অ্যাডভোকেট এম এ মজিদ,ঢাকা || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ৬ জুন, ২০২৬ ৮:৪৪ অপরাহ্ণ
১৯৭০ সালে আমি রাঙ্গামাটিতে আমার ছোট মামা এমদাদুর রহমানের বাসায় থাকতাম। সে সময় তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার জেলা পরিষদের ডিস্ট্রিক্ট ইঞ্জিনিয়ার (এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। আমার আপন ফুফাতো ভাই মোহাম্মদ আলী (এম. আলী) সে-সময় রাঙ্গামাটি সদর মহকুমার মহকুমা প্রশাসক (এস.ডি.ও) ছিলেন। ছাত্রজীবনে তিনি আমাদের দিনাজপুরের বাড়িতে অর্থাৎ তার মামা বাড়িতে থেকেই লেখাপড়া করেছিলেন। ফলে আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত আন্তরিক ও স্নেহপূর্ণ।
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে – দিনাজপুরে এত কলেজ থাকতে আমি কেন সুদূর রাঙ্গামাটিতে গিয়ে রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজে পড়াশোনা করেছিলাম? বিষয়টি আর্থিক অনটনের কারণে নয়। এর পেছনে ছিল এক অদ্ভুত এবং বেদনাদায়ক বাস্তবতা। সেই সময় আমি এবং আমার পিতা এবং মিন্টু নামের এক ঘনিষ্ট বন্ধু পাকিস্তানি সামরিক জোনাল আদালতের একটি মামলার আসামি ছিলাম। দিনাজপুরের তদানীন্তন জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা খোগেন বাবু তাঁর দুই কন্যাকে ভিকটিম দেখিয়ে আমার পিতাকে নির্দেশদাতা এবং আমাকে ও আমার বন্ধু মিন্টুকে ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগের আসামি করে রংপুর জোনাল সামরিক আদালতে মামলা দায়ের করেছিলেন। অভিযোগটি ছিল সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, কাল্পনিক এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
আমাদের পারিবারিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের প্রতি খোগেন বাবুর দীর্ঘদিনের বিরূপ মনোভাবই ছিল এই ষড়যন্ত্রের মূল কারণ। আমাদের পাক-পাহাড়পুর মহল্লার ফোরকানিয়া মাদ্রাসাটি আমার পিতার একক প্রচেষ্টা এবং অর্থে প্রতিদিন বিনা টিউশন ফিতে আশেপাশের পাঁচটি মহল্লার ছেলে-মেয়েদের আরবি, বাংলা ও ইংরেজি শিক্ষা প্রদান করাতেন। এই মাদ্রসায় জুমার নামাজ ছাড়া প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য আজান দেওয়া এবং মসজিদের ইমাম-কাম- মাদ্রাসার আরবি শিক্ষকের বেতনসহ তিন বেলা খাওয়ানোর দায়িত্ব বাবা বহন করতেন।
বর্তমানে যেখানে পাক-পাহাড়পুর জামে মসজিদটি দাঁড়িয়ে আছে, তখন সেখানে ছিল একটি প্রশস্ত খাল। আমার পিতা সেই স্থান ভরাট করে একটি জামে মসজিদ প্রতিষ্ঠার কাজও শুরু করে দিয়েছিলেন। খোগেন বাবু জেলা প্রশাসন, পুলুশ প্রশাসন ও পৌরসভার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে সেই কাজ বন্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পৃথক তদন্তে তার অভিযোগ ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়।
সব চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি সামরিক আদালতে তার দুই মেয়েকে ধর্ষণচেষ্টার ভিকটিম দেখিয়ে মামলা দায়ের করেন, যার সম্ভাব্য শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড। খোগেন বাবু অর্থের বিনিময়ে সাক্ষীও সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু সামরিক আদালতের ব্রিগেডিয়ার বিচারক একের পর এক জেরা করে সাক্ষীদের বক্তব্যের অসারতা প্রমাণ করে ফেলেন। শেষ পর্যন্ত সাক্ষীরা স্বীকার করে যে তারা ঘটনাটি সম্পর্কে কিছুই জানে না। ফলস্বরূপ, মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার দায়ে তাদের শাস্তিও দেওয়া হয়েছিল।
