admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ১৮ জুন, ২০২১ ১১:১৫ অপরাহ্ণ
নাগরিক ভাবনাঃ আবু মহী উদ্দীনঃ ঠাকুরগাঁও জেলায় করোনা ছড়াচ্ছে ব্যপক হারে। আমরা এখনো বুঝিনি যে , যাদের সেম্পল পরীক্ষা করা হচ্ছে , তাদের মধ্যে এই পার্সেন্টেজ। সকল মানুষকে পরীক্ষার আওতায় আনতে পারলে প্রকৃত অবস্থা জানা যেতো। এটা আপাতত সম্ভব নয়। আমাদের যে সামর্থ আছে তার সর্বোচ্য ব্যবহার করেই মোকাবেলা করতে হবে। বড়ো সমস্যা হচ্ছে অধিকাংশ করোনা এখন উপসর্গহীন।
ডাক্তার আমার মেয়েকে সন্দেহ করেনি। নিজেই করোনা পরীক্ষার সেম্পল দিলাম। ১০ ঘন্টা পর খবর হলো, আমার মেয়েটা করোনা পজেটিভ। একই বাসায় থাকি , একসঙ্গে খাওয়া দাওয়া সুতরাং ভয়েরই কথা। ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে নমুনা দিতে গেলাম। করোনা পরীক্ষার সময় যে বিষয়গুলি মোকাবেলা করলাম তা সবাইকে জানানো দরকার বলে মনে করি। ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অসম্ভব মেধার (?) পরিচয় দিয়েছে। আখেরে এর ফলাফল তাদের ডাক্তার এবং স্বাস্থ্যকর্মীদেরও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। সে কারনেই প্রায় সকল ডাক্তার করোনায় আক্রান্ত হয়েছিল।
১। গত করোনার সময় অনেক টাকা খরচ করে হাসপাতালে ঢোকার মুখে সুদৃশ্য কাঁচের ঘর বানানো হয়েছিল। সেখানে স্বাস্থ্যকর্মীরা ইনফ্রারেড থার্মোমিটার দিয়ে তাপ পরীক্ষা করতো। বর্তমানে সে ব্যবস্থা নাই। অথচ এখনেই বেশি কড়াকড়ি করা দরকার।
২। হাসপাতালে কোন পাশ সিস্টেম নাই। গাঁজাখোর , ডাক্তার , স্বাস্থ্যকর্মী , দর্শক, সাংবাদিক, ছিচকে চোর, রোগী, রোগির স্বজনরা, রক্তদাতার শুভানুধ্যায়ী , অবাধে একই রাস্তা দিয়ে যাতায়ত করে।
৩। টিকিট কাউন্টারে যে গাদাগাদি করে টিকিট কাটা হয়, কোন স্বাস্থ্য বিধি কেউ মানেনা, তাদের মানানোর চেষ্টা কোনদিন নজরে পড়েনি।
৪। ডাক্তার দেখানোর ঘরের সামনে সেখানেতো রোগিদের বসার জায়গা নাই। দরজায় টিকিট নেওয়া স্বাস্থ্যকর্মী যে অবস্থা মোকাবেলা করে এটা শুধু অনুভবের ব্যপার। পারলে সবাই একসঙ্গে ঘরে ঢুকতে পারলেই ভালো হতো। হাসপাতালের কোথায় লাইন ধরা ধরি নাই। কিছু বীরপুঙ্গবরা; মাস্কও পড়েনা।
৫। প্যাথোলজি ল্যাব এর রক্ত যেখানে নেওয়া হয় , সেই একই দরজা দিয়ে করোনা , অকরোনা সবাই যাতায়ত করছে দরজা ঠেলাঠেলি করে।
৬। করোনা পরীক্ষার্থী , ট্রান্সফিউশনে বøাড দেওয়ার জন্য রক্তদাতা এবং তাদের আত্মীয় স্বজন , রক্তদাতার শুভানুধ্যায়ী , প্যাথোলজি ল্যাবে সেম্পল দেওয়ার জন্য টাকা পয়সা জমা দেওয়ার লোকজন , পরীক্ষার রিপোর্ট সংগ্রহকারীগণ , সবার বসার জায়গা একই । কয়েকটা চেয়ার আছে।
৭। যারা করোনার সেম্পল দেওয়ার জন্য এসেছে , তাদের আর কিছু যতই থাকুক ‘সময়’ একেবারে নাই। তাড়াহুড়া করার যত কৌশল তা তারা অবলম্বন করছে। লাইন ধরতে হয় এ কথা তারা কোন দিন কোথাও দেখেছে বা শুনেছে বলে মনে হয়না। সবাই এক সঙ্গে কে কার আগে কি ভাবে নাম তালিকাভুক্ত করবে তার যুদ্ধক্ষেত্র। একসঙ্গে গাদাগাদি করে , একই কলম দিয়ে তালিকা টানাটানি করে নাম তালিকাভুক্ত করা।
