admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ১৪ ডিসেম্বর, ২০২৩ ১১:২৯ অপরাহ্ণ
নাগরিক ভাবনা: অ্যাডভোকেট আবু মহী উদ্দীন: ৩ ডিসেম্বর ঠাকুরগাঁও পাকিস্তান হানাদার মুক্ত দিবস। সেটা আবিস্কার করতে হয়েছে সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীকে। উদীচীকে যারা সাদামাটা সাংস্কৃতিক সংগঠন বলে মনে করেন তাদের ভুল ভাঙ্গাটা জরুরী। উদীচীর জন্ম হয়েছিল ৬৮ সালে, প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন লেখক , সাহিত্যিক, রাজনীতিক সত্যেন সেন , রণেশ দাস গুপ্ত। তারা বছরের পর বছর জেল খেটেছেন সাধারণ মানুষ মুক্তির লড়াইয়ের জন্য। তারা অনুভব করেছিলেন সাংস্কৃতিক বিপ্লব ছাড়া মুক্তি আসবেনা। বাঙ্গালী জাতিকে স্বাধীনতার মূলমন্ত্রে উজ্জীবিত করতে শেখ মুজিব প্রথম সারিতে নের্তৃত্ব দিয়েছেন। জাতি তাকে বঙ্গবন্ধু এবং বাঙ্গালী জাতির গর্ব, এরকম ক্ষনজন্মা পুরুষ জন্মগ্রহণ করেছিলেন এই জনপদে। তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী। উদীচী তেমনি সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মাধ্যমে জাতিকে স্বাধীনতার পথ থেকে জন্য যাতে বিচ্যুত না হয় তার জন্য মেধা ও শ্রম বিনিয়োগ করেছে। উদীচী সম্মানিত হয়েছে ‘একুশে পদক’ পেয়ে। দেশ স্বাধীন হয়েছে ৭১ সালে। এর পর বাংলাদেশের জনগণের উপর বিপর্যয় নেমে এসেছে সত্য, কিন্তু বীর মুক্তিযোদ্ধারা বা স্থানীয় আওয়ামী লীগ কি করে ৪০ বছর ধরে ঠাকুরগাঁয়ের মুক্তি অর্জনের দিনটিকে মনেই করতে পারলেননা এই প্রশ্নটি ছোট হলেও এর জবাব অনেক বড়।
৯ মাস যুদ্ধের পর যেদিন বিজয় অর্জিত হলো সেই দিনটার কথা তারা ভুলে গেলেন কি করে ? ইনিয়ে বিনিয়ে অনেক ব্যাখ্যা অনেকেই দিতে পারবেন। ২০০৯ সালে উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী পূনর্গঠিত হয়ে ঠাকুরগাঁয়ে । তারপরেই তারা শেকড়ের সন্ধানের কাজ শুরু করে। তাদেও সামনে ভেসে ওঠে ঠাকুরগাঁও পাকিসআনি বাহিনীর দখলমুক্ত হয়েছিল বিজয় দিবসের আগেই। উদীচী নিশ্চিত হয় ৩ ডিসেম্বর ঠাকুরগাঁও পাকিস্তান হানাদার মুক্ত দিবস। শতভাগ নিশ্চয়তার জন্য মুক্তিযোদ্ধা যাদুঘর থেকেও মতামত নেওয়া হয়। শুরু থেকে অভুতপূর্ব সাড়া পড়ে গেল গোটা ঠাকুরগাঁওয়ে। স্বত:স্ফুর্ত অংশগ্রহন এবং সমর্থনে ব্যপক উৎসাহ উদ্দীপনায় মানুষ অংশগ্রহণ করলো। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের শিক্ষার্থীদের পাঠালো , মুক্তিযোদ্ধাদের ১টি বড় দল অংশগ্রহণ করলো। কলেজ , স্কুলের শিক্ষার্থী এবং সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে স্মরণকালের বৃহত্তম শোভাযাত্রা হলো। বাদ্যবাজনা, হাতী সমবিব্যহারে অংশগ্রহনে র্যালি হলো।
