নাগরিক ভাবনাঃ অ্যাডভোকেট আবু মহী উদ্দীনঃ রিলিফের খাদ্য বিতরণের সমস্যা অবিভক্ত ভারতে এর পাকিস্তান আমলেও, তারপর দেশ স্বাধীন হলে তো আরো প্রকট আকার ধারণ করে। পাকিস্তান আমলে গরীব মানুষরা গরীবানা আল্লার তৈরি বলে মেনে নিত। স্বাধীনতার পরে একটু বুঝতে পারল এটা মানুষের তৈরি। সরকারি দল যে ভাবে পরিচালনা করবে সেভাবেই হবে। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে মানুষের খাদ্যাভাব হয়েছিল এর কারণও ছিল। আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ছিল। রিলিফ চোর ছিল । ফলে নাজুক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সরকার এবং ব্যক্তি পর্যায়েও লঙ্গরখানা খুলতে হয়েছিল। তবু মানুষকে বাঁচানো আপ্রান চেষ্টা ছিল। বঙ্গবন্ধুকে বাধ্য হয়ে বলতে হয়েছিল মানুষে পায় সোনার খনি আমি পেয়েছি চোরের খনি।
এরপর বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে স্বাধীনতা বিরোধী চক্র প্রতিশোধ নিয়েছিল। দেশটাকে পাকিস্তান বানানোর একটা চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জনকারী বাঙ্গালী জাতি সেটা হতে দেয়নি। বলা হয়েছিল দুধের নহর বয়ে যাবে কিন্তু যায়নি। জনগণের সম্পদের দুর্বৃত্তায়ন হয়েছে। দূর্নীতি বেড়েছে। বার বার দেশ পৃথিবীর মধ্যে দূর্ণীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এর পর রাজনীতিতে সেনাশাসকরা এসেছেন। গায়ের জোরে শাসন করেছেন। তারা আরো দূর্ণীতি করেছেন। তাদের দূর্নীতির বিষয়ে কোন কথা বলা যায়নি। এর কারণ মানুষ আবার পরিবর্তন চেয়েছে। গনতান্ত্রিক ব্যবস্থা যার জন্য প্রত্যাশা ছিল। এখন গণতন্ত্র আছে তবে বিরোধী দলের লোকেরা তো কখনো বিরোধী দলে থাকতে অভ্যস্থ ছিলনা ফলে তারা হতাশায় ভুগছে। চোর বাটপারের দল তাদের নেতারাও তাই।ফলে আজকে ক্ষমতা থেকে বাইরে থাকার কারণে দুধের সরের নাগাল পাচ্ছেনা জন্য দলের লোক কমে গেছে। ক্ষমতায় থাকতে নেতারা সুবিধা পেয়েছে এখন বড় নেতারা মোবাইলে আন্দোলন করে। নেতারা অহীর অপেক্ষা করেন, অহী নাজেল হলে কথা বলেন। কর্মীরা বোঝে। মাঝে মাঝে ক্ষীন কন্ঠে কেবল দলীয় চেয়ারম্যানদের মুক্তির দাবী করে। মানুষ খায়না। তারা জানে ওদের মুক্তির অর্থ হলো হ্ওায়া ভবনের বিকেন্দ্রীকরণ। যা হোক বিষয়টি নিয়ে রাজনীতিবীদরা আলোচনা করবেন।
