অ্যাডভোকেট এম এ মজিদ,ঢাকা || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ১২ জুলাই, ২০২৬ ২:৩২ অপরাহ্ণ
১৯৬৮ সাল। আমি তখন ঠাকুরগাঁও কলেজের ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বর্ষের ছাত্র। সদ্য দিনাজপুর জিলা স্কুল থেকে এসএসসি পাস করে ঠাকুরগাঁও কলেজে ভর্তি হয়েছি। সে-সময় ঠাকুরগাঁও এখনকার মতো জেলা ছিল না – এটি ছিল বৃহত্তর দিনাজপুর জেলার একটি মহকুমা।
ঠাকুরগাঁও কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন প্রখ্যাত শিক্ষা ও চিন্তাবিদ আব্দুর রশীদ স্যার। আর ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক ছিলেন আব্দুল জব্বার। তখন আমরা প্রভাষকদেরও শ্রদ্ধাভরে ‘অধ্যাপক’ হিসেবেই জানতাম। আজ এত বছর পরে জানি না, আমাদের সেই প্রিয় জব্বার স্যার পৃথিবীতে আছেন কি-না! যদি না-ও থাকেন, তবু তাঁর রসিকতা, তাঁর প্রাণখোলা হাসি আর তাঁর ক্লাস নেওয়ার অভিনব ভঙ্গি আজও আমার স্মৃতির পাতায় অমলিন হয়ে আছে।
সেই সময় ইংরেজি ছিল অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীর কাছে সবচেয়ে কঠিন বিষয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, রশীদ স্যার ও জব্বার স্যারের ক্লাসে কেউ ফাঁকি দিতে চাইত না। কারণ, তাঁদের ক্লাস মানেই ছিল শিক্ষা, সাহিত্য, রসিকতা আর প্রাণখোলা হাসির এক অনন্য সমাবেশ।
বাংলা ও ইংরেজি ক্লাস হতো সম্মিলিতভাবে। মানবিক, বাণিজ্য ও বিজ্ঞান – তিন বিভাগের শতাধিক ছাত্রছাত্রী একসঙ্গে বসতাম বিশাল চারচালা টিনের হলরুমে। হলঘরটি ছিল যেন জ্ঞানের পাশাপাশি প্রাণেরও এক মিলনমেলা। ঠাকুরগাঁও কলেজে আমার অবস্থান ছিল খুবই ভালো এবং প্রশংসিত। শিক্ষক থেকে শুরু করে সকল ছাত্রছাত্রী আমাকে এক নামেই চিনতেন। এর মূল কারণ ছিল – আমি তদানিন্তন সমগ্র দিনাজপুর জেলার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ‘দিনাজপুর জিলা স্কুল’ থেকে এসএসসি পাশ করে ঠাকুরগাঁও কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম। আরেকটি অন্যতম কারণ হলো – আমার মিশুক ও বন্ধুবৎসল স্বভাব। কলেজের শিক্ষক এবং স্থানীয় সহপাঠীদের সঙ্গে এমন আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল যে, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ঠাকুরগাঁও কলেজটি আমার আপন ঠিকানায় পরিণত হয়েছিল।
