অ্যাডভোকেট এম এ মজিদ,ঢাকা || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ২১ জুন, ২০২৬ ৫:১১ অপরাহ্ণ
বাবা – মাত্র দু’টি অক্ষরের একটি শব্দ। অথচ এই ক্ষুদ্র শব্দটির ভেতর লুকিয়ে আছে বিশাল এক আকাশের ছায়া, পাহাড়সম দৃঢ়তা, সমুদ্রের গভীরতা আর অনিঃশেষ মমতার উৎস। একজন সন্তানের কাছে বাবা কেবল জন্মদাতা নন; তিনি প্রথম শিক্ষক, প্রথম অভিভাবক, প্রথম আদর্শ এবং জীবনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয়।
বাবা দিবসে পৃথিবীর সকল পিতার প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা, অফুরন্ত ভালোবাসা ও আন্তরিক দোয়া। যাঁদের বাবা এখনো বেঁচে আছেন, তারা যেন এই অমূল্য আশীর্বাদের মূল্য উপলব্ধি করেন। ব্যস্ততার অজুহাতে বাবাকে অবহেলা করবেন না। তাঁর পাশে বসুন, প্রাণভরে কথা বলুন, তাঁর হাতটি শক্ত করে ধরুন, তাঁকে জড়িয়ে ধরুন। কারণ বাবার চোখের গভীরে লুকিয়ে থাকে সন্তানের জন্য এক অনন্ত ভালোবাসার মহাকাব্য, যা মুখে প্রকাশিত না হলেও প্রতিটি নিঃশ্বাসে অনুভূত হয়। আজ যে স্নেহ, যে মমতা, যে আশীর্বাদ সহজলভ্য বলে মনে হচ্ছে – কাল হয়তো সেটিই সবচেয়ে বড় শূন্যতায় পরিণত হবে।
তবে বাবা দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিবস হয়ে থাকলে চলবে না। যাদের বাবা জীবিত আছেন, তাদের কাছে বছরের প্রতিটি দিনই হোক বাবা দিবস; প্রতিটি সকাল হোক বাবার হাসিমাখা মুখ দেখার উপলক্ষ, প্রতিটি সন্ধ্যা হোক তাঁর পাশে বসে জীবনের গল্প শোনার অমূল্য সময়।
এই উপলব্ধি আমার কাছে আরও গভীর, কারণ আমি এমন একজন বাবার সন্তান, যাঁর জীবন ছিল আত্মত্যাগ, মানবসেবা ও আদর্শের এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি। আমরা ছিলাম আট ভাই ও চার বোন – মোট এক ডজন ভাইবোন। একটি মাত্র মানুষের উপার্জনে এত বড় পরিবারকে মানুষ করা আজকের দিনে কল্পনা করাও কঠিন। কিন্তু আমাদের বাবা কখনো দায়িত্বের ভারে নুয়ে পড়েননি। সীমিত সামর্থ্য, অসংখ্য প্রতিকূলতা আর অগণিত ত্যাগের মধ্য দিয়েও তিনি আমাদের প্রত্যেককে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছেন। আমাদের সৌভাগ্য, তিনি তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর ১১ জন সন্তানকে জীবিত দেখে যেতে পেরেছিলেন।
কিন্তু তাঁর মহত্ত্ব কেবল নিজের পরিবারেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং নিজের সন্তানদের জন্য যতটুকু করেছেন, তার চেয়েও বেশি করেছেন সমাজের অসহায়, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য। তিনি বিশ্বাস করতেন – মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার সম্পদে নয়, তার সেবায়। আমাদের বাবা কবি মো. নূরুল আমিন ছিলেন দিনাজপুর প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা-সভাপতি। তিনি পাক-পাহাড়পুর জামে মসজিদেরও প্রতিষ্ঠাতা-সভাপতি ছিলেন। কিন্তু তাঁর কর্মযজ্ঞ এখানেই থেমে থাকেনি। শিক্ষা, কবিতা, সাহিত্য, সমাজকল্যাণ ও মানবসম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্যে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন; পাক-পাহাড়পুর ফোরকানিয়া মাদ্রাসা, পাক-পাহাড়পুর সমাজ উন্নয়ন কেন্দ্র, নেওয়াজ সাহিত্য মজলিস, আপ-টু-ডেট ক্লাব, সোনালী ক্লাব, আব্দুর রহমান স্মৃতি পাঠাগার, সেলাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, মৃত্তিকা শিল্প প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, তাঁত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্র এবং বীরগঞ্জে তাঁর নিজের জমিতে কাশিপুর বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় যেটি এখন ‘কবি নূরুল আমিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’।
এছাড়াও তাঁর হাতে গড়ে উঠেছে আরও বহু জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান, যার সুফল আজও মানুষ ভোগ করছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, দান মানে কেবল অর্থ দেওয়া নয়; মানুষের আত্মমর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়াই প্রকৃত দান। তাই তিনি দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বই-খাতা কিনে দিয়েছেন, মেধাবী ছাত্রদের পড়াশোনার ব্যয় বহন করেছেন, অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন, কর্মহীন মানুষকে কর্মমুখী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন। তিনি বলতেন, “কারও হাতে ভিক্ষার পাত্র তুলে দিও না; তার হাতে কাজের উপকরণ তুলে দাও।”
