admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ১৬ জুলাই, ২০২৩ ১০:১৯ পূর্বাহ্ণ
মুক্ত কলম নিউজ ডেক্সঃ দেশে চামড়ার মূল্য নেই জুতার দাম চড়া। পরিবেশবান্ধব ও টেকসই হওয়ায় বিশ্বজুড়ে চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা বেড়ে চলেছে। ফলে গত এক দশকে দেশে চামড়াজাত পণ্যের দাম কয়েক গুণ বাড়লেও ঠিক উল্টোচিত্র দেখা যাচ্ছে কাঁচা চামড়ার ক্ষেত্রে। বিশ্ববাজারে অত্যন্ত দামি বিবেচিত হলেও বাংলাদেশে অনেকটা অবহেলা আর উপেক্ষার শিকার কাঁচা চামড়া। গত এক দশকে দাম নেমেছে অর্ধেকের বেশি। এবারের কোরবানির ঈদে বড় গরুর চামড়াও কোথাও কোথাও ৩০০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। এমনকি বিক্রি করতে না পেরে অনেকে চামড়া ফেলেও দিয়েছে। অথচ একটি মাঝারি মানের গরুর চামড়া দিয়ে অন্তত ১০ জোড়া জুতা তৈরি হয়। ভালো ব্র্যান্ডের শোরুমগুলোতে যার একেক জোড়ার দাম দুই হাজার থেকে আট হাজার টাকা বা আরো বেশি মূল্য দেওয়া আছে।
যদিও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, চামড়াজাত পণ্য তৈরিতে প্রধান উপকরণ চামড়া হলেও এর সঙ্গে আরো অন্তত ১০ থেকে ১২ ধরনের কাঁচামাল প্রয়োজন হয়। যেগুলো বিদেশ থেকে আমদানি করে আনতে হয়। একই সঙ্গে যুক্ত হয় শোরুম ভাড়া, শ্রমিক ও বিক্রয়কর্মীদের মজুরি, পরিবহন খরচ এবং সর্বোপরি ব্র্যান্ড ভ্যালু। ফলে এক জোড়া জুতা তৈরির পর দাম হয়ে যায় দুই থেকে আট হাজার টাকা পর্যন্ত।
রাজধানীর ফার্মগেটে এপেক্স কম্পানির শোরুমে গিয়ে দেখা যায়, তারা সর্বনিম্ন দুই হাজার ২৯০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকার জুতাও বিক্রি করছে। তবে বাংলাদেশে তৈরি জুতা সর্বোচ্চ আট হাজার টাকার মধ্যে। বেল্ট বিক্রি হচ্ছে সর্বনিম্ন ৯৯০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ তিন হাজার ৪৯০ টাকা। এই শোরুমের বিক্রয়কর্মী রনি বলেন, ‘আমাদের এখানে সব জুতাই বাংলাদেশে তৈরি। শুধু ভেঞ্চুরিনি বিদেশ থেকে আমদানি করা, যার দাম ১৪ হাজার ৯৯৯ টাকা। ছাড়ে ১২ হাজার টাকা বিক্রি করা হচ্ছে। এই জুতার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তিনি বলেন, এটা আলট্রাসফট। এই জুতা পায়ে দিয়ে যখন কেউ হাঁটবে, তখন পা গরম হবে না। গরম হাওয়া বের হয়ে যায়, পা ঠাণ্ডা থাকে।
বাটা জুতার শোরুমে গিয়ে দেখা যায়, এ জুতা দুই হাজার ২৯৯ টাকা থেকে শুরু করে পাঁচ হাজার ৯৯৯ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। হাস পাপিস জুতা বিক্রি হচ্ছে ১৪ হাজার ৯৯৯ টাকা। বেল্ট বিক্রি হচ্ছে ৯৯৯ টাকা থেকে শুরু করে এক হাজার ৪৯৯ টাকা। এই শোরুমের একজন বিক্রয়কর্মী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এসব জুতা সব অরিজিনাল লেদারের তৈরি। আমাদের সর্বনিম্ন দুই হাজার ৪৯৯ টাকা থেকে শুরু করে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লেদারের জুতা আছে। হাস পাপিস ১৪ হাজার ৯৯৯ টাকা। হাস পাপিসের দাম এত বেশি কেন? জানতে চাইলে ওই বিক্রয়কর্মী বলেন, ‘এই জুতা আমদানি করা। এগুলো যাদের ডায়াবেটিস, পায়ের সমস্যা থাকে তাঁরা পরেন। রাজধানীর হাজারীবাগের শেরেবাংলা রোডে শতাধিক চামড়াজাত পণ্যের দোকান গড়ে উঠেছে। যারা সাশ্রয়ী মূল্যে চামড়াজাত পণ্য বিক্রি করেন। মো. রফিকুল ইসলাম নামের একজন উদ্যোক্তা জানান, তাঁর দোকানে অরিজিনাল লেদারের তৈরি লোফার বিক্রি করেন সর্বনিম্ন এক হাজার টাকা। আর নানা ধরনের জুতা বিক্রি করেন এক হাজার ২০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ দুই হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে।
