admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ২০ নভেম্বর, ২০২৪ ১:২৯ অপরাহ্ণ
নিউজ ডেক্সঃ দিনাজপুরের ভাবীর মোড় বলতেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে ভাবীর হোটেলের পাতিহাঁসের ভুনা মাংস। যে-সকল ভ্রমণপিপাসু দিনাজপুরে বেড়াতে আসেন তাদের বেশিরভাগ দর্শনার্থীদের দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে ভাবীর মোড়ের নামটি থাকেই। কেননা, ভাবীর মোড়ে পাশাপাশি ৬টি ভাবীর হোটেল রয়েছে। হোটেলগুলো হলো; ১।লিপি ভাবীর হোটেল, ২। বেলী ভাবীর হোটেল – ১ নং বড় ভাবীর হোটেল, ৩। ভাবীর হোটেল -১ ৪। প্রথম ১ নম্বর মেরিনা ভাবীর হোটেল, ৫। তসলিমা ভাবীর হোটেল, এবং ৬। সাত তারা ভাবীর হোটেল।
হোটেলের মালিকদের নাম পুরুষ হলেও সবগুলো ভাবীর হোটেল পরিচালনা করেন মহিলারা। পুরুষ মানুষগুলো খাদ্য পরিবেশন করা তো দূরের কথা, ক্যাশবাক্সেও তাদের দেখা মেলে না। রান্নাবান্না, খাদ্য পরিবেশন, টেবিল মোছামুছি ও ক্যাশবাক্সেসহ সব কাজ ভাবীরাই করে থাকেন। ভাবীদের বয়স মা-খালাদের মতো হলেও তাদেরকে কিন্তু ভোজনরসিক গ্রাহকরা ভাবী বলেই সম্বোধন করেন। ভাবীরা যে সুন্দরী, সুশ্রী এবং সাজুগুজু হয়ে বসে থাকেন, তা কিন্তু নয়, তারা অতি সাধারণভা এবং পরিচ্ছন্নভাবে সব কাজ নিজেরাই করে থাকেন।
ভাবীদের ব্যবহার, আন্তরিকতা এবং আতিথিয়েতার মধ্যে কোনো খাদ নেই। “কম দিয়ে বেশি লাভ”- এটা তাদের চিন্তা ও কল্পনার বাহিরে। বরং ভাবীরা তাদের আদরের দেবরকে পেট পুরে খাওয়ানোর পর দেবরদের মুখে আনন্দের হাসি এবং তৃপ্তির ঢেকু দেখে ভাবীরা যেমনটি আনন্দ পেয়ে থাকেন, ঠিক তেমনটি ভাবীর হোটেলের ভোজনরসিকদের খাওয়ানোর পর ভাবীরা সে-ধরনের আনন্দ অনুভব করেন। যারা একবার ভাবীর হোটেলে খেয়েছেন তারা সময় ও সুযোগ পেলে ভাবীর হোটেলে না গিয়ে পারবেন না।
ভাবীর হোটেলে ভাবীরা নিজেই রান্না করেন এবং গ্রাহকদেরকে খাদ্য পরিবেশন করেন। তারা যে শুধু পাতি হাঁসের ভুনা মাংসই খাওয়ান তা কিন্তু নয়, সঙ্গে দেওয়া হয় ভাবীর মোড়ের পাশ দিয়ে প্রবাহিত টাঙ্গন নদীর টাটকা ছোট মাছের চচ্চড়ি, তিলের ভিন্ন স্বাদের ভর্তা ও সালাত, ডাল তো আছেই। পেট চুক্তি অনুসারে যে যত খেতে পারে। হাঁসের ভুনা মাংসের ক্ষেত্রে অবশ্য সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে মাংসের পরিমান এতটাই বেশি যে, সম্পূর্ণ মাংস খাওয়া অনেকের পক্ষেই সম্ভব নয়, অন্তত আমার মতো মানুষের পক্ষে। খাবার দাম পরিমান ভেদে আশি টাকা থেকে দুইশো টাকার মধ্যেই।
