অ্যাডভোকেট এম এ মজিদ ঢাকা || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ২০ আগস্ট, ২০২৬ ৩:১২ অপরাহ্ণ
কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা কখনো কখনো সত্যিই হারিয়ে যায়। কিছু মানুষের উপকারের কথা লিখতে গেলে শব্দগুলো বড় অসহায় মনে হয় – যত কথাই বলা হোক, তাঁদের অবদানের যথার্থ মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। আজ তেমনই এক গভীর কৃতজ্ঞতার মুহূর্তে এই কৃতজ্ঞতার বন্ধনে আবদ্ধ তিন জনের কথা লেখার প্রয়াস চলাচ্ছি মাত্র।
গত ১৭ জুলাই ২০২৬ শুক্রবার আমরা মিয়া-বিবি দু’জনেই যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসি’তে আমাদের পুত্র, পুত্রবধূ এবং প্রিয় নাতি-নাতনিদের সঙ্গে দেখা করার উদ্দেশ্যে যাত্রা করার কথা ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে কাতার এয়ারওয়েজের বাংলাদেশি টিকিট কাউন্টারের সংশ্লিষ্ট বাঙ্গালী ব্যক্তিদের রহস্যজনক কর্মকাণ্ডে আমাদের সেই যাত্রা বাতিল হয়ে যায়। এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো ষড়যন্ত্র, দূরভিসন্ধি কিংবা আর্থিক অনিয়ম কাজ করেছিল বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছিল। সে বিষয়ে আমি নতুন করে কিছু বলে কাটা ঘায়ে লবন লাগাতে চাই না। তবে ঘটনাটি আমাদের জন্য কতটা হতাশা, কষ্ট ও অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করেছিল – তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
বিরতিহীনভাবে একের পর এক চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার পর শেষ পর্যন্ত এক মাস দুই দিন পর অর্থাৎ আজ ১৯ আগস্ট ২০২৬ বুধবার আমাদের আমেরিকা যাত্রার প্রস্তুতিতে আর কিছু অবশিষ্ট থাকলো না। এখন নির্ভর করছে ভাগ্য, সবার দোয়া এবং সর্বশক্তিমান আল্লাহ ইচ্ছার ওপরে।
কিন্তু আমেরিকা যাওয়ার সেই প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে গিয়ে আমার গিন্নির শিক্ষাগত সনদপত্র ও জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি)-কে ঘিরে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কাজ সম্পন্ন করতে হয়েছে। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সনদপত্রে নাম সংশোধন, সংশোধিত নাম অনুসারে জাতীয় পরিচয়পত্রের নাম সংশোধন এবং সর্বশেষ সেই সংশোধিত নামের ভিত্তিতে অতি জরুরি ভিত্তিতে নতুন আন্তর্জাতিক পাসপোর্ট তৈরি করতে যেসব বিড়ম্বনা এবং আনাকাঙ্খীত ঘটনা এবং মুহুর্ত মোকাবিলা করতে হয়েছে – সেসব ঘটনা অবর্ণনীয় এবং অসহনীয়।
বাংলাদেশের প্রশাসনিক বাস্তবতায় সকল কাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি এমনভাবে বিস্তার লাভ করেছে – যা এখন নিয়ম এবং বাধ্যতামূলক করনীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই তিনটি কাজ সম্পন্ন করা যে কতটা কষ্টসাধ্য, সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়সাপেক্ষ – যিনি নিজে এমন প্রক্রিয়ার ভেতরে যাননি, তার পক্ষে এটি কল্পনা করাও কঠিন।
একটি কাগজের একটি নামের অক্ষর সংশোধনের পেছনে তাদের অনৈতিক প্রস্তাব মেনে না নিলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মাসের পর মাস অপেক্ষা, অসংখ্যবার দপ্তরে যোগাযোগ, বারবার যাতায়াত এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে সময় কাটানোর পরেও কাজ হয় না। একজন সাধারণ নাগরিকের কাছে এই অভিজ্ঞতা অনেকটা এমন যে কেয়ামতের পুলসুরাত পার হওয়ার মতো পরীক্ষা। একটি দরজা খুললে কি হবে – সঙ্গে সঙ্গে তাকে একের পর এক অসংখ্য দরজার সামনে দাঁড়াতে হবে। শেষমেশ তাদের কুপ্রস্তাবে রাজি না হলে কাজ না হওয়ার সম্ভাবনা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রায় শতভাগ বাধ্যগত। ধর্মপ্রাণ এবং সৎ মানুষগুলোকেও এই চির চেনা অসৎ প্রস্তাব ও অনিয়মকে মেনে নিতে বাধ্য হতে হচ্ছে। আমারও কষ্ট হয়েছে সীমাহীন, সময় নষ্ট ও দৌঁড়াদৌঁড়ি করতে হয়েছে অগণিত। কিন্তু এই কষ্ট, সময় ও সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ যে পর্যায়ে পৌঁছাতে পারত, তা পৌঁছাতে দেননি তিনজন অসাধারণ মানুষের আন্তরিকতা, দায়িত্ববোধ ও মানবিক সহযোগিতা।
তাঁদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা কোনো আনুষ্ঠানিক ধন্যবাদে প্রকাশ করার মতো কোনো ক্ষমতা নেই। কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা কখনো কখনো সত্যিই হারিয়ে যায়। কিছু মানুষের উপকারের কথা লিখতে গেলে শব্দগুলো বড় অসহায় মনে হয়। মনে হয়, যত কথাই বলা হোক, তাঁদের অবদানের যথার্থ মূল্যায়ন করা কোনো অবস্থাতেই সম্ভব নয়। আজ তেমনই এক গভীর কৃতজ্ঞতার মুহূর্তে দাঁড়িয়ে কয়েকটি কথা কয়েকজনের পক্ষে বলার চেষ্টা করছি মাত্র।
কাতার এয়ারওয়েজের কয়েকজন অসৎ বাঙালীর কুচক্রান্তে ১৭ জুলাঔ ২০২৬ তারিখে আমেরিকা যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। তবে মানুষের পরিকল্পনা ব্যর্থ হলেও আল্লাহর পরিকল্পনা ব্যর্থ হয় না। জানিনা, কপালে কি লেখা রয়েছে। শেষাবধি এক মাস দুই দিন পর অর্থাৎ আজ ১৯ আগস্ট ২০২৬ বুধবার বিকলে সাড়ে ৪টার মধ্যেই আমাদের যাত্রার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়ে গেল। যাওয়ার এবং না যাওয়ার বিষয়টি এখনোও উপরওয়ালার ওপরেই নির্ভর করছে।
কিন্তু এই সময়ে আমার স্ত্রীর শিক্ষাগত সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট সংশোধনের দীর্ঘ ও জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্যে অতিক্রম করতে হয়েছে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এসব কাজ কতটা সময়সাপেক্ষ, কষ্টকর ও অর্থ বিনষ্ট – তা ভুক্তভোগীরাই জানেন। অসংখ্য দপ্তর, বারবার যাতায়াত ও অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে যেতে হয়। তবে এই পুরো প্রক্রিয়ায় তিনজন অনন্য মাত্রার ভালো মানুষের আন্তরিক সহযোগিতা আমাদের জন্য বড় সহায়তা হয়ে দাঁড়ায়।
প্রথমজন হলেন অধ্যাপক ইফফাত জেরীন ময়নাঃ
১৮তম বিসিএস কাডারের রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের প্রধান পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ইফফাত জেরীন ময়না আমার স্ত্রীর এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সনদপত্রে নাম সংশোধনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব ও দ্রুততার সঙ্গে সমাপ্ত করেছেন। একটি সরকারি দপ্তরে শিক্ষাগত সনদপত্র সংশোধনের কাজ কতটা জটিল এবং সময় সাপেক্ষ হতে পারে, তা যারা জানেন একমাত্র ভূক্তভোগীরাই সেটা বুঝবেন। দ্রুততার সঙ্গে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া এখন সত্যি সত্যিই খুবই কঠিন কাজ ও দায়িত্ব। অধ্যাপক ইফফাত জেরীন ময়না শুধু দায়িত্ব পালনই করেননি; তাঁর আন্তরিকতা, সহযোগিতা ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে কাজটি দ্রুত সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে তিনি অসামান্য অবদান রেখেছেন।
দ্বিতীয়জন হলেন এম এ আখেরঃ আমার স্ত্রীর শিক্ষাগত সনদপত্রের সংশোধিত নাম অনুযায়ী জাতীয় পরিচয়পত্রে সংশোধনের কাজটি ছিল আরও জটিল ও সময়সাপেক্ষ। এম এ আখের বাংলাদেশ সরকারের যুগ্মসচিব এবং বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশনের পরিচালক (প্রশাসন)। তিনি যে আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন, তার তুলনা করা কঠিন। বিশেষ করে তিনি একই সঙ্গে আমাদের পরিবারের সবার খুবই নিকটতম পরিচিতজন এবং বাংলাদেশের ২০তম বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের ব্যাচমেট হিসেবে বিষয়টি ব্যক্তিগতভাবে গুরুত্ব সহকারে তিনি তাঁর ব্যাচমেট জাতীয় পরিচয়পত্র উইংয়ের মহাপরিচালক আনোয়ার পাশাকে বুঝিয়ে কাজটি করাতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। এটা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, তাঁর আন্তরিক উদ্যোগ ছাড়া কাজটি এত দ্রুত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হতো না।
