admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ১৮ মে, ২০২০ ১:৩৮ অপরাহ্ণ
রাজধানীসহ সারাদেশের বেসরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স সংকট দেখা দিয়েছে। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেয়ার জন্য সরকার জরুরিভিত্তিতে পাঁচ হাজার ৫৪ জন নার্সকে সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। তারা দলবেঁধে বেসরকারি হাসপাতাল থেকে চলে যাওয়ায় এখন রোগীদের সেবা নিয়ে সমস্যা হচ্ছে। ফলে বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে নার্স সংকটে চিকিৎসা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হাজার হাজার রোগীর চিকিৎসার জন্য চিকিৎসক ও নার্স সংকট দেখা দেয়ায় সম্প্রতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জরুরিভিত্তিতে পাঁচ হাজার সিনিয়র স্টাফ নার্স নিয়োগ দিয়েছে। নিয়োগ দেয়া নার্সরা পূর্বে রাজধানীর নামিদামি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের ক্লিনিকে চাকরি করতেন। এখন থেকে তারা রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগ ও জেলা-উপজেলা পর্যায়ে করোনভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত হাসপাতালগুলোতে সেবা দেবেন।
এদিকে বেসরকারি চিকিৎসাসেবাকেন্দ্র আদ-দ্বীন হাসপাতাল, জাতীয় কিডনি ফাউন্ডেশন, জাতীয় হার্ট ফাউন্ডেশন, বারডেম, ইবনেসিনা, পপুলারসহ বিভিন্ন হাসপাতাল-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দ্বিতীয় শ্রেণির পদমর্যাদা পাওয়ায় নার্সরা সরকারি চাকরিতে যোগদান করেছেন। এমনকি বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও কয়েকজন নার্স চাকরিতে যোগদান করেছেন। কারণ, তারা নিজের পছন্দমত সরকারি হাসপাতালে কাজ করবেন। সেখানে তাদের বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে- এমন চিন্তা থেকে সরকারি চাকরিতে যোগদান করছেন।
তবে বিষয়টি সম্পর্কে বেসরকারি হাসপাতাল ক্লিনিক-সংশ্লিষ্টরা যায়যায়দিনকে বলেন, সরকারি চাকরিতে যোগ দেয়া নার্সরা দীর্ঘদিন ধরে প্রাইভেট হাসপাতালে রোগীদের সেবা দিয়ে প্রশিক্ষণ অর্জন করেছেন। এতে সরকারি হাসপাতালে করোনা রোগীদের সেবার মান ভালো হবে। কিন্তু যেসব প্রাইভেট হাসপাতাল থেকে নার্সরা চাকরি ছেড়ে সরকারি চাকরিতে চলে গেছেন, তারা এখন বিপাকে পড়েছেন। সেই সঙ্গে একাধিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও অভিজ্ঞ নার্স চলে যাওয়ায় সেখানে শিশুসহ বিভিন্ন বয়সের রোগীদের সেবা দেয়া নিয়ে বেসরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ হঠাৎ করে সমস্যায় পড়েছেন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্যবিদরা যায়যায়দিনকে বলেন, দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রথম দুইজনের মৃতু্য হয়েছিল দুটি বেসরকারি হাসপাতালে। সে সময় সংক্রমণ আতঙ্কে রাজধানীর শ্যামলী এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকেই ১১ জন চিকিৎসক এবং ৬০ জন নার্স কাজে ইস্তফা দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে আরও বেশ কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকের চিকিৎসক নার্সরা চাকরি ছেড়ে দেয়ায় অনেক বেসরকারি হাসপাতাল ক্লিনিকে জনবল সংকট তৈরি হয়। এর