admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ৯:৫৮ পূর্বাহ্ণ
প্রাচীন কাল থেকেই বাংলাদেশে পাটের চাষ ও ব্যবহার চলে আসছে। বিগত দুশো বছরের অধিক সময় ধরে বহু চড়াই উৎরাই এর মধ্য দিয়ে ব্যবসায়িক ভিত্তিতে পাট এ অঞ্চলের মানেুষের অতি পরিচিত অর্থকরী ফসল। পাট গাছঃ দেশী (Coschorus capsularis) ও তোষা (C. olitorius) দু’প্রজাতির পাট গাছের ছাল থেকে আহরিত আঁশ পাট নামে পরিচিত যা বাংলাদেশের সোনালী আঁশ নামে সমাধিক পরিচিত। মনে করা হয় সংস্কৃত শব্দ পট্ট থেকে পাট শব্দের উদ্ভব হয়েছে। পাটের ইংরেজি নাম জুট (Jute )। সম্ভবতঃ উড়ে (উড়িষ্যা, ভারত) ভাষা থেকে এসেছে। পাট একটি বর্ষজীবী ফসল। এর জীবনকাল ১০০ থেকে ১২০ দিন পর্যন্ত। চৈত্র/বৈশাখ থেকে আষাঢ়/শ্রবণ। পাট বৃষ্টি নির্ভর ফসল।

সোনালী আঁশের দিন কি আবার ফিরে আসছে?
বায়ুর আদ্রতা ৬০% থেকে ৯০% এর পছন্দ। পাট চাষে কোনো রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োজন হয় না। গড় ফলন হেক্টর প্রতি প্রায় ২ টন। পাটের আঁশঃ পাটের আঁশ নরম উজ্জ্বল চক্চকে এবং ১-৪ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। তবে একক আঁশ কোষ ২-৬ মিলি মিটার লম্বা এবং ১৭-২০ মাইক্রণ মোট হয়। পাটের আঁশ প্রধানত সেলুলোজ এবং লিগনিন দ্বারা গঠিত। সাধারণত: পাট গাছ জৈব প্রক্রিয়ায় পানিতে জাগ দিয়ে আঁশ ছাড়ানো হয়। ব্যবহারঃ পাট পরিবেশ বান্ধব, বহুমুখী ব্যবহার যোগ্য আঁশ।
শিল্প বিপ্লবের সময় ফ্লাক্স এবং হেম্প এর স্থান দখল করে পাটের যাত্রা শুরু। বস্তা তৈরির ক্ষেত্রে পাট এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান জুড়ে আছে। পাটের আঁশের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অন্য অনেক আঁশের সঙ্গে মিশ্রণ করে ব্যবহার করা যায়। টেক্সটাইলঃ প্রচলিত বয়ন শিল্পে পাটের উল্লেখযোগ্য ব্যবহারের মধ্যে রয়েছে সুতা, পাকানো সুতা, বস্তা, চট, কার্পেট ব্যাকিং ইত্যাদি। পাট আঁশের রয়েছে উচ্চ মাত্রার টান শক্তি, সীমিত প্রসারতা এবং বস্ত্রের স্থায়ীত্ব। পর্দার কাপড়, কুশন কভার, কার্পেট, ইত্যাদি পাট থেকে তৈরি হয়। গরম কাপড় তৈরীর জন্য উলের সঙ্গে মিশ্রণ করা হয়। মোড়কঃ কৃষি পণ্য এবং অন্যান্য দ্রব্যাদি বস্তাবন্দি ও প্যাকিং করার জন্য ব্যাপকভাবে পাট ব্যবহার করা হয়। উপজাতঃ পাটের আঁশের বহুমুখী ব্যবহারের মধ্যে রয়েছে প্রসাধনী, ওষুধ, রং ইত্যাদি। পাট খড়ি জ্বালানী, ঘরের বেড়া, ঘরের চালের ছাউনীতে ব্যবহার হয়। বাঁশ এবং কাঠের বিকল্প হিসাবে পার্টিকেল বোর্ড, কাগজের মন্ড ও কাগজ তৈরিতেও পাট খড়ি ব্যবহৃত হয়।
উৎপাদন কারীঃ পাট দক্ষিণ এশিয়ার একটি ফসল। বিশেষ করে ভারত ও বাংলাদেশের ফসল। উৎপাদিত আঁশের ৯৫% ভারত ও বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়। নেপাল এবং মায়েনমারেও কিছু পাট উৎপাদিত হয়। পাটের দাম ও চাষ বাড়ছে, সোনালী আঁশের দিন কি আবার ফিরে আসছে? ফরিদপুরের একজন কৃষক হারুন-অর-রশীদ গত বছর পর্যন্ত যে জমিতে ধান চাষ করেছেন, এই বছর সেখানে পাট লাগিয়ে ছিলেন। জুলাই মাসে সেই পাট তোলার পর প্রতি মণ বিক্রি করেছেন তিন হাজার ২০০ টাকা করে। গত বছর পাট বিক্রি করে অনেকে লাভ করেছে দেখে এইবার আমিও লাগাইছি। দুই বিঘা জমিতে চাষ করেছিলাম, বিক্রি করে ভালো লাভ হইছে। অনেক বছর পর আবার আমরার জমিতে পাট চাষ হইল, বলছিলেন মি. রশীদ। বাংলাদেশের যত জমিতে পাট চাষ হয়, তার এক তৃতীয়াংশ হয় বৃহত্তর ফরিদপুর জেলায়। তবে মন্দার কারণে কৃষকরা পাট চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু গত বছর থেকে ভালো দাম পাওয়ার কারণে আবার পাটের চাষের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন কৃষকরা।
