অ্যাডভোকেট এম এ মজিদ,ঢাকা || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ২৯ জুন, ২০২৬ ২:২৫ অপরাহ্ণ
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি এবং নীতিনির্ধারকেরা যদি উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে বাধ্য হন, তাহলে দেশের সাধারণ মানুষ কী বার্তা পান? অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টার সরকারি অর্থে বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণের বিপুল অর্থ ব্যয়ের তথ্য প্রকাশের পর প্রশ্নটি আবারও নতুন করে সামনে এসেছে।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কোনো ব্যক্তি প্রয়োজনবোধে সরকারি অনুমোদন নিয়ে বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারেন। এতে নীতিগত আপত্তির সুযোগ খুব বেশি নেই। কারণ, মানুষের জীবন রক্ষা সর্বাগ্রে। যদি দেশে কোনো বিশেষায়িত চিকিৎসা না থাকে, তবে বিদেশে চিকিৎসা নেওয়াই যুক্তিযুক্ত।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো – স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় পরও কেন বাংলাদেশ এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি, যেখানে রাষ্ট্র পরিচালনাকারীরাও নিশ্চিন্তে চিকিৎসা নিতে পারেন? প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি চিকিৎসার জন্য ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে যান। এর ফলে হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা দেশ থেকে বেরিয়ে যায়। এই বাস্তবতা কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতির নয়; এটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
তবে এ কথাও সত্য যে, দেশের চিকিৎসকদের সামগ্রিকভাবে অযোগ্য বা অদক্ষ বলা বাস্তবসম্মত হবে না। বাংলাদেশের অসংখ্য চিকিৎসক দেশে এবং বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের মেধা, দক্ষতা ও মানবিকতার স্বীকৃতি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও রয়েছে।
তাহলে মানুষ বিদেশে যায় কেন?
এর উত্তর বহুমাত্রিক। কোথাও উন্নত প্রযুক্তির অভাব, কোথাও বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্রের সীমাবদ্ধতা, কোথাও আধুনিক যন্ত্রপাতির ঘাটতি, কোথাও দীর্ঘসূত্রতা, কোথাও রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব, আবার কোথাও চিকিৎসক-রোগীর আস্থার সংকট। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বহুমাত্রিক বাণিজ্যিক মনোভাব, দুর্বল তদারকি এবং স্বাস্থ্যখাতে দীর্ঘদিনের নীতিগত অব্যবস্থাপনা।
অতএব, সমস্যার মূল কারণ কেবল চিকিৎসক নন; পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা।
তবু একটি প্রশ্ন থেকে যায়। দেশের প্রভাবশালী ব্যক্তি, আমলা, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য কিংবা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিরা যদি নিজেদের চিকিৎসার জন্য প্রথমেই বিদেশমুখী হন, তাহলে দেশের হাসপাতালগুলোর মানোন্নয়নের প্রয়োজনীয় চাপ কোথা থেকে আসবে? যারা নীতিনির্ধারণ করেন, তারা যদি নিজেরাই সেই ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল না হন, তবে সেই ব্যবস্থাকে উন্নত করার প্রেরণাও অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়ে।
এ কারণেই এখন সময় এসেছে একটি নতুন নীতিগত বিতর্কের। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের সাধারণ ও নিয়মিত চিকিৎসা দেশের সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বা বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতালে গ্রহণকে উৎসাহিত করা উচিত। কেবলমাত্র মেডিকেল বোর্ডের সুস্পষ্ট সুপারিশে এবং দেশে চিকিৎসা সম্ভব নয় – প্রমাণিত হলেই বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিটি ক্ষেত্রেই চিকিৎসা-সংক্রান্ত ব্যয়, অনুমোদন এবং বিল-ভাউচার জনসমক্ষে প্রকাশের বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে।
এ ধরনের নীতি শুধু ব্যয় কমাবে না; বরং দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য সরকারের ওপর একটি স্বাভাবিক ও কার্যকর চাপও সৃষ্টি করবে। কারণ, যে হাসপাতালের সেবার ওপর নীতিনির্ধারকদের নিজেদের জীবন নির্ভর করবে, সেই হাসপাতালের উন্নয়ন আর অবহেলিত থাকবে না।
একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় তার অট্টালিকায় নয়, তার হাসপাতালের মানে। এমন বাংলাদেশই আমাদের প্রত্যাশা, যেখানে সাধারণ মানুষ যেমন দেশের চিকিৎসায় আস্থা রাখবেন, তেমনি রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, উপদেষ্টা, মন্ত্রী, আমলা কিংবা সংসদ সদস্যরাও নিশ্চিন্তে একই স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর নির্ভর করবেন। যেদিন এই আস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে, সেদিনই বিদেশমুখী চিকিৎসা-নির্ভরতার অবসান ঘটবে, বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে, আর দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাও প্রকৃত অর্থে জনগণের আস্থার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।
লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট, জাতীয় সাংবাদিক সোসাইটি এবং ওয়ার্ল্ড পীছ অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস সোসাইটির চেয়ারম্যান।
বি:দ্র: এই লেখাটি সম্পুর্ন লেখকের একান্ত নিজের কোন জিজ্ঞাসা থাকলে উনার সাথে যোগাযোগ করতে পারেন।