admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ১৪ জুন, ২০২০ ৪:৫৬ অপরাহ্ণ
টাকা ছাপিয়ে সংকট উত্তরণ সিপিডি নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন এটা মূর্খতাই হবে না, হবে আত্মঘাতী, বিশ্বব্যাপী বেশ কয়েকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলমান আর্থিক মন্দা থেকে মুক্তি পেতে নতুন মুদ্রা ছাপানো শুরু করেছে। তারই পথ ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকও ৫০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে একই উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ টাকা সঠিকভাবে ব্যবহার না হলে অর্থাৎ উৎপাদনশীল খাতে না গেলে অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। মূল্যস্ফিতি বাড়তে পারে এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে। মূল্যস্ফিতি বাড়লে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাবে।
যদিও এরই মধ্যে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের জন্য ইতোমধ্যে নতুন অর্থ মুদ্রণ শুরু করেছে। এটি এমন পদক্ষেপ যা উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছে দেশটি। দেশের আর্থিক খাত বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে সরকার নগদ টাকার সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। এর অর্থ, সরকারকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দরজায় নক করতে হচ্ছে।
এদিকে, করোনাভাইরাসের কারণে যেসব প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়া হয়েছে, তার পুরোটাই ব্যাংকঋণনির্ভর হয়ে গেছে। ব্যাংকগুলোকে দিয়ে প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে। কারণ, ব্যাংকগুলোর অবস্থা এমনিতেই ভালো নয়। আমানতের অবস্থা খারাপ, পরিচালনাগত ত্রম্নটি আছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি ঘাটতি বিদ্যমান। পুরো ব্যাংক খাত সমস্যায় আছে। তাই নতুন টাকা ছাপিয়ে সংকট মোকাবেলার উদ্যোগের মধ্যে আছে সরকার।
অন্যদিকে, নতুন অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি মেটাতে এবার ব্যাংক থেকে ৮৪ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকার রেকর্ড ঋণ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। যা গত বছরের প্রস্তাবিত বাজেটে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩৭ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা বেশি। বর্তমান বাজেটে ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা। তবে সংশোধিত বাজেটে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৮২ হাজার ৪২১ কোটি টাকা। বাজেট ঘাটতি পূরণে দুইভাবে ঋণ নিয়ে থাকে সরকার। বৈদেশিক সহায়তা ও অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ৯ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে সরকার।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় না হওয়ার কারণে সরকারের ব্যাংক ঋণনির্ভরতা বাড়ছে। সামনের দিনগুলোতে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে না। ফলে ঘাটতি মেটাতে বাধ্য হয়েই সরকার ব্যাংকের ওপর নির্ভর করছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন টাকা ছাপিয়ে সামাল দেওয়া লাগতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে টাকা সরবরাহ বাড়ানোর দুটি পদ্ধতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি এবং সরকারের বাজেটনীতি। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের মাধ্যমে বাজারে টাকা সরবরাহ বাড়ানো যায়। আর সরকার সরাসরি খরচ করে বাজারে টাকা সরবরাহ বাড়াতে পারে। এখন প্রশ্ন সংকটের কারণে ব্যাংকগুলোর আমানত বাড়বে না, ঋণ আদায় হবে না। তাহলে নতুন করে ঋণ দেবে কীভাবে। আর অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বন্ধ থাকায় সরকারের রাজস্ব আয় অনেক কম হবে। ফলে বাজারে ছাড়ার মতো অর্থ সরকারের কাছে থাকবে না- এটাই স্বাভাবিক।
