admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ১৮ ডিসেম্বর, ২০২০ ১০:৩০ পূর্বাহ্ণ
শ্রীলঙ্কায় ২০ দিনের মুসলিম শিশুর মরদেহ জোর করে দাহ, ক্ষোভে ফুঁসছেন মুসলমানেরা। ২০ দিনের একটি মুসলিম শিশুকে জোর করে দাহ করার প্রতিবাদে কলম্বোর একটি ক্রিমেটোরিয়ামের দেয়ালে সাদা ফিতে ঝোলাচ্ছেন এক নারী। কলম্বোতে গত ৯ই ডিসেম্বর ২০ দিন বয়সী একটি মুসলিম শিশুকে বাবা-মায়ের তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও দাহ করার এক ঘটনা শ্রীলঙ্কায় ক্ষোভ ও নিন্দার জন্ম দিয়েছে। ওই ঘটনায় শ্রীলঙ্কা ছাড়াও বিশ্বের আরও অনেক দেশ থেকে ক্ষোভ ও নিন্দার খবর পাওয়া গেছে।
কোভিড-১৯ রোগে মরলেই জাতি-ধর্ম নির্বিশেষ মরদেহ পুড়িয়ে ফেলার সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে শ্রীলঙ্কার সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায় এমনিতেই নাখোশ। তাদের কথা, গোতাবায়া রাজাপাকসের সরকার মুসলমানদের ধর্মীয় স্পর্শকাতরতাকে ইচ্ছা করে অবজ্ঞা করছে। জানা গেছে, এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাসে মারা যাওয়া ১০৭ জন মুসলমানকে জোর করে দাহ করা হয়েছে। কোভিডে আক্রান্ত সন্দেহে মৃত শেখ নামের শিশুটিকে জোর করে দাহ করার ঘটনা মুসলিমদের ক্ষোভকে আরও উস্কে দিয়েছে।
শ্রীলঙ্কা হামলা: মুসলিম সংখ্যালঘুদের অবস্থা কেমন?
কলম্বোর যে ক্রিমেটোরিয়াম বা দাহ করার স্থানে শিশুটিকে দাহ করা হয়, সেখানে মুসলিমরা রোববার দলে দলে হাজির হয়ে দেয়ালে গেটে সাদা ফিতা ঝুলিয়ে দেয়। সারা শ্রীলঙ্কা জুড়েই বহু মুসলমান তাদের দরজা-জানালায়-দেয়ালে সাদা ফিতা বেঁধে প্রতিবাদ করছে। প্রতিবাদ চলছে সোশ্যাল মিডিয়ায় স্টপফোর্সডক্রিমেশন এই হ্যাশট্যাগে। আমেরিকা, কানাডা, ব্রিটেন এবং মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশেও প্রবাসী শ্রীলঙ্কান মুসলমানেরা বিক্ষোভ করেছেন। তাদের সাথে যোগ দেন অন্য দেশের মুসলিম এবং মানবাধিকার কর্মীরা। চারজন ব্রিটিশ এমপি এক যৌথ বিবৃতিতে দাহ করার বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহারে শ্রীলঙ্কার ওপর চাপ দিতে ব্রিটিশ সরকারকে অনুরোধ করেছেন। শিশুদের দাহ করার ঘটনায় লঙ্কান মুসলমানদের প্রতিবাদ। এছাড়া, ৫৭টি মুসলিম দেশের জোট ওআইসি গত সপ্তাহে এ নিয়ে তৃতীয়বারের মত বিবৃতি জারী করে মুসলিমদের দাহ করার বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহারের দাবি করছে।
শিশু শেখের দাহঃ কলম্বোর দরিদ্র একটি মুসলমান দম্পতির যে শিশুটির মরদেহ জোর করে দাহ করা হয়, তার কোভিড হয়েছিল কিনা সে বিতর্কের এখনও সুরাহা হয়নি। ঘটনা অনুসন্ধান করতে গিয়ে সরোজ পাথিরানা কথা বলেন শিশুটির বাবা অটোচালক মোহাম্মদ ফাহিমের সাথে। মি. ফাহিম এবং তার স্ত্রী সাফিনা ছয় বছর চেষ্টার পর ছেলের জন্মে যারপরনাই খুশী হয়েছিলেন। ৭ই ডিসেম্বর বাচ্চাটি অসুস্থ হওয়ার পর দ্রুত তাকে তারা কলম্বোর একটি হাসপাতালে নিয়ে যান। কোভিড সনাক্ত করতে ডাক্তাররা সেই রাতেই তিনজনের শরীরে অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করেন। ফাহিম এবং সাফিনা করোনাভাইরাস নেগেটিভ হিসেবে শনাক্ত হলেও তাদের বাচ্চা পজিটিভ বলে জানানো হয়। ডাক্তাররা বাচ্চাটিকে রেখে রাতেই জোর করে বাবা-মাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেন।
মোহাম্মদ ফাহিম সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, আমি ও আমার স্ত্রী কান্নাকাটি করেছি যেন আমাদের বাচ্চার পাশে থাকতে দেয়া হয়। তারা তা দেয়নি। পরদিন অর্থাৎ ৮ই ডিসেম্বর বাবাকে ফোন করে জানানো হয় যে শিশুটি কোভিডে মারা গেছে। ফাহিম এখনও মানতে চান না যে তার বাচ্চার আসলেই কোভিড হয়েছিল। তার কথা, তারা স্বামী-স্ত্রী দুজনই যেখানে নেগেটিভ, বাচ্চার কীভাবে কোভিড হয়। শুধু অ্যান্টিজেন পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে দেওয়া সিদ্ধান্ত তিনি মানছেন না।
