admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ২৫ এপ্রিল, ২০২০ ১১:০৯ অপরাহ্ণ
নাগরিক ভাবনা, অ্যাডভোকেট আবু মহী উদ্দীনঃ করোনায় খাদ্য সহায়তা সমন্বয়ে সচিবদের দায়িত্ব পালন। সরকারি চাকুরীতে নীলফামারী পোষ্টিং ছিল। তখন বি এন পি আমল , অসাংবিধানিক হলেও জেলা মন্ত্রী সিস্টেম ছিল। নীলফামারীর জেলা মন্ত্রী এহছানুল হক মিলন। তিনি বিএনপির শিক্ষা প্রতিমন্ত্রি। সুতরাং তিনি জেলার উন্নয়ন ও সমন্বয় সভায় আসতেন। বিমানে আসতেন , আলাপ আলোচনা সেরে সার্কিট হাউসে থেকে আবার বিমানে ফেরত যেতেন। একদিনে যাতায়ত করা যেতোনা। বিমান ব্যবস্থা এখনকার মতো ছিলনা। তাঁর দোষ যতই থাকুক পাবলিক পরীক্ষায় নকল বন্ধ করার একটা কৃতিত্ব তাকে দিতে হবে। এক সময় তাঁর খায়েশ হলো উপজেলাগুলোর অবস্থা তিনি সরজমিনে দেখবেন।
তিনি অভিনব সিদ্ধান্ত দিলেন এক এক মাসের জেলা উন্নয়ন ও সমন্বয় সভা একেক উপজেলায় হবে। বিষয়টা রাজদর্শনে পাপক্ষয়ের পর্যায়ে গেল। শুরু হলো কার্যক্রম। ২০০৩/৪/ ৫ সাল। তখন তো জেলা কর্মকর্তাদের অধিকাংশেরই সরকারি গাড়ী ছিলনা। এখন তো ২/১ টি ছাড়া বলতে গেলে সব দপ্তর প্রধাণের গাড়ী আছে। তখন জেলা পর্যায়ে বেশ কয়েকজন মহিলা কর্মকর্তা ছিলেন । তাদের কোন গাড়ী ছিলনা। সব বিভাগের কর্মকর্তাদের পরিবহন নাই। অটোও তখন চালু হয়নি। উপজেলায় যাওয়ার রাস্তাগুলো ছিল প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন। এতো পরিমান ভাঙ্গাচোরা যে মোটর সাইকেল নিয়ে যাওয়াও দুস্কর ছিল। যাহোক , রাজ আজ্ঞা , অমান্য করার উপায় নাই। মিটিংয়ের সময় নির্ধারিত থাকতো সচরাচর ১০ বা সাড়ে ১০ টায়। ট্রেন দেরী করে আসবে বলেতো প্যাসেঞ্জার দেরী করে আসলে চলবেনা।
আমরা প্রজারা যে ভাবেই হোক উপস্থিত হতাম। মিটিংয়ের আয়োজক ইউএনও সাহেবতো তখন তাঁতের মাকু। কখন কি অহি নাজেল হয় সেই নিয়ে ব্যস্তো থাকতেন। আর খাবারের আয়োজন তো করতে পারেননা। সে সময় নীলফামারী খুবই গরীব ও মঙ্গা পীড়িত জেলা। উপজেলাগুলোর বাজা ব্যবস্থা এখনকার ইউনিয়নের চেয়েও দুর্বল অবস্থায়। বাজারে তেমন কোন খাবারে ও দোকানও নাই যে এতোগুলো মানুষ খাবে। এর পর অপেক্ষার পালা। রাগ করে কোন কর্মকর্তার কাছে কোন শ্রুতিকটু মন্তব্য করাও ঝুঁকিপুর্ন। মন্ত্রী মহোদয় বিকাল ৫ টার দিকে আসতেন। মিটিংস্থলে আসার আগে ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ , কোন নির্মান কাজের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন , কোন সম্বর্ধনা সভায় যোগদান শেষে রাত্রি ১০/১১ টার সময় মিটিং রুমে প্রবেশ করে ই তিনি কিভাবে আসলেন এবং কত কষ্ট করে আমাদের দর্শন দিতে আসলেন এসব ঘটনা আনুপূর্বিক বিশ্লেষন করার পর বলতেন আজকে তো রাত হয়েছে , আমরা আগামী সভায় সময় নিয়ে বিস্তারিত আলাপ করবো।