একটানা ১২ বছর গোটা আয়োজনের গুরুত্বপুর্ণ অংশ মুক্তি শোভাযাত্রার আহবায়ক হিসাবে দ্বায়িত্ব পালনের সুযোগ উদীচী আমাকে দিয়েছিল। প্রতিবছরই র্যালীতে নুতন নুতন মাত্রা যোগ হয়েছে। হাতী , ঘোড়া , ঘোড়ার গাড়ী , ফায়ার বিগ্রেডের আউট রাইডার , ইএসডিও এলজিইিডির , জেলা প্রশাসনের পিকআপে বিশেষ ব্যবস্থায় পতাকা বহণ , পুলিশের ব্যান্ড , পটকা , মোটর সাইকেল বহর , কি ছিলনা। কোলকাতা সহ দেশের বিভিন্ন জায়গার প্রথিতযশা শিল্পী কলাকুশলীদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করেছে। স্থানীয় সকল সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রোগামে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পেতো। আলোচনা সভায় বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধাগণ স্মৃতি চারণ করতেন। মুক্তিযোদ্ধাদের ক্রেষ্ট, উত্তরীয় দেওয়া হয়েছে। শহীদ সন্তান জালাল উদ্দীনের তত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হতো মুক্তিযুদ্ধের চিত্র প্রদর্শনী যার মাধ্যমে দর্শকরা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সাথে পরিচিত হতো। বীর মুক্তিযোদ্ধা , মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকরা অংশগ্রহণ করতেন। মুক্তিশোভাযাত্রার উদ্বোধন করতেন অবশ্যই একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা অথবা মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। জেলা প্রশাসন এবং পুলিশ প্রশাসন অকুন্ঠ সমর্থন দিয়েছেন এবং তারা সশরীরে অংশগ্রহণ করতেন । সাংসদ, জনপ্রতিনিধি , রাজনৈতিক নের্তৃবৃন্দ সবাই অংশগ্রহণ করতেন। শহরের মোড়ে মোড়ে পরিবেশিত হতো জাগরণের গান। সন্ধায় হতো বর্নিল আতশবাজি , উড়তো শত শত ফানুস।
এলাকার বীর মুক্তিযোদ্ধা অসচ্ছল পরিবার, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পরিবারের আত্মকর্মসংস্থানের জন্য এ পর্যন্ত ১১৬ টি সেলাই মেসিন বিতরণ করেছে। সেলাই মেসিন সংগ্রহে শহীদ সন্তান কমল কুমার রায় বিশেষ ভুমিকা পালন করেন। এবারে মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের উদ্দেশ্যে খোলা চিঠি বেলুনের মাধ্যমে আকাশে ওড়ানো হয়। এ বিষয়টিতে শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকগণ খুবই ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। ১০ বছর পর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ দাবী করলো এই কর্মসুচীটি মুক্তিযোদ্ধা সংসদের যৌথ উদ্যোগে হতে হবে এবং ব্যানারে নাম লিখতে হবে। উদীচী সানন্দে রাজী হয়েছে। অনুষ্ঠানে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ অংশগ্রহণ ছাড়া কোন প্রকার আর্থিক বা সাংগঠনিক দায় বহণ করেনি। অবশ্য সরকারিকরণ হবার পর এখন আর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের যৌথ মালিকানা বা ব্যানারে নাম বা তাদের নিজশ^ ব্যানার কিছুই থাকেনা। মুক্তিযোদ্ধারা অবশ্য এতে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেনা।
