admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ২২ নভেম্বর, ২০২১ ৯:০১ পূর্বাহ্ণ
অস্ট্রেলিয়ার শরণার্থী দ্বীপ নাউরুতে প্রথম পা রেখেছিলেন যারা ? দু’হাজার এক সালে শত শত প্রধানত আফগান শরণার্থী নিয়ে অনেকগুলো নৌকা এসে ভিড়েছিল প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ নাউরুতে। এ ঘটনা থেকেই শুরু হয় প্যাসিফিক সলিউশন নামে অস্ট্রেলিয়ান নীতির। এর মূল কথা ছিল: সেদেশে আশ্রয়প্রার্থী অভিবাসীদের আবেদনের কোন নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাদের অস্ট্রেলিয়ার মূলভূমির বাইরে কোন দ্বীপে আশ্রয়কেন্দ্রে রেখে দেয়া । উদ্দেশ্য ছিল যাতে অস্ট্রেলিয়ায় যাবার চেষ্টা থেকে অভিবাসীরা নিরুৎসাহিত হয়।। এ নিয়েই জোসেফিন ক্যাসার্লির তৈরি ইতিহাসের সাক্ষীর এ পর্ব।
নাউরু দ্বীপে প্রথম শরণার্থী একশ আফগানঃ প্রশান্ত মহাসাগরীয় নাউরু দ্বীপে প্রথম এসে পৌছয় প্রায় একশ আফগান শরণার্থী। একটি নরওয়েজিয়ান জাহাজে করে আসা এই শরণার্থীরা প্রায় এক মাস সাগরে ভাসছিল। অস্ট্রেলিয়া তাদেরকে সে দেশে ঢুকতে দেয়নি। তাদের আবেদনের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নাউরু দ্বীপ তাদের আশ্রয় দিতে রাজি হয়। এই আশ্রয়প্রার্থীরা নাউরু দ্বীপে প্রথম পা রাখে ২০০১ সালের ১৮ই সেপ্টেম্বর। তাদেরকে স্থানীয় লোকেরা স্বাগত জানায়। তাদের স্বাগত জানিয়ে ঐতিহ্যবাহী নাচও পরিবেশন করা হয়। কাউকে কাউকে দেয়া হয় ফুল। আফগানিস্তান ও ইরাক থেকে আসা এই অভিবাসীরা যখন অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীর জাহাজ থেকে নামছে – তখন তাদের বেশ বিভ্রান্ত দেখাচ্ছিল।
এই লোকেরা ইন্দোনেশিয়া থেকে অস্ট্রেলিয়ায় আসার চেষ্টা করেছিল একটি মাছধরার নৌকায় চড়ে। একটি নরওয়েজিয়ান জাহাজ বিপদাপন্ন অবস্থায় তাদের সাগর থেকে উদ্ধার করে। অস্ট্রেলিয়ার মূলভূমি থেকে ৩০০০ মাইল দূরে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র নাউরু কিন্তু অস্ট্রেলিয়ান কর্তৃপক্ষ তাদের সেদেশের মাটিতে নামতে দেয়নি। শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া নাউরু দ্বীপকে তিন কোটি ডলার দিয়ে তাদের সেখানে রাখার ব্যবস্থা করে। পরবর্তীকালে এরই নাম হয়ে দাঁড়ায় ‘প্যাসিফিক সলিউশন।’
ইয়াহিয়ার কাহিনিঃ নাউরু দ্বীপে যে অভিবাসীরা প্রথম পা রেখেছিলেন তাদের একজনের নাম ইয়াহিয়া। অবশ্য এটা তার আসল নাম নয়। তিনি বলছিলেন, অস্ট্রেলিয়ান নৌবাহিনীর জাহাজে আমাদের কয়েকটা দলে ভাগ করা হয়েছিল। আমি ছিলাম দ্বিতীয় বা তৃতীয় দলে। তখন আমাদের আশা ছিল যে আমাদের সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। আমরা মনে করেছিলাম এই দ্বীপে আমাদের কয়েক মাস থাকতে হবে। তারা বলেছিল, এতে বেশি সময় লাগবে না। তারা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শরণার্থীদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করবে।
