admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ২৪ নভেম্বর, ২০১৯ ৭:৪৮ পূর্বাহ্ণ
ফের বাড়ছে পেঁয়াজের দাম। পাইকারি বাজারে প্রতিদিন দেশি-বিদেশি পেঁয়াজ প্রবেশ করছে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় যোগান খুবই কম। এতে করে সংকট থেকেই যাচ্ছে। মনিটরিং না থাকায় খুচরা ব্যবসায়ীরা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজার ও পাড়া মহল্লার দোকানগুলোতে গতকাল শনিবার দেশি পেঁয়াজ ২০০-২২০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। আর মিসর, তুরস্ক ও মিয়ানমারের পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ১৫০ থেকে ১৭০ টাকা কেজি দরে। পেঁয়াজ নিয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কাটছে না। কাওরান বাজারের পাইকারি বাজারে
গতকাল শনিবার দেশি পেঁয়াজ ১৭০-১৮০ টাকা, মিয়ানমারের পেঁয়াজ ১৪০ টাকা ও মিশরের পেঁয়াজ ১৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে। তবে খুচরা বাজারে দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ২০০ টাকা কেজি দরে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা শহরের অধিকাংশ ছোট দোকানেই পেঁয়াজ নেই। অনেক দোকানদার সংকটের কারনে পেঁয়াজ বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে। পেঁয়াজ বিক্রি করলে পরিচিত ক্রেতাদের নানা ধরনের কথা শুনতে হয়। তাই অনেকেই পেঁয়াজ বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে। অনেকে আবার প্রতিদিন পাঁচ কেজি করে পেঁয়াজ কিনে থাকেন। খবর নিয়ে জানা গেছে, অনেক ক্রেতা পেঁয়াজ খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। অনেকে আবার প্রতি তরকারিতে সামান্য পেয়াজ দিয়ে থাকেন। অনেক ভোক্তা পেঁয়াজে বিকল্প পণ্য খোজছেন। তবে বিকল্প হিসেবে অনেকেই রসুন ব্যবহার করছেন। এতে তরকারির স্বাদও কমছে না। তবে হোটেলগুলোতে কাঁচা পেঁয়াজ খাওয়া বন্ধ হয়েছে। একই সাথে পেঁয়াজ দিয়ে তৈরি খাবারও বন্ধ হয়েছে। এতে করে পেঁয়াজের ব্যবহারও কমেছে আগের চেয়ে কয়েকগুণ। জানতে চাইলে মাতুয়াইলের মুসলিম নগরের খুচরা ব্যবসায়ী সামছু মিয়া বলেন, আমরা এক সপ্তাহ আগে ২১০ টাকা কেজি দরে কিনে এনেছি। এখন চাহিদা কমে গেছে। কারণ সবজির দোকানে নতুন পাতাসহ পেঁয়াজ উঠে গেছে। দাম কম বলে সেগুলো কিনছেন ক্রেতারা। পুরনো পেঁয়াজ কিনছেন না। এমন অবস্থায় পচে যাওয়ার ভয়ে কেজিতে ১০ টাকা কমিয়ে বিক্রি করছি। তাও তো ঠিক মতো বিক্রি হচ্ছে না। বেশি ক্ষতিতে তো আর বিক্রি করতে পারি না।
শ্যামবাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী হাজী এমএ মাজেদ বলেন, প্রতিদিনই পাইকারি বাজারে বিভিন্ন দেশ থেকে পেঁয়াজ আসছে। তারপরেও বাজারে সরবরাহ বাড়ছে না। চাহিদার তুলনায যোগান খুবই কম। এক প্রশ্নের জবাবে মাজেদ বলেন, খুচরা বাজারে কী দরে বিক্রি হচ্ছে, তা আমাদের পক্ষে দেখভাল করা সম্ভব নয়। বিষয়টি সরকারের লোকজন দেখভাল করলে ভালো হয়।
এদিকে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শরিফা খান জানান, পাইকারি ও খুচরা বাজারের মধ্যে পার্থক্য দূর করতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা বাজার মনিটরিং করছেন। তারা বাজারে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছেন। ব্যবধান বেশি হলে জরিমানাও করছেন। তারপরেও বাজার নিয়ন্ত্রনে আসছে না। অপরদিকে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিদিন উপসচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে চারটি টিম বাজার মনিটরিংয়ে যাচ্ছে। তারা এসব বিষয় মনিটর করছে।কিন্তু এসবের কোন ফল পাচ্ছে না ভোক্তারা।
গতকালও রাজধানীতে দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২২০ টাকা কেজিতে। যদিও গত বুধবার (২০ নভেম্বর) রাজধানীর সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার কারওয়ানবাজারে এই পেঁয়াজ ১৬০ থেকে ১৭০ টাকায় নেমে এসেছিল। অথচ মাত্র চারদিনের ব্যবধানে একইবাজারে দেশি পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ৪০ থেকে ৫০ টাকা।