আজ যে ঘটনাটি লেখার জন্য বসেছি – সেই ঘটনাটি ১৯৬৮ সালের ডিসেম্বর মাসের কোনো এক শীতের দিনের।
সেদিন জব্বার স্যারের ইংরেজি ক্লাস চলছে। বাইরে আকাশ মেঘলা। হঠাৎ ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হলো। টিনের ছাদের ওপর বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ যেন প্রকৃতির নিজস্ব এক সুমধুর সংগীত হয়ে বেজে উঠল। মনে হলো, প্রকৃতি নিজেই যেন শ্রেণিকক্ষে বসে রবীন্দ্রসংগীত গাইছে।ফার্স্ট ইয়ার – ড্যাম্প কেয়ার মানসিকতার তরুণ-তরুণীরা আর চুপ করে থাকতে পারল না। কেউ গুনগুন করে গান ধরল, কেউ রবীন্দ্রনাথের কবিতার কয়েকটি লাইন আবৃত্তি করতে লাগল। মুহূর্তেই পুরো ক্লাসরুমে এক অন্যরকম রোমান্টিক আবহ তৈরি হলো।
জব্বার স্যারও ছিলেন সাহিত্যপ্রেমী এবং অসাধারণ রসিক মানুষ। তিনি কিছুক্ষণ আমাদের দিকে মুচকি হেসে তাকিয়ে থেকে বললেন, আচ্ছা, তোমরাই বলো তো, এমন শীতের দিনে, তার ওপর এই রিমঝিম বৃষ্টিতে সবচেয়ে কী খেতে ভালো লাগে? প্রশ্ন শেষ হতে না হতেই উত্তর আসতে লাগল চারদিক থেকে।
নারিকেল কুড়ে মুড়ি দিয়ে মাখিয়ে খেতে।
পাতলা খিচুড়ি, ডিম ভাজি আর কাঁচা মরিচ।
ভাপা পিঠা,পুঁলি পিঠা।চিতাই পিঠা।
গরম ভাত আর ভুনা গরুর মাংস।
“পাটিসাপটা পিঠা,খেজুরের রস আর মুড়ি।
এভাবে চলতেই থাকল। একজন বলল,
স্যার, বড় কাপে খাঁটি দুধের গরম গরম চা, আর সেই সাথে মুড়ি”। আরেকজন বলল,সরিষার তেল দিয়ে মুড়ি ও কাঁচা মরিচ মাখিয়ে খেতে। পুরো ক্লাসে হাসির রোল উঠল।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, প্রতিটি উত্তরের পরই জব্বার স্যার মাথা নেড়ে বলছেন, না… না… এটাও না…।
এভাবে প্রায় পঞ্চাশটিরও বেশি খাবারের নাম বলা হলো। স্যারের মুখে একটাই উত্তর, না, না, আর না।
অবশেষে আমরা সবাই একসঙ্গে বললাম,স্যার, আমাদের তো আর কিছুই বাকি নেই! এবার আপনি-ই বলুন, এই শীতের ঠান্ডায় এবং বৃষ্টির দিনে আপনার সবচেয়ে প্রিয় খাবার কোনটা?
স্যার একটু গম্ভীর মুখ করলেন। তারপর ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে ধীরে ধীরে বললেন,এই শীতের দিনে, এই রিমঝিম বৃষ্টিতে পৃথিবীর সবচেয়ে মজার, সবচেয়ে সুস্বাদু, সবচেয়ে আনন্দের খাবার হলো – ‘নারিকেল মুড়ি’।
আমরা সবাই একসঙ্গে প্রতিবাদ করে বললাম, “স্যার! এটা তো আমরা প্রথমেই বলেছি!
