হোম
নাগরিক ভাবনা

নাগরিক ভাবনা: জীবনের এক পর্যায়ে আমরা শোষক এবং আর পর্যায়ে আমরাই শোষিত।

অ্যাডভোকেট এম এ মজিদ || মুক্ত কলম সংবাদ

প্রকাশিত: ৭ আগস্ট, ২০২৬ ১১:১২ পূর্বাহ্ণ

ফাইল ছবি

মানুষের সভ্যতার ইতিহাস মূলত ন্যায়, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার ইতিহাস। কিন্তু একই সঙ্গে এটি আত্মস্বার্থ, লোভ এবং অন্যকে বঞ্চিত করার প্রবণতার ইতিহাসও। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে এমন বহু প্রথা ও সামাজিক রীতি আজও টিকে আছে, যা মানুষকে মানুষ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। যৌতুক প্রথা সেই অমানবিক বাস্তবতার অন্যতম নির্মম প্রতীক।

বিবাহের উদ্দেশ্য দু’টি মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, বিশ্বাস ও পারস্পরিক দায়িত্ববোধের বন্ধন সৃষ্টি করা। দু’টি পরিবারের মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে তোলা। কিন্তু বাস্তবে বহু ক্ষেত্রে বিবাহ একটি অলিখিত আর্থিক চুক্তিতে পরিণত হয়েছে। কোথাও প্রকাশ্যে, কোথাও নীরবে, কোথাও আবার সামাজিক মর্যাদার মোড়কে কন্যাপক্ষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় যৌতুক, মূল্যবান উপঢৌকন, আসবাবপত্র, স্বর্ণালংকার, নগদ অর্থ, ব্যয়বহুল ভোজ এবং নানা ধরনের আনুষ্ঠানিক খরচ।

এই প্রথার সবচেয়ে বড় শিকার কন্যার পরিবার। একটি মেয়ের বিয়ে দিতে গিয়ে কত পিতা জীবনের সমস্ত সঞ্চয় ব্যয় করেন, কত মা নিজের গয়না বিক্রি করেন, কত পরিবার পৈতৃক ভিটেমাটি বন্ধক রাখে কিংবা বিক্রি করে দেয়, কত মানুষ উচ্চসুদের ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে বছরের পর বছর সংগ্রাম করেন – তার সঠিক হিসাব কোনো পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না। একটি আনন্দঘন অনুষ্ঠান অনেক সময় একটি পরিবারের দীর্ঘস্থায়ী আর্থিক বিপর্যয়ের সূচনা হয়ে দাঁড়ায়।

কিন্তু এখানেই রয়েছে সবচেয়ে বড় আত্মপ্রবঞ্চনা। যে ব্যক্তি আজ নিজের পুত্রের বিয়েতে কন্যাপক্ষের কাছ থেকে যৌতুক, দামি উপঢৌকন কিংবা আড়ম্বরপূর্ণ আপ্যায়ন প্রত্যাশা করছেন, কয়েক বছর পর তিনিই যখন নিজের কন্যার বিয়ের আয়োজন করেন, তখন একই সামাজিক প্রথার সামনে অসহায় হয়ে দাঁড়ান। তখন তাকেও বরপক্ষের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে সঞ্চয় ভাঙতে হয়, ঋণ নিতে হয়, কখনো সম্মান রক্ষার জন্য নিজের সামর্থ্যের সীমা অতিক্রম করতে হয়।

অর্থাৎ জীবনের এক পর্যায়ে আমরা শোষক, আরেক পর্যায়ে আমরা শোষিত। আজ যে অন্যের ঘরে কান্নার কারণ, কাল সেই নিজের ঘরেই একই কান্নার প্রতিধ্বনি শুনতে হয়। এই নির্মম সত্যটি উপলব্ধি করতে না পারার কারণেই যৌতুকের অভিশাপ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আমাদের সমাজে বেঁচে আছে।

একটু গভীরভাবে ভাবলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়। যদি প্রতিটি পুত্রসন্তানের পরিবার আন্তরিকভাবে সিদ্ধান্ত নেয় – কোনো যৌতুক নয়, কোনো অপ্রয়োজনীয় উপঢৌকন নয়, কোনো বাহুল্যপূর্ণ মেহমানদারিরও প্রয়োজন নেই – তাহলে অধিকাংশ কন্যার পিতাকে আর ঋণগ্রস্ত হতে হবে না। জমিজমা বিক্রি করতে হবে না। ধার-দেনার বোঝা টেনে জীবন কাটাতে হবে না। অসংখ্য পরিবার আর্থিক ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পাবে। অর্থাৎ সমস্যার সমাধান অন্য কোথাও নয়; আমাদের নিজেদের হাতেই।