শরণার্থীদের তোলা হয় একটি পুরনো স্কুল বাসে। তারপর তাদের নিয়ে যাওয়া হয় একটি শিবিরে। সেখানে ছিল সবুজ রঙের তাঁবু – যেগুলো সেনাবাহিনী ব্যবহার করে। তাঁবুগুলোর চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া। ওই বন্দীশিবিরে আমরা ৩শ জনেরও বেশি ছিলাম। পরে ২৬০ জন লোক নিয়ে আরেকটি জাহাজ এলো । তার পর আরেকটি জাহাজে করে আরো শ’দুয়েক বা তারও বেশি লোককে আনা হলো। ক দীর্ঘ এবং বিপদসংকুল পথে ইয়াহিয়া এবং তার সঙ্গী আরো অনেকে আফগানিস্তান থেকে পালিয়েছিলেন।

নাউরু দ্বীপ হচ্ছে পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম প্রজাতন্ত্র।
ইয়াহিয়া ছিলেন একজন সমাজতন্ত্রী রাজনৈতিক কর্মী। তিনি বুঝেছিলেন, তারও বিপদ হতে যাচ্ছে। তালেবান ওই জেলাটি দখল করে নিয়েছিল। বহু লোকের ওপর অত্যাচার করা হয়। বিশেষ করে যারা রাজনীতি করতো – তাদের জীবন ছিল বিপন্ন। কাজেই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, দেশ ছাড়বো। ঠিক করলাম – আমার গন্তব্য হবে অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু তার ঠাঁই হলো অস্ট্রেলিয়া থেকে তিন হাজার মাইল দূরে – নাউরু দ্বীপে। সে সময় অস্ট্রেলিয়ায় ফেডারেল নির্বাচন আসছে, আর তাতে অভিবাসন একটা বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে।
প্রধানমন্ত্রী জন হাওয়ার্ড তখন পুনঃনির্বাচনের জন্য লড়ছেন। জন হাওয়ার্ড বলেছিলেন, আমাদের গর্ব করার মত রেকর্ড আছে যে আমরা ১৪০টি জাতিসত্তার লোককে এদেশে থাকতে দিয়েছি। কিন্তু কারা এদেশে আসতে পারবে, কিভাবে আসতে পারবে, তা ঠিক করবো আমরা। প্যাসিফিক সলিউশনের বিষয়টি আইনে পরিণত হলো ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিকে। এতে বলা হয় – কোন আশ্রয়প্রার্থীকে অস্ট্রেলিয়ায় ঢোকার চেষ্টার সময় পাওয়া গেলে – তার অ্যাসাইলামের আবেদনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত – তাকে অন্য একটি দেশে রাখা হবে। অস্ট্রেলিয়ায় কেউ অবৈধ পথে আসতে চাইলে তাকে নিরুৎসাহিত করতেই এ আইন করা হয়েছিল। নাউরু দ্বীপে থাকা আশ্রয়প্রার্থীরা তাই অপেক্ষায় থাকতে বাধ্য হলো। প্রথম দুই মাস আসলে আমাদের করার কিছু ছিল না। আমরা কিছু শরীরচর্চা করতাম। ঘুরে বেড়াতাম । ইংরেজি ভাষা শিক্ষার কিছু ক্লাস হতো। একজন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে আমিও অন্যদের ইংরেজি শেখাতাম।