আজকের আলোচনার বিষয় করোনা সমস্যায় খাদ্য ব্যবস্থাপনা। বর্তমান সময়ে জেলা প্রশাসন তালিকা করে ডিলার নিয়োগ করেছে । ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে নিশ্চয় সরকারি দলের অনুমোদন কিংবা পরামর্শ নিয়েছেন। যাদের নিয়োগ করা হয়েছে তারা সরকারি দলের নেতাদের অপরিচিত বা আনুগত্যের পরীক্ষায় উর্ত্তীর্ণ নয় একথা কোন ভাবে বলা যাবেনা। সুতরাং তারা যে ভাবেই হোক সরকারি দলের লোক। ইতোমধ্যে বস্তা বস্তা চুরি হওয়ার খবর চাউর হয়েছে। কোথাও তো দেখিনি আওয়ামী লীগ ২/১ টা কেস ধরে থানায় এনেছে, বা আইন প্রয়োগকারীর হাতে তুলে দিয়েছে, বা তাৎক্ষনিক ভাবে দল থেকে বহিস্কার করেছে। তারা অপেক্ষায় আছে কেস ধরা হবে , তদন্ত হবে। তদন্তে অধিকাংশ প্রমান হবে ওসব চাল চুরির নয়। রাখার জায়গা ছিলনা সেজন্য তার গোডাউনে বা বাড়িতে রেখেছিল। তার কোন খারাপ উদ্দ্যেশ্য ছিলনা। এতোগুলো চালতো আর রাস্তায় রাখা যায়না? বিএনপির ব্যর্থতার জন্য আওয়ামী লীগের এইসব পাতি নেতারা এই সময়ে খাদ্য চুরি করার সাহস দেখাতে পারছে। বিএনপি নেতারা হয়তো বাকবাকুম করছেন আওয়ামী লীগের এই চাল চুরির ফলে তাদের দুর্নাম হচেছ আর মানুষ দলে দলে বিএনপিকে ক্ষমতায় আনার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। সে গুড়ে বালি। দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আসতে হলে দেশের মানুষের রাজনীতি করতে হবে। ওহীর অপেক্ষায় থাকলে হবেনা। ওহী আর দেশের মানুষের চাহিদার সমন্বয় কখনো হবেনা।
তবে একটা বিষয় হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এত শক্তিশালী , সবাই সাংবাদিক। কোথায় এক কেজি চাউলের হেরফের হলেও মানুষ তা জানতে পারবে। মিডিয়াতো আছেই। এতো পরিমান চ্যানেল , বিএনপি ঘরানার চ্যানেলেওতো আছে। সুতরাং গোপন করা বেশ শক্ত। তবে চাল চুরি হবার পরে আমরা জানতে আগ্রহী না , কিংবা চালচুরির কি শাস্তি হলো সেটা জানতেও আমাদের কোন আগ্রহ নাই। কেননা চাল চুরির বিচার হতে না হতেই আরো একটা ইসু আমাদের সামনে চলে আসবে। আমরা সামারি ট্রায়াল চাই এবং তাৎক্ষনিক বিচার কার্যকরী চাই। আমরা চাই চাল চুরি হওয়ার কোন সুযোগই থাকবেনা।
খাদ্য বিতরণে একটা সমস্যা আছে। এটার সমাধান জরুরী। আমাদের দেশে অসৎ মিল মালিক , অর্থলোভী ব্যবসায়ী , মজুদদারের অভাব নাই। ওরা ওৎ পেতে থাকে। কোন ভাবে এটা অছিলা পেলেই হলো। তাদের মুল বিষয় মুনাফা। ত্রান বিতরণে চুরি করার একটা প্রবনতা আছে। ইতোমধ্যে ফেসবুকে যে ভাবে ছবি সহ খবরাদি প্রকাশ হচ্ছে করোনায় আক্রান্তের চেয়ে চোর ই বেশি। আরো অনেকে ধরা পড়েনি। সাবধান হওয়া জরুরী। ৭৪ সালের ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি। মাঠে ময়দানে সকল কাজে ডিসি , ম্যাজিষ্ট্রেটদের দেখা যায় ওদের তো দায়িত্ব পালনের অস্বীকার করার কেন সুযোগ নাই। আবার পুলিশ , আর্মি, র্যাব আনসার তারা ফ্রন্টিয়ার