admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ১১:৫৭ পূর্বাহ্ণ
আওয়ামী লীগের ঘাটে ঘাটে দীর্ঘদিন থেকেই রয়েছে মনোনয়ন, নিয়োগ বাণিজ্য, বিভিন্ন কমিটির পদ বিক্রি, চাঁদাবাজি, দখলসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ। ছাত্রলীগ, যুবলীগ নেতাদের বিরুদ্ধেও রয়েছে ব্যাপক অনিয়মের পাশাপাশি কমিটি ও পদ বিক্রির কুৎসিত কাহিনী। সহযোগী সংগঠন যুবলীগ, কৃষক লীগ ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগে টাকার বিনিময়ে পদ বিক্রি অনেকটাই এখন ওপেন সিক্রেট। যুবলীগের প্রেসিডিয়ামের পদ পেতে হলে নেতাদের গুনতে হয়েছে ৫০ লাখ থেকে দেড় কোটি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদ পেতে ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকা, সম্পাদকীয় পদে ২০ থেকে ৩০ লাখ। আবার মোবাইলে এসএমএসে বানানো হয় যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা। এ জন্যও পিয়ন থেকে দফতর সম্পাদক কাজী আনিসকে দিতে হয় মোটা অংকের টাকা। পদ-পদবি বিক্রিতে পিছিয়ে নেই ছাত্রলীগ, কৃষক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগও। চাঁদাবাজির দায়ে অপসারিত ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী ৪০ লাখ টাকায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ সম্পাদকের পদ বিক্রি করেছেন বলে অডিও রেকর্ড ফাঁস হয়েছে। রাজধানীর অদূরে রূপগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ বিক্রি হয়েছে ৮০ লাখ টাকায়। পদ-পদবি বিক্রিতে পিছিয়ে নেই জেলা নেতারাও। সূত্রমতে, গত ১০ বছরে এমপি-মন্ত্রী, কেন্দ্রীয় নেতা, সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের হাত ধরে লক্ষাধিক জামায়াত-বিএনপি নেতা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের পদ-পদবি পেয়েছেন। এর বিনিময়ে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকে গুনতে হয়েছে মোটা অঙ্কের টাকা। আবার কেউ কেউ এমপি-মন্ত্রীদের ‘শেল্টার’ হিসেবে কাজ করেছেন স্থানীয় পর্যায়ে। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন উপ-কমিটির সহ-সম্পাদকের নাম লেখাতে বড় অংকের টাকার লেনদেন হয়েছে। সেসময় তৎকালীন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, ‘যার গায়ে ধাক্কা লাগে, সেই-ই সহ-সম্পাদক’। এসব সহ-সম্পাদকের কেউ কেউ রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় কেন্দ্রীয় নেতার পরিচয়ে টেন্ডার, নিয়োগ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সূত্রমতে, অর্থের বিনিময়ে পদ বিক্রি এবং অনুপ্রবেশকারীদের কারণেই চরম বিতর্কের মুখে পড়েছে শক্তিশালী অঙ্গসংগঠন ‘আওয়ামী যুবলীগ’। মোটা অংকের টাকা ও তদবিরের মাধ্যমে যুবলীগের বিভিন্ন পদ বাগিয়ে নিয়েছিল বিএনপি-জামায়াতের সুবিধাবাদী নেতারা। যুবলীগে এদের অনুপ্রবেশের কারণেই চরম বিতর্কের মুখে পড়েছে আওয়ামী লীগের এই সহযোগী সংগঠনটি। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটি, নগর কমিটি, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কমিটির বিভিন্ন পদ অনেক সময় বিক্রির অভিযোগ ওঠে।
চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির অভিযোগে যুবলীগের র্যাবের হাতে আটক এস এম গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীম যুবলীগের কেন্দ্রীয় সমবায়বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। কয়েক কোটি টাকার বিনিময়ে তিনি ২০১৫ সালে এই পদ পান। শামীম এক সময়ে যুবদলের সহ-সম্পাদক ছিলেন। বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাসের ঘনিষ্ঠ ক্যাডার। যুবলীগে যোগদানের পর থেকেই গণপূর্ত ভবনের বেশির ভাগ ঠিকাদারি কাজই জি কে শামীম নিয়ন্ত্রণ করেন। বিএনপি-জামায়াত শাসনামলেও গণপূর্তে শামীম ছিলেন ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তি। যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সমবায়বিষয়ক সম্পাদক এস এম মেজবাহ হোসেন বুরুজ ২০১৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর মারা যাওয়ার পর শূন্য পদটি দেওয়া হয়েছে জি কে শামীমকে। অবৈধভাবে ক্যানিসো চালু, চাঁদাবাজি ও অবৈধ অস্ত্র রাখার দায়ে গ্রেফতার হওয়া ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া এক সময় ফ্রিডম পার্টির নেতা ছিলেন। কোনো দিন আওয়ামী লীগ না করা ড. আহমেদ আল কবীর রূপালি ব্যাংকের চেয়ারম্যান হন ২০০৯ সালে দল ক্ষমতায় এলে। তারপর যুবলীগের প্রেসিডিয়াম পদ কিনে নেন চড়া দামে। এমন ঘটনা অনেক।
যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যুবলীগের সদস্য পদ পেতেই ন্যূনতম ২০ লাখ টাকা ব্যয় করতে হয়। কমিটি গঠনের দায়িত্বে থাকা অনেক নেতাকেই মোটা অংকের টাকা দিতে হয়। যুবলীগের মাঠ পর্যায়ের কমিটিতে টাকা ছাড়া স্থান পাওয়া বিরল ঘটনা। লাখ লাখ টাকা দিয়েই যুবলীগে অনুপ্রবেশ ঘটেছে বিএনপি-জামায়াত ক্যাডারদের। গত সাত বছরে যুবলীগের কমিটিতে সদস্য সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে গেছে। অনেকেই মোবাইল ফোনের এসএমএসে নেতা হয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, যুবলীগের প্রেসিডিয়ামের পদ বিক্রি হয়েছে ৫০ লাখ থেকে শুরু করে দেড় কোটি টাকায়। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদ বিক্রি হয়েছে ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকায়। সম্পাদকীয় পদ বিক্রি হয়েছে ২০-৩০ লাখ টাকায়। যুবলীগের একাধিক সূত্র জানায়, তিন থেকে চারজন প্রেসিডিয়াম সদস্য রয়েছেন যারা কখনই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তারা দুটি ব্যাংকের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। মোটা অর্থের বিনিময়ে তারা পদ বাগিয়ে নিয়েছেন। একই অবস্থা অন্য পদগুলোতেও। চাঁপাইনবাবগঞ্জে জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত শিমুলও এখন যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা। এ সবকিছুই হয়েছে নগদ টাকার বিনিময়ে। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও পাঠাগার সম্পাদক করা হয়েছেন মিজানুল ইসলাম মিজু। মিজু ছাত্রজীবনে ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ ছাত্রলীগের ক্রীড়া সম্পাদক ছিলেন। পরে এরশাদের ছাত্রসমাজে যোগ দেন। এরপর যুবলীগেরই একনেতার সুপারিশে কেন্দ্রে সদস্য, পরে সম্পাদকীয় পোস্ট পান। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদকের পদটি খালি ছিল। সেখানে শফিকুল ইসলামকে মৌখিকভাবে পদায়ন করা হয়। ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্র শফিক এক সময়ে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তথ্য ও যোগাযোগ বিষয়ক সম্পাদক পদটিও খালি ছিল। সেখানেও ফারুক হোসেনকে মৌখিকভাবে দেওয়া হয়। ফারুক বিদেশ চলে গেলে নারায়ণগঞ্জের ইকবাল পারভেজকে দেওয়া হয়। ইকবাল গণপূর্তে চাকরি করতেন, সে সুবাধে পূর্বাচলে একাধিক প্লট ও নানা জায়গায় ফ্ল্যাট বাগিয়ে নেন। এরপর টাকার বিনিময়ে পেয়ে যান কেন্দ্রীয় যুবলীগের সম্পাদকীয় পোস্ট। একই অবস্থা ছাত্রলীগেও। শোভন-রাব্বানী দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই তারা কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের চেয়ে বেশি মনোযোগী ছিলেন উপজেলা কমিটি নিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, ৮০ লাখ টাকার বিনিময়ে রূপগঞ্জ উপজেলা ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪০ লাখ টাকার বিনিময়ে ছাত্রলীগের একটি পদ বিক্রি হয়েছে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ সম্পাদক রাকিবুল ইসলামের কাছ থেকে তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী টাকা নিয়েছিলেন বলে অডিও রেকর্ড ফাঁস হয়েছে। বর্তমান ওই সাধারণ সম্পাদক ক্যাম্পাসছাড়া। এ ছাড়াও টাঙ্গাইলের সখীপুরে ২৮ লাখ, খুলনার কয়রায় ২৩ লাখ টাকায় কমিটি দেওয়া হয়। নিয়ম না থাকলেও জেলাকে পাশ কাটিয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কেন্দ্রীয় কমিটি উপজেলা কমিটি গঠনে তৎপর ছিলেন। পরে চাঁদাবাজি ও মাদক সেবনের অভিযোগে ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে অপসারণ করা হয়। একই অবস্থা কৃষক লীগেও। কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সমানতালে কমিটির পদ বিক্রি করেন। টাকা হলেই মেলে সহ-সভাপতি ও সহ-সম্পাদক এবং সদস্যের পদ। কৃষক লীগকে ‘অ্যাডভোকেট’ লীগ বানাতে মরিয়া সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক রেজা। অন্যদিকে কৃষিবিদসহ ‘টাকার কুমির’দের কাছে পদ বিক্রি করেন সংগঠনের সভাপতি মোতাহার হোসেন মোল্লা। পিছিয়ে নেই স্বেচ্ছাসেবক লীগও। কেন্দ্রে নেতা বানানো কিংবা জেলা সম্মেলনের চেয়ে সংগঠনের সভাপতি অ্যাডভোকেট মোল্লা মো. আবু কাওছারের আগ্রহ বিদেশ কমিটি নিয়ে। মোল্লা কাওছার বছরের বেশির ভাগ সময় বিদেশেই থাকেন। সম্প্রতি ক্যাসিনো বাণিজ্যের চিত্র অভিযানে বের হয়ে এলে দেখা যায় তিনিও একটি ক্লাবের প্রেসিডেন্ট। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, কৃষক লীগ ছাড়া কমিটির পদ-পদবি বিক্রি ছাড়াও টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, দখল বাণিজ্যের অভিযোগ বিস্তর। পিছিয়ে নেই জেলা পর্যায়ের নেতারাও। দলের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের বাদ দিয়ে পরিবার লীগে রূপান্তর করেছেন। এমনকি দলের ভিতরে ব্যাপক আলোচনায় আছেন যুব মহিলা লীগের অনেক নেত্রী ও কর্মী। সেদিন রাজপথে থাকতে যাদের কিছু ছিল না, ১০ বছরের ক্ষমতায় তাদের অনেকের অর্থ-বিত্ত, সম্পদ, গাড়ি-বাড়ি হয়ে গেছে আলাদিনের চেরাগের মতো।