিরপুরের একটি বহুতল ভবনের একটি ঘর। চারপাশে মানুষের বসবাস, পাশের ফ্ল্যাটে শিশুদের হাসি, করিডোরে মানুষের যাতায়াত, রাস্তায় গাড়ির শব্দ – জীবন তার স্বাভাবিক গতিতেই চলছিল। কিন্তু সেই জীবনের কোলাহলের মাঝখানে একটি ঘরে নিঃশব্দে নিভে যাচ্ছিল একটি জীবন।

সেই জীবনের নাম নূর জাহান। বয়স হয়েছিল পচাত্তর। শরীরের শক্তি কমে গিয়েছিল, চোখের দৃষ্টিও হয়তো আগের মতো ছিল না। কিন্তু মায়ের মন কি কখনো বৃদ্ধ হয়? সন্তান যত বড়ই হোক, যত দূরেই যাক, মায়ের হৃদয়ে সে চিরকালই ছোট্ট একটি শিশু হয়ে থাকে। নূর জাহানও হয়তো তার ব্যতিক্রম ছিলেন না।
কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি এমন এক নিঃসঙ্গতার মুখোমুখি হলেন, যা মৃত্যুর চেয়েও ভয়ংকর। একদিন তিনি মারা গেলেন।

না, তাঁর মৃত্যুর মুহূর্তে কেউ তাঁর হাত ধরে ছিল না। কেউ তাঁর কপালে হাত বুলিয়ে বলেনি, “মা, ভয় পেয়ো না, আমি আছি।” কেউ এক গ্লাস পানি এগিয়ে দেয়নি। কেউ তাঁর কষ্টের কথা শুনতে চায়নি। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, তাঁর নিথর দেহ পড়ে ছিল ঘরের ভেতর। দিনের পর দিন নয়তো ঘণ্টার পর ঘণ্টা – একটি মৃতদেহ, একটি মায়ের দেহ, যে মা একদিন নিজের বুকের রক্ত পানি করে সন্তানদের বড় করেছিলেন। আর সেই সময় তাঁরই মেয়ে ছিলেন পাশের কক্ষে।
ভাবা যায়?

একই ছাদের নিচে মা মৃত অবস্থায় পড়ে আছেন, অথচ তাঁর খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজনও কেউ অনুভব করেনি। যে মা সন্তানের সামান্য কাশির শব্দ শুনে মাঝরাতে ছুটে যেতেন, সেই মায়ের মৃত্যুর নিস্তব্ধতা কারও হৃদয় স্পর্শ করল না।
নূর জাহানের সন্তানরা কিন্তু সমাজে প্রতিষ্ঠিত। একজন যুগ্ম সচিব-রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত। একজন বুয়েটের শিক্ষক-দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের জ্ঞান দিচ্ছেন। একজন কানাডায় প্রতিষ্ঠিত প্রবাসী – সফল জীবনের প্রতীক।

সমাজ তাঁদের সম্মান করে,পরিচয়ে গর্ব করে, সাফল্যের গল্প বলে। কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর কে দেবে- যে মা তাঁদের মানুষ করলেন, সেই মায়ের শেষ সময়ে তাঁরা কোথায় ছিলেন?
একজন মা যখন সন্তানকে জন্ম দেন, তখন তিনি জানেন না সন্তান একদিন যুগ্ম সচিব হবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবে, কিংবা বিদেশে গিয়ে প্রতিষ্ঠিত হবে। তিনি শুধু জানেন, এই শিশুটিকে বাঁচাতে হবে।

সন্তানের জ্বর হলে তিনিই রাত জেগে থাকেন। সন্তানের মুখে একমুঠো ভাত তুলে দিতে নিজের ক্ষুধা লুকিয়ে ফেলেন। সন্তানের বই কেনার জন্য নিজের শখ বিসর্জন দেন। সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে গিয়ে নিজের বর্তমানকে উৎসর্গ করেন।
সেই মায়ের জীবনের শেষ পরিণতি যদি হয় একটি নির্জন ঘরে একা পড়ে থাকা মৃতদেহ, তাহলে সভ্যতার এত অগ্রগতি, এত শিক্ষার আলো, এত সামাজিক মর্যাদার অর্থ কী?
হয়তো মৃত্যুর আগে নূর জাহান দরজার দিকে তাকিয়েছিলেন। হয়তো তাঁর শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁট থেকে বেরিয়ে এসেছিল সন্তানের নাম। হয়তো তিনি ভেবেছিলেন, “আমার মেয়েটা একবার আসবে।