এই পরিস্থিতিতে আমি কার্যত পলাতক আসামির জীবন যাপন করছিলাম। নিরাপত্তার কারণেই রাঙ্গামাটিতে আশ্রয় নিয়েছিলাম। তবে মামা কিংবা এসডিও ভাইয়ের কাছে কখনোই আমি আমার প্রকৃত অবস্থার কথা প্রকাশ করিনি। কারণ আমি জানতাম, সামরিক আদালতের পলাতক আসামিকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ উঠলে তাঁদের চাকরি মুহূর্তের মধ্যে বিপন্ন হয়ে পড়তে পারত। মামার বিশাল বাসায় একজন খুবই বিশ্বস্ত আপনজনের খুবই প্রয়োজন ছিল। আমাকে কাছে পেয়ে মামা অত্যন্ত স্নেহের সঙ্গে বললেন, “তুমি এখানে থেকেই কলেজে পড়াশোনা করো, আমাদের পরিবারের সদস্য হয়ে থাকো।” আমি মনে মনে আনন্দে আত্মহারা হলেও বাইরে তা প্রকাশ করিনি। শুধু বলেছিলাম, “আদর-যত্ন, লেখাপড়ার সুযোগ আর সামান্য পকেট খরচ পেলে আমার কোনো আপত্তি নেই।” মামা-মামি হাসিমুখে সম্মতি দিলে আমিও রাঙ্গামাটিকে নিজের নতুন ঠিকানা বানিয়ে ফেললাম।
রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজে ভর্তি হওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই কলেজের শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং কর্মকর্তাদের কাছে আমি খুবই পরিচিত ও প্রিয় হয়ে উঠি। আমার হাসিখুশি স্বভাব, শালীন আচরণ, বন্ধুবৎসল মনোভাব, সঙ্গে এসডিও সাহেবের ভাই এবং নির্বাহী প্রকৌশলীর ভাগিনা – এই পরিচয় আমাকে সবার কাছেই আপন করে তুলেছিল। কলেজের অধ্যক্ষ হাসান ওয়ায়েস স্যারও আমাকে বিশেষ স্নেহ করতেন। সে সময় পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রকাশ্যে ছাত্ররাজনীতি বলতে কিছুই ছিল না। ইয়াহিয়া খানের সামরিক শাসনের কঠোর নজরদারির কারণে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অনেকটাই নিষিদ্ধ ছিল। ঠিক তখনই ছাত্রনেতা সুনীল দে পার্বত্য চট্টগ্রামে ছাত্র ইউনিয়নের সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে তোলার দায়িত্ব পান।
একদিন তিনি আমাকে গোপনে জানালেন – নির্দিষ্ট দিন ও সময়ে রাঙ্গামাটির রাজবাড়ি এলাকার ঘন জঙ্গলের ভেতরে একটি গোপন বৈঠক হবে। নিরাপত্তার স্বার্থে তিনি কারও নাম প্রকাশ করেননি। কারণ ধরা পড়লে নির্যাতনের মুখে কেউ যেন অন্যদের পরিচয় ফাঁস করতে না পারে। নির্ধারিত দিনে আমরা ৩১ জন তরুণ সেই নির্জন জঙ্গলে একত্রিত হয়েছিলাম। চারপাশে নিস্তব্ধতা, মাথার ওপর ঘন বৃক্ষরাজি, আর বুকের ভেতর অদ্ভুত উত্তেজনা। সুনীল দে অত্যন্ত নিচু স্বরে আমাদের সামনে ছাত্র ইউনিয়নের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তুলে ধরলেন। তাঁর কথায় পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকার আন্দোলনের স্পষ্ট প্রতিধ্বনি ছিল। তিনি বললেন, দেশের প্রয়োজনে জীবন উৎসর্গ করতেও আমরা যেন পিছপা না হই; গোপনীয়তা রক্ষা করি; নেতৃত্বের প্রতি অবিচল আস্থা রাখি।
অল্প সময়ের মধ্যেই গঠিত হলো ৩১ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা শাখা। একটি মোমবাতি জ্বালিয়ে সেই জ্বলন্ত মোমবাতির আগুনের একটু উপরে হাত রেখে আমরা অগ্নিশপথ নিলাম। সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, আমরাই হয়তো ভবিষ্যতের বৈষম্যহীন স্বাধীন রাষ্ট্রের নির্মাতা হবো। সুনীল দে সর্বসম্মতিক্রমে সভাপতি নির্বাচিত হলেন এবং আমাকে করা হলো সহ-সভাপতি। এই বৈঠকের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি দুষ্টুমি, একটি লজ্জার স্মৃতি এবং একটি অসাধারণ মানবিকতার গল্প।
আমাদের অজান্তে রাঙ্গামাটি সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার আব্দুল খালেক নামের একজন গোয়েন্দা – আমরা তাকে টিকটিকি বলেই জানতাম – তিনি পাহাড়ের নিচে জঙ্গলে লুকিয়ে আমাদের আলোচনা শুনছিলেন। বিষয়টি টের পেয়ে আমরা কয়েকজন তরুণ মিলে একটি অদ্ভুত পরিকল্পনা করি। আমরা ১৫ – ১৬ জন মিলে একসাথে টিকটিকির মাথার ওপর প্রস্রাব করি । তিনি মাথা থেকে পা পর্যন্ত ভিজে গেলেও তিনি টু শব্দটিও উচ্চারণ করেননি।
