admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ২৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ৮:২৫ পূর্বাহ্ণ
কোরানের একটি আয়াত যাতে যীশুর উল্লেখ আছে আচ্ছা, আপনারা তুরস্কে বড়দিন পালন করেন কিভাবে ? একুশ বছর আগে যুক্তরাজ্যে আসার পর থেকেই প্রতিবার বড়দিনের সময় এই প্রশ্ন আমাকে শুনতে হবেই। জবাবে আমি বলি যে তুরস্ক একটি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ – কাজেই ২৫শে ডিসেম্বর বছরের আর দশটা দিনের মতোই। সে কি? তার মানে কি সেখানে বড়দিন হয় না? মনে রাখবেন, শুধু তুরস্ক নয় বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই বড়দিন পালন করে না। এটা যতই শুনতে অবাক লাগুক, পশ্চিমা দেশগুলোতে অনেকেরই ধারণা যে সারা পৃথিবীতেই বড়দিনের ছুটি পালিত হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো বড়দিন হচ্ছে যীশুর জন্মদিন – যিনি খ্রিস্টানদের নবী।

Shoppers walk among Christmas lights in Berlin
ইহুদি, হিন্দু বা মুসলিমদের জন্য এটা কোন ছুটির দিন নয়। অন্যভাবে বলতে গেলে যেমন মুসলিম বিশ্বে পরিবারের সদস্যরা একসাথে হন ঈদের দিন, বড়দিনে নয়। এই পার্থক্যটুকু উপলব্ধি করা জরুরি, তবে আমাদের মধ্যে যে মিলও আছে তা-ও জানা গুরুত্বপূর্ণ।
মুসলিমদের কাছে যীশু হচ্ছেন ঈসা নবী :
যা জেনে পশ্চিমা বিশ্বের খ্রিস্টানরা অবাক হতে পারেন তা হলো – ইসলাম যীশুর জন্মদিন পালন না করলেও – তাকে সম্মান করেন। মুসলমানরা তাদের ধর্ম বিশ্বাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে খ্রিস্টানদের যীশুকে গভীরভাবে সম্মান করেন। নবী মোহাম্মদের আগে অবতীর্ণদের মধ্যে যীশুকে সবচেয়ে সম্মানিতদের অন্যতম বলে স্থান দিয়েছে কোরান। সত্যি কথা হলো, কোরানে অসংখ্যবার উল্লিখিত হয়েছে যীশুর (যাকে আরবিতে বলা হয় ঈসা) নাম, নবী মোহাম্মদের নামের চেয়েও বেশিবার। কোরানের বর্ণনা অবলম্বনে একজন মুসলিম শিল্পীর আঁকা কুমারী মেরির ছবি ইসলাম ধর্মের পবিত্র গ্রন্থে নাম ধরে উল্লেখ করা হয়েছে এমন নারী আছেন মাত্র একজন।

তিনি হচ্ছেন কুমারী মেরি । আরবিতে তার নাম মরিয়ম। মেরি বা মরিয়মের নামে কোরানের একটি পূর্ণাঙ্গ সুরার নামকরণ হয়েছে – যাতে কুমারীর গর্ভ থেকে যীশুর জন্মের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। তবে ইসলামের এই কাহিনিতে কোনো জোসেফের উল্লেখ নেই, নেই কোন যীশুর জন্মের বার্তাবাহী জ্ঞানী ব্যক্তি বা পশুর আস্তাবলের কথাও। এখানে আছে, মেরি একাই যীশুর জন্ম দিয়েছিলেন মরুভূমিতে, একটি মরা খেজুর গাছের নিচে আশ্রয় নিয়ে। সেখানে তার খাবার জন্য গাছ থেকে পাকা খেজুর পড়ে, এবং তার পায়ের কাছে পানির ধারার সৃষ্টি হয়।
মেরি এবং তার কুমারী অবস্থায় যীশুর জন্মের গল্প শত শত বছর ধরে বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের মনে দাগ কেটেছে। একজন অবিবাহিত নারী সন্তান জন্ম দেবার ফলে তাকে নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু যীশু – নবজাত শিশু অবস্থা থেকেই ঈশ্বরের প্রেরিত পুরুষ হিসেবে কথা বলতে শুরু করেন। এই যাদুকরী ঘটনার পর তার মায়ের সততা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা থেমে যায়। এটি হচ্ছে সংস্কারের ওপর বিজয়ের এক গল্প।
আত্মার নবী :
মুসলিমরা যখন যীশুর নাম নেন, তখন তাদের ‘তার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক’ বলতে হয়। তা ছাড়া মুসলিম ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী শেষ বিচারের দিনের আগে – ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য – কে পৃথিবীতে ফিরে আসবেন? ঠিকই ধরেছেন, যীশু। মুসলিম সাহিত্যে তাকে যেভাবে মহিমান্বিত করা হয়েছে তা শুধু কোরানেই সীমিত নয়। সুফী দার্শনিক আল-গাজ্জালি যীশুকে বর্ণনা করেছেন ‘আত্মার নবী’ বলে। ইবনে আরাবি তার সম্পর্কে লিখেছেন ‘সন্তদের নিশানা’ হিসেবে। মুসলিম বিশ্ব জুড়েই ঈসা এবং মরিয়মের নামে শিশুদের নাম রাখা হয়। খ্রিস্টান পরিবারে কি মোহাম্মদের নামে শিশুর নাম রাখার কথা কেউ কল্পনা করতে পারেন? ইসলাম ধর্মের সাথে যীশু পরিচয়ের ঐতিহাসিক কারণ আছে। ধর্ম হিসেবে ইসলামের জন্ম হয় সপ্তম শতাব্দীর প্রথম দিকে। ততদিনে মধ্যপ্রাচ্যে খ্রিস্টান ধর্ম ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে।