কারওয়ানবাজারের পাইকারি বিক্রেতা মোনায়েম বলেন, দেশি পেঁয়াজের দাম ১৬০ টাকায় নেমেছিল। এখন আবার ১৯০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। কারণ, জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাজারে দেশি পেঁয়াজ নেই। কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। তাই পুরোনো ও ভালো মানের দেশি পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। শহীদুল নামের আরেক বিক্রেতা বলেন, দেশে পেঁয়াজের সরবরাহ কম থাকায় আবারও দাম বেড়েছে। বাজারে তো দেশি পেঁয়াজ নেই। আলম নামের আরেক বিক্রেতাও বলেন, বাজারে দেশি পেঁয়াজ না থাকায় ফের দাম বেড়েছে। আরেক পাইকারি বিক্রেতা অন্তর বলেন, দেশি পেঁয়াজের দাম বাড়লেও অন্যান্য পেঁয়াজের দাম স্থির রয়েছে। এদিকে, মহাখালীর বউবাজারে দেশি পেঁয়াজ ২০০ থেকে ২১০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। মিসরের পেঁয়াজও ১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই বাজারের পেঁয়াজের বিক্রেতা আমিনুল ইসলাম বলেন, বাজারে দেশি পেঁয়াজের দাম আবার বেড়েছে। এখন ২১০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। বিজয় স্মরণীর কলমিলতা বাজার ও ফার্মগেট ইন্দিরা রোডের মাহবুব প্লাজার নিচতলার বাজারটিতেও ২০০ থেকে ২১০ টাকা কেজিতে দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হতে দেখা গেছে।
চলতি বছরের আগস্ট থেকে ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে বিভিন্ন দেশ থেকে ৮টি কাস্টম বন্দর দিয়ে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৮০৬ দশমক ৪৭ মেট্রিক টন পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে। আর আমদানি করা এই পেঁয়াজের মূল্য ৬৬০ কোটি টাকা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
এনবিআরের হালনাগাদ তথ্যে জানা গেছে, বাংলাবান্ধা স্থল বন্দর দিয়ে আমদানি করা হয়েছে ১৭১ টন পেঁয়াজ, যার দাম ৪৮ লাখ টাকা। বেনাপোল কাস্টম হাউস দিয়ে ১৮ কোটি ২ লাখ টাকায় আনা হয়েছে ৩ হাজার ৭২৬ দশমিক ২৮ টন পেঁয়াজ। ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে এসেছে ৪৬ হাজার ৩৭০ দশমিক ৬০ মেট্রিক টন পেঁয়াজ। যার মূল্য ১৮৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকায়। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস দিয়ে আমদানি করা হয়েছে ৬ হাজার ৬৯২ দশমিক ৭৫ মেট্রিক টন পেঁয়াজ যার মূল্য ১৯ কোটি ১১ লাখ টাকায়।
ঢাকা কাস্টম হাউস দিয়ে আমদানি করা হয়েছে ২৬ দশমিক ৭২ মেট্রিক টন পেঁয়াজ যার মূল্য ৩৭ লাখ টাকা, হিলি বন্দর দিয়ে আমদানি করা হয়েছে ২৪ হাজার ৩০৮ দশমিক ৫০ মেট্রিক টন পেঁয়াজ যার মূল্য ৮৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকায়। সোনা মসজিদ বন্দর দিয়ে আমদানি করা হয়েছে ৫১ হাজার ৬৪৯ দশমিক ২৪ মেট্রিক টন পেঁয়াজ যার মূল্য ২০২ কোটি ৪১ লাখ টাকা। আর টেকনাফ দিয়ে আমদানি করা হয়েছে ৩৪ হাজার ৮৬১ দশমিক ৩৮ মেট্রিক টন পেঁয়াজ যার মূল্য ১৫১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। সবমিলিয়ে ২ মাস ১৮ দিনে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৮০৬ টনের কিছু বেশি পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে।
অন্যদিকে, গত ২৯ সেপ্টেম্বর ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের ঘোষণা দিলে দেশের বাজারে হু হু করে বাড়তে থাকে পেঁয়াজের দাম। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ৩০০ টাকা ছাড়িয়ে যায় পেঁয়াজের কেজি। পরে মিশর, মিয়ানমার, চীন থেকে পেঁয়াজ আমদানির সিদ্ধান্ত হয়। সেই অনুযায়ী দেশে আসছে বিভিন্ন দেশের পেঁয়াজ। এদিকে, কিছু কিছু জায়গায় উঠতে শুরু করেছে দেশি নতুন পেঁয়াজ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের হিসাব মতে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে (জুলাই-জুন) দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন হয়েছে ২৩ দশমিক ৩০ লাখ মেট্রিক টন। আর পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে ১০ দশমিক ৯২ লাখ মেট্রিক টন। ফলে মোট সরবরাহ হয়েছে ৩৪ দশমিক ২২ লাখ মেট্রিক টন। অন্যদিকে, দেশে বাৎসরিক পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে ২৪ লাখ মেট্রিক টন। ফলে দেশেই বাড়তি সরবরাহ রয়েছে প্রায় ১০ দশমিক ২২ লাখ মেট্রিক টন।