অ্যাডভোকেট এম এ মজিদ,ঢাকা || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ১৮ জুলাই, ২০২৬ ৫:৩৩ অপরাহ্ণ
কাঁদবো, নাকি হাসবো – কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন চোখের পানিও যেন পথ হারিয়ে ফেলে। কাঁদতে গেলেও কান্না আসে না, আবার হাসারও কোনো কারণ থাকে না। আজ আমার জীবনের এমনই এক বেদনাময় অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে রইলাম।
আমি এবং আমার সহধর্মিণী আজ ১৭ জুলাই ২০২৬ শুক্রবার এখনো ঢাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনালে বসে আছি। এই মুহূর্তে আমাদের কাতার এয়ারওয়েজের ৬৪৩ নম্বর ফ্লাইটে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসি’র উদ্দেশ্যে আকাশে থাকার কথা ছিল। কিন্তু নিয়তির এক নির্মম পরিহাসে আমরা এখনো সেই টার্মিনালের বেঞ্চে বসে আছি – ভোরের আলো ফোটার অপেক্ষায়, বুকভরা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে। রাত ঠিক ১২টায় আমরা কাতার এয়ারওয়েজের চেক-ইন কাউন্টারে রিপোর্ট করি। আমার পাসপোর্ট, ভিসা ও টিকিটে কোনো জটিলতা না থাকায় মুহূর্তেই বোর্ডিং পাস হাতে পাই। কিন্তু আমার সহধর্মিণীর ক্ষেত্রে শুরু হয় এক অপ্রত্যাশিত জটিলতা।
তার পূর্ববর্তী পাসপোর্টে নাম ছিল “কামরুন নাহার জেসমিন”। সেই নামেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নেওয়া হয়েছিল এবং ২০২৩ সালে আমরা দু’জনই সেই পাসপোর্ট ও ভিসা ব্যবহার করে নির্বিঘ্নে আমেরিকা সফর করেছি। পরে পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হলে নতুন পাসপোর্ট করা হয় এসএসসি’র সনদ এবং জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী। সেখানে নাম হয় “মোছা. কামরুন নাহার বেগম”। নামের এই সামান্য পরিবর্তনই আজ আমাদের সমস্ত পরিকল্পনাকে থামিয়ে দিল।
কাতার এয়ারওয়েজ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি যাচাইয়ের জন্য রাত সাড়ে ১২টার দিকে মার্কিন ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছে ই-মেইল পাঠায়। এখান থেকে আরও দু’বার রিমাইন্ডারও পাঠানো হয়। প্রতিবারই আমরা আশায় বুক বাঁধি – হয়তো এবার উত্তর আসবে, হয়তো এবার বোর্ডিং পাস হাতে পাব। কিন্তু সময় শুধু এগিয়ে গেছে, উত্তর আর আসেনি। রাত ৩টা ৫০ মিনিটে আমাদের জানানো হলো – মার্কন যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন হতে কোনো উত্তর না আসায় এই ফ্লাইটে আর যাওয়া সম্ভব নয়।
মাত্র একটি বাক্য! অথচ সেই একটি বাক্য মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে দিল কয়েক মাসের প্রস্তুতি, অগণিত স্বপ্ন এবং বহু প্রতীক্ষার আনন্দ।
রাত ১২টা থেকে ভোর ৩টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত কখনো দাঁড়িয়ে এবং কখনো কাউন্টারের সামনে পায়চারি করে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত ছিল অসহ্য মানসিক যন্ত্রণার। কাউন্টারের সামনে চেয়ার না থাকায় বসার কোনো উপায় ছিল না। আমার বয়স এখন ৭৪ বছর। ৩ মাস পূর্বে আইসিইউ থেকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জমে দূতে লড়াইয়ের মধ্যে সবার দোয়ায় এবং আল্লাহর অশেষ রহমতে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি। শারীরিকভাবে আগের মতো শক্তি নেই। এমন অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ ও টানটান মানসিক চাপ ও উত্তেজনা আমার মতো একজন বয়স্ক মানুষের জন্য কতটা কষ্টকর – তা ভাষায় প্রকাশ করা সত্যিই অসম্ভব।