এই বিশ্বাসেরই এক উজ্জ্বল ও বিরল দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছিলেন ১৯৬৬ সালে। সে বছর কবি, সাহিত্যিক, সমাজসেবক ও বিদ্যোৎসাহী হিসেবে তিনি লাভ করেন মর্যাদাপূর্ণ “প্রেসিডেন্ট পদক” এবং পুরস্কার হিসেবে পান নগদ দশ হাজার টাকা। কিন্তু সেই অর্থের একটি টাকাও তিনি নিজের সংসারের প্রয়োজনে ব্যয় করেননি। বরং নিজের সঞ্চয় থেকে আরও সমপরিমাণ অর্থ যোগ করে দিনাজপুরে মাসব্যাপী “প্রাপ্তবয়স্ক প্রশিক্ষক প্রশিক্ষণ” কর্মসূচির আয়োজন করেন। সেই প্রশিক্ষণে শতাধিক ব্যক্তি অংশগ্রহণ করেন এবং পরবর্তীকালে তাঁরা নিজ নিজ এলাকায় নিরক্ষরতা দূরীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ব্যক্তিগত প্রাপ্তিকে জনকল্যাণে উৎসর্গ করার এমন বিরল দৃষ্টান্ত সে সময়ে যেমন ছিল অনন্য ও বিরল, আজও তেমনি অনুকরণীয়। তাঁর কাছে সম্মান বা পুরস্কারের প্রকৃত মূল্য ছিল তখনই, যখন তা মানুষের কল্যাণে ব্যয় হয়ে সমাজকে আলোকিত করতে পারে।
আমাদের যখন বুঝবার বয়স হয়েছে, তখন থেকেই বাবা শিখিয়েছেন – অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে, আর্ত-পীড়িতের সেবা করতে, বড়দের শ্রদ্ধা করতে এবং ছোটদের স্নেহ দিতে। তিনি শেখাতেন, মানুষের পরিচয় তার পোশাকে নয়, তার ব্যবহারে; তার সম্পদে নয়, তার সততায়; তার কথায় নয়, তার কর্মে।
আজও মনে পড়ে, কোনো অভাবী মানুষ বাবার দরজায় এলে তিনি কখনো খালি হাতে ফিরিয়ে দিতেন না। কোনো মেধাবী ছাত্র অর্থাভাবে পড়াশোনা বন্ধ করবে – এ কথা তিনি মেনে নিতে পারতেন না। সমাজের যে কোনো কল্যাণকর কাজে তিনি নিজেকে সবার আগে সম্পৃক্ত করতেন। মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই যেন ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ।
আজ যখন সমাজে আত্মকেন্দ্রিকতা, মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং মানবিক সংকট নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন, তখন বাবার জীবন যেন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন – একজন মানুষ তাঁর রেখে যাওয়া সম্পদের জন্য নয়, তাঁর রেখে যাওয়া কর্মযজ্ঞ ও আদর্শের জন্য যুগের পর যুগ বেঁচে থাকেন।
আমাদের বাবা ৮৭ বছর বয়সে ২০০০ সালের ২২ নভেম্বর শুক্রবার সকাল ৮ টায় আমাদের সকলকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। কিন্তু তাঁর শিক্ষা, তাঁর মূল্যবোধ, তাঁর সততা, তাঁর মানবিকতা এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো আজও আমাদের পথ দেখায়। তাঁর প্রতিটি উপদেশ আজও আমাদের বিবেককে জাগ্রত করে। তিনি নেই, কিন্তু তাঁর আদর্শ এখনো আমাদের জীবনের বাতিঘর।
এই বাবা দিবসে পৃথিবীর প্রতিটি সন্তানের কাছে আমার একটাই আবেদন – আপনারা আপনাদের বাবাকে শুধু ভালোবাসবেন না, তাঁকে সময় দিন, তাঁর জীবনের সংগ্রামের গল্প শুনুন, তাঁর ত্যাগকে উপলব্ধি করুন, তাঁর অভিজ্ঞতাকে সম্মান করুন। কারণ একজন বাবা চলে গেলে শুধু একজন মানুষ হারিয়ে যান না; হারিয়ে যায় একটি পরিবারের সবচেয়ে শক্তিশালী ছায়া, সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়, সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রেরণা।
বাবারা আসলে কখনো চলে যান না। তাঁরা বেঁচে থাকেন তাঁদের আদর্শে, তাঁদের সন্তানদের চরিত্রে, তাঁদের প্রতিষ্ঠিত কর্মে এবং মানুষের অন্তরের গভীর শ্রদ্ধায়।
এই বাবা দিবসে মহান আল্লাহর কাছে একান্ত প্রার্থনা – পৃথিবীর সকল জীবিত বাবাকে সুস্থ, দীর্ঘ ও শান্তিময় জীবন দান করুন। আর যাঁরা আমাদের ছেড়ে অনন্তের পথে পাড়ি জমিয়েছেন, তাঁদের সকলকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন। আমার বাবা কবি নূরুল আমিনের প্রতিও রইল অফুরন্ত শ্রদ্ধা, সীমাহীন কৃতজ্ঞতা এবং অশ্রুসিক্ত ভালোবাসা। তিনি শুধু আমার বাবা ছিলেন না – তিনি ছিলেন একটি জীবন্ত প্রতিষ্ঠান, একটি আলোকিত উত্তরাধিকার – যার আলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পথ দেখিয়ে যাবে।
লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট এবং জাতীয় সাংবাদিক সোসাইটি ও ওয়ার্ল্ড পীছ অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস সোসাইটির চেয়ারম্যান।