admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ ৬:৫৩ অপরাহ্ণ
রফিকুল ইসলাম জিলু,ব্যুরো প্রধান ঢাকাঃ সাভারে মধুমতি মডেল টাউনের ভিতর গড়ে উঠেছে বেশ কিছু রিসোর্ট। এসব রিসোর্ট মূলত পিকনিক স্পট হিসেবেই পরিচিত। কিন্তু এর বাইরেও এর একটা পরিচয় রয়েছে। ভদ্রলোকের নষ্ট পল্লি বলেও জানেন আশেপাশের লোকজন। প্রশাসনের নাকের ডগায় প্রায় প্রতিটি রিসোর্টে চলে অসামাজিক কার্যকলাপ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মধুমতী মডেল টাউন সাভারের বন্যা প্রবাহ অঞ্চলে অবৈধভাবে তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু ২০০৪ সালের আগস্টে এই প্রকল্পের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করে বেলা। পরে ২০০৫ সালে এই প্রকল্পটি অবৈধ ঘোষণা করেন উচ্চ আদালত। সর্বশেষ ২০২১ সালের ২৫ এপ্রিল ৫ টি রিভিউ পিটিশন খারিজ করে পূর্বের রায় বহাল রাখেন। রায়ের ৬ মাসের মধ্যে আগের অবস্থায় রূপান্তর করতেও নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া তো দূরের কথা, নাম পরিবর্তন করে নির্মান করা হচ্ছে নতুন স্থাপনা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মধুমতি মডেল টাউন নামে প্রায় ৫৫০ একর জমি ক্রয় করেন মেট্রো মেকারস অ্যান্ড ডেভেলপারস লিমিটেড। যদিও আইনানুযায়ী কোম্পানি কিংবা ব্যক্তির মালিকানাধীন ১০০ একরের ওপরে জমি থাকতে পারে না। যেখানে প্রায় ২০টি ডুপ্লেক্স বাড়ি, রাজমহল, লেকভিউ, জিওন, কল্লোল কুটির, ছায়াবিথি-১, ছায়াবিথী-২ সহ ৮ টি রিসোর্ট, প্রায় ৩০০ একতলা ভবন এবং ১৫০টি টিন শেড বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া নতুন করে নির্মান করা হয়েছে আরও একটি রিসোর্ট। যেখানে এখনও কোন কার্যক্রম শুরু হয় নি। মুলত এসব বাড়ি ঘরেই চলে অসামাজিক কার্যকলাপ। এ সব রিসোর্টের মধ্যে একটি হলো রাজমহল রিসোর্ট। যেখানে ৪ হাজার টাকার বিনিময়ে স্ত্রী পরিচয়ে যে কোন নারীকে নিয়ে একান্তে কাটানো যায় সারা দিন। দুপুর হলেই রিসোর্টের রান্না করা খাবার। এর পর চলে আবার নষ্টামি। রাজমহল রিসোর্টের দায়িত্বে থাকা শাহিন বলেন, আমাদের এই রিসোর্টে রয়েছে ৮ টি কক্ষ। এসব কক্ষের প্রতিটি সারা দিনের জন্য ৪ হাজার টাকায় ভাড়া দেওয়া হয়। আমরা একটি ফরম দেই সেটি পূরণ করলেই আর কোন সমস্যা নেই। সাহেবরা নারী নিয়েই এখানে একান্তে সময় কাটানোর জন্য আসেন। তবে সাহেবরা সবাই স্ত্রী পরিচয় দেন। স্বামী স্ত্রী প্রমানের উপায় সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা তো স্বামী-স্ত্রী প্রমান করতে পারি না। যদি কাবিননামা আনার নিয়ম থাকতো তাহলে এটা প্রমান করা যেত। অসামাজিক কার্যকলাপের ব্যাপারে তিনি বলেন, কোন রিসোর্টে অসামাজিক কার্যকলাপ হয় না। সব রিসোর্টেই তো এটা হয়। রিসোর্ট মানেই অসামাজিক কার্যকলাপ।
