admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ২৪ জুন, ২০২০ ১:০৩ অপরাহ্ণ
বাংলাদেশের গণপরিবহনে হাহাকার, লাভ দূরে থাক প্রতিদিনের খরচই উঠছে না ।বাস, লঞ্চ ও টেনে আবার উপচে পড়া যাত্রীর ঢল নামবে। করোনা মহামারীর লকডাউনে দীর্ঘদিন বসে থাকার পর ফের লাভের মুখ দেখবে পরিবহন খাত। এমনটা প্রত্যাশা করেই গত মাসের শেষ তারিখে সরকারি নির্দেশনা মেনে শুরু হয় যানবাহন চলাচল। কিন্তু মাত্র কয়েক দিনের মাথায়ই মোহভঙ্গ ঘটেছে পরিবহন-সংশ্লিষ্ট লোকজনের। যাত্রীস্বল্পতায় তাদের মধ্যে এখন শুধুই হাহাকার। লাভ দূরে থাক, প্রতিদিনের খরচই উঠছে না। উল্টো লোকসান পোষাতে ফুরোচ্ছে মালিকদের গাঁটের টাকা। আর শ্রমিকরা সারাদিন হারভাঙা খাটুনি শেষে ঘরে ফিরছেন খালি হাতে। ট্রেনেরও একই অবস্থা। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করে অর্ধেক আসন খালি রেখে চলাচল করলেও এক-চতুর্থাংশ যাত্রীরও সাড়া মিলছে না। লঞ্চযাত্রাও তথৈবচ। তবে যাত্রীসাধারণের আবার পাল্টা অভিযোগ-একে তো করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুশঙ্কা তার ওপর আবার ভাড়া বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণ। তাই বেশির যাত্রীই হয়ে পড়েছেন গণপরিবহন বিমুখ। ফলে তীব্র যাত্রী সংকটে পরিবহন খাত চরম লোকসানের মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ অবস্থায় সারা দেশে প্রায় ৫০ শতাংশ লঞ্চ সার্ভিস থেকে বিরত রয়েছে। প্রায় ৭০ শতাংশ দূরপাল্লার বাসও চলাচল করছে না। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রুটের ট্রেন সার্ভিসও বন্ধ করা হয়েছে। পরিবহন মালিকসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমনিতেই সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক স্বাস্থ্যবিধি মেনে ৫০ শতাংশ আসন ফাঁকা রাখা হয়। কিন্তু বর্তমানে চলাচলকারী ট্রেন, লঞ্চ ও বাসে বাকি অর্ধেকের প্রায় অর্ধেক (৫০ শতাংশ) আসন ফাঁকা যাওয়ায় চরম সংকট দেখা দিয়েছে। তীব্র যাত্রীস্বল্পতার কারণে মালিক ও শ্রমিকরা চরম অর্থসংকটে পড়ছেন। এমন পরিস্থিতিতে লোকসান গুনে ট্রেন চলাচল অব্যাহত রাখা গেলেও লঞ্চ ও দূরপাল্লার বাস চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তেমনটা হলে চরম দুর্ভোগে পড়বে মানুষ।
লঞ্চঃ ঢাকা-বরিশাল রুটের বিলাসবহুল যাত্রীবাহী লঞ্চ কীর্তনখোলা-১০। টানা প্রায় আড়াই মাস বন্ধ থাকার পর ৩১ মে যাত্রী পরিবহনে নামে লঞ্চটি। প্রথম ৪-৫ দিন ঢাকা-বরিশাল রুটে চলাচলও করেছে। কিন্তু তারপর বন্ধ হয়ে গেছে এর চলাচল। একই রুটের আরেক বিলাসবহুল লঞ্চ সুন্দরবন-১০। এর সার্বিক দেখভাল করার দায়িত্বে থাকা ঝন্টু মিয়া জানান, টানা আড়াই মাস লঞ্চ-বাস চলাচল বন্ধ থাকায় বিভিন্ন এলাকায় আটকা পড়েছিল বেশকিছু মানুষ। যে কারণে শুরুর দিকে যাত্রীর সংকট হয়নি। কিন্তু এখন আর যাত্রী পাচ্ছি না। প্রতি রাউন্ড ট্রিপে এক থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে। এ অবস্থায় লঞ্চ পরিচালনা করা কতদিন সম্ভব হবে- তা জানি না। এদিকে ঢাকা-বরিশাল