৮। স্বাস্থ্য কর্মীরা প্রানান্ত চেষ্ট করছিলেন একটা সিস্টেমে আনার জন্য। সিষ্টেম কিছু করা যায়নি। এর পর ২ জন স্বাস্থ্যকর্মী মিলে সেম্পল নেওয়া শুরু করলেন। একজন করে যাওয়াতো দুরের কথা দরজা টেকানোই দায় হয়ে গেল। রাগে অভিমানে অপারগ একজন স্বাস্থ্যকর্র্মী সব ফেলে দিয়ে রাগে পিপিই খুলে ফেললেন এবং এই অবস্থা থাকলে তিনি কাজ করতে পারবেননা বলে চলে গেলেন। আবার সব মানুষগুলো গিয়ে তাকে ধরে এনে আবার কাজ শুরু হলো। একজনের সেম্পল নিতে মাত্র ৩০/৪০ সেকেন্ড প্রয়োজন হয়। এই ধৈর্যটা কোথায় শেখানো যায় সে বিষয়টা বিবেচনা করা যেতে পারে।
৯। একটা বিষয় আমার মতো বেকুবের মনে খটকা লাগছে , করোনা যদি এতই সমস্যার বিষয় হয়, তাহলে একই হাসপাতালে , করোনা , প্যাথোলজি ল্যাবে সে¤পল দেওয়া , রিপোর্ট সংগ্রহ করা , রক্তদাতা এবং তাদের আত্মীয় স্বজনের অবস্থান একই জায়গায় একই রুমে করার বিষয়টি ঠিক হয়নি সেটা বোঝার জন্য লেখাপড়া জানার কোন দরকার নাই। এটা যারা করেছে তারা জ্ঞানী (?) ব্যক্তি।
১০। ফেসবুকে দেখলাম , সিভিল সার্জন মহোদয় মাইকিং করাচ্ছেন, ফ্রি মাস্ক বিতরণ করছেন , সিভিল সার্জন কি জেলার ১৪ লাখ মানুষের কাছে ম্যাসেজ পৌঁছাতে পারবেন , বা মাস্ক দিতে পারবেন ? আর এসব কাজ কি সিভিল সার্জনের? হাসপাতালে যে সব স্বাস্থ্যকর্মী সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে কাজ করছেন তাদের নিরাপত্তা এবং কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করা তার দায়িত্ব। এদিকে নজর দিন। মাস্ক বিতরণ করবেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা , তারা ৩০ মিনিট মাস্ক বিতরণ করবেন , ২০০০ টাকার গাড়ীর তেল পুরিয়ে , ৪০০ টাকা জরিমানা আদায় করে ফেসবুকে ছবি আপলোড করে দায়িত্ব পালন শেষ করবেন। তারা তো কোন রোগীর সরাসরি কন্টাক্টে আসেননা। কিন্তু স্বাস্থ্য কর্মীরা প্রচন্ড ঝুঁকির মধ্যে কাজ করছেন। জানা গেল যে ৪ জন স্বাস্থ্যকর্মী করোনা সেম্পল সংগ্রহ করতো তাদের ৪ জনই করোনা আক্রান্ত হয়েছেন।
১১। ফেসবুকের কল্যাণে করোনা নিয়ন্ত্রনে জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে উচ্চ পর্যায়ের মিটিং (?) হচ্ছে। মিটিংয়ে নিশ্চয় পুরনো শব্দগুলো নুতন করে শোনা যাবে। লকডাউন , কঠোর লকডাউন , সর্বাত্মক লকডাউন এসব শব্দের সাথে পরিচিত হয়েছি। অবশেষে মিটিং উপহার দিল “কঠোর বিধি নিষেধ”। এ বিষয়ে বলা যায় শুধুমাত্র অহি নাজেল করলেই সবাই প্রাণভয়ে হোক বা রাজঘোষণার জন্য সবাই মানতে শুরু করে দিলো, এমন হলেতো দেশে করোনা কবেই নিয়ন্ত্রণ হতো।