সৈনিক। তারা নিজেদের জীবন বাজী রেখে দায়িত্ব পালন করছে। দেশের মানুষ যাতে শান্তিতে থাকে সে জন্য ঝুঁকি নিয়ে তাদের দায়িত্ব পালন। এর মধ্যে ভুলভাল হতেই পারে। খবরের কাগজ কিংবা টকশোজীবিদের কথা শুনলে মনে হবে সকল দায়িত্ব সরকারের আর আমরা রাষ্ট্রীয় অতিথি। যেদিন থেকে ছুটি ঘোষনা করেছে সেদিন থেকে কত কত সংগঠন মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। কত পরিমান মানুষকে চাল , আলু , ডাল , তেল , সাবান ব্যগে করে প্রকাশ্যে , গোপনে দিয়েছে এবং দিচ্ছে। সরকার ১০ টাকা কেজি দরে ওএমএস এর চাল বিক্রি করছে। ভিজিএফ . ভিজিডি , বিধবা ভাতা , বয়স্ক ভাতা কত কিছু চালু আছে। এর পরেই এই কয়েকদিনেই হাহাকার। এই হাহাকার তৈরি করতে সহায়তা করছেন কিছু সাংবাদিক। সম্প্রতি ঠাকুরগাঁও জেলার আউলিয়াপুরে এ রকম এটা ঘটনা ঘটানো হয়েছে। বিষয়টির জরুরী তদন্ত করে ব্যবস্থা নিয়ে প্রকৃত ঘটনা জেলা বাসীকে জানানো দরকার। কেননা কোথাও ঠিকঠাক ত্রাণ বা খাদ্য বিতরণ হচ্ছে এটা কোন নিউজ না , নিউজ হলো কিছুই পাচ্ছেনা। কেউ কিছু দেয়নি। ছোট বেলা থেকে রিলিফ ওয়ার্কের সাথে জড়িত থাকার সুবাদে আমি একটা বিষয়ে সার্ভে করার অনুরোধ জানাব , নিরপেক্ষ কোন সার্ভেয়ার দিয়ে যদি সার্ভে করা হয় এবং বস্তি বা গরীব এলাকার মানূষজনকে জিজ্ঞাসা করা হয় আপনারা কোন ত্রান পেয়েছেন? জবাব আসবে এ পর্যন্ত কোন রকম ত্রান পাইনি। এটা আমাদের চারিত্রিক বৈশিষ্টের অন্যতম। এই কদিনে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন , ব্যক্তি সরকার যেভাবে এগিয়ে এসেছে তাবৎ দুনিয়ার আর কোথাও এভাবে মানবিকতা এগিয়ে এসেছে এটা আমার জানা নাই। সেই কারনে প্রস্তাব হলো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাড়ে বাহাত্তর হাজার কোটি টাকার একটি হিসাব অনেকে করেছেন।
সেই হিসাবটা একটু ভাল করে দেখে যে ভাবেই হোক এটা নিখুত তালিকা তৈরি প্রয়োজন। এর পর এই তালিকা মোতাবেক খাদ্য বিতরণ হবে। নির্ধারণ করা জরুরী কার কি জাতীয় সহায়তা লাগবে। সে মোতাবেক তালিকা করতে হবে। একই মানুষ যেন একাধিক সোর্স থেকে সহায়তা না পায় সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া দরকার। তাতে যা হবে সরকারের যে সব সহায়তা আছে সেগুলোকে সমন্বয় করতে পারলেই তেমন কোন সমস্যা থাকবেনা । আমরা মোকাবেলা করতে পারব। ১০ টাকা কেজির চাল বিতরন পদ্ধতিটি কঠোরতা অবলম্বন করতে হবে। সেটা হলো প্রাপকদের রেশন কার্ড থাকবে। জেলা পর্যায়ের একজন ট্যাগ অফিসারের তত্বাবধানে চাল তোলা হবে , স্পটে নিয়ে যাওয়া হবে কার্ড মোতাবেক বিতরণ করা হবে। চাল