ইতালির স্যান পেত্রোনিও ব্যাসিলিকায় আক্রমণের চেষ্টার সন্দেহে পাঁচ জন লোককে গ্রেফতার করা হয়।
ইতালির স্যান পেত্রোনিও ব্যাসিলিকায় আক্রমণের চেষ্টার সন্দেহে পাঁচ জন লোককে গ্রেফতার করা হয়। তাই স্বাভাবিকভাবেই বাইবেলে নবী মোহাম্মদের কোন উল্লেখ নেই।কিন্তু ইসলাম যদিও যীশুকে সম্মান করে, তবু এটা বলা খুব একটা ভুল হবে না যে খ্রিস্টান চার্চ সবসময় এ অনুভূতির সদয় প্রত্যুত্তর দেয়নি। ইতালির বোলোনায় পঞ্চদশ শতকের স্যান পেত্রোনিও গীর্জায় একটি দেয়ালচিত্র আছে যাতে ইসলামের নবীকে দেখানো হয়েছে নরকে, তার ওপর নির্যাতন করা হচ্ছে। ইউরোপে এমন অনেক শিল্পকর্ম আছে যাতে তাকে অবমাননার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। অবশ্যই বলতে হবে – এ যুগে ইসলাম সম্পর্কে খ্রিস্টান

জিহাদি আক্রমণের নিন্দা জানাতে রোমের একটি গীর্জায় মুসলিম ধর্মীয় নেতারা ক্যাথলিক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন।
চার্চের অবস্থান মোটেও এরকম নয়। সময় বদলে গেছে, কিন্তু আমাদের এই যুগে নতুন সব ধর্মীয় দ্বন্দ্ব, বিদ্বেষমূলক সংস্কার, এবং উগ্রপন্থী সহিংসতার জন্ম হয়েছে। ২০০২ সালে বোলোনার চার্চের দেয়ালচিত্র বোমা মেরে উড়িযে দেবার ষড়যন্ত্রের জন্য ইসলামী জঙ্গীদের সন্দেহ করা হয়।
আন্ত:ধর্মীয় সংলাপ
বোলোনার ওই ঘটনার পরবর্তীকালে ইসলামের নামে ইউরোপে এবং বহু মুসলিম দেশেও বড় বড় আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে – যাতে বহু লোকের মৃত্যু হয়েছে। এগুলোর ফলে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যেকার সম্প্রীতির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। সেকারণেই মুসলিমদের মধ্যে যীশুকে কিভাবে চিত্রিত করা হয়, এবং তার গুরুত্বই বা কি – এটা উপলব্ধি করাটা হয়তো আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তা খ্রিস্টানদের জন্য যেমন, তেমনি মুসলিমদের জন্যও। নানা সম্প্রদায়ের মধ্যে যে বিভক্তি তৈরি হয়েছে – তা দূর করার একটা ভালো পন্থা হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে যেসব অভিন্ন ব্যাপার আছে তা তুলে ধরা।