ইয়াহিয়ার আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলোঃ জাতিসংঘের শরণার্থী কমিশন তাদের প্রত্যোকের সাক্ষাৎকার নিলো। ইয়াহিয়া আশা করছিলেন যে তাদের অধিকাংশকেই শরণার্থীর মর্যাদা দেয়া হবে। কিন্তু এক মাস পর যে সিদ্ধান্ত এলো তাতে দেখা গেল মাত্র কয়েকজনকে শরণার্থীর মর্যাদা দেয়া হয়েছে, এবং ইয়াহিয়া তাদের একজন ছিলেন না। তখন তারা বললো, আরেকটি ইন্টারভিউ নেয়া হবে। ইয়াহিয়াকে আবার অপেক্ষায় থাকতে হলো। আমি কিছু পড়াশোনার চেষ্টা করতাম নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্য, এবং আমার মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য। আমি পড়তাম রাজনীতি, দর্শন এবং ইতিহাস। মার্কসের দর্শন পড়ার চেষ্টা করছিলাম, তবে সেটা বোঝা খুব কঠিন ছিল। প্রতিটি পাতা পড়তে আমার দু ঘণ্টা লাগতো। কারণ তখন আমি খুব বেশি ইংরেজি জানতাম না।
বাসিন্দাদের মধ্যে মানসিক সমস্যাঃ বাইরের জগতের সাথে এই আশ্রয়প্রার্থীদের যোগাযোগ ছিল অতি সামান্য। তারা আত্মীয় স্বজনকে ফোন করতে পারতো না, কোন আইনি সহায়তাও পেতো না। এই বিচ্ছিন্নতার মধ্যে তৈরি হতে লাগলো চাপা উত্তেজনা। প্রথম দিকে সবকিছু ভালোই ছিল। সবাই মিলেমিশে থাকতো। একে অন্যকে সহায়তা করতো। কিন্তু ধীরে ধীরে যত সময় যেতে লাগলো – লোকদের মধ্যে মানসিক সমস্যা দেখা দিতে লাগলো। বন্দী অবস্থায় তারা তাদের সহিষ্ণুতা হারিয়ে ফেলতে লাগলো। তাদের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ হতে লাগলো। আমি লক্ষ্য করছিলাম যে তাদের মানসিক সমস্যা আর বিষণ্ণতার কারণেই এগুলো হচ্ছে। কয়েক মাস অপেক্ষার পর জাতিসংঘের সাথে তাদের দ্বিতীয় সাক্ষাতকার হলো। তার ফল পেতে আবার কয়েক মাসের অপেক্ষা। শেষে তাদের জানানো হলো, তাদের মধ্যে খুব অল্প কয়েকজনকে শরণার্থীর মর্যাদা দেয়া হবে। এবারও ইয়াহিয়াসহ শত শত আশ্রয়প্রার্থী প্রত্যাখ্যাত হলেন।
আমি খুবই হতাশ হয়ে পড়লাম। রাতে ঘুমাতে পারতাম না। শুয়ে শুয়ে ভাবতাম, আমাদের ভাগ্যে কী ঘটতে যাচ্ছে। আমি ছিলাম সম্পূর্ণ অসহায়, কিছু করার ক্ষমতা ছিল না। আমাদের জীবন এখন অন্যদের হাতে। আমার মনে হতো আমি যেন একটা ফুটবল, যে কেউ আমাকে লাথি মেরে এখান থেকে ওখানে ঠেলে দিচ্ছে। আমার কিছুই করার নেই। সবচেয়ে কঠিন সময় ছিল যখন আমাকে বলা হলো যে আমাকে অন্য কোন দেশেই পুনর্বাসন করা হবে না। সবাইকে জানিয়ে দেয়া হলো যে আর কাউকেই শরণার্থীর মর্যাদা দেয়া হবে না। তাদের দুটি বিকল্প দেয়া হলো।