হয়তো তাঁর মন বলেছিল,আমার ছেলেটা ফোন করবে। হয়তো শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি বিশ্বাস করতে চেয়েছিলেন যে তাঁর সন্তানরা তাঁকে ভুলে যায়নি। কিন্তু অপেক্ষা দীর্ঘ হয়েছে, দরজায় কেউ কড়া নাড়েনি। ফোন বেজে ওঠেনি। কেউ এসে বলেনি, “মা, তোমার কিছু লাগবে? তারপর একসময় সব অপেক্ষার অবসান হয়েছে। চোখ দুটি চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু সেই বন্ধ চোখের ভেতর হয়তো জমে ছিল হাজারো অপূর্ণতা, হাজারো প্রশ্ন, হাজারো না বলা কষ্ট।

আজ নূর জাহান আর নেই। তাঁর মৃত্যুর সংবাদ কয়েকদিন আলোচনায় থাকবে, মানুষ আফসোস করবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করবে। তারপর একসময় সবাই ভুলে যাবে। কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকে যাবে – আমরা কি সত্যিই উন্নত হচ্ছি? যে সমাজে বৃদ্ধাশ্রম বাড়ে, কিন্তু বৃদ্ধ বাবা-মায়ের জন্য সন্তানের সময় কমে যায়; যে সমাজে সন্তানদের ডিগ্রি বাড়ে, পদমর্যাদা বাড়ে, ব্যাংক ব্যালেন্স বাড়ে, কিন্তু মায়ের খোঁজ নেওয়ার অভ্যাস কমে যায় – সেই সমাজ কি সত্যিই সভ্য?

নূর জাহানের মৃত্যু শুধু একজন বৃদ্ধার মৃত্যু নয়। এটি আমাদের সময়ের এক নির্মম আয়না। এই আয়নায় আমরা দেখতে পাই, সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে কত মানুষ সেই হাত দুটোকেই ভুলে যায়, যে হাত একদিন তাদের হাঁটতে শিখিয়েছিল। আজ নূর জাহান পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন।
কিন্তু তাঁর নিঃসঙ্গ ঘর, তাঁর নিথর দেহ, তাঁর অপূর্ণ প্রতীক্ষা এবং তাঁর নীরব প্রশ্ন আমাদের বিবেককে তাড়া করে ফিরবে – “যাদের জন্য সারাজীবন বেঁচে ছিলাম, মৃত্যুর সময় তাদের একজনও কি আমার জন্য একবার দরজায় কড়া নাড়তে পারল না? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো নূর জাহান আর কোনোদিন শুনবেন না। কিন্তু আমাদের প্রত্যেক সন্তানের হৃদয়ে এই প্রশ্নটি অনন্তকাল ধরে প্রতিধ্বনিত হবে।

লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট এবং জাতীয় সাংবাদিক সোসাইটি ও জাতীয় সাংবাদিক সোসাইটির চেয়ারম্যান।

ফেসবুক মন্তব্য

মতামত জানান :

Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930  

সর্বশেষ খবর

বোচাগঞ্জে মাদক ও অনলাইন জুয়া মুক্ত করার জন্য কিশোর ও
খেলাধুলা 6 minutes আগে

বীরগঞ্জে জমি-সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে হামলা ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ।
অপরাধ 41 minutes আগে

সাবেক স্ত্রী হাতে সেতাবগঞ্জের রাইস মিল মালিক মোস্তাফিজুর খুন।
রংপুর 2 hours আগে

৯ মাদক সেবীকে ভ্রাম্যমাণ আদালতে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড ও অর্থ
অপরাধ 2 hours আগে

কুড়িগ্রামের রাজারহাটে মাদক বিরোধী সচেতনতামূলক প্রচার ও র‍্যালি অনুষ্ঠিত।
রংপুর 2 hours আগে

মৃত্যুর আগে শেষবারও কেউ ডাকেনি-মা তুমি কেমন আছো?
ঢাকা 2 hours আগে

ঠাকুরগাঁওয়ের ‎হরিপুরে অগ্নিকাণ্ডে ২ লক্ষাধিক ক্ষয়ক্ষতি
দুর্ঘটনা 3 hours আগে

সেতু নির্মাণের সময় ক্ষেপন জনদুর্ভোগ,শুকনো নদীতে নৌকার রাজত্ব।
জনদুর্ভোগ 3 hours আগে