শ্রীলংকা হামলাঃ কী কারণে এমন ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডঃ কিন্তু শুধু সন্তানের মৃত্যুই নয়, যেভাবে জোর করে তাদের আপত্তি পায়ে ঠেলে ২০ দিনের বাচ্চাকে দাহ করা হয়েছে, তা নিয়ে চরম ক্ষুব্ধ পুরো পরিবার। দেশে-বিদেশে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করছে যে বাচ্চার মরদেহ নিতে বাবা-মা অস্বীকার করার পর দাহ করার এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
মে মাসে কোভিডে মারা গেলে তাকে জোর করে দাহ করা হয়। এখন পর্যন্ত একশো’রও বেশি মুসলিমকে কবর না দিয়ে দাহ করা হয়েছে মোহাম্মদ ফাহিম অবশ্য সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, হাসপাতালের কথা ডাহা মিথ্যা, বরঞ্চ তাকে ডেকে নিয়ে জোর করে কাগজে সই করার জন্য চাপ দেয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, দাহ করার আগ মূহুর্তে তাকে ফোন করে ক্রিমেটোরিয়ামে আসতে বলা হয়। তিনি গিয়েছিলেন, কিন্তু ভেতরে ঢোকেননি। আমি কী করে দেখবো যে আমার ২০ দিনের বাচ্চাকে পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এমন কষ্ট যেন আর কাউকে সহ্য করতে না হয়,“ টেলিফোনে বিবিসির সরোজ পাথিরানাকে বলেন মোহাম্মদ ফাহিম।
ভয়ে মুসলিমরা হাসপাতালে যাচ্ছেন নাঃ শ্রীলঙ্কায় মুসলিম সংগঠনগুলোর জোট মুসলিম কাউন্সিল অব শ্রীলঙ্কা’র ভাইস-প্রেসিডেন্ট ইলমি আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন এবং বিশেষজ্ঞদের মতামতের তোয়াক্কা না করে মুসলমানদের সঙ্গে যে আচরণ করা হচ্ছে তা এক কথায় বর্ণবাদ। তিনি বলেন, ২০ দিনের একটি বাচ্চার মরদেহ জোর করে দাহ করা সমস্ত অসভ্যতার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। মি. আহমেদ বলেন, কোভিড হয়ে মরলে দাহ হতে হবে এই ভয়ে শ্রীলঙ্কার মুসলমানেরা আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। শুধু এই ভয়ে অনেক মুসলমান কোভিডের উপসর্গ দেখা দিলেও হাসপাতালে যাচ্ছে না। গোপন রাখছে। আর গোপনে পরিচিত ডাক্তারদের কাছে যাচ্ছে। তিনি বলেন, প্রতিদিন তাদের সংগঠনের কাছে শত শত ফোন আসছে সাহায্য চেয়ে। তারা বুঝতে পারছেন না কি করবে। সাহায্য চাইছেন, যোগ করেন তিনি।
এপ্রিল মাসে করোনাভাইরাসে মৃতদের জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে দাহ করার সিদ্ধান্ত জারীর পর থেকেই দেশটির মুসলিম সংগঠন গুলো এবং মুসলিম রাজনীতিকরা সরকারের সাথে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য দেন-দরবার করছেন। বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে মৃতদেহ দাহ করা ইসলামের অনুশাসন বিরোধী এবং মুসলিমদের কাছে এটি কত স্পর্শকাতর একটি বিষয়। কিন্তু সরকার এতে কানে দিচ্ছে না। করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের কবর দেওয়া পুরোপুরি নিরাপদ বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন এবং ১৯০টি দেশে কবর দেয়া এবং দাহ করা সমান্তরালে এই দুটোই করা হচ্ছে – এসব যুক্তিও সরকার মানছে না।
শ্রীলংকার নির্বাচনে কেন জিতলেন বিতর্কিত গোটাবায়াঃ ইলমি আহমেদ বলেন, “সরকার বারবার দোহাই দিচ্ছে টেকনিক্যাল কমিটির পরামর্শে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমরা জানি, যিনি ওই কমিটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি একজন জুডিশিয়াল মেডিকেল অফিসার, তিনি কোনো ভাইরোলজিস্ট নন। আমরা সত্যিকারের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে এই টেকনিক্যাল কমিটির পুনর্গঠন চেয়েছি। চিকিৎসা বিজ্ঞানে নৈতিকতারও একটি বিষয় রয়েছে, কমিউনিটির কথা রয়েছে। কোন কথাই কানে তোলা হচ্ছে না।