আব্দুল্লাহ্ আল মামুন,জেলা প্রতিনিধি পঞ্চগড় || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ১৪ মে, ২০২৬ ১১:৫৮ অপরাহ্ণ
পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ পৌর শহরে দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে অপহরণের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় সুলতানা রোজ নিপা নামে এক নায়িকা ও তার ভাইসহ তিনজনকে আসামি করা হয়েছে। এ ঘটনায় এলাকাজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ৬ মে বৃহস্পতিবার প্রতিদিনের মতো ওই শিক্ষার্থী স্কুলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়। তবে স্কুল ছুটির পরও বাড়িতে না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে তারা জানতে পারেন, ওই শিক্ষার্থী সেদিন স্কুলে উপস্থিত ছিল না।সন্ধ্যা পর্যন্ত বাড়িতে না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। দীর্ঘ সময় অনুসন্ধানের পরও কোনো সন্ধান না পেয়ে শিক্ষার্থীর বাবা দেবীগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং-৩৩০) করেন।
শিক্ষার্থী দেবীগঞ্জের নর্থ স্টার রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির ছাত্রী। তিনি পৌরসভার ৮ নং ওয়ার্ডের কলেজপাড়া এলাকার বাসিন্দা মোঃ জামিরুল ইসলাম বাবুলের মেয়ে ঘটনার দিন সন্ধ্যা আনুমানিক ৬টা ১৫ মিনিটে শিক্ষার্থীর বাবার মোবাইলে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে তার মোবাইলে কল আসে। কলদাতা বলেন, “আঙ্কেল, আপনার মেয়ে আমার কাছে এসেছে। আমি তাকে বিয়ে করেছি। এরপর থেকে নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। পুলিশের সহায়তায় মোবাইল নম্বরটি ট্রুকলারে “আকাশ” নামে শনাক্ত করা হয়।
পরবর্তীতে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য যাচাই করে মোঃ আব্বাস আলী ওরফে আকাশ নামে এক ব্যক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। তার বাবার নাম মৃত জাহাঙ্গীর হোসেন। স্থায়ী ঠিকানা নোয়াখালীর সদর উপজেলার ধর্মপুর হাজিরহাট এলাকা এবং বর্তমান ঠিকানা ঢাকার বাড্ডা দেবীগঞ্জ থানা পুলিশের সহযোগিতায় গত ৮ মে রাতে ঢাকার বাড্ডা থানার ডিআইটি প্রজেক্ট ৪ নং রোড এলাকা থেকে ওই শিক্ষার্থীকে নায়িকা নিপার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধারের সময় শিক্ষার্থীর শারীরিক অবস্থা ভালো না থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে তাকে পরিবারের জিম্মায় দেওয়া হয়। পরে শিক্ষার্থী স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলে তার বক্তব্যের ভিত্তিতে অপহরণের ঘটনায় মামলা দায়েরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
শিক্ষার্থীর পিতা মোঃ জামিরুল ইসলাম বাবুল বাদী হয়ে গত ১৩ মে দেবীগঞ্জ থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৭/৩০ ধারায় মামলা নং-১২/৭১ দায়ের করেন। মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে মোঃ আব্বাস আলী ওরফে আকাশ (৩৫), তার বড় বোন সুলতানা রোজ নিপা (৩৮) এবং দেবীগঞ্জ কলেজপাড়া এলাকার বাসিন্দা মোঃ মনোয়ার হোসেনের স্ত্রী মোছাঃ ফজিলা বেগমকে (৩৫)। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ৪ থেকে ৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। জানা যায়, সুলতানা রোজ নিপা ঢাকায় নায়িকা হিসেবে পরিচিত।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়, অভিযুক্ত আকাশ দেবীগঞ্জে ভাড়া ভেকু মেশিন কোম্পানিতে ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং কলেজপাড়ায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। এ সময় শিক্ষার্থীর বাড়ির পাশ দিয়ে স্কুলে যাওয়ার পথে তিনি ওই শিক্ষার্থীকে প্রেমের প্রস্তাব দেন। শিক্ষার্থী প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় স্থানীয় কয়েকজনের সহায়তায় পরিকল্পিতভাবে অপহরণের ঘটনা ঘটানো হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
শিক্ষার্থীর পরিবার দাবি করেছে, এটি পূর্বপরিকল্পিত অপহরণ। এ ঘটনায় এলাকায় উদ্বেগ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষার্থীর বাবা বাবুল হোসেন বলেন, আমার নাবালিকা মেয়েকে পরিকল্পিতভাবে অপহরণ করেছে মামলার আসামিরা। আমার পরিবারকে মানসিক ও সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে স্থানীয় কিছু অসাধু ব্যক্তির সহযোগিতায় এই অপহরণের ঘটনা ঘটানো হয়। পরে পুলিশের সহায়তায় আমি আমার মেয়ে উদ্ধার হয় এবং এ ঘটনায় মামলা দায়ের করেছি। আমি আইনের কাছে সঠিক বিচার চাই। আমার মতো আর কোনো বাবাকে যেন এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও অসহায় হতে না হয়, সেই কামনাই করি।
এ ধরনের অপরাধের কঠোর শাস্তি হওয়া প্রয়োজন।আমার মেয়ে দশম শ্রেণির একজন মেধাবী বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল। তার পড়ালেখার এত বড় ক্ষতি করে তার ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দেওয়া হয়েছে। আমি কি আমার সেই মেয়ের স্বাভাবিক জীবন আবার ফিরে পাব?
দেবীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সেলিম মালিক জানান, গত ৬ মে দেবীগঞ্জের এক শিক্ষার্থী নিখোঁজ হলে তার অভিভাবক থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরবর্তীতে দেবীগঞ্জ থানা পুলিশের একটি চৌকস দল ঢাকা বাড্ডা থানা এলাকা থেকে ওই শিক্ষার্থীকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে উদ্ধার করে। পরে শিক্ষার্থীর বাবা দেবীগঞ্জ থানায় একটি এজাহার দায়ের করলে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৭/৩০ ধারায় মামলা নং-১২/৭১ রুজু করা হয়। এ ঘটনায় জড়িত আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।