রুটের জনপ্রিয় ডে-সার্ভিস গ্রিন লাইন ওয়াটার সার্ভিসও যাত্রী সংকটে ভুগছে। করোনা পূর্ববর্তী সময়ে টিকিট পেতে সমস্যা হলেও এখন এক-তৃতীয়াংশ যাত্রীও মিলছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে ঢাকা থেকে বরিশাল, ভোলা এবং সাগরপারের পায়রা বন্দরসহ বেশকিছু রুটে চলে অ্যাডভেঞ্চার নেভিগেশনের লঞ্চ। এই কোম্পানির মালিক এফবিসিসিআইর পরিচালক নিজাম উদ্দিন বলেন, লোকসানের কারণে ঢাকা-পায়রাবন্দর রুটে লঞ্চ পরিচালনা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছি। জানা গেছে, রাজধানীর সঙ্গে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের নৌ-যোগাযোগই শুধু নয়, সারা দেশে বিরাজ করছে একই চিত্র। নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী ৬৫টি লঞ্চের মধ্যে যাত্রী সংকটের কারণে ২৫টি লঞ্চই চলছে না। কাঁঠালবাড়ী লঞ্চ মালিক সমিতির সভাপতি বিএম আতাহার রহমানও চরম যাত্রী সংকটের কথা জানান।জানতে চাইলে লঞ্চ যাত্রী পবিবহন সংস্থার সভাপতি মাহবুব উদ্দিন বীরবিক্রম বলেন, তীব্র যাত্রী সংকটের ফলে প্রায় সব লঞ্চ মালিক- শ্রমিক আর্থিক সংকটে পড়েছেন। করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকির কারণে যাত্রীরা যাতায়াতে ভয় পাচ্ছেন। প্রায় সব লঞ্চে স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিধি মেনে চলাচল করার পরও সীমিত পরিসরের জায়গার কারণে যাত্রীদের মধ্যে ভীতি কাজ করছে।
ট্রেনঃ রেলওয়ে সূত্র বলছে, যাত্রী কিংবা আয়ের দিক বিবেচনা করলে ট্রেন চালানোটা অনেকটা আনুষ্ঠানিকতা হয়েছে। কারণ, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার লক্ষ্যে এমনিতেই প্রতিটি ট্রেন অর্ধেক আসন ফাঁকা রাখা হচ্ছে। বাকি অর্ধেকের ৫০ শতাংশ আসন ফাঁকা যাচ্ছে বেশকিছু ট্রেনের। এ পর্যন্ত চালু ট্রেনের প্রায় ৭৫ শতাংশেরই অর্ধেক আসন পূর্ণ হচ্ছে না। রেলের কর্মকর্তারা জানান, রেল এমনিতে লোকসানি প্রতিষ্ঠান। এভাবে যাত্রীশূন্য ট্রেন চালাতে থাকলে লোকসানের পাল্লা আরো ভারী হতে থাকবে। এ ক্ষেত্রে কাউন্টারে টিকিট বিক্রি শুরু, কিছু বন্ধ স্টেশন চালু এবং কিছু কিছু মেইল বা কমিউটার ট্রেন চালু করলে যাত্রী বাড়তে পারে।জানা গেছে, সরকার সীমিত আকারে গণপরিবহন চালুর ঘোষণা দেয়ার পর ৩১ মে থেকে আট জোড়া ট্রেন চালু করে রেলওয়ে। ৩ জুন আরো ১১ জোড়া ট্রেন নামানো হয়। সিদ্ধান্ত ছিল, যাত্রী পেলে পরবর্তীতে ধীরে ধীরে সব ট্রেন চালু করা হবে। কিন্তু যাত্রী সংকটের কারণে গত শনিবার ঢাকা-চট্টগ্রাম পথের বিলাসবহুল সোনার বাংলা এক্সপ্রেস ও রোববার ঢাকা-নোয়াখালী পথের উপক‚ল এক্সপ্রেস বন্ধ হয়ে যায়।
