admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ৩০ এপ্রিল, ২০২০ ৩:৫৯ পূর্বাহ্ণ
ঢাকার হৃদরোগ চিকিৎসার হাসপাতালে এত ডাক্তার-নার্স কেন কোভিড-১৯ আক্রান্ত এটি হচ্ছে হৃদরোগের জন্য সরকারি উদ্যোগে বাংলাদেশের একমাত্র বিশেষায়িত হাসপাতাল ও ইন্সটিটিউট। সপ্তাহ তিনেক আগে একজন রোগী ঢাকার জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালে এসেছিলেন হার্টের সমস্যা নিয়ে। দিন দশেক ধরে তিনি ভর্তিও ছিলেন হাসপাতালের একটি ওয়ার্ডে। এক পর্যায়ে তিনি কোভিড-১৯ পজিটিভ শনাক্ত হন। এখন দেখা যাচ্ছে হাসপাতালটির একের পর এক চিকিৎসাকর্মী কোভিড-১৯ পজিটিভ বলে শনাক্ত হচ্ছেন, যারা প্রত্যেকেই কোন না কোনভাবে ওই রোগীটির সংস্পর্শে গিয়েছিলেন। এখন বাংলাদেশের একমাত্র সরকারি এই বিশেষায়িত হৃদরোগ হাসপাতালটির আটটি সাধারণ ওয়ার্ডের মধ্যে একটিকে লকডাউন করে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সেখানকার একজন সহকারী অধ্যাপক পর্যায়ের চিকিৎসক, যিনি নাম প্রকাশ করতে আগ্রহী নন।
সাংবাদিকদের সাথে কথা বলে ইনস্টিটিউটের পরিচালক মীর জামালউদ্দীন নিশ্চিত করেছেন যে সব মিলিয়ে ২৯ জন হাসপাতাল কর্মী সংক্রমিত হয়েছেন, তবে তিনি অবশ্য লকডাউনের ব্যাপারটি স্বীকার করেননি। জানা গেছে, সব মিলিয়ে যে ২৯ জন হাসপাতালকর্মী শনাক্ত হয়েছেন, তাদের মধ্যে আটজন ডাক্তার ও সাতজন নার্স। একজন নার্সের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় আগেই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিলো। এখন আরো একজন ডাক্তারের অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে আজ (বুধবার) হাসপাতালে ভর্তি করা হবে বলে জানাচ্ছে হৃদরোগ ইন্সটিটিউট কর্তৃপক্ষ। বাকীদের বাড়িতে রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশে করোনাভাইরাস মোট শনাক্ত ৭ হাজার ১০৩ জন
সুস্থ হয়েছেন মোট ১ শত ৫০ জন
মৃত্যু বরণ করেছে ১ শত ৬৩ জন
সারা বাংলাদেশের মধ্যে শুধুমাত্র এই হাসপাতালটিতেই ভাসক্যুলার সার্জারি করার ব্যবস্থা রয়েছে। অর্থাৎ শরীরে যেকোনো অংশে আঘাত লেগে বা কেটে গিয়ে যদি কোন ধমনী ক্ষতিগ্রস্ত হয়, জরুরি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তা সারিয়ে তোলার ব্যবস্থা একমাত্র হৃদরোগ ইন্সটিটিউটেই আছে। এছাড়া সারা বাংলাদেশ থেকেই হৃদরোগে আক্রান্ত মানুষেরা এই হাসপাতালে আসেন, যাদের জীবন বাঁচানোর জন্য জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসা দেয়া বা অস্ত্রোপচার করার প্রয়োজন পড়ে। ফলে মহামারি ছড়িয়ে পড়ার কারণে এই হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা যদি ব্যহত হয়, তাহলে বহু মানুষের জীবন সংশয় তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশে আক্রান্তের ৭% ডাক্তার ২৯ এপ্রিল ২০ পযন্ত পাওয়া। মোট আক্রান্ত ৬ হাজার ৪৫২ জন এর মধ্যে ডাক্তার ৪ শত ৪০ জন, আর নার্স ২ শত ৩৫ জন এই তর্থ্য বাংলাদেশ ডক্টরস ফোরাম থেকে প্রাপ্ত ।
যেভাবে সংক্রমণ ছড়ালো পরিচালক মীর জামালউদ্দীন বলেন, একজন রোগীর মাধ্যমেই ২৯ জন চিকিৎসাকর্মী আক্রান্ত হন। যদিও তিনি এদের ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু জানাতে রাজী হননি। 
বে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সিনিয়র চিকিৎসক জানান, আক্রান্তদের মধ্যে ১৫ জন ডাক্তার-নার্স ছাড়াও রয়েছেন একজন ওয়ার্ড মাস্টার, জনাকয়েক ওয়ার্ডবয় এবং নিরাপত্তারক্ষীসহ অন্যান্য সহায়তা কর্মী। এরা সবাই ওই রোগীর সংস্পর্শে এসেছিলেন, যাদেরকে পরবর্তীতে কন্টাক্ট ট্রেসিংয়ের মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সপ্তাহ তিনেক আগে ওই রোগী হৃদরোগের জটিলতা নিয়ে জরুরি বিভাগে আসেন এবং এরপর তাকে সাধারণ ওয়ার্ডে ভর্তি করে নেয়া হয়। এসময় তার শরীরে করোনাভাইরাসের কোন লক্ষণ ছিলো না। দিনকয়েক পরে কিছু উপসর্গ দেখা দিলে তার নমুনা পরীক্ষা করতে পাঠানো হয়। নমুনার ফলাফল হাতে পাওয়ার আগেই ওই রোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে বাড়ি চলে গিয়েছিলেন।
