admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ১৭ এপ্রিল, ২০২০ ৮:০৯ অপরাহ্ণ
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৃহস্পতিবার গণভবন থেকে করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে ঢাকা বিভাগের কয়েকটি জেলা কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে বক্তব্য রাখেন করোনাভাইরাসের মহামারির মধ্যে সবার সুরক্ষার স্বার্থে আসন্ন রোজায় মসজিদে না গিয়ে ঘরে বসেই তারাবি নামাজ পড়তে দেশের মুসলমানদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
মসজিদে আপাতত জামাতে নামাজ না পড়ার বিষয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশন যেসব নির্দেশনা দিয়েছে, সেগুলোও মেনে চলতে বলেছেন তিনি। করোনাভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ে বৃহস্পতিবার গণভবন থেকে ঢাকা বিভাগের নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জ জেলার কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়ে সরকারপ্রধানের এ আহ্বান আসে।
তিনি বলেন, ‘সামনে রোজা। এই রমজান মাসে আমাদের পণ্য পরিবহণ বা খাদ্যসামগ্রীর যাতে অসুবিধা না হয়, সেজন্য আমরা যথেষ্ট ব্যবস্থা নিয়েছি। কিন্তু সেই সঙ্গে এখানে তারাবির নামাজ, যেহেতু সৌদি আরবেও মসজিদে পড়ছে না, কিংবা অন্যান্য দেশে হচ্ছে না। আমাদের এখানেও, যেহেতু ইসলামিক ফাউন্ডেশন কতগুলো নির্দেশনা দিয়েছে, সেগুলো আপনারা মেনে ঘরে বসে তারাবি পড়েন। নিজের মন মতো করে পড়েন। নোভেল করোনাভাইরাসজনিত রোগ কোভিড-১৯ অতি সংক্রামক বলে বিশ্বজুড়ে এখন সামাজিক ও শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। জনসমাগম এড়িয়ে চলার পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও অন্তত তিন ফুট দূরত্ব থেকে চলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ধর্মীয় উপাসনালয়ের জমায়েত থেকে বড় আকারে করোনাভাইরাসের বিস্তার ঘটছে দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, ফ্রান্স ও ভারতে। দেশে দেশে লকডাউনের মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালতের পাশাপাশি জনসমাগমের অন্যতম জায়গা ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোও বন্ধ রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশেও সাধারণ নাগরিকদের মসজিদসহ কোনো ধরনের ধর্মীয় উপাসনালয়ে না গিয়ে বাসায় থেকে নামাজ ও প্রার্থনা সারতে বলেছে সরকার। এ আদেশ অমান্য করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ার করেছে ধর্ম মন্ত্রণালয়।এ বিষয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নেওয়া ব্যবস্থাগুলো তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা দেখেছেন যে, সৌদি আরবে, সেখানে পর্যন্ত মসজিদে নামাজ বা জমায়েত হওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। এমনকি তারাবি নামাজ পর্যন্ত সেখানে হবে না। সবাই ঘরে বসে পড়বে। খুব সীমিত আকারে কিন্তু সেখানে তারা করছেন, তারা নিষেধ করে দিয়েছেন। ঠিক এভাবে মসজিদ, মন্দির, গির্জা, এমকি ভ্যাটিকান সিটি থেকে শুরু করে সব জায়গায় কিন্তু এইভাবে তারা সুরক্ষা করার ব্যবস্থা নিয়েছে। নিজেদের সুরক্ষিত রাখা, অন্যদের সুরক্ষিত করা।
এ বিষয়গুলো থেকে বাংলাদেশেরও শেখার আছে মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘মসজিদে না গিয়ে নিজের ঘরে বসে নামাজ পড়া, কারণ আলস্নাহর ইবাদত, ইবাদত তো আপনি যেকোনো জায়গায় বসে করতে পারেন। এটা তো আলস্নাহর কাছে সরাসরি আপনি করবেন। বরং এখন ইবাদত করার একটা ভালো সুযোগ আসছে।
আল্লাহ্ পাককে ডাকতে হবে, ইবাদত করতে হবে। আপনি আপনার মতো করে যত ডাকতে পারবেন, আল্লাহ্ সেটাই কবুল করবে। কাজেই সেভাবে আপনারা করবেন। অযথা মসজিদে গিয়ে অন্য কেউ সংক্রমিত থাকল, সে আরেকজনকে সংক্রমিত করল বা আপনার নিজের হলে অন্যকে করবেন সেটা কিন্তু করবেন না দয়া করে। এ বিষয়টি সবাই আপনারা মেনে চলবেন, সেটাই আমরা চাই। ভারতে তাবলিগ জামাতের সমাবেশ থেকে ব্যাপক হারে সংক্রমণ ঘটার বিষয়ে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেহেতু এই অঞ্চলে এরকম কিছু দেখা গেছে, সেক্ষেত্রে আমি বলব যে সবাইকে আরও সচেতন থাকতে হবে। কিন্তু জীবন চালানোর জন্য অবশ্যই কাজ করতে হবে। বসে থাকলে চলবে না।