সভা শেষ। এখন বোঝেন এই মানুষগুলো যাদের পরিবহন নেই বিশেষত: মহিলা কর্মকর্তা তারা কিভাবে জেলা সদরে পৌঁছাবেন। সবাই আবার জেলা সদরে থাকেননা । ডেইলী প্যাসেজ্ঞারী করেন। এই ঘটনা যে কেবল এক সভাতেই ঘটতো তা নয় . কোন সভায়ই সন্ধে ৬ টার আগে শুরু হয়নি। সব সভাতেই তার কৃতিত্বের কথাগুলো আমাদের মনোযোগ দিয়ে শুনতে হতো। ডিসি সাহেবরা মন্ত্রীর প্রটোকল নিয়ে ব্যাস্তো থাকতেন। আর এডিসি ম্যাজিষ্ট্রেটরা এমপি , বিএনপির জেলার নেতা , জোটের জামাত নেতা এদের যত্নআত্বি নিয়ে গলদঘর্ম হতেন। তারা সবাই রাষ্ট্রীয় কাজে এসেছেন সুতরাং তাদের তো কোন ঘাটতি থাকা চলবেনা। বিএনপির গোটা আমলটাই এই অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি। হাইকোর্ট এটাকে অসংবিধানিক ঘোষনা না করলে এই যন্ত্রনা হয়তো চালুই থাকতো।
বর্তমানে দেশে করোনা দুর্যোগ চলছে। এই দুর্যোগে একমাত্র ভরসার স্থল শেখ হাসিনা। দেশের মানুষ বাঁকীদেরকে খুব একটা হিসাবের মধ্যে ধরে বলে মনে হয়না। চাল চোরদের ধরার কথা প্রধানমন্ত্রীকে বলতে হয়। আবার কোন গ্রামে বা পাড়ায় বা বস্তিতে খাদ্য সহায়তা বা ত্রান বিতরণ করে ফেসবুকে প্রমান পত্র হাজির করতেও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সেখানে ত্রান বিতরণ করা হয়েছে তাও লেখা থাকে। করোনার ফ্রন্ট ফাইটার স্বাস্থ্য কর্মীদের ২ নম্বরী উপকরণ সরবারহের অভিযোগ উঠেছে। ২ নম্বরী মাল সরবরাহ করা হয়েছে এটা মিথ্যা নয়। তবে প্রধানমন্ত্রী তাগিদের পর তদন্ত কমিটি গঠণ হয়েছে। তাও আবার স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের কর্মকর্তা দিয়ে। যেখানে খুব বড় মাপের লোকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে সেখানে অতিরিক্ত সচিব আর উপসচিবের কতটুকু খাওয়া আছে আমরা জানিনা। ঔষধ প্রশাসনের কর্মকর্তা হুমকী দিয়ে বলেছেন এবিষয়ে বাড়াবাড়ি করলে আইসিটি আইনে মামলা করা হবে। জোর গলায় বলেছেন এই সব মালামালের মান নিয়ন্ত্রনের কমিটি আছে। প্রশ্ন হলো তারাতো মান যাচাইই করেন, হয়তো সনদ দিয়েছেন। যারা সনদ দিয়েছেন তারা জিনিষের মান বোঝেননা বা বুঝতে প্রয়োজন মনে করেননি। আর একটি প্রশ্ন তারা কিন্তু পর্দার মানও যাচাই করেছিলেন।
তারা নিশ্চয় স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের কেনাকাটার সকল জিনিষের মান যাচাই করেন। প্রশ্নটি মৌলিক। মাননীয় প্রধনমন্ত্রীর দিকে জাতি তাকিয়ে আছে। এটারতো ফয়সালা হওয়া দরকার। পুলিশের তদন্ত পুলিশ করলে যেমন হয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের উর্ধতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগের তদন্ত স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের উপসচিব করবেন এটা কিন্তু প্রশ্নবোধক। এটার জন্য এফবিআইকে ডেকে আনা দরকার। স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের দূনীতির শিকড় ধরে টান দেওয়া দরকার , একে উপড়ে ফেলা দরকার। আজকে ভিয়েতনাম . কিউবা স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ করে জাতির স্বাস্থ্য গঠন করেছে। তারা চিকিৎসক রপ্তানী করতে পারে। আমাদের দেশে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ খুব কম হয়েছে এদাবী আমাদের নয় । দেশের মানুষের দাবী যা বরাদ্দ করা হয়েছে তার কোথায় কিভাবে ব্যবহার করা হয়েছে ,তার হিসাব বের করার সময় এসেছে। দেশী দুদক না পারলে বিদেশী দুদক ভাড়া করে আনা হোক। যে কথা বলছিলাম , জেলা মন্ত্রী।
এখন দুর্যোগ চলছে। জাতির স্বার্থে যেকোন পদক্ষেপ গ্রহনযোগ্য। তবে তা যেন আবার বোঝার উপরে শাকের আটি না হয়। আমাদের ডিসি, এসপি সাহেবরা, ইউ এন ও , ম্যাজিষ্ট্র্রট, মিডিয়াকর্মী , জনপ্রতিনিধি স্বেচ্ছাসেবক সবাই কাজ করছেন। র্যাব সেনাবাহিনী পুলিশতো জীবন উৎসর্গ করেছে। আর সবচেয়ে ঝুঁকিতে আছে ডাক্তার এবং স্বাস্থ্য কর্মীরা। যে ভাবেই হোক ওদের ভালো রাখতেই হবে। উন্নত দেশেও পিপিইর সমস্যা রয়েছে আমাদের দেশেও থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিকল্প খুজে বের করতে বাঙ্গালী জাতি অপারগ একথা বলার সময় এখনো আসেনি। অন্যান্য ব্যবস্থা নিতে কার্পণ্য করা যাবেনা। তবে প্রতিটি জেলায় একজন করে সচিব আসবেন। তিনি সার্কিট হাউসে অবস্থান করবেন। তার নিরাপত্তা , প্রটোকল ইত্যাদি বিষয়ে ডিসি সাহেবদের তটস্থ থাকতে হবে। প্রচুর সময় দিতে হবে। তিনি স্বাধীনভাবে যে কাজগুলো করতে পারতেন সে কাজগুলো বাধাপ্রাপ্ত হবে। সব কাজেই তার সাথে পরামর্শ করতে হবে। আর সচিব যেভাবে চাইবেন সেভাবে কাজ করতে ডিসি সাহেব বাধ্য। জেলার খোজ খবর নিয়ে সচিব সাহেবদেরতো জেলায় ভ্রমনে আসার দরকার নাই।
আমরা দেশকে ডিজিটাল করেছি। কর্মকর্তাদের লক্ষ টাকার মোবাইল দিয়েছি। ইন্টারনেট দিয়েছি , ট্যাব দিয়েছি, ল্যাপটপ দিয়েছি এসব তো সি.এ ,পি.এ দিয়ে ব্যবহার করেন এখন নিজে ব্যবহার করতে শিখুন। জেলায় এসে কাজের ব্যাঘাত করার কোন প্রয়োজন আছে বলে আমরা মনে করিনা। ঢাকায় বসে ফেসবুকের মন্তব্য দেখেন, অনলাইন পত্রিকা পড়েন , সাংবাদিকদের গুরুত্ব দেন , সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে এমন সংবাদ পেলে তড়িৎ ব্যবস্থা নিন, জজ মিয়া তৈরি করবেননা। ডিসি এসপি সাহেবদের সাহস ও পরামর্শ দেন , যে ডিসি এসপি ভালো কাজ করবে তার বিষয়ে ফলাও করে প্রচার করুন। মডেল হলে অন্যেরাও যাতে সেই