হোম
নাগরিক ভাবনা

নাগরিক ভাবনা: প্রশিক্ষণ,পদায়ন ও রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়:দায় কি শুধু আমলাদের,নাকি সরকারের?

অ্যাডভোকেট এম এ মজিদ ঢাকা || মুক্ত কলম সংবাদ

প্রকাশিত: ২১ আগস্ট, ২০২৬ ১:৪৬ অপরাহ্ণ

ফাইল ছবি

সরকারি কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন – এ নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। দক্ষ, আধুনিক ও জনবান্ধব প্রশাসন গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। বিশেষ করে বিসিএস ক্যাডারে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের শিক্ষানবীশকালেই তাদের নিজ নিজ ক্যাডার ও দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বাধ্যতামূলক পেশাগত প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত। প্রশিক্ষণ ছাড়া দক্ষতা ও কর্মক্ষমতা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে – কী ধরনের প্রশিক্ষণ, কাকে, কেন এবং কত ব্যয়ে দেওয়া হচ্ছে? প্রশিক্ষণ শেষে রাষ্ট্র তার বিনিয়োগের কতটা সুফল পাচ্ছে? বিদেশে উচ্চশিক্ষা বা প্রশিক্ষণ কোনো অপচয় নয়। যোগ্য কর্মকর্তা প্রয়োজনীয় বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নিয়ে দেশে ফিরে সেই জ্ঞান কাজে লাগাতে পারলে তা রাষ্ট্রের জন্য মূল্যবান বিনিয়োগ।

সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন প্রশিক্ষণ রাষ্ট্রের প্রয়োজনের পরিবর্তে ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার সুবিধায় পরিণত হয় এবং প্রশিক্ষণ শেষে অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগানোর সুযোগও থাকে না। ধরা যাক, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন উপসচিবকে শিক্ষা বিষয়ে চার বছরের জন্য বিদেশে উচ্চশিক্ষা বা পিএইচডি ডিগ্রি করতে পাঠানো হলো। এ সময়ে তিনি দেশের জনগণের জন্য নিয়মিত দাপ্তরিক সেবা দিতে পারলেন না। অথচ সরকারি নিয়ম অনুসারে তার বেতন-ভাতা ও অন্যান্য চাকরিগত সকল সুযোগ-সুবিধা অব্যাহত থাকল। এর সঙ্গে যুক্ত হলো বিদেশে শিক্ষা, আবাসন, ভ্রমণসহ বিভিন্ন ব্যয় বাবদ কমপক্ষে দশ কোটি টাকা – যা সমমূল্যের বৈদেশিক মূদ্রায় প্রদান করতে হবে।। রাষ্ট্রের মোট ব্যয় যদি বিপুল অঙ্কে পৌঁছে যায়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে – এই বিনিয়োগের বিনিময়ে জনগণ কী পেল?

চার বছর পর ওই ডিগ্রিধারী কর্মকর্তা দেশে ফিরে আসার পর সাথে সাথেই পদোন্নতি দেওয়াটা একটা অলিখিত রীতির কারনে পদোন্নতি পেয়ে যুগ্মসচিব হলেন। পদোন্নতির এক-দুই মাসের মধ্যেই তাঁকে মৎস্য মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হলো। তখন প্রশ্ন উঠবে – শিক্ষা বিষয়ে চার বছরের উচ্চশিক্ষা অর্জনের পর তার সেই বিশেষায়িত জ্ঞান রাষ্ট্র কোথায় কাজে লাগাবেন? অবশ্যই একজন দক্ষ কর্মকর্তা যেকোনো মন্ত্রণালয়েই কিছু না কিছু অবদান রাখতে পারেন। কিন্তু বিশেষায়িত উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট জ্ঞান প্রয়োগের সুযোগ না থাকলে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের বড় অংশই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। তার ওপর নতুন মন্ত্রণালয়ে গিয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞতা না থাকায় তাকে আবার নতুন করে কাজ শিখতে হয়। তাহলে উচ্চ শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ বা ডিগ্রির হিসাবটা কী দাঁড়াল?

রাষ্ট্র বিপুল অর্থ ব্যয় করল, কর্মকর্তা চার বছর বিদেশে থাকলেন, দেশে ফিরে পদোন্নতি পেলেন, কিন্তু যে বিষয়ে তাঁকে উচ্চশিক্ষা দেওয়া হলো সেই জ্ঞান কাজে লাগানোর সুযোগই তাকে দেওয়া হলো না। এটি কি রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের যৌক্তিক ব্যবহার?