আমাদের দেশে সরকারি দপ্তরের কোনো জটিল কাজ যখন দ্রুত সমাধানের প্রয়োজন হয়, তখন একজন দায়িত্বশীল ও সৎ কর্মকর্তার একাধিক ফোন, একাধিক বার্তা কিংবা একাধিক আন্তরিক অনুরোধ কখনো কখনো একজন ভুক্তভোগী মানুষের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়ায়। যুগ্মসচিব এম এ আখেরের অকৃত্রিম এবং আন্তরিক সহযোগিতা আমার কাছে তার চাইতেও অনেক বেশি মনে হয়েছে।
তৃতীয়জন হলেন আনোয়ার পাশাঃ আমার স্ত্রীর জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনের পুরো প্রক্রিয়ায় যাঁর সহযোগিতা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি আমাকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছে, তিনি হলেন বাংলাদেশ সরকারের অতিরিক্ত সচিব এবং বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) উইংয়ের মহাপরিচালক আনোয়ার পাশা।
আমার জানামতে, তিনি দায়িত্বশীল, মেধাবী, কর্মনিষ্ঠ ও দেশপ্রেমিক একজন কর্মকর্তা। তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ যাঁদের হয়েছে, তাঁরা নিশ্চয়ই আমার কথার সঙ্গে একমত হবেন।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়টি হলো – রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে তিনি যখন বিদেশে অবস্থান করছিলেন, তখনও আমার স্ত্রীর এনআইডি সংশোধনের বিষয়টি তিনি অবহেলা করেননি। বরং মোবাইল ফোনের হোয়াটস অ্যাপের মাধ্যমে একাধিকবার তাঁর অধীনস্থদের সাথে যোগাযোগ করে বিষয়টি এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ তিনি নিয়েছেন।
একজন তা়র বিভাগের সর্বোচ্চসরকারি কর্মকর্তা যখন দেশের বাইরে থেকেও একজন সাধারণ নাগরিকের একটি জরুরি সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়ে তার সমাধানের জন্য সময় দেন, তখন সেটি শুধু দায়িত্ব পালনের উদাহরণ নয়; এটি মানবিকতারও এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
এ ব্যাপারে যাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ ও ঋণীঃ
আজ আমার স্ত্রীর শিক্ষাগত সনদপত্রের নাম সংশোধিত হয়েছে, জাতীয় পরিচয়পত্রে সংশোধিত নাম এসেছে এবং সেই সংশোধিত নাম অনুযায়ী নতুন আন্তর্জাতিক পাসপোর্টও তৈরি হয়েছে। ফলে দীর্ঘ অনিশ্চয়তার অবসান ঘটেছে। আমাদের আমেরিকা যাত্রার পথ এখন অনেকটাই পরিষ্কার, তবে সব কিছুই নির্ভর করছে শুভাকাঙ্ক্ষীদের দোয়া এবং আল্লাহতায়ালার ইচ্ছার ওপরে।
এই সাফল্যের পেছনে অনেক কাগজপত্র, অনেক দৌড়ঝাঁপ, অনেক অপেক্ষা এবং অনেক মানুষের আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব জড়িত রয়েছে। কিন্তু কিছু মানুষ থাকেন, যাঁদের ব্যক্তিগত আন্তরিকতা একটি জটিল প্রক্রিয়াকে সহজ করে দেন। আমার জীবনের এই বিশেষ অধ্যায়ে সেই তিনজন মানুষ হলেন – অধ্যাপক ইফফাত জেরীন ময়না, আনোয়ার পাশা এবং এম এ আখের।
আমি তাঁদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও অকৃত্রিম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। কৃতজ্ঞতার ঋণ আসলে এমন এক ঋণ, যা অর্থ দিয়ে বা কোনো কিছুর বিনিময়ে পরিশোধ করা যায় না। কিন্তু তাঁদের এই সহযোগিতা কথা আমি হৃদয়ে ধারণ করে রাখব। মনের মনিকোঠা থেকে তাঁদের জন্য দোয়া তো সর্বদা থাকবেই।
অধ্যাপক ইফফাত জেরীন ময়না, আনোয়ার পাশা এবং এম এ আখের – আপনাদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা শুধু আজকের জন্য নয়; এটি আমার হৃদয়ে দীর্ঘদিনের জন্য লেখা হয়ে রইল। আল্লাহ আপনাদের প্রত্যেককে সুস্থ রাখুন, সম্মানিত করুন এবং মানুষের কল্যাণে আরও বেশি কাজ করার তৌফিক দান করুন।
নিচের বামের ছবিটি – রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের প্রধান পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ইফফাত জেরীন ময়না, ডানের উপরের ছবিটি – বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয়পত্র উইংয়ের মহাপরিচালক আনোয়ার পাশা এবং ডানের নিচের ছবিটি – বাংলাদেশ সরকারের যুগ্মসচিব এবং বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশনের পরিচালক (প্রশাসন) এম এ আখের।
এই লেখাটি একান্ত লেখকের ব্যক্তিগত।