হোম
নাগরিক ভাবনা

নাগরিক ভাবনা: সর্বোচ্চ আদালতের মান-মর্যাদা বনাম বিচার প্রার্থীর বাস্তবত।

অ্যাডভোকেট এম এ মজিদ,ঢাকা || মুক্ত কলম সংবাদ

প্রকাশিত: ১৭ জুন, ২০২৬ ৩:৩৯ অপরাহ্ণ

ফাইল ছবি

বাংলাদেশের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট, বিশেষ করে হাইকোর্ট বিভাগ, সেই সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার সর্বোচ্চ আশ্রয়স্থল। কিন্তু বাস্তবতার নির্মম প্রশ্ন হলো – হাইকোর্টের দ্বার কি সত্যিই বিচারপ্রার্থীদের জন্য উন্মুক্ত, নাকি সেটি কেবল কাগজে-কলমে খোলা?

আজ ১৬ জুন ২০২৬ বুধবার একটি আদালতের কার্যতালিকাই সেই প্রশ্নের জবাব অনেকাংশে দিয়ে দেয়। একটি মাত্র বেঞ্চে ৪৮৬টি মামলার তালিকা। এর মধ্যে ১ থেকে ৯ নম্বর পর্যন্ত কয়েকটি মামলা আদেশের জন্য, ১০ থেকে ৩৪৭ নম্বর পর্যন্ত ৩৩৮টি মামলা বিভিন্ন দরখাস্তের জন্য এবং ৩৪৮ থেকে ৪৬৮ নম্বর পর্যন্ত ১২২টি মামলা মূল শুনানির জন্য নির্ধারিত। অথচ প্রতি সপ্তাহে কার্যত কেবল বুধবারই শুনানির তালিকা প্রকাশ করা হয়।

বাস্তবতা হলো, দিনের অধিকাংশ সময়ই দরখাস্ত, সময় প্রার্থনা, স্থগিতাদেশ, তালিকা সংশোধন কিংবা অন্যান্য প্রাথমিক বিষয়ে ব্যয় হয়ে যায়। ফলে শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত অধিকাংশ মামলার নম্বরই আর ডাকা হয় না। বিচারপ্রার্থীরা আদালতে উপস্থিত থাকেন, আইনজীবীরা প্রস্তুতি নেন, কিন্তু দিনের শেষে মামলাটি আবারও পরবর্তী বুধবারে চলে যায়। এভাবে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর কেটে যায়।

আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, আজও ২০০৯ সালের মামলাও শুনানির তালিকায় স্থান পায়। অর্থাৎ, ১৬ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও একটি মামলা কার্যকর শুনানির সুযোগ পায়নি। যে আইনজীবী বছরের পর বছর তার মক্কেলের মামলা শুনানির পর্যায়ে আনতেই পারেন না, তাকে যদি মক্কেল অযোগ্য মনে করেন, তবে সেই ক্ষোভকে কি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক বলা যাবে? অথচ অনেক ক্ষেত্রেই সমস্যার মূল কারণ আইনজীবী নন; সমস্যা বিচার ব্যবস্থার কাঠামোগত জটিলতা, মামলার অস্বাভাবিক জট এবং কার্যকর কেস ম্যানেজমেন্টের অভাব।

বাংলাদেশে একটি মামলার নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় লাগার বিষয়টি বহু বছর ধরেই আলোচিত। “Justice delayed is justice denied” – বিচারে বিলম্ব মানেই বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়া। কারণ, সময়মতো বিচার না পেলে অনেক ক্ষেত্রেই সেই বিচার অর্থহীন হয়ে পড়ে। জমি-সংক্রান্ত বিরোধে পক্ষ মারা যান, চাকরির মামলায় চাকরির বয়স শেষ হয়ে যায়, ব্যবসায়িক বিরোধে প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যায়, পারিবারিক মামলায় সম্পর্ক ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত আদালতের রায় এলেও বাস্তব জীবনে তার কার্যকারিতা অনেকাংশে হারিয়ে যায়।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি ভয়াবহ অভিযোগ – দুর্নীতি। ২০১৪ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) তাদের এক জরিপে উল্লেখ করেছিল যে, দেশের মধ্যে উচ্চ আদালতে সর্বোচ্চ দুর্নীতি। বিচারপ্রার্থীদের অভিজ্ঞতার বিচারে হাইকোর্ট বিভাগে দুর্নীতির অভিযোগ উদ্বেগজনক। সে সময়ের প্রধান বিচারপতি টিআইবি’কে ডেকে তাদের তথ্য-উপাত্ত জানতে চেয়েছিলেন। আলোচনার পর টিআইবি’কে তাদের প্রতিবেদন প্রত্যাহার কিংবা ক্ষমা চাইতে বলা হয়নি। ফলে জনমনে সেই প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা আরও জোরালো হয়েছিল।