স্যার এবার আরও একটু কাছে এগিয়ে এসে চোখে দুষ্টু হাসি দিয়ে তারপর শব্দগুলো আলাদা আলাদা করে উচ্চারণ করলেন, “নারিকেল দিয়ে মুড়ি খাওয়ার কথা আমি বলিনি – আমি বলেছি, নারীর কোলে মুড়ি দিয়ে থাকার কথা”।
এক মুহূর্ত…দুই মুহূর্ত…যাঁদের মাথায় বুদ্ধির বাতি একটু দেরিতে জ্বলত, তাঁদের বুঝতে মিনিটখানেক সময় লেগেছিল। কিন্তু আমাদের মতো কিছু দুষ্টু ছাত্রের বুঝতে কয়েক সেকেন্ডও লাগেনি। অর্থটা বুঝে আমরা এমন হেসেছিলাম যে, হাসতে হাসতে কারও চোখে পানি, কারও পেটে খিল, কেউ বেঞ্চে মাথা রেখে হাসছে, আবার কেউ হাততালি ও টেবিল চাপড়াচ্ছে।
মেয়েরা প্রথমে একটু থমকে গেল। তারপর লজ্জায় মাথা নিচু করে কেউ ওড়নায় মুখ ঢাকল, কেউ মুচকি হাসতে হাসতে বান্ধবীর কাঁধে মাথা রাখল। পুরো হলরুম যেন হাসির ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল।
হাসির সেই ঢেউ থামার কোনো লক্ষণই ছিল না।
শেষ পর্যন্ত জব্বার স্যার নিজেও আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। তিনি নিজেও প্রাণ খুলে হাসতে লাগলেন। তারপর বই বগলে নিয়ে বললেন,আজ আর ইংরেজি ক্লাস হবে না। আপনারা হাসেন, আমি চললাম! এই বলে তিনি বৃষ্টির মধ্যেই টিচার্স কমনরুমের দিকে হাঁটতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পরে মেয়েরাও হাসতে হাসতে মহিলা কমনরুমে চলে গেল।
আজ প্রায় ছয় দশক পেরিয়ে গেছে। জীবনে অসংখ্য শিক্ষক দেখেছি, অসংখ্য বক্তৃতা শুনেছি, অগণিত মানুষের সংস্পর্শে এসেছি। কিন্তু সেই শীতের বিকেলের টিনের ছাদে বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ, জব্বার স্যারের রসিকতা আর পুরো হলরুম জুড়ে ফেটে পড়া সেই অট্টহাসি – আজও আমার স্মৃতির সবচেয়ে উজ্জ্বল, সবচেয়ে আনন্দময় অধ্যায়গুলোর একটি।
শিক্ষক শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানই দেন না, কখনো কখনো তাঁর একটি নির্মল রসিকতা, একটি প্রাণখোলা হাসি কিংবা একটি স্মরণীয় মুহূর্ত ছাত্রদের হৃদয়ে সারাজীবনের জন্য জায়গা করে নেয়। জব্বার স্যারও ছিলেন ঠিক তেমনই একজন শিক্ষক – যিনি ইংরেজি সাহিত্য ও ব্যাকরণের চেয়েও বেশি শিখিয়েছিলেন, কীভাবে প্রান খুলে হাসতে হয়, আর কীভাবে আনন্দ চিত্তে বাঁচার মতো বাঁচতে হয়।
এটি ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের বর্তমান একটি ভবনের ছবি। তবে ১৯৬৮ সালের কলেজের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তখন এ ধরনের বহুতল বা আধুনিক ভবনের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। কলেজে ছিল পাঁচ ইঞ্চি ইটের গাঁথুনির দেওয়াল ও টিনের ছাদবিশিষ্ট তিনটি দীর্ঘ একতলা ভবন, যেখানে পাঠদান কার্যক্রম পরিচালিত হতো। এসব ভবন থেকে কিছুটা দূরে ছিল দশ ইঞ্চি ইটের গাঁথুনির একটি ছোট আরসিসি ছাদযুক্ত পাকা ভবন। ভবনটিতে মোট চারটি কক্ষ ছিল। এর দু’টি কক্ষে ছিল কলেজের ছোট্ট পাঠাগার। সেখানে ১০ থেকে ১২ জন শিক্ষার্থী একসঙ্গে বসে পড়াশোনা করার জন্য রিডিং টেবিল ও চেয়ার রাখা ছিল। অপর দু’টি কক্ষ ছিল ইনডোর গেমসের জন্য নির্ধারিত। সেখানে কেরাম বোর্ড, টেবিল টেনিস, দাবা, লুডু ও ডার্টসহ বিভিন্ন ধরনের ইনডোর খেলার ব্যবস্থা ছিল। আকারে ছোট হলেও ভবনটি সে সময়ের শিক্ষার্থীদের কাছে পড়াশোনা ও বিনোদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত ছিল।
লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট, জাতীয় সাংবাদিক সোসাইটি এবং ওয়ার্ল্ড পীছ অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস সোসাইটির চেয়ারম্যান।