ইসলাম যৌতুককে সমর্থন করে না; বরং স্বামীর ওপর স্ত্রীর মোহরানা প্রদানকে বাধ্যতামূলক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বাংলাদেশের আইনও যৌতুক গ্রহণ ও প্রদান – উভয়কেই দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে। তবুও সামাজিক লোভ, অযৌক্তিক মর্যাদাবোধ এবং লোকদেখানো প্রতিযোগিতা এই কুপ্রথাকে টিকিয়ে রেখেছে।

আমরা প্রায়ই সন্তানের জন্য অঢেল সম্পদ রেখে যাওয়ার কথা ভাবি, কিন্তু তার চেয়েও বড় সম্পদ হলো একটি সৎ, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ। যে পিতা যৌতুক প্রত্যাখ্যান করেন, তিনি শুধু একটি পরিবারের আর্থিক বোঝা কমান না; তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি মহৎ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। সমাজের প্রকৃত সম্মান তারই প্রাপ্য, যিনি অন্যের অসহায়ত্বকে নিজের লাভের উপায়ে পরিণত করেন না।

আজ সময় এসেছে আমরা নিজেদের বিবেকের সামনে দাঁড়াই। আমরা কি সত্যিই আমাদের সন্তানের সুখ চাই, নাকি অন্যের কষ্টের ওপর নিজের সামাজিক মর্যাদার প্রাসাদ গড়তে চাই? মনে রাখতে হবে, অন্যের চোখের জল দিয়ে কখনো সুখের সংসার গড়ে ওঠে না।
পরিবর্তনের জন্য কোনো বড় আন্দোলনের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু একটি দৃঢ় সিদ্ধান্ত – আমার সন্তানের বিয়েতে আমি কোনো যৌতুক নেব না, কোনো অযৌক্তিক উপঢৌকন দাবি করব না এবং কাউকে সামাজিক আড়ম্বরের নামে নিঃস্ব হতে বাধ্য করব না।

যেদিন এই অঙ্গীকার প্রতিটি পরিবারে পৌঁছে যাবে, সেদিন যৌতুকের বিরুদ্ধে আইনকে আর একা লড়তে হবে না। সমাজ নিজেই সমাজকে বদলে দেবে। তখন বিবাহ হবে ভালোবাসার বন্ধন, ব্যবসার নয়; আত্মীয়তার সূচনা, আর্থিক শোষণের নয়; মানবিকতার উৎসব, লোভের প্রদর্শনী নয়।

সেদিনই আমরা সত্যিকার অর্থে সভ্য সমাজের দাবিদার হতে পারব। কারণ, যে সমাজে কন্যার পিতার দীর্ঘশ্বাস নেই, সেই সমাজেই পুত্রের হাসিও হবে নির্মল, বিবাহও হবে পবিত্র, আর মানবিকতাই হবে সর্বোচ্চ সামাজিক মর্যাদা।

লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট, জাতীয় সাংবাদিক সোসাইটি এবং ওয়ার্ল্ড পীছ অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস সোসাইটির চেয়ারম্যান।

ফেসবুক মন্তব্য

মতামত জানান :

সর্বশেষ খবর

রাজশাহীতে ফটো সাংবাদিকে ফাঁসানোর অভিযোগে তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ।
আইন-বিচার 2 hours আগে

সুনামগঞ্জে ঐতিহাসিক সীরাতুন্নবী মাহফিল অনুষ্ঠিত।
ধর্ম ও ইসলাম 3 hours আগে

পঞ্চগড়ে বাংলা টি ও বিসমিল্লাহ টি কারখানা পরিদর্শন করলেন বাংলাদেশ
অর্থনীতি 22 hours আগে

সিরাজগঞ্জে জাতীয় কন্যাশিশু দিবস ২০২৬ উদযাপন উপলক্ষে বর্ণাঢ্য র‍্যালি ও
জাতীয় 22 hours আগে

পঞ্চগড়ে ব্যবসায়ীর বাড়ি থেকে ৬১ বস্তা সার জব্দ,২০ হাজার টাকা
অপরাধ 24 hours আগে

নাগরিক ভাবনা : ও ডাক্তার ও ডাক্তার-মানুষ বাঁচানোর শপথ নিয়েছিলেন,
নাগরিক ভাবনা 1 day আগে

বগুড়ায় গাঁজাসহ ৩ জন গ্রেফতার, ভ্রাম্যমাণ আদালতে ১০ দিনের কারাদণ্ড
অপরাধ 1 day আগে