বেড়েছে পাটের চাষাবাদঃ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে এই বছর সাড়ে আট লক্ষ হেক্টর জমিতে পাটের চাষ হয়েছে। উৎপাদন হয়েছে কম-বেশি ৯০ লাখ বেল (১৮২ কেজিতে এক বেল)। প্রতি বিঘায় গড়ে নয় মণ পাট চাষ হয়েছে। বেশিরভাগ স্থানে প্রতি মণ পাট বিক্রি হয়েছে তিন হাজার টাকার ওপরে। বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইন্সটিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে ৭ দশমিক শূন্য ৮ হেক্টর জমিতে পাটের চাষ হয়েছিল। সেই বছর মোট উৎপাদন হয়েছিল ১৫ দশমিক ২৬ লাখ মেট্রিক টন। সেই হিসাবে এই বছর উৎপাদন দাঁড়াতে যাচ্ছে প্রায় সাড়ে ১৬ লাখ মেট্রিক টন।
চালের চেয়েও দাম বেশি পাটেরঃ বাজারে এই বছর চালের দাম গত তিনবছরের মধ্যে সর্বোচ্চ স্থানে পৌঁছেছে। বর্তমানে চালের দাম অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সেই দামকেও টেক্কা দিয়েছে পাট। বাজারে যেখানে এক মণ মোটা চালের দাম ১৬০০ থেকে ২০০০ টাকার মধ্যে রয়েছে, সেখানে ভরা মৌসুমে এক মণ পাটের দাম তিন হাজার টাকার ওপরে। যে কারণে বাড়ছে পাটের চাহিদাঃ বাংলাদেশের পাট গবেষণা ইন্সটিটিউটের মহাপরিচালক কৃষিবিদ মোঃ আইয়ুব খান বলছেন, সারা বিশ্বে এখন প্লাস্টিক বা সিনথেটিক ফাইবার বাদ দিয়ে ন্যাচারাল ফাইবারের একটা ডিমান্ড তৈরি হয়েছে। নানা ধরণের পণ্য তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশে এই খাতে অনেক প্রাইভেট সেক্টর তৈরি হয়েছে, বিনিয়োগ হয়েছে, যারা পাট দিয়ে পণ্য তৈরি করে বিদেশে রপ্তানি করছে। ফলে এই খাতে একটা প্রতিযোগিতার বাজার তৈরি হয়েছে। তারা কৃষকের কাছ থেকে বেশি দামে পাট কিনছে। তাই পাটের চাহিদাও বাড়ছে, দামও বেড়েছে। ভালো দাম পাওয়ার কারণে কৃষকরাও পাট চাষের প্রতি আরও বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছে বলে তিনি জানান। তিনি জানান, গত বছরের আগে পাটের সর্বোচ্চ মূল্য উঠেছিল আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা। কিন্তু গত বছর সর্বোচ্চ ছয়-সাত হাজার টাকা দরেও পাটের মণ বিক্রি হয়েছে। পাট খাতের সাথে সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, প্রতিবেশী ভারতেও পাটের বড় একটি বাজার রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে ভারতে কাঁচা পাট রপ্তানির পাশাপাশি অবৈধ পথেও পাট পাচার হয়ে যায় বলে তারা বলছেন।
পাটজাত পণ্য রপ্তানিকারক ইসরাত জাহান চৌধুরী বলছেন, পাটের এত দাম বৃদ্ধির একটা কারণ একটা অসাধু মহল পাট মজুত করে দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। আরেকটা কারণ হলো আমাদের পাশের দেশে ‘আনঅফিসিয়াল’ভাবে বেশ কিছু পাট চলে গেছে। যে কারণে আড়াই হাজার টাকার পাটের মণ ছয় হাজার টাকায় পৌঁছেছে। পাটের উৎপাদনে বাংলাদেশ সবচেয়ে বড় দেশ হলেও পাটের বর্তমান বিশ্ব বাজার দখল করছে ভারত। বাংলাদেশে উৎপাদিত এসব পাটের কাঁচামাল ভারতেই সবচেয়ে বেশি রফতানি হয় এবং বিদেশি ক্রেতারা এই পণ্যগুলো ভারতের কাছ থেকে কিনে থাকে।

পাট দিয়ে এখন কী তৈরি করা হচ্ছে ?