১২। মাঝে মাঝে আমরা হাস্যকর কিছু ঘটনা প্রত্যক্ষ করছি। যেমন ১৬ জুনে চেম্বার নেতারা বর্নাঢ্য র্যালি করে প্লাকার্ড ঝুলিয়ে জানিয়ে দিল ‘ নো মাস্ক , নো সেল ’ বিষয়টা মোটেও নুতন না। গত করোনার সময় এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল চেম্বার ্অব কমার্স। দোকানে দোকানে এখনো শোভা পাচ্ছে সেই ফেষ্টুন। অথচ আমরা প্রত্যক্ষ করেছি বিক্রয়কর্মীরাই মাস্ক পরেনা। মানে বিষয়টা কার্যকরী করা যায়নি। এখানে মোবাইল কোর্ট করে যদি জরিমানা করতে হয় তাহলে চেম্বার নেতাদের করতে হবে। বিক্রয়কর্মীদের কয়টাকে পাহাড়া দিবেন। তার প্রয়োজনই বা কি? যার কাজ তাদেরকে দিয়েই করাতে হবে। আজ আবার তারা ঢেকুর তুলবেন মাস্ক বিতরণ করে দারুন কাজ করলেন বলে। এখন ফেসবুকের কল্যানে ছবি সয়লাব হয়ে যাবে।
১৩। করোনার উপসর্গের অধিকাংশ অনুভুত হওয়ায় ১৪/৬/২১ দুপুরে করোনার সেম্পল দিলাম। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার চেষ্টা করছি। সাড়ে চার দিন পর ১৭/৬/২১ রাত সাড়ে দশটায় রিপোর্ট পেলাম আমি কভিড ১৯ পজেটিভ। সুতরাং টেষ্টের ব্যবস্থাপনার উপর নজর দিতে হবে। তাড়াতাড়ি রিপোর্ট কিভাবে পাওয়া যায় সেদিকে নজর দিলে ঝুঁকি কমবে। এরকম যারা রিপোর্ট দেরিতে পাচ্ছে তারা মনের আনন্দে পিকনিক , অবকাশ যাপন করে করোনা বিতরণে ভূমিকা রাখছে বলে সন্দেহ করা কি খুব দোষের ? এই ঘটনা প্রতিদিনই ঘটছে। তাহলে আমরা করোনা পরীক্ষা করার কয়েকদিন পরে তালিকাভুক্ত হচ্ছি? ।
১৪। রিপোর্ট পাওয়ার কোন সময়সীমা নাই। ১৪ জুন নমুনা দিয়ে সাড়ে ৪ দিন পর রিপোর্ট পাওয়া গেল, এটাকে কোন বিভাগীয় পারফরমেন্স বলা যায়না। সিভিল সার্জন বরং তাড়া তাড়ি রিপোর্ট আনার ব্যবস্থা করবেন। এটার তার দ্বায়িত্বের অংশ।
১৫। কভিড ১৯ টেষ্টের রিপোর্ট ৩ জায়গায় আসে। থানা থেকে শুধু বলে দেয় আপনার করোনা হয়েছে , সাবধানে থাকবেন। ২য় টা আসে হাসপাতালের স্বাস্থ্য বিভাগে। ৩য়টা আসে পুরাতন হাসপাতাল থেকে। তারা সবাই করোনা পজেটিভের কথা জানায়। বিষয়টা ভালো। তবে এইটা আরো ভালো করা সম্ভব তা হলো প্রতিদিন একবার করে খোজ নেওয়া , ঔষধ পত্র খাচ্ছে কিনা , আর কোন সমস্যা আছে কিনা ? আলাপ করলে অনেক বিষয় পরিস্কার হবে। সবচে বড়ো বিষয় হবে আক্রান্ত ব্যাক্তি মনে করবে আমি একা নই।
স্বাস্থ্য বিভাগ আমার সাথে আছে। উপসংহারে বলা যায়ঃ জেলার সকল হাসপাতালে,
ক) তড়িৎ গতিতে হাসপাতালের কোভিট টেষ্টের জায়গা টা বিষেশত আধুনিক সদর হাসপাতালে যেখানে টিকা দেওয়া হচ্ছিল সেখানে অথবা আর অন্য কোথাও সরানো।
খ) হাসপাতালের ঢোকার মুখে থার্মোমিটার দিয়ে পরীক্ষা , ভিতরে েেঢাকার বিষয়ে কড়াকড়ি আরোপ করা ,
গ) ভিতরে প্রতিটি স্পটে কড়াকড়িভাবে দুরত্ব রেখে লাইন করার ব্যবস্থা করা ,
ঘ) সঠিকভাবে মাস্ক না পড়ে কেউ যেন ভিতওে যেতে না পারে তার জন্য কড়াকড়ি করা
ঙ। প্রয়োজনে জেলা প্রশাসনকে অনুরোধ করে হাসপাতালে সার্বক্ষনিক মোবাইল কোর্ট চালু রাখা। সারা বাংলাদেশের চিন্তায় গলদঘর্ম না হয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ মোতাবেক ঠাকুরগাঁওয়ের মধ্যে কার্যক্রম কেন্দ্রীভুত করুন জেলার মানুষ উপকার পাবে।