নাগরিক ভাবনা: ফিরে পাওয়া জীবন-ফিরে পাওয়া মানুষগুলো।
ঢাকা 3 hours আগে

বিরামপুর পৌর শহরে রাস্তার রেজিংয়ের ইট খুলে পড়ায় গর্তের কারণে
জনদুর্ভোগ 4 hours আগে

পাঠকপ্রিয়

শিরোনাম :

কুড়িগ্রামে ঐতিহাসিক আসনে কঠিন চ্যালেঞ্জে জাপা,মাঠ গরম এনসিপি-বিএনপির। হাদীর ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনায় দিনাজপুর সীমান্ত ৪২ বিজিবির রেড অ্যালার্ট জারি। রোহিঙ্গা মেয়েরা পাচার ছাড়াও বিদেশীদের দ্বারা যৌন কাজে ব্যবহারের টার্গেট হয়ে উঠছে ঠাকুরগাঁওয়ে নানা কর্মসূচিতে হানাদার মুক্ত দিবস উদযাপিত। ঠাকুরগাঁও জেলায় অনুষ্ঠিত হয়েছে ৪র্থ জেলা রোভার মুট-২০২৫। কুড়িগ্রামের রাজারহাটে প্রাণিসম্পদ সপ্তাহের প্রদর্শনী ও সমাপনী অনুষ্ঠিত। পার্বতীপুরে জাতীয় প্রাণি সম্পদ ও ডেইরি প্রকল্পের উদ্বোধন। রাণীশংকৈলে জাতীয় প্রাণীসম্পদ সপ্তাহ ও প্রাণিসম্পদ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত পলাতক শেখ হাসিনার অগ্রণী ব্যাংকের লকার ভেঙে ৮৩২ ভরি স্বর্ণ জব্দ রাজশাহীতে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে আহত ১০ জন ৩ ডিসেম্বর রংপুরে বিভাগীয় মহাসমাবেশ সফল করতে দিনাজপুরে ৮ ইসলামী দলের সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত। দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিতে সব বাহিনী প্রস্তুত: সিইসি পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ৬ হাজার কৃষক পাচ্ছে বিনামূল্যে গম বীজ ও সার। মাত্র চার মাসের শিশু সুমাইয়া বাঁচতে চায়! পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় হেফাজতে ইসলামের নতুন কমিটি গঠন। ভূমিকম্পে সম্ভাব্য ক্ষতি কমাতে এখনই শক্তিশালী ও সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে: সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান রাজধানীতে  আজ থেকে ঘরে বসেই মেট্রোরেলের কার্ড রিচার্জ করবেন? নীলফামারীতে পাটবীজ উৎপাদনকারী চাষীদের প্রশিক্ষণ। আর কোনো পরিস্থিতি নেই যে নির্বাচন ব্যাহত হবে-ঠাকুরগাঁওয়ে মির্জা ফখরুল  ৫-বছরেও শেষ হয়নি ওয়াশব্লকের নির্মাণ কাজ-জনস্বাস্থ্য অফিস বলছেন বাদ দেন চা খাওয়ার জন্য কিছু নেন। পার্বতীপুরে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকারের দাবীতে কর্মী সভা। পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় নদী বাঁচাও আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নাগরিক সমাবেশ। পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া ইউএনও এক গৃহহীন ভারসাম্যহীন নারীর পাশে দাঁড়ালো। ৮ দফা দাবিতে প্রধান উপদেষ্টা বরাবর নার্সিং এসোসিয়েশন দিনাজপুর জেলা শাখার স্মারকলিপি ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুরে ইউনিয়ন সিএসওর লাইভস্টক সংলাপ সভা অনুষ্ঠিত বগুড়ায় প্রেম করে বিয়ে অতপর ভাড়া বাসায় স্ত্রীকে হত্যা করল স্বামী। দিনাজপুরে ৩ দিনব্যাপী উদ্যোক্তা মেলা ও পিঠা উৎসবের সমাপনী। দিনাজপুরের বিরলে শতাধিক নেতা-কর্মীর মামলা থেকে বাঁচতে ফ্যাসিস্ট আ,লীগ থেকে পদত্যাগ! অভিযোগ দিয়ে ও কাজ বন্ধ হচ্ছে না আদমদিঘীতে সরকারি জায়গা দখল করে করা হচ্ছে অবকাঠামো নির্মাণ! বগুড়ার কইপাড়ায় নববধূ শম্পা হত্যার অভিযোগ, যৌতুক দাবির জেরে স্বামী আটক