ইব্রাহিম আলম সবুজ, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ১০ মার্চ, ২০২৬ ৪:৩৩ অপরাহ্ণ
কুড়িগ্রামের রাজারহাটে উপজেলার হতদরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থানের অন্যতম ভরসা ছিল Employment Generation Program for the Poorest (EGPP) বা ইজিপিপি। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে প্রকল্পটির আওতায় মাটি কাটার কাজ বন্ধ রয়েছে। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলেও কর্মসূচিটি আর চালু হয়নি। ফলে প্রায় দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন উপজেলার হাজারো শ্রমজীবী মানুষ।
এদিকে সামনে ঈদ ঘনিয়ে এলেও কর্মহীন এসব পরিবারের ঘরে নেই উৎসবের আমেজ। অনেক পরিবারের পক্ষে নতুন পোশাক কেনা তো দূরের কথা, দুমুঠো খাবার জোগাড় করাও হয়ে পড়েছে কঠিন। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলেও ইজিপিপি পুনরায় চালুর বিষয়ে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট ঘোষণা আসেনি। এতে দারিদ্র্যপীড়িত এ অঞ্চলের হতদরিদ্র পরিবারগুলোর মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা আরও বাড়ছে।
উপজেলার সদর, বিদ্যানন্দ, ছিনাইসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইজিপিপির আওতায় গ্রামীণ সড়ক সংস্কার, খাল খনন ও মাটি কাটার মতো শ্রমনির্ভর কাজের মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারের সদস্যরা বছরে নির্দিষ্ট সময় কর্মসংস্থানের সুযোগ পেতেন। দৈনিক মজুরির সেই আয়েই চলত তাদের সংসার। কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন অনেক পরিবার চরম অর্থকষ্টে দিন কাটাচ্ছে।
বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের নারী শ্রমিক সাজেনা বেগম বলেন, ইজিপিপির কাজ থাকলে অন্তত কয়েক মাসের খাবারের নিশ্চয়তা থাকত। পাঁচ সদস্যের পরিবার চালাতে এখন অনেক সময় ধারদেনা করতে হচ্ছে। মাঝেমধ্যে চরে গিয়ে আলু, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন কৃষিজমিতে শ্রম দিতে হয়। কাজটা অনেক কষ্টের, মজুরিও কম, তবুও না করে উপায় নেই। মেয়ের পড়াশোনাও বন্ধ হওয়ার উপক্রম। সামনে ঈদ উপলক্ষে ভালো খাবার ও নতুন জামাকাপড় কেনা এখন তাদের কাছে শুধুই স্বপ্ন।
সদর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য লাভলু মিয়া বলেন, বাজারে সবকিছুর দাম বেড়েছে, কিন্তু কাজ নেই। অনেকেই বাধ্য হয়ে অন্য জেলায় গিয়ে দিনমজুরি করছেন। পরিবার নিয়ে তারা খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, প্রকল্পটি পুনরায় চালু হলে এসব শ্রমজীবী মানুষের কিছুটা স্বস্তি ফিরবে।
রাজারহাট কারিগরি ও বাণিজ্যিক কলেজের অধ্যক্ষ আবুল হোসেন সরকার বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ ও দারিদ্র্যপীড়িত জেলা হিসেবে কুড়িগ্রামে এ ধরনের শ্রমভিত্তিক কর্মসূচি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু কর্মসংস্থানই সৃষ্টি করে না, বরং স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রকল্পটি পুনরায় চালু ও বরাদ্দ বৃদ্ধি করা না হলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তিনি আরও বলেন, প্রকল্পটি যেহেতু দরিদ্র শ্রমিকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্দেশ্যে চালু করা হয়েছিল, তাই তাদের কথা বিবেচনা করে এটি পুনরায় চালু করা প্রয়োজন। অন্যথায় বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করা উচিত।
বিদ্যানন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তাইজুল ইসলাম বলেন, ইজিপিপি বন্ধ থাকায় গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির চাপ বেড়েছে। অনেকেই সরকারি ভিজিএফসহ বিভিন্ন সহায়তার অপেক্ষায় থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। তিনি দ্রুত কর্মসূচিটি পুনরায় চালুর দাবি জানান। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশনা এলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, ইজিপিপি প্রকল্পটি বর্তমানে সারা দেশেই বন্ধ রয়েছে। উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামেও একই অবস্থা বিরাজ করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজারহাট উপজেলায় এ প্রকল্পের আওতায় ২ হাজার ৬৩১ জন সুবিধাভোগী শ্রমিক কাজ করতেন।