কিন্তু ফলাফলে তার কোভিড-১৯ পজিটিভ আসে। ফলে তার সংস্পর্শে আসা চিকিৎসাকর্মীদের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা শুরু করা হয় এবং সবারই সংক্রমণ শনাক্ত হয়। বাংলাদেশের অনেক হাসপাতালেই এখন রোগী ভর্তি করার আগে করোনাভাইরাস নেই এমন সার্টিফিকেট দেখতে চাওয়া হয় বলে অভিযোগ আছে।কিন্তু পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে এই চিকিৎসক বলেন, হৃদরোগ এমন এক সমস্যা, যার চিকিৎসা শুরু করতে হয় অনতিবিলম্বে। নয়তো তার বড় ক্ষতি, এমনকি জীবননাশের হুমকি তৈরি হতে পারে।এক্ষেত্রে ভর্তি করার আগে তার সংক্রমণ আছে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখার কোন সুযোগই থাকে না। ফার্মেসি ও নিরাপত্তা প্রহরীদের কামরা লকডাউন হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের পরিচালক জানাচ্ছেন, এখন পর্যন্ত মোট ১০ জন রোগী তারা পেয়েছেন যারা করোনাভাইরাস আক্রান্ত হওয়ায় কোভিড-১৯ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
শুধুমাত্র একজন রোগীর ক্ষেত্রে বিষয়টি আগেভাগে ধরতে না পারার কারণে তিনি বহু চিকিৎসা কর্মীকে আক্রান্ত করে ফেলেছেন। তবে বড় এই হাসপাতাল ক্যাম্পাসটির আরো দু’টি জায়গায় দুজন কর্মী কোভিড-১৯ পজিটিভ শনাক্ত হন, যারা ওই রোগীর সংস্পর্শে আসেননি। এদের একজন হাসপাতালের ফার্মেসির একজন কর্মী। আরেকজন নিরাপত্তা রক্ষীদলের একজন আনসার সদস্য। ফলে আনসার সদস্যরা বিশ্রাম নেয় এমন একটি জায়গাকেও লকডাউন করা হয়েছে। আর ফার্মেসিটিকে প্রায় ১৬ দিন লকডাউন রাখার পর দিন কয়েক আগে খুলে দেয়া হয়েছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও মিটফোর্ড হাসপাতালে বহু চিকিৎসাকর্মীর আক্রান্ত হবার ঘটনা ঘটেছে এর আগে।
হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের পরিচালক মি. জামালউদ্দীন বলছেন, যেগুলো কোভিড-১৯ হাসপাতাল, সেখানে জানে সবাই যে এরা কোভিড-১৯ রোগী। ফলে সেক্ষেত্রে তারা যে প্রস্তুতি নিয়ে এগোন, আমরা প্রায় একই প্রস্তুতি থাকলেও হয়তো অতটা খেয়াল করি না। এই কারণেই নন-কোভিড হাসপাতালে এখন সংক্রমণ একটু বেশি। এ রকম পরিস্থিতিতে কোভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত হাসপাতালের সংখ্যা বাড়ানোর কথা বলেছেন ডক্টরস ফাউন্ডেশনের প্রধান সমন্বয়ক ডা. নিরুপম দাশ।তিনি বলছেন, এভাবে যদি চলতে থাকে তাহলে যারা নন-কোভিড রোগী, তাদের চিকিৎসাসেবা অচিরেই হুমকির মুখে পড়ে যাবে।
সুরক্ষা উপকরণের সংকটঃ সরকারের তরফ থেকে এ কথা বলা হচ্ছে যে সুরক্ষা উপকরণের কোন অভাব নেই এবং সব চিকিৎসাকর্মীদেরই পর্যাপ্ত সুরক্ষা উপকরণ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন চিকিৎসক বলেছেন, দশদিন আগেও তাদের পিপিইর মতো কোন সুরক্ষা উপকরণ দিচ্ছিল না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ডাক্তার-নার্সদের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়ার ঘটনার পর থেকে অর্থাৎ দিন দশেক আগে থেকে পিপিই সরবরাহ শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ।
কিন্তু সেগুলো পর্যাপ্ত নয় এবং এগুলো একবার ব্যাবহারোপযোগী হলেও তারা জীবাণুমুক্ত করে একাধিকবার ব্যবহার করছেন বলে জানান ওই চিকিৎসক। তিনি বলেন, এখন ব্যক্তিগত খরচে এবং নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় তারা পিপিই সংগ্রহ শুরু করেছেন। তবে পর্যাপ্ত সুরক্ষা উপকরণ না সরবরাহ করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পরিচালক মীর জামালউদ্দীন। তিনি বলেন, পিপিই একদম প্রথম থেকেই আমরা দিচ্ছি। প্রতিদিন আড়াইশো থেকে তিনশো পিপিই দিচ্ছি।