বাংলাদেশে পাট দিয়ে পাট সূতা, দড়ি, বস্তা, প্যাকিং সরঞ্জাম, ব্যাগ বা থলে, হাতে বাছাই করা আঁশ, পাটজাত কাপড় বহুদিন ধরে তৈরি হয়। এখন সেই সঙ্গে পাটের তৈরি বৈচিত্র্যময় পণ্যের রপ্তানিও বেড়েছে। পাটের তৈরি টব, খেলনা, জুট ডেনিম, জুয়েলারি, ম্যাটস, নারী-পুরুষের জুতা স্যান্ডেল, বাস্কেট, পাটের শাড়ি, পাঞ্জাবি ও পাটের তৈরি গৃহস্থালি নানা সরঞ্জামের বিদেশে চাহিদা তৈরি হয়েছে। প্রধানত আমেরিকা ও ইউরোপীয় দেশগুলোয় এই জাতীয় পণ্য রপ্তানি করা হয়। আফ্রিকান দেশগুলো বস্তা ও পাটজাত দড়ি বেশি রপ্তানি হয়। পাটের আঁশের পাশাপাশি পাটখড়িরও একটি বড় বাজার তৈরি হয়েছে বলে তিনি জানান। এসব পণ্য দিয়ে পার্টিকেল বোর্ড, কম্পোজিট, সেলুলয়েডে ব্যবহার হয়। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, এক যুগের রেকর্ড ভেঙ্গে ২০২০-২০২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ পাটজাত দ্রব্য রপ্তানি করে ১১৬.১৪ কোটি ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে।আগের বছরের তুলনায় গত বছর পাটজাত পণ্য রপ্তানি বেড়েছে ৩১ শতাংশ। বেসরকারি খাত পাট পণ্য তৈরি ও রপ্তানি করলেও রাষ্ট্রায়ত্ত ২৬টি পাটকল লোকসানের কারণে গত বছরের পহেলা জুলাই থেকে বন্ধ রয়েছে।
দাম বৃদ্ধি নিয়ে শঙ্কায় মিল মালিকরাঃ গত বছর পাটের দাম বৃদ্ধির পর রপ্তানিকারকরা ছয় হাজার টাকা মণের বেশি দরে পাট কিনেছেন। তাতে হারুন-অর-রশীদের মতো অনেক কৃষক এই বছর আরও বেশি জমিতে পাট চাষে আগ্রহী হয়েছেন। তবে রপ্তানিকারকদের আশংকা পাটের দাম এরকম বেশি থাকলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বাংলাদেশের জুট গুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক ইসরাত জাহান চৌধুরী বলছেন, ”পাটের বেশি দাম বৃদ্ধির কারণে আমাদের প্রোডাক্টের দাম বাড়াতে হয়েছে, কিন্তু রপ্তানি ভলিউম বাড়েনি। ফলে তারা সুইচ করে অন্য প্রোডাক্টে চলে যাচ্ছে। দামটা এরকম ওঠানামা করলে ভালোর চেয়ে ক্ষতিই বেশি হবে। তিনি বলছেন, পাটের দাম একটি স্থিতাবস্থায় বেধে দেয়া সম্ভব হলে কৃষক ও ব্যবসায়ী- উভয়েই লাভবান হবে। গত মাসে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে একটি বৈঠকে ভারতে যাতে পাট পাচার বন্ধ করার ব্যবস্থা নিতে তারা অনুরোধ করেছেন বলে তিনি জানিয়েছেন।