admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ১৪ জুন, ২০২৩ ১২:১৫ পূর্বাহ্ণ
এম.মাসুম আজাদ: ঝিনাইদহে অস্বাস্থ্যকর বেকারির ছড়াছড়ি, চানাচুর, পাউরুটি, বাটারবন, মিষ্টি, সন্দেশ ইত্যাদি। এসব পণ্য জনপ্রিয় হলেও এর মান নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন।অভিযোগ রয়েছে, ঝিনাইদহে সব বেকারির কারখানায় এসব খাবার তৈরি হয় অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে। বিএসটিআইয়ের অনুমোদন ছাড়াই এগুলো বাজারজাত করা হয়।
সরেজমিন বেকারির কারখানাগুলোতে দেখা গেছে, অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশ। প্রতিটি কারখানার ভেতরে স্যাঁতসেঁতে।নিম্নমানের উপকরণ দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে বিস্কুট, চানাচুর, পাউরুটি, বাটারবন, মিষ্টি, সন্দেশসহ বিভিন্ন বেকারির পণ্য।কারখানার ভেতরে যেখানে তৈরি করা খাবার রাখা আছে, সেখানেই ময়দা ও আটার গোডাউন। পাশে রাখা আছে জ্বালানির কাঠও। সঙ্গে রয়েছে মানবদেহের ক্ষতিকারক কেমিক্যাল এবং পামওয়েল তেলের ড্রাম। এর পাশেই ছড়ানো ছিটানো আছে নানা প্রকার তৈরি সব খাদ্যপণ্য।এসব খাদ্যদ্রব্য তৈরির জন্য আটা-ময়দা প্রক্রিয়াজাত করানো কড়াইগুলোও নোংরা।
যেসব কর্মচারী এসব পণ্য তৈরি করছেন, তাঁদের শরীর থেকে ঝরছে ঘাম।
বাজার থেকে টাকা খরচ করে কি কিনে খাচ্ছেন ভোক্তারা? বেকারি পণ্য প্রতিটি পরিবারের নিত্যদিনের সঙ্গী, সকালের নাস্তা থেকে শুরু করে প্রায় সব বেলাতেই আমরা বেকারি বিভিন্ন পণ্যের উপরে নির্ভর করি। কিন্তু ঝিনাইদহের বেকারি গুলো নিবিড় ভাবে পর্যবেক্ষণ করে ভয়াবহ চিত্র দেখা যায়,অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, নোংরা হাতে, শরীরের ঘামে তৈরি হচ্ছে বেকারি খাদ্য পণ্য।
খোঁজ নিয়ে জানা যায় ঝিনাইদহে বেকারি মালিক সমিতির অন্তর্ভুক্ত প্রায় ৪০ টি বেকারি রয়েছে যার সভাপতি আলিফ ফুড এ্যান্ড বেকারির প্রোপাইটার মো: মাহাবুব হাসান। সাধারণ সম্পাদক, হীরা বেকারির বর্তমান প্রোপাইটার শেখ জামাল উদ্দিন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বেকারি পরিচালনা করতে হলে ছয় ধরনের কাগজপত্র থাকতে হবে:
১)ট্রেড লাইসেন্স ২) ট্রেড মার্ক ৩) পরিবেশের ছাড়পত্র ৪) বি,এস,টি,আই ৫) ফায়ার সার্ভিস ৬) ভ্যাট ক্লিয়ারেন্স এছাড়াও থাকতে হবে আধুনিক চুল্লী ও ফ্লোর টাইলস্ করা,সেই সাথে স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলতে হবে। কিন্তু বাস্তব পর্যবেক্ষণে দেথা যায় প্রায় ৯০% বেকারির নেই কোনো লাইসেন্স ও মানছে না স্বাস্থ্য বিধি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন দোকানী ব্যবসায়ী
বলেন আলিফ বেকারির পণ্য বিক্রয়ের জন্যে কিছুদিন আগে আমি একহাজার টাকা জরিমানা দিয়েছি,কারণ এদের উৎপাদনের চেয়ে মেয়াদ দেওয়া থাকে দুই তিন দিন বেশি করে।
ঝিনাইদহ শহরের চাকলাপাড়ায় সাদাতীয়া ও নূরতাজ বেকারিতে সরেজমিনে উপস্থিত হয়ে দেখা মেলে চরম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চলছে বেকারির খাদ্য পণ্য উৎপাদন।
নূরতাজ বেকারির মধ্যে দেখা যায়, শ্রমিকেরা কাজ করছে চরম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে, কেক,বিস্কুট, পাউরুটির আটা ময়দা খালি হাতে ঘামযুক্ত শরীরের মাখা হচ্ছে,মানা হচ্ছে না কোনো ধরনের নিয়মনীতি।