আজও আইনজীবী, বিচারপ্রার্থী এবং আদালত-সংশ্লিষ্ট অনেকের মুখে একই অভিযোগ শোনা যায় – বেশিরভাগ বেঞ্চ এবং প্রশাসনিক সেকশনে অনৈতিক অর্থ লেনদেন ছাড়া অনেক কাজ এগোয় না। অভিযোগ সত্য হলে তা কেবল বিচার বিভাগের জন্য নয়, সমগ্র রাষ্ট্রের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। কারণ, বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হলে আইনের শাসনের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।

দুঃখজনক হলেও সত্য, এ ধরনের অভিযোগ এখন আর বিচ্ছিন্নভাবে উচ্চারিত হয় না; বরং তা জনমতের অংশ হয়ে উঠছে। অথচ বিচার বিভাগের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো জনগণের বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস ক্ষয়ে গেলে আদালতের ভবনের উচ্চতা বা সাংবিধানিক মর্যাদা দিয়ে বিচারব্যবস্থার সম্মান রক্ষা করা যায় না।

এখানে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি, মামলার দীর্ঘসূত্রতা, কার্যতালিকার অকার্যকারিতা কিংবা প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে আইনজীবীদের মতামত সংগ্রহ করে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে নিয়মিত নীতিগত আলোচনার উদ্যোগ জনগণ খুব একটা প্রত্যক্ষ করে না। অথচ আদালতের বাস্তব সমস্যাগুলো সবচেয়ে ভালো জানেন আইনজীবীরাই।

সময়ের দাবি হলো – মামলা ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, কার্যকর কেস ম্যানেজমেন্ট, অপ্রয়োজনীয় মুলতবি কমানো, শুনানির জন্য পৃথক ও বাস্তবসম্মত কার্যতালিকা প্রণয়ন, বেঞ্চ ও সেকশনে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা এবং অভিযোগ তদন্তে স্বাধীন ও কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা। একই সঙ্গে বিচারকদের সংখ্যা বৃদ্ধি, দক্ষ জনবল নিয়োগ এবং আদালতের প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানোও অপরিহার্য।
বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। কারণ, একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় তার সুউচ্চ ভবনে নয়; বরং তার আদালতে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তায়।

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতের মর্যাদা রক্ষা করা শুধু বিচারকদের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, আইনজীবী সমাজ এবং সমগ্র নাগরিক সমাজের যৌথ দায়িত্ব। প্রশ্ন একটাই – আমরা কি সমস্যাকে স্বীকার করে সংস্কারের পথে এগোব, নাকি বিচারপ্রার্থীদের দীর্ঘশ্বাসকেই বিচারব্যবস্থার নিত্যসঙ্গী হতে দেব? ইতিহাসের আদালতে সেই জবাব একদিন সংশ্লিষ্ট সকলেই দিতে হবে।

লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট এবং জাতীয় সাংবাদিক সোসাইটি ও ওয়ার্ল্ড পীছ অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস সোসাইটির চেয়ারম্যান।

ফেসবুক মন্তব্য

মতামত জানান :

সর্বশেষ খবর

১৪ বছর পর সাগর-রুনি হত্যা মামলায় তদন্তের রেডার ও সিডিআরে
আইন-বিচার 7 hours আগে

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে যুক্তরাষ্ট্রের ২৪ লাখ ডলারের সহায়তা।
আন্তর্জাতিক 16 hours আগে

চাঁদার দাবীতে ব্যবসায়ী হৃদয় হত্যা মামলায় ২ জনের মৃত্যুদণ্ড ও
আইন-বিচার 16 hours আগে

প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে পীরগঞ্জের ডুবন্ত লিপনের পরিবারকে ২৫ হাজার
রংপুর 21 hours আগে

বগুড়ায় দিনে দুপুরে স্বর্ণ ব্যবসায়ীর বাসায় ভয়াবহ ডাকাতি, লুটপাট-ভাঙচুরে আহত
অপরাধ 1 day আগে

পঞ্চগড়ে জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধন।
খেলাধুলা 2 days আগে

ফ্যাসিস্টদের লুটপাট ও অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে  স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে:
খুলনা 2 days আগে

নাগরিক ভাবনা: বিচারের দ্বারে ঘুষই যদি হয় প্রবেশের চাবিকাঠি-তহলে বিচারপ্রার্থীরা
নাগরিক ভাবনা 2 days আগে