কাজ করতে পারে তার ব্যবস্থা করুন , ডাক্তার , স্বাস্থ্যকর্মীরা কি অবস্থায় আছেন এ সবের খোজ নেওয়ার জন্য প্রমোদ ভ্রমনে আসার প্রয়োজন নাই। যে সব হাসপাতালে সব প্রস্তুত বলে স্বাস্থ্য বিভাগে দাবী করছে সে হাসপাতালগুলো সরজমিনে দেখুন। ডাক্তার আর স্বাস্থ্য কর্মীদের খোজ খবর নিন। তাদের সমস্যার সমাধাণের চেষ্টা করুন। সময় নষ্ট না করে করোনা মোকাবেলায় আপনার বিভাগের ইনোভেশন জাতিকে উপহার দেওয়ার চেষ্টা করুন। একই সঙ্গে পরিকল্পনা প্রস্তুত করুন, করোনা থেমে গেলে আপনার বিভাগে কত তাড়াতাড়ি কিভাবে পুনর্গঠনে কাজ করবে।
পাকিস্তান আমলে একটা টার্ম খুব প্রচলিত ছিল। পাকিস্তান আমলে মন্ত্রীদের পাকি ভাষায় উজিরে আলা , উজিরে আজম ইত্যাদি বলা হতো। তাদের দপ্তর ছিল, কাজও ছিল। আমাদের তৎকালীন পুর্ব পাকিস্তানে কিছু মন্ত্রী ছিলেন। তারা শুধু মন্ত্রীই ছিলেন তাদের কোন কাজও ছিলনা , তাদের কথা কেউ শুনতোনা আবার পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারে তাদের কোন কথাও কেউ শুনতোনা। তাদের করার কিছুই ছিলনা। পুর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিবিদরা তাদের উপাধি দিল ‘উজিরে খামাখা’। আমাদের এম পি , জেলা পরিষদ চেয়ার ম্যান , উপজেলা চেয়ারম্যান , মেয়র , ইউপি চেয়ারম্যান , কাউন্সিলার মেম্বার মিলিয়ে ৬০ হাজারেরও বেশি জনপ্রতিনিধি থাকতে আমলাদের কেন সমম্বয় করার দায়িত্বে আনতে হলো এটা কিন্তু ভাববার বিষয়। তাহলে এই সব ‘গুরুত্বপূর্ণ’ জনপ্রতিনিধিরা যারা কিনা স্কুল কলেজের ম্যানেজিং কমিটিতে থাকেন , কিন্তু সেখানে লেখাপড়া হয়না। হবে কি করে , শিক্ষকরা রাজনীতি আর মোসাহেবী করে।
নিয়োগ থাকলে তো কথাই নেই, বিষয়টা লাভজনক। সে জন্য আগ্রহ। আবার যে কোন উন্নয়ন প্রকল্পে তাদের পছন্দ অপছন্দকে গুরুত্ব দিতে হয়। এখানে রাজনীতি করার সুবিধা হয়। ঠিকাদারদের নিয়ন্ত্রন করা যায়। না হলে ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে এক্সরে মেসিন নাই দীর্ঘদিন , আলট্রাসনোগ্রাম মেসিন স্মরনাতীতকাল থেকে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। লিপিড প্রোফাইলের মতো ছোট পরীক্ষাটাও হয়না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যদি নির্দেশনা দিতেন যে জনপ্রতিনিধিরা আগে স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা নিবেন। সেখানে যে চিকিৎসা নাই সেটার জন্য বাইরে হাসপাতালে যেতে পারবেন। আর বিদেশ যেতে গেলে বিশেষ অনমুতি নিয়ে যেতে হবে। তাহলে স্থানীয় হাসপাতালগুলোর মানের উন্নয়ন ঘটতো। তাহলে কি ধরে নেওয়া যায় জাতির এই গুরুত্বপুর্ণ সময়ে আমলারা সমন্বয় করবেন আর জনপ্রতিনিধিরা ‘উজিরে খামাখা’ হয়ে থাকবেন ?