রেলওয়ে সূত্র বলছে, দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই জোড়া আন্তনগর ট্রেন সুবর্ণ ও সোনার বাংলা এক্সপ্রেস। ঢাকা-চট্টগ্রামের মধ্যে দুই দিক থেকে প্রতিদিনই চারটি ট্রেন চলে। মাঝখানে শুধু ঢাকা বিমানবন্দর স্টেশনে যাত্রাবিরতি আছে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে তাও বন্ধ করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। আর ঢাকা-নোয়াখালীতে লকডাউনের কারণে যাত্রী মিলছে না। ট্রেনটি নোয়াখালী যেতে না পেরে লাকসাম থেকে ফিরে আসে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন জানান, আট জোড়া ট্রেন চালুর ইচ্ছা তাদের ছিল। কিন্তু যাত্রীর সাড়া মেলেনি। বিমানবন্দর স্টেশনটি শিগগিরই চালু করা হবে। এজন্য অস্থায়ী বেড়া দেয়া হবে। আরো নতুন ট্রেন নামানো এবং বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল করার বিষয়ে আগামী মাসের শুরুতে বিবেচনা করা হবে। এখন কিছু কিছু জেলা নতুন করে লকডাউন করা হচ্ছে। এগুলো মূল্যায়ন করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
বাসঃ ট্রেন ও বাসের মতোই যাত্রীদের সাড়া মিলছে না সড়ক পথের বাসে। ঢাকাশহরের মধ্যে চলাচলকারী সিটি সার্ভিসের বাসগুলো কিছু যাত্রী পেলেও দূরপাল্লার রুটগুলোয় চরম যাত্রী সংকট। যে কারণে প্রায় ৭০ শতাংশ বাস সার্ভিস বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-খুলনা, ঢাকা-রাজশাহী, ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-বরিশালসহ বিভিন্ন রুটে চলাচল করা বিলাসবহুল বাস সার্ভিসের মালিক ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম-সিলেট রুটের সবচেয়ে জনপ্রিয় গ্রিনলাইন পরিবহনের কর্মকর্তা মাহমুদ হোসেন জানান, করোনা ভাইরাসের কারণে দীর্ঘদিন বসে থাকার পর চলতি মাসের শুরুতে ফের বাস চলাচাল চালু হয়। প্রথম কিছুদিন যাত্রী পেলেও এখন চরম যাত্রী সংকট। অধিকাংশ রুটে এক-চতুর্থাংশ যাত্রী পাওয়া যায় না। ফলে প্রতিদিন বড় অঙ্কের টাকা লোকসান হচ্ছে। শ্যামলী, সোহাগ, হানিফ, ঈগল পরিবহন ও এনা পরিবহনসহ দেশের বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী বাসগুলোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেও একই চিত্র খবর পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে ঢাকা শহরের উত্তরা-জুরাইন রুটে চলা রাঈদা পরিবহনের চালক মইন জানান, যাত্রীদের নিরাপদ রাখতে অর্ধেক আসন খালি রেখে বাস চালাচ্ছি। তারপরও প্রত্যাশিত যাত্রী পাচ্ছি না। মূলত যাত্রীদের মধ্যে করোনা সংক্রমণের আতঙ্ক ও ভয়ের কারণেই এ অবস্থা তৈরি হয়েছে। মালিবাগ-শ্যামলী রুটের লাব্বাইক পরিবহনের চালক বেল্লালও একই কথা বলেন। জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ মানবকণ্ঠকে বলেন, সরকারি নির্দেশনা মেনে ও স্বাস্থ্যবিধি বজায় রেখে বাস চলাচল করছে। কিন্তু যাত্রী সংকটের কারণে দূরপাল্লার মাত্র ৩০ শতাংশ বাস চালু থাকলেও বাকি ৭০ শতাংশ বন্ধ রয়েছে। চরম লোকসানের মুখে মালিক পক্ষ। অধিকাংশ রুটে আগে যেখানে ১৫ মিনিট পর পর এক-একটি বাস ছাড়া হতো এখন সেখানে দুই ঘণ্টা পরও একটি বাস ছেড়েও যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, মূলত দেশে করোনা আক্রান্তের হার ও মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাওয়ায় অধিকাংশ মানুষ আতঙ্কিত ও ভীত। ফলে গণপরিবহনে তীব্র যাত্রী স্বল্পতা দেখা দিয়েছে বলে মনে করেন তিনি।