ছায়াবিথি রিসোর্টের বাবুর্চী মিরাজ বলেন, এখানে বান্ধবী নিয়ে, প্রেমিকা নিয়ে অবসর সময় কাটানের জন্যই মানুষ বেশি আসেন। এখানে ঘন্টা চুক্তি, দিন চুক্তিতে ভাড়া দেওয়া হয়। প্রতিটি ঘর ৫০০০ টাকায় ভাড়া দেওয়া হয়। কল্লোল কুটিরের সিকিউরিটি নুরুল ইসলাম বলেন, এখানে প্রতিটি ঘর ৫ হাজার টাকায় ভাড়া দেওয়া হয়। অনেকে স্বামী স্ত্রী পরিচয়ে এখানে আসেন। স্বামী স্ত্রী অবসর সময় কাটাতে ৫ হাজার টাকায় রুম নেবে কেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তারা বলেন স্বামী-স্ত্রী কিন্তু সত্যিই স্বামী স্ত্রী কি না এটার প্রমান আমাদের কাছে থাকে না।
এব্যাপারে নির্মানাধীন রিসোর্ট “ওন ভিলার” মালিক মফিজ উদ্দিন বলেন, ওই রকম রিসোর্ট তো আমাদের না। আমি মুলত থাকার জন্য করেছি। তবে টুকটাক অনুষ্ঠান করছে, এখন করলে করবে না করলে নাই। আমার কোন কাগজপত্র নাই। জায়গাটা পরিত্যক্ত ছিল তাই একটা স্থাপনা করেছি। ওইভাবে এখানে অনুষ্ঠান হয় না। এখানে যাস্ট একটা ঘর আর বাউন্ডারি ওয়াল। এখানে সবাই করছে, শুধু আমি না। সবাই করছে তাদের দেখে আমিও করেছি। ছায়াবিথী রিসোর্টের ম্যানেজার তানজিম আহমেদ বলেন, আমাদের লাইসেন্স রয়েছে। প্রতিটি জেলায় জেলা প্রশাসক থেকে একটি অনুমতি পত্র দেন। যেটা আমাদের রয়েছে। আমরা ট্রেড লাইসেন্স নিয়েছি রাজফুলবাড়িয়া থেকে। তবে রাজফুলবাড়িয়ায় ট্রেড লাইসেন্স দেওয়ার মত কেউ নেই।
সাভার উপজেলা সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি সালাউদ্দিন খান নইম বলেন, সুপ্রীম কোর্টের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্বেও যদি সেখানে অবৈধ স্থাপনা, অবৈধ কার্যকলাপ হয় আমরা মোটেও এটা প্রত্যাশা করি না। আমরা চাই দ্রুত প্রশাসন যেন সু-দৃষ্টি দেন। ভাকুর্তা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হাজ্বী মো. লিয়াকত হোসেন বলেন, যেহেতু পুরো মধুমতী মডেল টাউনই অবৈধ। সেখানে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। আমি যতদূর জানি এসব রিসোর্টে ভাল কোন কর্মকান্ড হয় না। আশা করি প্রশাসন এব্যাপারে সু-দৃষ্টি দেবেন।
এ ব্যাপারে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাজহারুল ইসলাম বলেন, আদালতের নির্দেশ কার্যকর করার জন্য আমরা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছি। হাউজিং কতৃপক্ষের প্রতি আদালত যে নির্দেশ দিয়েছেন তা পালন না করে তারা বিভিন্ন ছলচাতুরী পন্থা অবলম্বন করছেন। আমি আমাদের ঊর্ধ্বতন কতৃপক্ষকে জানিয়েছি তারা সিদ্ধান্ত নেবেন। এখানে যে গুলো স্থাপনা রয়েছে সব গুলোই অবৈধ। এখানে যেসব রিসোর্ট রয়েছে তাদের জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে নিবন্ধন নিতে হবে। অন্যথায় সব গুলোই অবৈধ। আমরা এসব রিসোর্টের বিরুদ্ধে খুব শিঘ্রই অভিযান পরিচালনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