দায় কি শুধু আমলাদের?
এখানেই আরও কঠিন একটি প্রশ্ন সামনে আসে। এ ব্যবস্থার জন্য শুধু আমলাদের দায়ী করলে সত্যের পুরোটা বলা হবে না। সরকারও এর জন্য সমানভাবে দায়ী।
কারণ, কোন কর্মকর্তা বিদেশে যাবেন, কে দীর্ঘমেয়াদি উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাবেন, কে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকবেন এবং কে পদোন্নতি পাবেন – এসবের বড় অংশই সরকারের পছন্দের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, যোগ্যতা, দক্ষতা ও সততার চেয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সরকারের প্রতি আনুগত্য, তোষামোদ এবং ক্ষমতাসীনদের মনোরঞ্জনকারীরাই প্রশাসনিক সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে অঘোষিত গুরুত্ব পেয়ে থাকেন – এমন অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই সমাজে রয়েছে। কোনো কোনো সরকার তাদের অনুগত ও আজ্ঞাবাহী কর্মকর্তাদের পুরস্কৃত করতে বিদেশি প্রশিক্ষণ, উচ্চশিক্ষা, গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন, পদোন্নতি কিংবা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাকে ব্যবহার করেছে – এমন ধারণা জনমনে, এমনকি আমলাদের মধ্যেও সৃষ্টি হয়েছে। ফলে প্রশাসনে সরকারের নিরপেক্ষতা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে চলেছে।

সরকারের কাজ হওয়া উচিত যোগ্যতম ব্যক্তিকে উপযুক্ত সুযোগ দেওয়া, আজ্ঞাবাহী ও তৈলমর্দনকারী ব্যক্তিকে পুরস্কৃত করা নয়। রাষ্ট্রীয় সুযোগ কোনো রাজনৈতিক আনুগত্যের পুরস্কার হতে পারে না। বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগও কোনো কর্মকর্তাকে খুশি করার উপায় হওয়া উচিত নয়। কারণ এর অর্থ আসে জনগণের করের টাকা থেকে।

প্রশিক্ষণ হবে রাষ্ট্রের জন্য, ব্যক্তির জন্য নয় বিদেশে প্রশিক্ষণ বা উচ্চশিক্ষা বন্ধ করার প্রশ্নই ওঠে না। বরং প্রয়োজন আরও উন্নত ও মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ। কিন্তু পুরো ব্যবস্থাটিকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
যে কর্মকর্তা যে বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নেবেন, দেশে ফিরে সম্ভব হলে তাকে সেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা খাতে নির্দিষ্ট সময় কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। বিশেষ কারণে পদায়ন সম্ভব না হলে তার কারণ নথিভুক্ত করা উচিত।
প্রতিটি দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের আগে নির্ধারণ করতে হবে – রাষ্ট্র কেন এই কর্মকর্তাকে পাঠাচ্ছে এবং তার কাছ থেকে কী ফল আশা করছে।

দেশে ফিরে তাকে তার অর্জিত জ্ঞান ও গবেষণার আলোকে একটি কর্মপরিকল্পনা বা নীতিগত প্রস্তাব দেওয়ার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। কয়েক বছর পর মূল্যায়ন করতে হবে – তিনি তার প্রশিক্ষণ বাস্তবে কতটা কাজে লাগিয়েছেন এবং রাষ্ট্র তার পেছনে ব্যয় করা অর্থের কী সুফল ফেরৎ পেয়েছে।

প্রয়োজনে একটি কেন্দ্রীয় ‘Training Investment and Outcome Database’ চালু করা যেতে পারে। সেখানে থাকবে – কে কোথায়, কোন বিষয়ে, কতদিন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন; রাষ্ট্রের কত অর্থ ব্যয় হয়েছে; দেশে ফিরে তিনি কোথায় পদায়িত হয়েছেন এবং তার অর্জিত জ্ঞান কীভাবে কাজে লাগানো হয়েছে।

জনগণের টাকার জবাবদিহিতা অবশ্যই শতভাগ জনগণের কাছে প্রকাশ করতে হবে। সরকারি অর্থ মানেই জনগণের অর্থ। তাই একজন কর্মকর্তাকে বিদেশে পাঠানোর আগে যেমন প্রশ্ন করতে হবে – কেন পাঠানো হচ্ছে?
দেশে ফিরে প্রশ্ন করতে হবে – কী অর্জন হলো?
আর কয়েক বছর পর প্রশ্ন করতে হবে – সেই অর্জন জনগণের কাজে কতটা বাস্তবায়ন করা হয়েছে?
যোগ্য ও দক্ষ কর্মকর্তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু প্রশিক্ষণকে যদি ক্ষমতাসীনদের অনুগতদের। এই লেখাটি একান্ত লেখকের ব্যক্তিগত মতামত।

ফেসবুক মন্তব্য

মতামত জানান :

সর্বশেষ খবর

ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গীতে ৩০০ পিস ইয়াবাসহ দুইজন গ্রেপ্তার।
আইন-বিচার 2 hours আগে

ঠাকুরগাঁও পীরগঞ্জে বৃদ্ধ মাকে মারধর ভরণ-পোষণ না দেওয়া,হত্যাচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে
রংপুর 3 hours আগে

সাভারে বিদেশি পিস্তল ও গুলি এবং মাদকদ্রব্যসহ দুইজন গ্রেপ্তার।
অপরাধ 11 hours আগে

নাগরিক ভাবনা: প্রশিক্ষণ,পদায়ন ও রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়:দায় কি শুধু আমলাদের,নাকি
নাগরিক ভাবনা 11 hours আগে

পঞ্চগড় পৌর যুবলীগের হাবিবুর রহমান শিশিরকে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার।
অপরাধ 1 day আগে

