অ্যাডভোকেট এম এ মজিদ, ঢাকা || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ৩ আগস্ট, ২০২৬ ১১:২৬ পূর্বাহ্ণ
৩০ জুলাই ২০২৬ বৃহস্পতিবার রাত ৯ টা ৩০ মিনিট থেকে নাবিল স্ক্যানিয়া এসি বিজনেস ক্লাস কোচযোগে দিনাজপুর রওয়ানা হওয়ার পূর্বে আমি ও আমার সহধর্মিণী কল্যাণপুরের খালেক পেট্রোল পাম্পসংলগ্ন নাবিল কাউন্টারে অপেক্ষা করছিলাম।
অপেক্ষমাণ যাত্রীদের ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ চোখ আটকে গেল একটি ছোট্ট শিশুর দিকে। হাতে কয়েকটি শিশুতোষ বই। মুখে লাজুক হাসি। কণ্ঠে অসহায় মিনতি, “স্যার, একটা বই নেন।”
তার বয়স দেখে মনে হলো ছয়-সাত বছরের বেশি নয়। অথচ একের পর এক মানুষ তাকে ফিরিয়ে দিচ্ছে। কেউ অবহেলায়, কেউ বিরক্তিতে, কেউ এমনভাবে ধমক দিচ্ছে যেন শিশুটি কোনো অপরাধ করেছে।
এই দৃশ্য দেখে মনে হলো – আমাদের হৃদয়গুলো কি সত্যিই এতটাই পাথর হয়ে গেছে? শিশুটি আমার কাছে এলো। নাম জিজ্ঞেস করতেই বলল,আমার নাম ফাহিম।
আমি বললাম,তোমার বয়স কি ছয় বছর হয়েছে?
সে বলল,না স্যার, আমার বয়স সাড়ে দশ বছর। আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, “তোমাকে তো এত বড় মনে হয় না।
সে যে উত্তর দিল, তা আমার বুকের ভেতর গভীর ক্ষত তৈরি করল। সে বলল,স্যার, প্যাট ভইরা খাইতে পাই না, তাই বয়স বুঝা যায় না। আমি জানতে চাইলাম, স্কুলে যাও?
সে বলল, ক্যামনে পড়ুম? আমাকেই কামাই কইরা মারে ট্যাকা দিতে হয়। আমি বললাম,তোমার বাবা কি করেন?
তার শান্ত উত্তর,আমি ছোট থাকতেই বাবা মইরা গ্যাছে।
আর কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস হলো না। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কয়েকটি বই কিনলাম। ইচ্ছা করেই কিছু অতিরিক্ত টাকা দিলাম।
কিন্তু যে শিশুটির ঘরে হয়তো রাতে খাবারও নেই, সেই শিশুটি আমার দিকে টাকা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,স্যার, আমার কাছে ভাঙতি টাকা নাই। আইজ আমার এ্যাহনো বহনি হয় নাই
আমি বললাম,ভাঙতি টাকা ফেরৎ দিতে হবে না।
সে অতিরিক্ত টাকাটা নিতে চাইল না। শেষ পর্যন্ত অনেক বুঝিয়ে, অনেকটা জোর করেই তাকে অতিরিক্ত টাকাটা রাখতে রাজি করালাম।
এই শিশুটি মাত্র ছয় বছর বয়স থেকেই জীবন সংগ্রামে বই বিক্রি করতে শুরু করেছে। পিতৃহারা সংসারের দায়িত্ব তার ছোট্ট কাঁধে। ফাহিমের মা মানুষের বাড়িতে কাজ করেন। একটি ভাই ও একটি বোনের মুখে খাবার তুলে দিতে সে নিজের শিশুজীবন বিসর্জন দিয়েছে। ভাবুন একবার, যে হাতে খাতা-কলম থাকার কথা, সেই হাতে বই বিক্রির ঝুড়ি।
যে কাঁধে স্কুলব্যাগ থাকার কথা, সেই কাঁধে সংসারের দায়িত্ব।
যে শিশুর মাঠে দৌঁড়ানোর কথা, সে আজ বাস কাউন্টারে দাঁড়িয়ে মানুষের করুণা নয়, সম্মানজনকভাবে বই বিক্রি করে বেঁচে থাকার সংগ্রাম করছে।
এটাই কি আমাদের স্বাধীনতার ৫৪ বছরের বাংলাদেশ?
আমরা কি শুধু উন্নয়নের উঁচু উঁচু সেতু, মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে আর পরিসংখ্যান নিয়ে গর্ব করব, আর ফাহিমদের দিকে তাকাব না? রাষ্ট্রের কাছে প্রশ্ন, একটি শিশুর শৈশব রক্ষা করা কি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব নয়?
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রশ্ন, ফাহিম কেন আজও বিদ্যালয়ের বাইরে? সমাজের বিত্তবানদের কাছে প্রশ্ন, আপনাদের বিলাসী ভোজের একবেলার খরচে কতজন ফাহিমের এক বছরের বই-খাতা হতে পারে, কখনও কি ভেবেছেন?
রাজনীতিবিদদের কাছে প্রশ্ন, নির্বাচনের সময় শিশুদের মাথায় হাত রাখার ছবি তোলেন, কিন্তু নির্বাচনের পর সেই শিশুদের জীবনের দায়িত্ব কে নেয়? আর আমাদের সবার কাছে প্রশ্ন, আমরা কি সত্যিই মানুষ, যদি একটি শিশুর মুখে “প্যাট ভইরা খাইতে পাই না” – এই কথাটি শুনেও নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারি?
ফাহিম কোনো ভিক্ষুক নয়।
সে একজন সংগ্রামী শিশু।
সে হাত পাতেনি – সে বই বিক্রি করছে।
সে করুণা চায়নি – সে সম্মান নিয়ে বাঁচতে চেয়েছে।
লজ্জা ফাহিমের নয়, এ লজ্জা আমাদের সবার, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদদের।
লজ্জা এমন একটি রাষ্ট্রের – যেখানে একটি শিশুকে নিজের শিশুজীবন বিসর্জন দিয়ে পরিবারের ভাত জোগাড় করতে হয়।
লজ্জা এমন একটি সমাজের, যেখানে কোটি কোটি টাকার অপচয় হয়, অথচ হাজার হাজার ফাহিম বিদ্যালয়ের দরজায় পৌঁছাতে পারে না। আজ ফাহিমের চোখের দিকে তাকিয়ে মনে হলো – এই শিশুটি রাষ্ট্রের কাছে ভিক্ষা চায় না; সে তার প্রাপ্য অধিকার চায়। আর সেই অধিকার নিশ্চিত করতে না পারলে উন্নয়নের সব পরিসংখ্যান, সব স্লোগান, সব আত্মপ্রশংসা – একজন ক্ষুধার্ত শিশুর চোখের সামনে এসে নীরবে ভেঙে পড়ে।
যেদিন বাংলাদেশের প্রতিটি ফাহিম বই বিক্রি নয়, বই হাতে নিয়ে বিদ্যালয়ে যাবে – সেদিনই আমরা সত্যিকার অর্থে একটি সভ্য, স্বাধীন, মানবিক ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্রর নাগরিক হিসেবে নিজেদের দাবি করার নৈতিক অধিকার অর্জন করব, তার আগে নয়।
লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট, জাতীয় সাংবাদিক সোসাইটি এবং ওয়ার্ল্ড পীছ অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস সোসাইটির চেয়ারম্যান।