কুমিল্লার স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনের মৃত্যুর ঘটনার সাথে প্রেমিক জড়িত।
আইন-বিচার 1 day আগে

আশ্বিনের শেষ বেলায় অঝোর বৃষ্টি, পার্বতীপুরে শীতের আগমনী বার্তা।
রংপুর 3 days আগে

চেয়ারম্যান স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনালয় ট্রাইব্রেকারে রনচন্ডির জয় ।
খেলাধুলা 4 days আগে

পাঠকপ্রিয়

শিরোনাম :

কুড়িগ্রামে ঐতিহাসিক আসনে কঠিন চ্যালেঞ্জে জাপা,মাঠ গরম এনসিপি-বিএনপির। হাদীর ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনায় দিনাজপুর সীমান্ত ৪২ বিজিবির রেড অ্যালার্ট জারি। রোহিঙ্গা মেয়েরা পাচার ছাড়াও বিদেশীদের দ্বারা যৌন কাজে ব্যবহারের টার্গেট হয়ে উঠছে ঠাকুরগাঁওয়ে নানা কর্মসূচিতে হানাদার মুক্ত দিবস উদযাপিত। ঠাকুরগাঁও জেলায় অনুষ্ঠিত হয়েছে ৪র্থ জেলা রোভার মুট-২০২৫। কুড়িগ্রামের রাজারহাটে প্রাণিসম্পদ সপ্তাহের প্রদর্শনী ও সমাপনী অনুষ্ঠিত। পার্বতীপুরে জাতীয় প্রাণি সম্পদ ও ডেইরি প্রকল্পের উদ্বোধন। রাণীশংকৈলে জাতীয় প্রাণীসম্পদ সপ্তাহ ও প্রাণিসম্পদ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত পলাতক শেখ হাসিনার অগ্রণী ব্যাংকের লকার ভেঙে ৮৩২ ভরি স্বর্ণ জব্দ রাজশাহীতে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে আহত ১০ জন ৩ ডিসেম্বর রংপুরে বিভাগীয় মহাসমাবেশ সফল করতে দিনাজপুরে ৮ ইসলামী দলের সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত। দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিতে সব বাহিনী প্রস্তুত: সিইসি পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ৬ হাজার কৃষক পাচ্ছে বিনামূল্যে গম বীজ ও সার। মাত্র চার মাসের শিশু সুমাইয়া বাঁচতে চায়! পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় হেফাজতে ইসলামের নতুন কমিটি গঠন। ভূমিকম্পে সম্ভাব্য ক্ষতি কমাতে এখনই শক্তিশালী ও সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে: সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান রাজধানীতে  আজ থেকে ঘরে বসেই মেট্রোরেলের কার্ড রিচার্জ করবেন? নীলফামারীতে পাটবীজ উৎপাদনকারী চাষীদের প্রশিক্ষণ। আর কোনো পরিস্থিতি নেই যে নির্বাচন ব্যাহত হবে-ঠাকুরগাঁওয়ে মির্জা ফখরুল  ৫-বছরেও শেষ হয়নি ওয়াশব্লকের নির্মাণ কাজ-জনস্বাস্থ্য অফিস বলছেন বাদ দেন চা খাওয়ার জন্য কিছু নেন। পার্বতীপুরে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকারের দাবীতে কর্মী সভা। পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় নদী বাঁচাও আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নাগরিক সমাবেশ। পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া ইউএনও এক গৃহহীন ভারসাম্যহীন নারীর পাশে দাঁড়ালো। ৮ দফা দাবিতে প্রধান উপদেষ্টা বরাবর নার্সিং এসোসিয়েশন দিনাজপুর জেলা শাখার স্মারকলিপি ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুরে ইউনিয়ন সিএসওর লাইভস্টক সংলাপ সভা অনুষ্ঠিত বগুড়ায় প্রেম করে বিয়ে অতপর ভাড়া বাসায় স্ত্রীকে হত্যা করল স্বামী। দিনাজপুরে ৩ দিনব্যাপী উদ্যোক্তা মেলা ও পিঠা উৎসবের সমাপনী। দিনাজপুরের বিরলে শতাধিক নেতা-কর্মীর মামলা থেকে বাঁচতে ফ্যাসিস্ট আ,লীগ থেকে পদত্যাগ! অভিযোগ দিয়ে ও কাজ বন্ধ হচ্ছে না আদমদিঘীতে সরকারি জায়গা দখল করে করা হচ্ছে অবকাঠামো নির্মাণ! বগুড়ার কইপাড়ায় নববধূ শম্পা হত্যার অভিযোগ, যৌতুক দাবির জেরে স্বামী আটক