একটি হচ্ছে, আমাদের আফগানিস্তানে ফিরে যেতে হবে। অন্যথায় আমাদের এই বন্দীশিবিরেই থাকতে হবে, এখানেই বাকি জীবন কাটাতে হবে। কিন্তু একজন আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী একটি তৃতীয় বিকল্পের জন্য চেষ্টা করছিলেন। তার জন্য ওই শিবিরের লোকদের সাথে কথা বলার সুযোগ পাওয়া সত্যি কঠিন ছিল। কিন্তু মানবাধিকার আইনজীবী ম্যারিয়ান লেই অস্ট্রেলিয়ান কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে সেই সুযোগ পেলেন। প্রথম দিকে তিনি সেখানে তিন দিন ছিলেন। ক্যাম্পের অনেকের সাথে কথা বললেন তিনি। দেখতে পেলেন – তাদের অনেকেই জাতিসয়ঘের কনভেনশন অনুযায়ী শরণার্থী হতে পারেন।
ফিরে এসে তিনি অস্ট্রেলিয়ান সরকারের সাথে আলোচনা করলেন – তাদের অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে আসার ব্যবস্থা করলেন।
শেষ পর্যন্ত ৫০০-রও বেশি মানুষ অস্ট্রেলিয়ায় পুনর্বাসিত হলেন। আরো অনেককে নিউজিল্যান্ড , ক্যানাডা আর ইউরোপে আশ্রয়ের সুযোগ করে দেয়া হলো। আফগানিস্তানে ফিরে যেতে হলো ইয়াহিয়াকে কিন্তু এ সুযোগ যখন আসে তখন ইয়াহিয়ার জন্য অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। তার কয়েক মাস আগেই তিনি আফগানিস্তানে ফিরে গিয়েছেন। তার মনে হয়েছিল – তার সামনে আর কোন পথ ছিল না। ততদিনে তার ওই শিবিরে প্রায় দু’বছর থাকা হয়ে গেছে।

নাউরু দ্বীপের শিবিরে আটক থাকা কয়েকজন শরণার্থী ।
তারা আমার কাছে আফগানিস্তানের একটি সুন্দর ছবি তুলে ধরলো। বলা হলো, আফগানিস্তান এখন নিরাপদ। কিন্তু কাবুল এয়ারপোর্টের বাইরে এসে আমি দেখলাম সবখানেই শুধু ভাঙাচোরা বাড়িঘর আর ধ্বংসের চিহ্ন। তারা যদি আমাকে আফগানিস্তানের সত্যিকারের চিত্র তুলে ধরতো- আমি কখনো ফিরে আসতাম না। আমি ওই বন্দীশিবিরেই থেকে যেতাম।
নাউরুর ওই বন্দীশিবিরটি বন্ধ করে দেয়া হয় ২০০৭ সালে । কিন্তু পাঁচ বছর পর তা আবার খোলা হয়। ওই ক্যাম্পে হাজার হাজার শরণার্থী থেকেছে এবং সেখান থেকে পাওয়া গেছে অত্যাচার, নিপীড়ন এবং নিজের দেহে নির্যাতনের খবর। সাম্প্রতিক বছর গুলোতে নাউরুর শিবিরগুলোতে অভিবাসীর সংখ্যা অনেক কমে গেছে কিন্তু এখনো সেখানে কয়েকশ লোক অবস্থান করছে।
ইয়াহিয়া এখন অস্ট্রেলিয়ায়ঃ ইয়াহিয়ার আর আফগানিস্তানে থাকার ইচ্ছা ছিল না। সেখানে পরিস্থিতি ছিল খুবই বিপজ্জনক। কয়েক মাস পরেই তিনি আবার দেশ ছাড়লেন। এখন তাকে শরণার্থীর মর্যাদা দেয়া হয়েছে এবং তিনি এখন অস্ট্রেলিয়ায় বাস করছেন। তিনি একটি এনজিও চালাচ্ছেন যার কাজ আফগানিস্তানের মানুষকে সহায়তা দেয়া।”যারা নিরাপত্তার জন্য অন্য দেশে আশ্রয় নিতে গেছে – তাদেরকে এই ধরনের বন্দীশিবিরে রাখা এক ধরণের শাস্তি। এসব শিবিরে লোকদের স্থানীয় মানুষদের সাথে মিশতে দেয়া হয় না, আইনি সহায়তাও দেয়া হয় না। কেউ যদি অন্য দেশে গিয়ে আশ্রয় এবং সুরক্ষা চায় সেটা কোন অপরাধ নয়। এটা তার একটা অধিকার বলেন ইয়াহিয়া।