নাগরিক ভাবনা: তিনজন মানুষের ঋণ,কৃতজ্ঞতার ভাষা যেখানে নীরব
নাগরিক ভাবনা 1 day আগে

বগুড়ায় শয়ন ঘরে তালা দেয়াকে কেন্দ্র করে উল্টো বাদীর বিরুদ্ধে
অপরাধ 2 days আগে

পঞ্চগড়ে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে নানা দুর্নীতির অভিযোগে ১২ ইউপি সদস্যের অনাস্থা
অপরাধ 2 days আগে

ঠাকুরগাঁয়ের বালিয়াডাঙ্গীতে ৪ হাজার ৫০০ পিস ইয়াবাসহ দুইজন গ্রেপ্তার।
অপরাধ 2 days আগে

নড়াইলে পাঁচ বছরের শিশু জান্নাতুল মাওয়াকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলায়
আইন-বিচার 2 days আগে

পাঠকপ্রিয়

শিরোনাম :

কুড়িগ্রামে ঐতিহাসিক আসনে কঠিন চ্যালেঞ্জে জাপা,মাঠ গরম এনসিপি-বিএনপির। হাদীর ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনায় দিনাজপুর সীমান্ত ৪২ বিজিবির রেড অ্যালার্ট জারি। রোহিঙ্গা মেয়েরা পাচার ছাড়াও বিদেশীদের দ্বারা যৌন কাজে ব্যবহারের টার্গেট হয়ে উঠছে ঠাকুরগাঁওয়ে নানা কর্মসূচিতে হানাদার মুক্ত দিবস উদযাপিত। ঠাকুরগাঁও জেলায় অনুষ্ঠিত হয়েছে ৪র্থ জেলা রোভার মুট-২০২৫। কুড়িগ্রামের রাজারহাটে প্রাণিসম্পদ সপ্তাহের প্রদর্শনী ও সমাপনী অনুষ্ঠিত। পার্বতীপুরে জাতীয় প্রাণি সম্পদ ও ডেইরি প্রকল্পের উদ্বোধন। রাণীশংকৈলে জাতীয় প্রাণীসম্পদ সপ্তাহ ও প্রাণিসম্পদ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত পলাতক শেখ হাসিনার অগ্রণী ব্যাংকের লকার ভেঙে ৮৩২ ভরি স্বর্ণ জব্দ রাজশাহীতে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে আহত ১০ জন ৩ ডিসেম্বর রংপুরে বিভাগীয় মহাসমাবেশ সফল করতে দিনাজপুরে ৮ ইসলামী দলের সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত। দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিতে সব বাহিনী প্রস্তুত: সিইসি পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ৬ হাজার কৃষক পাচ্ছে বিনামূল্যে গম বীজ ও সার। মাত্র চার মাসের শিশু সুমাইয়া বাঁচতে চায়! পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় হেফাজতে ইসলামের নতুন কমিটি গঠন। ভূমিকম্পে সম্ভাব্য ক্ষতি কমাতে এখনই শক্তিশালী ও সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে: সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান রাজধানীতে  আজ থেকে ঘরে বসেই মেট্রোরেলের কার্ড রিচার্জ করবেন? নীলফামারীতে পাটবীজ উৎপাদনকারী চাষীদের প্রশিক্ষণ। আর কোনো পরিস্থিতি নেই যে নির্বাচন ব্যাহত হবে-ঠাকুরগাঁওয়ে মির্জা ফখরুল  ৫-বছরেও শেষ হয়নি ওয়াশব্লকের নির্মাণ কাজ-জনস্বাস্থ্য অফিস বলছেন বাদ দেন চা খাওয়ার জন্য কিছু নেন। পার্বতীপুরে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকারের দাবীতে কর্মী সভা। পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় নদী বাঁচাও আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নাগরিক সমাবেশ। পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া ইউএনও এক গৃহহীন ভারসাম্যহীন নারীর পাশে দাঁড়ালো। ৮ দফা দাবিতে প্রধান উপদেষ্টা বরাবর নার্সিং এসোসিয়েশন দিনাজপুর জেলা শাখার স্মারকলিপি ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুরে ইউনিয়ন সিএসওর লাইভস্টক সংলাপ সভা অনুষ্ঠিত বগুড়ায় প্রেম করে বিয়ে অতপর ভাড়া বাসায় স্ত্রীকে হত্যা করল স্বামী। দিনাজপুরে ৩ দিনব্যাপী উদ্যোক্তা মেলা ও পিঠা উৎসবের সমাপনী। দিনাজপুরের বিরলে শতাধিক নেতা-কর্মীর মামলা থেকে বাঁচতে ফ্যাসিস্ট আ,লীগ থেকে পদত্যাগ! অভিযোগ দিয়ে ও কাজ বন্ধ হচ্ছে না আদমদিঘীতে সরকারি জায়গা দখল করে করা হচ্ছে অবকাঠামো নির্মাণ! বগুড়ার কইপাড়ায় নববধূ শম্পা হত্যার অভিযোগ, যৌতুক দাবির জেরে স্বামী আটক