জানা যায় চাকলাপাড়ার নূরতাজ বেকারির মালিক চারজন আলাল, ফিরোজসহ আরো দুইজন। যদিও সরেজমিনে যেয়ে তাদের কাউকেই পাওয়া যায়নি।
অস্বাস্থ্যকর বেকারি সম্পর্কে বটতলা নিবাসী বিদুর সাহা বলেন ইতিপূর্বে বেকারির পণ্য খেয়ে আমার পেটে অনেক সমস্যা হয়েছিলো,তার পর থেকে আমি আর বেকারি পণ্যসামগ্রীই গ্রহণ করি না। আদর্শ পাড়া নিবাসী বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ গজনবী জানান,আলীফ বেকারির উৎপাদিত কেক খেয়ে আমার ডায়রিয়া হয়েছিল, দুই দিন সদর হসপিটালের চিকিৎসা নেবার পরে সুস্থ হয়।
এ বিষয়ে ঝিনাইদহের ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রাপ্ত সহকারী পরিচালক
মো: মামুনুল হাসানের সাথে কথা হলে তিনি সাংবাদিকদের জানান, আমি ঝিনাইদহের বেশ কিছু বেকারি ভিজিট করেছি এবং তাদেরকে নোটিশ করছি,আপনারা তথ্য সহকারে নিউজ করুন আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নিবো।
এ বিষয়ে ঝিনাইদহের পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালকের সাথে কথা বলতে অফিসে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে পরিবেশ অধিদপ্তরের ডাটা এন্ট্রি গিয়াস উদ্দিন জানান ঝিনাইদহের কয়েকটা বেকারি বাদে প্রায় অধিকাংশ বেকারির নেই কোনো পরিবেশের ছাড়পত্র।
উক্ত বিষয়ে কথা হয় ঝিনাইদহের নিরাপদ খাদ্য অধিদপ্তর ও সেনেটারি ইন্সপেক্টর নারায়ন চন্দ্রের সাথে, তিনি সাংবাদিকদের জানান, ঝিনাইদহের অধিকাংশ বেকারিই মানছে না স্বাস্থ্যবিধি,প্রায় সকলেরই নাই বি,এস,টিআইয়ের লাইসেন্স। এদের বিরুদ্ধে খুব দ্রুতই ব্যাপক হারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ঝিনাইদহের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের বেকারির খাদ্য পণ্যসামগ্রীর উৎপাদন, লাইসেন্স ও সনদ না থাকার পরেও খাদ্য পণ্য উৎপাদনের অভিযোগের বিষয়ে কথা হয় ঝিনাইদহ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাদিয়া জেরিনের সাথে, তিনি বিস্তারিত অভিযোগের বিষয়ে শুনে সাংবাদিকদের জানান, আমরা এই বিষয়ে সরেজমিনে যদি কোনো অনিয়ম পাই তবে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।অস্বাস্থ্যকর ও স্বাস্থ্য বিধি না মেনে খাদ্য উৎপাদন করলে,সেই খাদ্য গ্রহণে কি কি ধরনের শারীরিক সমস্যা হতে পারে তা জানতে কথা হয় সিলেট এম, এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজের রেসিডেন্সিয়াল এ্যানেস্থেসিয়া ডা. মো. জুবায়ের মঞ্জুরের সাথে। তিনি সাংবাদিকদের জানান, এই ধরনের বেকারি পণ্য গ্রহণের কারণে ভোক্তার স্থায়ী পেটের সমস্যা হতে পারে,জন্ডিস, আলসার, হেপাটাইটিস,আমাশায় সহ নানান ধরনের শারীরিক অসুস্থতা দেখা দিতে পারে।
তাই বেকারি পণ্য সামগ্রী উৎপাদনের সময় অবশ্যই স্বাস্থ্য বিধি মানতে হবে।
ঝিনাইদহের সর্বসাধারণ জনগণ ভোক্তা অধিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। শহরের আনাচে কানাচে, অসংখ্য নামে-বেনামে চলছে বেকারি। অস্বাস্থ্যকর খাদ্য দ্রব্য তৈরির অপরাধে নিয়মিত ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালিত করে ভোক্তাদের খাদ্য দ্রব্যের মান নিশ্চিত করা হোক।