আপনারা সেইভাবে নিজেদের সুরক্ষিত করে যেভাবে যা কাজ করার করবেন। সেই সঙ্গে আমি বারবার অনুরোধ করব, নিজেকে সুরক্ষিত রাখেন। এদিকে লকডাউনের মধ্যে দুর্দশায় পড়া শ্রমজীবী মানুষকে বিশেষ ওএমএসের মাধ্যমে ১০ টাকা কেজি দরের চাল দিতে রেশন কার্ডের সংখ্যা ৫০ লাখ থেকে বাড়িয়ে এক কোটি করার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। করোনাভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ে বৃহস্পতিবার বিভিন্ন জেলার কর্মকর্তার সঙ্গে মতবিনিমকালে সরকারপ্রধানের এ ঘোষণা আসে।তিনি বলেন, ‘আমি জানি যে যেহেতু সব কিছু এখন বন্ধ, অনেক মানুষের কষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে যারা দিনমজুর, যারা কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষ, যারা খেটে খাওয়া মানুষ, ছোটোখাটো ব্যবসায়ী, এমনকি নিম্নবিত্ত তাদেরও কষ্ট হচ্ছে।
সেটা মাথায় রেখে আপনারা জানেন যে আমরা ইতোমধ্যে একটা প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা দিয়েছি, যেখান থেকে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ, সবাইকে আমরা সহযোগিতা করব। এবং সেটা আমরা করে যাচ্ছি। ইতোমধ্যে আমরা শুরু করেছি। যারা হাত পেতে খেতে পারবে না তাদের জন্যও ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রির ব্যবস্থা করার বিষয়টি মনে করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা এখন সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমাদের ৫০ লক্ষ মানুষের জন্য রেশনকার্ড করা আছে, তারা ১০ টাকায় চাল পান, আমরা আরও ৫০ লক্ষ মানুষের রেশনকার্ড করে দেব।
বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়তে থাকায় গত ২৬ মার্চ থেকে দেশের সব অফিস-আদালত এবং যানবাহন চলাচল বন্ধ। সরকারের ভাষায় এই ‘সাধারণ ছুটিতে’ মানুষের ঘরবন্দি দশা চলবে অন্তত ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত। এই সময় বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া সবাইকে ঘরে থাকার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। ফলে বেশিরভাগ শ্রমজীবী মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। এই প্রেক্ষাপটে গত ২৫ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওএমএস খাতে ভোক্তা পর্যায়ে ৩০ টাকা কেজি দরের চালের দাম ১০ টাকা নির্ধারণের ঘোষণা দেন। পরে খাদ্য মন্ত্রণালয় বিশেষ ওএমএসের মাধ্যমে ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রির কার্যক্রম শুরু করেছিল। সপ্তাহে প্রতি রবি, মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত এই চাল বিক্রি চলছিল। একজন ভোক্তা সপ্তাহে একবার পাঁচ কেজি চাল কিনতে পারতেন।
কিন্তু চাল বিক্রির সময় ভিড় হলে ভাইরাসের বিস্তার বাড়ার ঝুঁকি থাকার কথা বলে ১৩ এপ্রিল ওই বিশেষ ওএমএস কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। এরপর বুধবার জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) পাঠানো এক নির্দেশনায় বলা হয়, যাদের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির কার্ড নেই- এমন দরিদ্র ও নিম্নবিত্তদের তালিকা তৈরি করে কার্ডের মাধ্যমে তাদের বিশেষ ওএমএসের ১০ টাকা কেজি দরের চাল দেওয়া হবে। বিশেষ ওএমএস সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার কারণ ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এমনি দিতে গেলে অনেক সময় সমস্যা হয়ে যায়। সে ধরনের কিছু ঘটনা ঘটার পরে আমরা এটা আপাতত স্থগিত করে তালিকা করার জন্য নির্দেশ দিয়েছি।
করোনাভাইরাস মহামারি মোকাবিলায় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, সশস্ত্র বাহিনী, স্বাস্থ্যসেবাকর্মী- যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন, তাদের সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘করোনাভাইরাস সারাবিশ্বকে স্থবির করে দিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা আশঙ্কা করছে এ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে বিশ্বমন্দা বা দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে। এই পরিস্থিতিতেও দেশের মানুষকে অভয় দিয়ে তিনি বলেন মন্দা হলে দেশকে কীভাবে আমরা রক্ষা করব? সেজন্য সরকার আগাম কিছু ব্যবস্থা নিয়েছে। ৯২ হাজার কোটি টাকা, আসলে বলতে গেলে প্রায় এক লক্ষ কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ আমরা করেছি। আগামী তিন বছর কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করব, সেই পরিকল্পনাও আমরা নিচ্ছি। সরকার সামর্থ্যের সর্বোচ্চ দিয়ে দেশবাসীকে রক্ষা করতে প্রস্তুত।