টাকার সরবরাহ বাড়াতে ব্যাংকগুলোকে নীতি ছাড় দিয়ে বিদ্যমান টাকা থেকে ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে পারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিকল্প হচ্ছে টাকা ছাপিয়ে বাজারে ছাড়তে পারে সরকার। এ জন্য অনেক অর্থনীতিবিদ টাকা ছাপানোর পক্ষে। তবে ছাপানোর বিপক্ষে মতও রয়েছে। তারা বলছেন, টাকা ছাপানোর বিকল্প কিছু পদ্ধতি এখনো রয়েছে। সেগুলো আগে বাস্তবায়ন দরকার। ঠিক এ মুহূর্তে টাকা ছাপালে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এদিকে, করোনাভাইরাস সংকটের মধ্যে বিশাল লক্ষ্যকেও ছাড়িয়ে প্রায় লাখ-কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে সরকারের ধার। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনই ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে এত বেশি ঋণ নেয়নি সরকার। করোনাভাইরাস মহামারিতে বিশ্বসহ দেশের অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ার মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের ৩১ মে পর্যন্ত অর্থাৎ ১১ মাসে (জুলাই-মে) সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ৯৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরের মূল বাজেটে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ৪২ হাজার ২৯ কোটি টাকা।
গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হবে না। কিন্তু এই সময়ে মানুষের জীবন ও জীবিকা স্বাভাবিক রাখতে হবে। ফলে বাধ্য হয়েই ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে প্রয়োজনীয় কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, প্রয়োজন হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকা ছাপানোর উদ্যোগ নিতে পারে। সামগ্রিক চাহিদা হ্রাস পাওয়ায় এখনই মুদ্রাস্ফীতি চাপের ঝুঁকি নেই। তবে মুদ্রিত অর্থ, সাধারণত রিজার্ভ মানি বা বেস মানি হিসেবে পরিচিত। এটা অবশ্যই উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার করা উচিত হবে। অন্যথায় অর্থনীতিতে স্থবিরতার আশঙ্কা রয়েছে। যেমন উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং জিডিপির হার কমে যেতে পারে।
একদিকে, করোনার সময় অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশগুলো টাকা ছাপানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর কারণ উন্নত দেশগুলোয় ব্যাংকগুলোর জন্য নীতিনির্ধারণী সুদহার শূন্য বা শূন্যের কাছাকাছি। ওইসব দেশের নীতি ছাড়ের কোনো সুযোগ না থাকায় তারা টাকা ছাপাতে বাধ্য।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রে টাকা ছাপানোর অভিজ্ঞতা ভালো নয়। এর আগে ২০০০ সালে জিম্বাবুয়ে টাকা ছাপানোর ফলে তাদের মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়ে যায়। আর ভেনিজুয়েলার মূল্যস্ফীতির অবস্থা একই হয়। এই দুটি দেশের উদাহরণ দিয়ে অনেকেই মজা করে বলেছেন, ট্রাকভর্তি টাকা নিয়ে বস্তায় করে বাজার করতে হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও টাকা ছাপানোর বিপদ হচ্ছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি। যদিও টাকা ছাপানো হচ্ছে অর্থনীতিকে বাঁচানোর সর্বশেষ ধাপ।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে টাকা ছাপানোর সিদ্ধান্ত শুধু মূর্খতাই হবে না, হবে আত্মঘাতী। বরং কয়েকটি পদ্ধতি ব্যবহার করে তারল্য সরবরাহ বাড়াতে হবে। তারল্য সরবরাহ বাড়ানোর ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিছাড় বাদেও সরকার কিছু পদক্ষেপ নিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের বেতনভাতা ২০ থেকে ৫০ শতাংশ কমানো। ভারত এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উচ্চব্যয়ে প্রশিক্ষণ ও বিদেশ ভ্রমণ আপাতত বন্ধ রাখা। অতিপ্রয়োজনীয় প্রকল্প ছাড়া সব ধরনের বড়-মাঝারি-ছোট প্রকল্প বাস্তবায়ন আপাতত স্থগিত রাখা। এতে সরকার অন্তত দেড় থেকে ২ লাখ কোটি টাকা বাজারে সরবরাহ করতে পারবে, যে টাকা গরিব মানুষের পকেটে দেওয়া যেতে পারে। ‘হেলিকপ্টারমানি’ অর্থাৎ একেবারে আয়হীন মানুষের পকেটে টাকা ছিটানোর পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারে। এতে গ্রামীণ ও স্থানীয় বাজার চাঙ্গা হবে।