তিনি বলেন, ‘এক জোড়া জুতা তৈরিতে চামড়া ছাড়াও ১০ থেকে ১২ ধরনের উপকরণ প্রয়োজন হয়। যেগুলো বিদেশ থেকে আমদানি করা। যেমন—জুতার সোল, লাইলিং বা আস্তরণ, রাবার শিট, সুতা, পেস্টিং, আঠা, বকলেস ইত্যাদি। এর সঙ্গে যুক্ত হয় দোকান ভাড়া, কারিগরদের মজুরি, কারখানার খরচ, বিক্রয়কর্মীদের বেতন ও পরিবহন ব্যয়। এসব খরচ বাদ দেওয়ার পরও আমরা এক জোড়া জুতা এক হাজার ২০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ দুই হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে বিক্রি করতে পারলেও লাভ হয়। আমাদের এখানে যে মানের জুতা দুই হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করি সেই একই মানের জুতা নামি শোরুমগুলোতে পাঁচ হাজার টাকা বিক্রি করবে। কারণ তাদের ব্র্যান্ড ভ্যালু রয়েছে। যদিও জুতার মান একই।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের এখানে লেদারের তৈরি একটি বেল্টের দাম ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা। আর একই বেল্ট শোরুমে বিক্রি করবে এক হাজার থেকে এক হাজার ৫০০ টাকায়।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির পরিচালক মিজানুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ব্র্যান্ডের কম্পানিগুলোর উৎপাদন খরচ এত বেশি হওয়ার কথা না। ডিজাইন ও চামড়ার গুণগত মানের চেয়ে তাদেরগুলো ১০ শতাংশ কমবেশি হতে পারে। মাঝারি আকারের একটি গরুর চামড়া থেকে সর্বনিম্ন ১০ জোড়া জুতা তৈরি করা যায়। সর্বোচ্চ ভালো মানের লেদার প্রতি বর্গফুট ১৫০ টাকার মধ্যে বাজারে পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে দুই হাজার ২০০ থেকে দুই হাজার ৩০০ টাকা জুতার দাম হলে সেটা সাশ্রয়ী। কম্পানিগুলো হয়তো ডিজাইনের জন্য বাড়তি খরচ নেয়, আবার বড় কম্পানিগুলো তাদের ব্র্যান্ড ভ্যালু নেয়। কিন্তু যেটা নিচ্ছে সেটা অনেক বেশি দাম নিচ্ছে। আমাদের দেশের বাজারে জুতা পাঁচ হাজার, আট হাজার টাকা! এত হওয়া উচিত না। আমাদের দেশে যে জুতা তৈরি হয় সেগুলো সর্বোচ্চ মানের হলেও তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার হওয়া উচিত। এর বেশি হওয়া কোনোভাবেই যৌক্তিক না। সেটা ব্র্যান্ড হোক বা নন ব্র্যান্ড।’
বাংলাদেশের বাজারে জুতার দাম নিয়ে বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ) সাবেক চেয়ারম্যান ও বেঙ্গল শু ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর (এমডি) টিপু সুলতান বলেন, ‘জুতার দাম গত তিন বছরে খুব বাড়েনি। এপেক্স ও বাটা কম্পানি ছয় হাজার টাকার ওপরে যে জুতা বিক্রি করে সে জুতাগুলোর অনেক উপাদান আছে যেগুলো দেশের বাইরে থেকে আমদানি করতে হয়, যার জন্য খরচ বেশি হয় কিন্তু উৎপাদন কম থাকে। আমাদের জুতার দাম কিন্তু দুই হাজার বা আড়াই হাজারের মধ্যে। স্যান্ডেল বিক্রি করি ৯০০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকায়। মানুষ কিন্তু কিনছে। হাজারীবাগে এখন অনেক ভালো জুতা হয়, সেখানে দাম কমে পাওয়া যায়। কিন্তু ব্র্যান্ডের জন্য এখানে ব্র্যান্ড ভ্যালু যুক্ত হচ্ছে। বেশি দামটার কারণ ব্র্যান্ড ভ্যালু পে করা লাগছে।