এরই মধ্যে বারবার মনে পড়ছিল – এই সফরের জন্য কত যত্ন করে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম! প্রিয়জনদের জন্য দেশীয় নানা রকম খাবার, মিষ্টি, কাপড়চোপড়, বই, খেলনা, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র – কত কিছুই না সুকৌশলে গুছিয়ে নিয়েছিলাম! প্রতিটি ব্যাগে ছিল ভালোবাসা, প্রতিটি উপহারে ছিল আপনজনদের মুখে হাসি ফোটানোর আকাঙ্ক্ষা।
আর ছিল আমাদের একটি বিশেষ স্বপ্ন।
ছেলে এবং এবং বৌমার বড় স্বপ্ন ছিল আমাদেরকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসে বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল খেলা দেখার। একই স্টেডিয়ামে, একই উচ্ছ্বাসে, একই আনন্দে অংশ নেব। সেই স্বপ্নটিও আজ মুহূর্তের মধ্যে যেন ধুলিস্মাৎ হয়ে গেল।
এখন সকাল ৫টা ২০ মিনিট। বিমানবন্দরের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে কমে এসেছে। যাত্রীরা যে যার গন্তব্যে চলে গেছেন। অথচ আমরা দু’জন এখনো একই জায়গায় বসে আছি। মনে হচ্ছে, পুরো পৃথিবী যেন এগিয়ে যাচ্ছে, শুধু আমরা দু’জন সময়ের এক অদৃশ্য দেয়ালে আটকে আছি। আরেকটি বিষয় আমাকে ভীষণভাবে ভাবাচ্ছে।
আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে আমরা দুই মাস দশ দিনের জন্য বিদায় নিয়েছিলাম। সবাই আমাদের জন্য দোয়া করেছেন। কেউ কেউ বাসায় এসে বিদায় জানিয়েছেন, আবার কেউ বিমানবন্দর পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছেন। তারা ভেবেছেন, আমরা এখন হয়তো হাজার হাজার মাইল দূরে আকাশপথে গন্তব্যে এগিয়ে চলেছি। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পর তারা যখন আমাদের আবার দেখতে পাবে – তখন কী ভাববে? কী বলব তাদের? কীভাবে বোঝাব, সব প্রস্তুতি, সব কাগজপত্র, সব আয়োজন ঠিক থাকার পরও শুধুমাত্র নামের সামান্য অমিল আমাদের যাত্রাপথ রুদ্ধ করে দিল?
জীবন সত্যিই অদ্ভুত!
কখনো মানুষের বহু বছরের স্বপ্ন পূরণ হয়ে যায় একটি ছোট্ট সুযোগে, আবার কখনো অসংখ্য প্রস্তুতি, শতভাগ আন্তরিকতা এবং নির্ভুল পরিকল্পনাও একটি অপ্রত্যাশিত জটিলতার কাছে অসহায় হয়ে পড়ে। আজ মনে হচ্ছে, মানুষের পরিকল্পনার চেয়েও মহান পরিকল্পনাকারী একমাত্র মহান আল্লাহ। তিনি যা নির্ধারণ করেন, তাই ঘটে। হয়তো এই ঘটনার মধ্যেও এমন কোনো কল্যাণ নিহিত আছে, যা আজ আমাদের চোখে ধরা পড়ছে না। তবুও মানুষ তো মানুষই। স্বপ্ন ভাঙার বেদনা, ব্যর্থ যাত্রার কষ্ট এবং অপূর্ণ অপেক্ষার দীর্ঘশ্বাস সহজে মুছে যায় না।
মহান আল্লাহর দরবারে শুধু এই প্রার্থনাই করি – তিনি যেন আমাদের এই জটিলতার দ্রুত সমাধান করে আবার নিরাপদে যাত্রার সুযোগ করে দেন।
আর কাউকে যেন এমন এক অসহায়, বিব্রতকর এবং হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।
হে আল্লাহ, আপনি উত্তম ফয়সালাকারী। আমাদের ধৈর্য দিন, শক্তি দিন এবং আমাদের অপূর্ণ যাত্রাকে পূর্ণতার পথে পৌঁছে দিন। আমীন!