সঙ্গত কারণেই কারো মনে প্রশ্ন জাগতে পারে এতো বড়ো গুরুত্বপুর্ন সর্বসাধারণের সর্বাধিক আবেগের ১টি আয়োজনের কর্তৃত্ব উদীচীর মতো ১টি সাংস্কৃতিক সংগঠনের হাতে থাকবে, তাই ই বা কেমন করে হয়। কথাটা নিরেট সত্যি। ৪০ বছর ধরে মনে করতে না পারার গøানিমুক্ত হওয়ার জন্য স্থানীয় আওয়ামী লীগ মনে করলো , এই আয়োজন যে তাদের করা দরকার। ১ম আবেগ এবং জেদ , কৃতিত্ব ছিনতাইয়ের অদম্য আগ্রহে আয়োজন হলো । প্রশাসনিক নির্দেশনা জারী করে র্যালী করা গেল বটে তবে তা বর্নাঢ্য হলোনা। বাদ্য বাজিয়ে একটি জৌলুশহীন পদযাত্রা। যাহোক মন্দের ভালো। এদিকে উদীচীর প্রোগ্রাম সব চালু থাকলেও অঙ্গহানি হলো তো বটেই। তাদের অনুষ্ঠানের জৌলুশ একটু কম হলেও আবেগের জায়গা অটুট থাকলো। প্রেষ্টিজের লড়াইয়ে আওয়ামী লীগের র্যালী প্রানবন্ত হয়েছে এ দাবী করা যায়না।
পরের বছর আওয়ামী লীগ প্রশাসনের উপর ভর করলেন। এখন এই আয়োজন সম্পুর্ণভাবে সরকারি আয়োজন। প্রশাসন আয়োজন করলেতো কারোর পছন্দ অপছন্দ থাকার সুযোগ থাকেনা। চিঠি দিয়ে স্কুল থেকে কিছু শিক্ষার্থী এনে গাছতলায় জড়ো করে একটা ব্যানার ধরে পুলিশের ব্যান্ড বাজিয়ে পদযাত্রা করে বঙ্গবন্ধুর মুর্যালে পুস্পস্তবক অর্পন করে বিডি হলে আলোচনা সভা। আলোচনা সভায় কিছু শিক্ষার্থী , আর কয়েকজন কর্মকর্তা থাকেন। আলোচনা শেষে শিক্ষার্থীদের ভাগে সিঙ্গারা জিলাপী পরে। প্রোগ্রাম শেষে আয়োজকরা তৃপ্তির ঢেকুর তোলেন।
গতবারের আলোচনা সভায় ছিলাম। আলোচনা সভায় অংশগ্রহণকারীরা সবাই পরিচিত। আওয়ামী লীগ নের্তৃবৃন্দ , বীর মুক্তিযোদ্ধারা একটি বারের জন্য উদীচীর নামটি উচ্চারন করার সৌজন্য প্রকাশ করলেননা। তবে ডিসি সাহেবকে ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা জানাই কেবল তিনিই স্বীকৃতিটুকু দিলেন। তিনি বললেন যে তিনি জেনেছেন উদীচী নামে একটি সংগঠন ক’ বছর ধরে এই আয়োজনটা করে আসছে। এখন থেকে এটা সরকারিভাবে হবে। তার পর থেকে উদীচী এই দিবস উদযাপনে সকল কর্মসুচিই পালন করে কেবলমাত্র আলাদা করে র্যালিটা করেনা। তারা জেলা প্রশাসনের আয়োজনে র্যালীতে অংশগ্রহণ করে। ২০০৯ থেকে প্রতিবছর আয়োজন করার সুবাদে আলোচনা সভায় উদীচী প্রতিনিধি ২ মিনিট আলোচনায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাওয়ার যোগ্যতা কি রাখেনা? এতে নিশ্চয় আলোচনা আলোচনা সভা সমৃদ্ধ হতো, ইতিহাসেরও স্বীকৃতি হতো।
তবে একটা বিষয়ে উদীচী গর্ব করতেই পারে তা হলো এই আয়োজন করার জন্য সরকার দ্বায়িত্ব নিয়েছে। এটাই উদীচীর কৃতিত্ব। এটাওতো ইতিহাস।
