admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ১০:৫০ পূর্বাহ্ণ
তুরস্ক বাংলাদেশের কৌশলগত মিত্র হয়ে উঠছে! দ্বিপাক্ষিক নানা চড়াই-উৎড়াই পেরিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ক্রমেই ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠছে বাংলাদেশ ও তুরস্ক, সেটি কৌশলগত মিত্রতার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। একান্ত আলাপচারিতায় এমন আভাস দিয়ে একাধিক শীর্ষ কূটনীতিক বলছেন, কৌশলগত কারণেই বিষয়টি এত তাড়াতাড়ি স্বীকার করতে নারাজ ঢাকা। তুরস্কের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তা সামগ্রী কিনলেও কৌশলগত সম্পর্কের বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন।
তিনি বলেন, আঙ্কারার নিরাপত্তা সামগ্রীগুলো ন্যাটোর মানসম্পন্ন, দামও একটু কম। এই ক্রয়ের ক্ষেত্রে কোনো শর্তারোপ করা হয়নি, সেটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে দুই দেশের সম্পর্কে কিছু সমস্যা থাকলেও এখন আর সেটি নেই দাবি করে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, আঙ্কারার কাছে ঢাকার অবস্থান অনেকটাই পরিষ্কার। আমাদের স্পর্শকাতর বিষয়গুলো ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করেছে তারা। উচ্চাকাঙ্ক্ষার তুরস্কের ও বাংলাদেশের আগ্রহের ক্ষেত্রে কিছু বিষয়ে মিল রয়েছে, সেগুলো উভয় দেশকে কাছাকাছি আসতে সাহায্য করছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঢাকার এই অগ্রগতির বিষয়টি ভালো করেই বুঝতে পারছে আঙ্কারা। তারাও মধ্যপ্রাচ্য ও ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে উদীয়মান শক্তি রূপে আবির্ভূত হয়েছে। এ ছাড়া রোহিঙ্গা সংকটকে কেন্দ্র করে দুই দেশ আরো ঘনিষ্ঠ হয়েছে। মিয়ানমারে দমনের মুখে ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়েছে উল্লেখ করে পররাষ্ট্র সচিব আরো বলেন, ওআইসিতে ভারসাম্যপূর্ণ নীতি নিয়েছে বাংলাদেশ। এটিও তুরস্ক পর্যবেক্ষণে নিয়েছে বলে মনে করে ঢাকা। এসব উপাদানের জন্য দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরো বাড়াতে দুই দেশ খুবই আগ্রহী। কৌশলগত সম্পর্কর বিষয়ে তিনি বলেন, মুসলিম দেশ দুটির অনেক সাধারণ উপাদান আছে এখানে।

চলতি মাসের শুরুর দিকে ঢাকার বিশ্লেষকেরা জানিয়েছিলেন, প্রধান দুটি লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও তুরস্ক সাম্প্রতিক সময়ে ক্রমেই ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠছে। একদিকে মুসলিম বিশ্বে নিজেদের প্রভাব-প্রতিপত্তি পুনরুদ্ধারে তুরস্কের সুদূরপ্রসারী প্রচেষ্টা। অন্যদিকে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানসহ বাণিজ্য সম্প্রসারণে বাংলাদেশের সদিচ্ছা। এ কারণে দু’দেশের সম্পর্ক ‘অনন্য উচ্চতায়’ পৌঁছাতে যাচ্ছে, যা শিগগিরেই স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।
তারা বলছেন, সামরিক শক্তিতে শক্তিশালী তুরস্ক ন্যাটো জোটের সদস্য, জাতিসংঘ ও ওআইসিসহ আন্তর্জাতিক ফোরামেও শক্ত অবস্থান রয়েছে। দেশটির সঙ্গে অতীতে দূরত্ব তৈরি হলেও রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশকে সমর্থন দেয়ায় সম্পর্ক জোরদার হয়। এরপর আঙ্কারার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়ানোর প্রতি মনোযোগী হয় ঢাকা, তাতে আশানুরূপ সাড়াও আসে। বর্তমানে বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে বার্ষিক ১ বিলিয়ন ডলারের দ্বিমুখী বাণিজ্য হলেও তা ২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার চেষ্টা চলছে। এর সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও বৃদ্ধি পাওয়ায় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে বলে মনে করা হয়।