ভাবীর মোড়টি বোচাগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ-পূর্ব কোনের শেষ প্রান্তে অবস্থিত হলেও বেশিরভাগ মানুষ এটাকে বিরলে ভাবীর হোটেল বলে থাকেন। দিনাজপুর শহর থেকে যেসকল ভোজনরসিকরা ভবীর মোড়ে আসেন তারা এটাকে বিরল উপজেলাই মনে করেন। কেননা, বিরল উপজেলার সীমানা পেরিয়ে ভাবীর মোড়ের দূরত্ব এক কিলোমিটারেরও কম। ভাবীর মোড়ের প্রকৃত নাম রাণীরঘাট। ভাবীর মোড়ের পূর্বে দিনাজপুরের বিরল উপজেলা, উত্তরে ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ উপজেলা এবং একটু দক্ষিণ-পশ্চিমেই ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রায়গঞ্জ জেলার কালিয়াগঞ্জ থানার রাধিকাপুর রেল স্টেশন।
ভাবির মোড়ের পশ্চিমে টাঙ্গন নদীর ওপরে নির্মিত রাবার ড্যাম, ব্রিজ এবং প্রাকৃতিক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য সত্যিই চোখজুড়ানো ও মনমাতানো। বর্ষাকালে নদীতে যখন অথৈ জলে পূর্ণ থাকে তখন এর একরকম দৃশ্য, আবার খরা মৌসুমে নদীতে যখন পানি শুকিয়ে যায় তখন আর এক ধরনের দৃশ্য। রবার ড্যামের কারণে ড্যামের উত্তরে থৈ থৈ পানি আর নদীর দু’পাশে সবুজের সমাহার এবং ড্যামের দক্ষিণ শুকানো নদীর করুন দৃশ্য দেখে মনটা বিষন্নে ভরে উঠে।
দিনাজপুর শহর থেকে ভাবীর মোড়ে যাওয়া খুবই সহজ। দিনাজপুর শহরের পশ্চিম পাশঘেষে প্রবাহিত পূনর্ভবা নদী (কাঞ্চন নদী) পার হলেই শুরু হলো বিরল উপজেলা। সোজা পশ্চিমে ৮ কিলোমিটার গেলেই বিরল উপজেলা। বিরল উপজেলা থেকে সোজা পশ্চিমে ৮ কিলোমিটার গেলেই পাকুড়া সীমান্ত আউট পোস্ট বা বিওপি ক্যাম্পর কাছেই পাকুড়া চৌরাস্তা। পাকুড়া চৌরাস্তার উত্তরে ২ মকিলোমিটার গিয়ে একটি নাড়াবাড়ির হাটের দেখা মিলবে। সেই হাটের সোজা পশ্চিমে ৪ কিলোমিটার গেলেই দেখা মিলবে বোচাগঞ্জের সাতইল ইউনিয়নের রাণীর হাট বা ভাবীর মোড়। দিনাজপুর শহর থেকে ইজিবাইক তিনশো থেকে চারশো টাকায় ৪/৫ জন একত্রে রিজার্ভ করে যাওয়া যায়। আবার ৮০ থেকে ১০০ টাকায় ঘন্টাওয়ারী চুক্তিতেও ইজিবাইক ভাড়া নেওয়া যায়। ভেঙ্গে ভেঙ্গেও যাওয়া যায় ভাবীর মোড়ে। দিনাজপুর শহরের পশ্চিমে চাউলিয়াপট্টি ইজিবাইক স্ট্যান্ড থেকে ১৫ টাকায় বিরল উপজেলায় গিয়ে সেখান থেকে ১৫ টাকায় পাকুড়া চৌরাস্তায় যেতে হবে। সেখান থেকে দরদাম করে একশো থেকে দেড়শো টাকার কিছু কম-বেশিতে ইজিবাইক রিজার্ভ করে ভাবীর মোড়ে যাওয়া ও আসা যাবে। দিনাজপুর শহরের ডিসি অফিস এবং বড়মাঠে কার ও মাইক্রোবাস স্ট্যান্ড থেকে এক থেকে দেড় হাজার টাকার মধ্যেই কার এবং মাইক্রোবাস ভাড়া নিয়ে ভাবীর মোড়ে যাওয়া যায়।