এক অভিযানে শীর্ষ মাদক কারবারি মিশাল মন্ডল আটক।
অপরাধ 2 days আগে

পর্যাপ্ত সারের মজুত আছে, কৃত্রিম সংকট করলেই ব্যবস্থা: কৃষিমন্ত্রী।
অর্থনীতি 2 days আগে

পাঠকপ্রিয়

শিরোনাম :

কুড়িগ্রামে ঐতিহাসিক আসনে কঠিন চ্যালেঞ্জে জাপা,মাঠ গরম এনসিপি-বিএনপির। হাদীর ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনায় দিনাজপুর সীমান্ত ৪২ বিজিবির রেড অ্যালার্ট জারি। রোহিঙ্গা মেয়েরা পাচার ছাড়াও বিদেশীদের দ্বারা যৌন কাজে ব্যবহারের টার্গেট হয়ে উঠছে ঠাকুরগাঁওয়ে নানা কর্মসূচিতে হানাদার মুক্ত দিবস উদযাপিত। ঠাকুরগাঁও জেলায় অনুষ্ঠিত হয়েছে ৪র্থ জেলা রোভার মুট-২০২৫। কুড়িগ্রামের রাজারহাটে প্রাণিসম্পদ সপ্তাহের প্রদর্শনী ও সমাপনী অনুষ্ঠিত। পার্বতীপুরে জাতীয় প্রাণি সম্পদ ও ডেইরি প্রকল্পের উদ্বোধন। রাণীশংকৈলে জাতীয় প্রাণীসম্পদ সপ্তাহ ও প্রাণিসম্পদ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত পলাতক শেখ হাসিনার অগ্রণী ব্যাংকের লকার ভেঙে ৮৩২ ভরি স্বর্ণ জব্দ রাজশাহীতে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে আহত ১০ জন ৩ ডিসেম্বর রংপুরে বিভাগীয় মহাসমাবেশ সফল করতে দিনাজপুরে ৮ ইসলামী দলের সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত। দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিতে সব বাহিনী প্রস্তুত: সিইসি পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ৬ হাজার কৃষক পাচ্ছে বিনামূল্যে গম বীজ ও সার। মাত্র চার মাসের শিশু সুমাইয়া বাঁচতে চায়! পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় হেফাজতে ইসলামের নতুন কমিটি গঠন। ভূমিকম্পে সম্ভাব্য ক্ষতি কমাতে এখনই শক্তিশালী ও সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে: সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান রাজধানীতে  আজ থেকে ঘরে বসেই মেট্রোরেলের কার্ড রিচার্জ করবেন? নীলফামারীতে পাটবীজ উৎপাদনকারী চাষীদের প্রশিক্ষণ। আর কোনো পরিস্থিতি নেই যে নির্বাচন ব্যাহত হবে-ঠাকুরগাঁওয়ে মির্জা ফখরুল  ৫-বছরেও শেষ হয়নি ওয়াশব্লকের নির্মাণ কাজ-জনস্বাস্থ্য অফিস বলছেন বাদ দেন চা খাওয়ার জন্য কিছু নেন। পার্বতীপুরে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকারের দাবীতে কর্মী সভা। পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় নদী বাঁচাও আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নাগরিক সমাবেশ। পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া ইউএনও এক গৃহহীন ভারসাম্যহীন নারীর পাশে দাঁড়ালো। ৮ দফা দাবিতে প্রধান উপদেষ্টা বরাবর নার্সিং এসোসিয়েশন দিনাজপুর জেলা শাখার স্মারকলিপি ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুরে ইউনিয়ন সিএসওর লাইভস্টক সংলাপ সভা অনুষ্ঠিত বগুড়ায় প্রেম করে বিয়ে অতপর ভাড়া বাসায় স্ত্রীকে হত্যা করল স্বামী। দিনাজপুরে ৩ দিনব্যাপী উদ্যোক্তা মেলা ও পিঠা উৎসবের সমাপনী। দিনাজপুরের বিরলে শতাধিক নেতা-কর্মীর মামলা থেকে বাঁচতে ফ্যাসিস্ট আ,লীগ থেকে পদত্যাগ! অভিযোগ দিয়ে ও কাজ বন্ধ হচ্ছে না আদমদিঘীতে সরকারি জায়গা দখল করে করা হচ্ছে অবকাঠামো নির্মাণ! বগুড়ার কইপাড়ায় নববধূ শম্পা হত্যার অভিযোগ, যৌতুক দাবির জেরে স্বামী আটক