আজ এত বছর পর ঘটনাটি স্মরণ হওয়ায় নিজের কাছেই লজ্জা লেগে গেল। তরুণ বয়সের উচ্ছ্বাস, অপরিণামদর্শিতা এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা আমাদের বিবেচনাবোধকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। এই ঘটনার প্রকৃত তাৎপর্য আমি জানতে পারি ১৯৯৩ সালে। সেই বছর আমি আমার স্ত্রী জেসমিন, আমার একমাত্র শ্যালিকা হাসিনা এবং একমাত্র পুত্র সাগরকে নিয়ে চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি ও কক্সবাজার ভ্রমণে গিয়েছিলাম। রাঙ্গামাটিতে পৌঁছানোর পূর্বে ‘বনরূপায়’ আমাদের বাস থামলে আমাদের বাসে আমার পূর্ব পরিচিত দৈনিক রাঙ্গামাটি পত্রিকার সে-সময়ের প্রকাশক ও সম্পাদক মো. মখলেছুর রহমান আমাদের বাসে উঠে বসেন। তাকে আমি চিনতে না পারলেও সে তাৎক্ষণিক আমাকে চিনে ফেলেছিল। আমাদের বাস রিজার্ভ বাজারে থামলে আমরা “থ্রি-ক্যাসেল হোটেলে” উঠি। সেদিন তিনি অনেকটা জোর-জবরদস্তি করে রাতে আমাদের আমন্ত্রণ জানালেন তার তবলছড়ির বাসায় রাতের খাবার খেতে।
মখলেছুর রহমান সন্ধ্যার পর হোটেলে এসে আমাদেরকে তার তবলছড়ির বাসায় নিয়ে গিয়ে তাঁর পিতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। তার পিতা আব্দুল খালেক আঙ্কেল আমাকে দেখেই জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কি পাকিস্তান আমলের রাঙ্গামাটির এস.ডি.ও মোহাম্মদ আলীর ভাই এবং এমদাদ সাহেবের ভাগিনা?” আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে উত্তরে হ্যা বললাম।
কিছুক্ষণ পর তিনি হেসে আবারও প্রশ্ন করলেন, “১৯৭০ সালে রাজবাড়ির জঙ্গলে ছাত্র ইউনিয়নের গোপন সভা করেছিলে, সেকথা কি তোমার মনে আছে?” আমি বললাম, “জি, মনে আছে।”তিনি আবার প্রশ্ন করে জিজ্ঞেস করে বললেন, “ওই মিটিংয়ের আরও কিছু ঘটনা মনে পড়ে?”
আমি না-সূচক উত্তর দিলে তিনি হেসে বললেন, “তোমরা সবাই মিলে একজন টিকটিকির মাথায় প্রস্রাব করেছিলে।”
মুহূর্তেই আমার মাথা নিচু হয়ে গেল। লজ্জায় মুখ রক্তিম হয়ে উঠল। মনে হচ্ছিল, মাটির সঙ্গে মিশে যাই। তখন তিনি আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন,“ওই বয়সে দুষ্টুমি করাটাই স্বাভাবিক। আমি চাইলে তোমাদের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করতে পারতাম। আমি রিপোর্ট করলে পাকিস্তানি সামরিক সরকার তোমাদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলত, আর তোমার এস.ডি.ও ভাই এবং নির্বাহী প্রকৌশলী মামার চাকরিও বিপন্ন হয়ে যেতে পারতো। কিন্তু আমি তা করিনি।”
কিছুক্ষণ থেমে তিনি আরও বললেন,“আমি তোমাদের কথাবার্তা সবই শুনেছিলাম। আমি বুঝেছিলাম, তোমরা ব্যক্তিস্বার্থের জন্য নয়, এই দেশের মানুষের মুক্তি, মর্যাদার ও জীবনের মানোন্নয়নের স্বপ্ন দেখছ। তাই তোমাদের ঘৃণা করিনি, বরং মনে মনে তোমাদেরকে স্যালুট জানিয়েছিলাম।”
এরপর তাঁর কণ্ঠে আবেগ জমে উঠল। তিনি বললেন, “তোমাদের সেই দেশপ্রেমই পরে মুক্তিযুদ্ধে রূপ নিয়েছিল। তোমাদের অনেকেই নিজের জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞান করে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলে। সেই আত্মত্যাগের ফলেই আমরা পেয়েছি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ, একটি জাতীয় পতাকা এবং একটি জাতীয় সঙ্গীত।” আমি নির্বাক হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। সেদিন উপলব্ধি করেছিলাম – দেশপ্রেম শুধু অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কখনো কখনো একজন নীরব গোয়েন্দার বিবেকও ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। আর সেই কারণেই আজও মোখলেছুর রহমানের বাবা আব্দুল খালেকের কথা মনে পড়লে আমার মাথা শ্রদ্ধায় নত হয়ে আসে।
লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট এবং জাতীয় সাংবাদিক সোসাইটি ও ওয়ার্ল্ড পীছ অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস সোসাইটির চেয়ারম্যান।