দিনাজপুরে যত সুন্দর আকর্ষনীয় ও দর্শনীয় স্হান রয়েছে, যা কল্পনারও বাহিরে। দিনাজপুর শহরের মধ্যেই মহারাজার বাড়ি, চেহেলগাজীর মাজার, রামসাগর, আনন্দ সাগর, মাতা সাগর, জুলুম সাগর, সুখ সাগরসহ বেশ কয়েকটি অপূর্ব রিসোর্ট রয়েছে। দিনাজপুর শহর থেকে ১২ মাইল উত্তরে সাতশো বছর পূর্বে নির্মিত আশ্চর্যে ভরা টেরাকাটা কান্তজী মন্দির এবং নয়াবাদ মসজিদ রয়েছে। আরো একটু উত্তরে বীরগঞ্জ উপজেলার শেষ প্রান্তে জাতীয় উদ্যান, বিশাল জাতীয় উদ্যানে সাজানো-গোছানো ও নয়নাভিরাম শাল বাগান এবং তার মধ্যেই বাংলাদেশের একমাত্র শকুন চিকিৎসা ও প্রতিপালন কেন্দ্র, পিকনিক স্পট ও রেস্টহাউজ তো রয়েছেই। নবাবগঞ্জ উপজেলায় হাজার বছর পূর্বের বৌদ্ধ বিহার ও সভ্যতার নিদর্শন রয়েছে। আর “স্বপ্নপুরী” হচ্ছে এমন একটি রিসোর্ট যা কল্পনার স্বপ্নকেও হার মানায়। এটি ৩০০ একর জমির ওপরে বিশালাকারের রিসোর্ট। কি নেই সেখানে! ঘোড়াঘাট ছিল মোঘল আমলের উত্তরাঞ্চলের সদরদপ্তর। ঐতিহাসিক সুরা মসজিদসহ অনেক কিছুই দেখার রয়েছে ঘোড়াঘাটে। হিমালয়ের পদদেশে অবস্হিত দিনাজপুর জেলা অপরূপ সৌন্দর্যে ভরপুর। সৃষ্টিকর্তা দিনাজপুরের মাটি, পানি এবং আবহাওয়া এমন সুন্দর এবং বৈচিত্রময় করে দিয়েছেন যার কারণে দিনাজপুরের মতো উন্নতমানের সুঘ্রানযুক্ত আম, লিচু ও কাটারিভোগ চাউলসহ আরো অনেক কিছুই শুধু দিনাজপুরেই জন্মায়, যা আর অন্য কোথায়ও জন্মে না। দিনাজপুরের মাটি, পানি ও আবহাওয়ার কারণে এখানকার সাধারণ মানুষগুলোও খুবই সহজ, সরল এবং অতিথিপরায়ণ।
অন্য জেলার লোকেরা এখানে এলে তারা কোনো অবস্থাতেই প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনাই নেই, বরং বাহিরের লোকদের অতিথি হিসেবে সমাদর এবং আদরযত্ন করাই দিনাজপুরবসীর স্বভাব ও নৈতিকতা। কোনো চাকুরীজীবীর দিনাজপুরে পোস্টিং হলে এত দূর, একথা ভেবে তিনি কাঁদেন। আবার যখন তিনি দিনাজপুর থেকে অন্যত্র বদলি হয়ে যান তখনও তিনি দিনাজপুরের মায়ায় কাঁদেন। দিনাজপুরের সব ধরনের খবারের মূল্য খুবই কম, কিন্তু খাবারের মান খুবই উন্নত। সব ঋতুতেই দিনাজপুরে ভ্রমণ করা যায়। তবে অক্টোবর, নভেম্বর এবং ডিসেম্বর মাসের ১৫ তারিখ পর্যন্ত দিনাজপুর ভ্রমণের সর্বোত্তম সময়।