এ বিষয়ে বিশ্লেষক এম হুমায়ুন কবির বলেন, গত এক দশকে তুরস্ক ব্যাপক উন্নতি করায় সারা বিশ্বের নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছে। এর বিপরীতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য নতুন সম্ভাবনার দেশ হিসেবে সামনে চলে এসেছে বাংলাদেশ। এই দুটি বিষয় উভয় দেশকে পারস্পরিক ঐক্য ও সম্পর্ক জোরদারে ভূমিকা রাখছে।
তুরস্কের এই উন্নতির নেপথ্যে থাকা দেশটির প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের বিরুদ্ধে ২০১৬ সালে অভ্যুত্থানের চেষ্টা হলে নিন্দা জানায় বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চিঠির সূত্র ধরে দুই দেশের সম্পর্ক উষ্ণ হতে থাকে। পরের বছর রোহিঙ্গা ইস্যুতে ঢাকার প্রতি এরদোয়ান প্রশাসন সমর্থন জানালে ঘনিষ্ঠতা আরো বাড়ে। এরপর কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে বাংলাদেশে আসেন তুর্কি ফার্স্ট লেডি এমিন এরদোয়ান। জাতিসংঘ-ওআইসিসহ বিশ্বমঞ্চে রোহিঙ্গাদের সমর্থন জানিয়ে জোরালো অবস্থান নেয় তুরস্ক। দেশটির পক্ষ থেকে তাদের মানবিক সহায়তাসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়। এসব কার্যত বাংলাদেশের পক্ষে যাওয়ায় কূটনীতিসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে লাভবান হয় ঢাকা।
ফলশ্রিুতে ২০২০ সালের শেষের দিকে তুরস্ক সফরে যান বিমান ও নৌবাহিনী প্রধান। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন যান আঙ্কারায়, তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত ক্যাভুসোগ্লু আসেন ঢাকায়। তারা দুই দেশে নিজেদের দূতাবাস ভবন উদ্বোধন করার পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতেও সই করেন। সম্প্রতি তুরস্ক সফর করে এসেছেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ। তিনি সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে তুর্কি প্রতিরক্ষামন্ত্রীসহ শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। তার এই সফর বাংলাদেশ-তুরস্কের কৌশলগত বন্ধুত্ব ও সামরিক সহযোগিতায় ‘নতুন মাত্রা’ যুক্ত করবে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকেরা।
এটি আরো উচ্চতায় পৌঁছাবে এ বছরের শেষ দিকে, তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের ঢাকা সফরের মধ্য দিয়ে। তার আগে তুরস্ক সফরে যাচ্ছে বাংলাদেশের একটি সংসদীয় প্রতিনিধিদল। এ ছাড়া গত জুনে আঙ্কারার সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আমদানির একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি তো রয়েছেই। তুর্কি সরকারি গণমাধ্যম আনাদুলু এজেন্সি জানায়, দেশটির অস্ত্রের চতুর্থ বৃহত্তম ক্রেতা হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আগামী ৫ বছরের মধ্যে দেশটির প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের অন্যতম শীর্ষ ক্রেতা হতে চলেছে ঢাকা। সেইসঙ্গে কূটনৈতিক শক্তি বৃদ্ধি এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণেও আগ্রহী হয়েছে শেখ হাসিনার প্রশাসন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহেদুল আনাম খান বলছেন, তুর্কি অ্যান্টি শিপ মিসাইল ও এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম কেনা মানেই দুই দেশের আরো কাছাকাছি চলে আসা। তাছাড়া বাংলাদেশ শিগগিরই মধ্যম আয়ের কাতারে যাওয়ার পথে থাকায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে চাইছে ঢাকা, বলছেন হুমায়ুন কবির।