ওপর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় রোগী ব্যবস্থাপনার জন্য সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালকে যুক্ত করায় ইতোমধ্যে একাধিক বেসরকারি হাসপাতাল কোভিড-১৯ চিকিৎসা দিচ্ছে। কিন্তু করোনার মতো এই দুর্যোগের সময় যেসব বেসরকারি হাসপাতাল এগিয়ে এসেছে, সেখানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক, নার্স নিশ্চিত করতে না পারলে সংক্রমণ ঝুঁকি বাড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন তারা।
বিষয়টি সম্পর্কে রাজধানীর পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাধারণ ব্যবস্থাপক (হাসপাতাল সেবা) সুকুমার চন্দ্র সাহা যায়যায়দিনকে বলেন, পপুলার হাসপাতালে জুনিয়র ও ট্রেইনি নার্স থাকায় তেমন সমস্যা হচ্ছে না। কারণ, এই মূহূর্তে হাসপাতালে রোগীর চাপ কম রয়েছে। তবে মেডিকেল কলেজ ও বড় হাসপাতালে তেমন প্রভাব না পড়লেও জেলা-উপজেলা পর্যায়ের ছোটখাটো হাসপাতাল ক্লিনিকগুলোতে কিছুটা সমস্যা হতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
নাম না প্রকাশের শর্তে রাজধানীর নামি একটি হাসপাতালের ব্যবস্থাপক যায়যায়দিনকে বলেন, এখন পর্যন্ত ৬৯৯ জন চিকিৎসক, ৩৯৬ নার্স ৫৪৩ জন স্বাস্থ্যকর্মীর করোনভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এসব চিকিৎসক-নার্সের মধ্যে অনেকে বেসরকারি হাসপাতালেও কাজ করছেন। এর ওপর আবার অনেক নার্স ও চিকিৎসক সরকারি চাকরিতে যোগদান করায় বেসরকারি হাসপাতাল ক্লিনিকে জনবল সংকট হচ্ছে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক মনিরুজ্জামান ভূঁইয়া যায়যায়দিনকে বলেন, যেসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নার্সরা দীর্ঘদিন কর্মরত ছিলেন, সেখানে কিছুটা সেবা ঘাটতি হবে। কারণ, মানদন্ড অনুযায়ী ১০ শয্যার বিপরীতে ছয়জন হিসেবে নার্স দরকার হলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও দক্ষ নার্স পূরণ কঠিন হবে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতাল ক্লিনিক গুলোতে এই সংকট আরও বেশি হবে। তবে করোনার সংকট মূহূর্তে বেসরকারি হাসপাতালের পাঁচ হাজার নার্স সরকারি হাসপাতালে নিয়োগ পাবে। সার্বিক জনস্বাস্থ্য সেবার বিবেচনায় সব বেসরকারি হাসপাতালকে বিষয়টি মেনে নিয়েই কাজ করতে হবে।
প্রসঙ্গত, করোনাভাইরাস সংকট মোকাবিলায় গত ৩০ এপ্রিল দুই হাজার চিকিৎসক ও পাঁচ হাজার ৫৪ জন নার্স নিয়োগ দেয়ার সুপারিশ করে তালিকা প্রকাশ করে সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)। এ ছাড়া স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন সেবা পরিদপ্তরের আওতায় চার হাজার সিনিয়র স্টাফ নার্স ও ৬০০ মিডওয়াইফ নিয়োগের জন্য ২০১৭ সালে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে পিএসসি। সে সময় পরীক্ষায় অংশ নেন ১৬ হাজার ৯০০ জন। চূড়ান্ত ফলে ১০ হাজার প্রার্থী উত্তীর্ণ হন। ২০১৮ সালের ১৯ আগস্ট তাদের মধ্য থেকে চূড়ান্তভাবে পাঁচ হাজার ১০০ জনকে নিয়োগের জন্য বাছাই করে পিএসসি। যারা তখন নিয়োগ পাননি, তাদের মধ্যে থেকে এখন পাঁচ হাজার ৫৪ জনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করেছে পিএসসি। সাময়িকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত নার্সরা ১৩ মে নিজ নিজ কর্মস্থলে যোগদান করেছেন।