বিতরণের সময় সোসাল ডিসট্যারিন্সং এর জন্য গোল গোল চিহ্ন দিতে হবে। এখানে দরকার স্বোচ্ছাসেবক। তারা এটা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করবে। একজন প্রাপক এক প্যাকেট করে চাল পাবে। মাপজোকের ঝামেলা থাকবেনা। কষ্ট করে দীর্ঘক্ষণ রোদে দাঁড়াতে হবেনা। ২০ কেজি চাল পাবে , ১০ দিন পর আবার ২০ কেজি পাবে। সেই কার্ডধারী আবার কবে চাল পাবে ডিলার সেটা লিখে দিবে। তাহলে তাকে ঘুরতে হবেনা। ট্যাগ অফিসার বিক্রি ক্লোজ করে স্থান ত্যাগ করবে। না হলে মুখ চিনে দলীয় কর্মীদের বিক্রি করতে দিলে সমুহ বিপদ হবে। এ কাজে প্রতিটি ওয়ার্ডে সর্বদলীয় কমিটি থাকবে। কোন ভাবেই ১০ টাকার চাল যেন লিকেজ না হয়।
চালচুরির দায়ে ইতোমধ্যে যারা ধরা পড়েছে তাদের বেশী তদন্তের দরকার নাই। সামারী ট্রায়াল করে কমপক্ষে যত চাল চুরি করেছে তার দিগুন টাকা জরিমানা , ২ বছর সশ্রম কারাদন্ড। সরকারের কাছে যে খাদ্য আছে তার ব্যবস্থাপনা যদি ঠিক মতো করা যায় তাহলে কোন সমস্যা হবেনা। এই সময় মন্ত্রীদের বাণী দেওয়া একটু কমাতে পারাটাই ভাল। জেলা প্রশাসক সাহেব স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগের উন্মুক্ত ঘোষণা দিয়েছেন। কাজটি খুবই সাহসের এবং এতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবার একটা সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এতে দলীয় বদ কর্মীরা, মতলববাজরা একটু অসন্তুষ্ট হবে। তবে সতর্কভাবে তালিকাটা করতে পারলে খুবই ভাল এটা পদক্ষেপ হবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখলাম ছাত্র লীগ সবজী বিতরণ করছে। খুবই প্রসংশনীয় কাজ। এই কাজটা সারা দেশে ছাত্রলীগ করতে পারে। এমনটাও করা যায় সারা দেশে একেক সংগঠন একেক কাজ করবে। কেউ সাবান বিতরণ করবে , কেউ ব্লিচিং পাউডার ছিটাবে কেউ বাজারে দুরত্ব বজায় রাখবে। সবাই নিজেরা এটা করে গাউন বানিয়ে নিবে। তাদের নিরাপত্তার ট্রনিং হবে তারপর তারা কাজে নামবে। আবার অনলাইনে যারা বাজার সরবরাহ করছে তারা যদি মানসম্মত মালামাল বাজারের দামে সরবরাহ করে তাহলে বাজারে গিয়ে ভিড় করে গায়ে গায়ে লাগালাগি করে করোনাকে আহবান জানানোর কোন প্রয়োজন হবেনা। সবচে বড়ো বিষয়টি হলো ছবি তুলে প্রচার করার লোভটা একটু সংবরণ করা দরকার, প্রয়োজনে সরকারের তরফ থেকে সার্কুলার দিতে হবে কেউ কোন খাদ্য সহায়তা দিলে কোন ছবি পোষ্ট করা যাবেনা। মানূষগুলোকে সম্মান করার চেষ্টা নিন। আজ ওরা বিপদে পরেছে। লাইনে দাড়াতে পারেনা, কারো কাছে সাহায্য চাইতে পারেনা। এমনকি প্রথমে স্বীকারই করতে চায়না। ছবি দিয়ে ওদের বিব্রত করবেননা।