এবারে ২০২৩ এর মুক্ত দিবসের আলোচনা সভায় ২/৪ কথা বলা দরকার। বক্তারা প্রায় সকলেই খুবই গুরুত্বের সাথে শিক্ষার্থীদের ইতিহাস জানার দ্বায়িত্ব দিলেন। অনেকের মধ্যে প্রথম আলোচক সংগঠন প্রেস ক্লাবের সভাপতি সাহেব প্রথম বক্তা হিসাবে অনেক জ্ঞানের কথা বললেন এবং শিক্ষার্থীরা কেন ইতিহাস চর্চা করছেনা সেজন্য কৌশলে গালমন্দই করলেন। তিনি তার বক্তৃতায় কেন বার বার পাক হানাদার বাহিনী বললেন সে প্রশ্নের জবাব তিনিই দিতে পারবেন। তবে বক্তব্য শেষ করে অফিসিয়াল শ্লোগান জয়বাংলা বললেন না । অবশ্য তিনি কখনো বলেননা। জয়বাংলা বলতে তার মুখ সব সময় আড়স্ট হয়ে আসে। এটা সরকারী প্রোগ্রাম। তিনিতো এ সময়ে শহরের প্রধান বক্তা। ডিসি সাহেবের চেয়েও তিনি বেশী অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। ডিসি সাহেবতো তাকে সকল অনুষ্ঠানে জ্ঞানগর্ভ আলোচনার জন্য ডাকেন। কিন্তু এই শ্লোগান তিনি কেন দেননা তা কি খতিয়ে দেখেছেন। কারণ তিনি এই শ্লোগান অন্তরে ধারণ করেননা। এটা সরকারি প্রোগ্রাম। তাও আবার মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজরিত সংবেদনশীল আয়োজন।
এর পর বক্তব্য দিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মোজাম্মেল হক। তিনি খুবই আবেগঘন বক্তৃতা করেছেন। তবে শ্রোতাদের জন্য সুবিধা থাকে , তার বক্তৃতা অবশ্য বোঝা যায়না। তিনি বার বার আচরনবিধি লংঘন থেকে নিজেকে রক্ষা করার ঘোষণা দিলেন । প্রশ্ন হলো তিনি কি এমপি ক্যান্ডিডেট নাকি রিটানিং অফিসার নাকি সরকারি কর্মকর্তা। তার আবার আচরন বিধি কি ? আচরনবিধির মোড়কে তিনি শ্রোতাদের বঞ্চিত করে দীর্ঘক্ষন আলোচনা করে ‘সংক্ষিপ্ত’ আলোচনা শেষ করলেন। তিনিও বক্তব্যে‘ পাক বাহিনীই’ বললেন। প্রশ্ন করা যেতেই পারে ৭১ সালে তারা কার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। এই বাহিনী কি পাক পবিত্র ছিল। পৌর মেয়র সবাইকে সম্বোধন করতে গিয়ে তার দলের গুরুত্বপুর্ন নেতার নাম মনেই করতে পারলেননা। অবশ্য এটা দোষের কোন বিষয় নয়। অনেক সময় এ রকম হয়। তবে না হলেই ভালো হতো। নাম না বললে কোন সমস্যা হতোনা। শ্রæতিকটু হয়েছে তিনি সরল স্বীকারোক্তি দিয়েছেন সরি এবং স্বগ:তোক্তি করেছেন। তিনি ইতিহাস শিক্ষার দ্বায়িত্ব শিক্ষার্থীদের দিলেও হলঘরে শ্রোতা যে কাংখিত পরিমান ছিলনা সে ব্যপারে ইঙ্গিত করলেন এবং ভবিষ্যতে আরো বেশী সংখ্যক শিক্ষার্থী সমাগম করার উপর গুরুত্ব আরোপ করলেন। সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধাও পাক বাহিনীই বললেন।
জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবুর রহমান বাবলু পরিশিলিত, তথ্যনির্ভর বক্তৃতা করেছেন। ৩ ডিসেম্বরের প্রেক্ষাপট আলোচনা করেছেন। ভালো হতো কেবলমাত্র তাকেই কমপক্ষে ১ঘন্টা কথা বলার জন্য সুযোগ দিলে। আর কেউ বক্তৃতা না করলেই বরং শ্রোতারা উপকৃত হতো।
| Sun | Mon | Tue | Wed | Thu | Fri | Sat |
|---|---|---|---|---|---|---|
| 1 | 2 | 3 | 4 | 5 | 6 | 7 |
| 8 | 9 | 10 | 11 | 12 | 13 | 14 |
| 15 | 16 | 17 | 18 | 19 | 20 | 21 |
| 22 | 23 | 24 | 25 | 26 | 27 | 28 |
| 29 | 30 | 31 | ||||