admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ১০:২৫ অপরাহ্ণ
ব্যাংক ডাচ-বাংলা ব্যাংকের গ্রাহকদের আপত্তিতে ন্যূনতম ব্যালেন্স বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বাতিল। গ্রাহকদের আপত্তির মুখে বাংলাদেশে বেসরকারি ব্যাংক ডাচ-বাংলা ব্যাংক সম্প্রতি সেভিংস অর্থাৎ সঞ্চয়ী হিসাবের জন্য মিনিমাম ব্যালেন্স বা ন্যূনতম আমানতের যে বর্ধিত হার নির্ধারণ করেছিল, রোববার ৭ই ফেব্রুয়ারি সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। ফলে এখন সঞ্চয়ী হিসাবের ক্ষেত্রে আগের নিয়ম মতই একজন গ্রাহককে মিনিমাম ব্যালেন্স হিসেবে কেবল ৫০০ টাকা রাখলে চলবে। ব্যাংকটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কাশেম মোহাম্মদ শিরিন বিবিসিকে বলেছেন, সঞ্চয়ী হিসাবের ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন আনার কথা ভাবা হয়েছিল, ডাচ-বাংলা ব্যাংক তা থেকে সরে এসেছে, এবং ৭ই ফেব্রুয়ারি ওই সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হয়েছে।

কী পরিবর্তন চেয়েছিল ডাচ-বাংলা ব্যাংকঃ এ বছরের শুরুতে ডাচ-বাংলা ব্যাংক সিদ্ধান্ত নেয়, সঞ্চয়ী হিসাবের মধ্যে দু’টি ভাগ করা হবে – একটি হবে সেভিংস প্লাস, এবং অন্যটি হবে সেভিংস রেগুলার। এর মধ্যে সেভিংস প্লাস অ্যাকাউন্টধারী গ্রাহকেরা ব্যাংক থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কিছু বাড়তি সুবিধা পাবেন। এসব সুবিধার মধ্যে রয়েছে ব্যাংকে কোন শাখায় সেবার জন্য গেলে লাইনে না দাঁড়িয়ে দ্রুত সেবা প্রদান, এটিএম বুথ থেকে টাকা উত্তোলনের সীমা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন সেবা। এজন্য একজন গ্রাহককে তার হিসাবে মিনিমাম ব্যালেন্স রাখতে হবে ন্যূনতম পাঁচ হাজার টাকা। অন্যদিকে, সেভিংস রেগুলার হিসাবে আগের মতই ন্যূনতম ৫০০ টাকা থাকলেই হবে, কিন্তু গ্রাহক বাড়তি কোন সুবিধা পাবেন না। এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাংকটি তাদের সঞ্চয়ী হিসাবের গ্রাহকদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে জানতে চায়, কারা সেভিংস প্লাস অ্যাকাউন্টের সুবিধা পেতে চান। যারা এই ‘অধিকতর’ সুবিধা পেতে চান, তারা যেন ব্যাংককে সেটি জানিয়ে দেন। সেক্ষেত্রে আগামী মে থেকে চালু হবে ওই স্কিম। কিন্তু গ্রাহক যদি না চান, তাহলে সেটি ব্যাংককে চিঠি পাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে জানাতে হবে।

গ্রাহকদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়াঃ এই বিষয়টি নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। সামাজিক মাধ্যমে এর বিরোধিতা করে লেখালেখি চলছে গত কয়েকদিন ধরে। ন্যূনতম ব্যালেন্সের সীমা ৫০০ থেকে পাঁচ হাজার হয়ে গেলে, স্বল্প আয়ের অনেকে সেটি রাখতে সমর্থ হবেন না, এমন যুক্তি তুলে ধরা হয়। অনেকেরই আশংকা যদি ন্যূনতম ব্যালেন্স পাঁচ হাজার টাকা রাখা না হয়, তাহলে তাদের সঞ্চয়ী হিসাব বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ঢাকার একটি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক তানিয়া ফেরদৌসি বলছিলেন,আমার বেতন ডাচ-বাংলা ব্যাংকে আমার সেভিংস অ্যাকাউন্টে যায়, আমি বেতনের জন্য নতুন করে স্যালারি অ্যকাউন্ট খুলি নাই। এখন যদি সেখানে ন্যূনতম পাঁচ হাজার টাকা না রাখলে অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে আমাকে বেতন তোলার জন্য বিরাট ঝামেলায় পড়তে হবে। এজন্য ফেসবুকে লেখালেখি দেখে আমি ঘাবড়ে গিয়েছিলাম।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, কিছু সম্মানিত গ্রাহকদের অনুরোধে সঞ্চয়ী হিসাবকে দুইটি প্রোডাক্টে বিভক্ত না করে বর্তমানে যে অবস্থায় রয়েছে সেই অবস্থাতেই অপরিবর্তিত রাখার জন্য ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। সম্মানিত গ্রাহকদের মধ্যে যারা ইতিমধ্যে পত্র পেয়েছেন তাদেরকে ঐ পত্রটি বিবেচনায় না নেওয়ার জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে। মি. শিরিন বলেছেন, এর ফলে এখন সঞ্চয়ী হিসাবধারী সকল গ্রাহকের জন্য ন্যূনতম ব্যালেন্স আগের মতই কেবল ৫০০ টাকা হলে হবে।
সঞ্চয়ী হিসাব এবং ব্যাংকের অন্যান্য সেবা অপরিবর্তিত থাকবে। সঞ্চয়ী হিসাবে কত টাকা থাকতে হয়?একটা সময় ছিল যখন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা হিসাব খোলার জন্য কোন টাকা লাগতো না। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন ব্যাংক তাদের নিজস্ব নীতি ও প্রয়োজন অনুসারে সঞ্চয়ী হিসাবের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট অর্থ ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা রাখার শর্ত অন্তর্ভুক্ত করে। সাধারণত ব্যাংকে গ্রাহকের হিসাব খোলার সময় নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা জমা নেওয়া হয়, মূলত হিসাবটি নিয়মিত রাখার জন্য। তবে জমা থাকা ওই অর্থের ওপর গ্রাহক তার সঞ্চয়ী হিসাবে বাৎসরিক একটি নির্দিষ্ট হারে ইন্টারেস্ট পান। একই সঙ্গে ব্যাংক হিসাব বন্ধ করে দিলে, ন্যূনতম ব্যালেন্সের পুরো অর্থটিই গ্রাহককে ফেরত দেয়া হয়। এদিকে, বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, এ নিয়ে নির্দিষ্ট কোন নির্দেশনা নেই বাংলাদেশ ব্যাংকের। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ সংক্রান্ত কোন বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু সাধারণ নির্দেশনা হচ্ছে গ্রাহকের ওপর কিছু চাপিয়ে দেয়া যাবে না, এবং নতুন কোন নীতিমালার ফল হিসাবে গ্রাহকের হিসাব বন্ধ করে দেয়া যাবে না।
তিনি বলেছেন, কোন ব্যাংক কত টাকা মিনিমাম ব্যালেন্স নির্ধারণ করবে তা নির্ধারণের বেলায়ও বাংলাদেশ ব্যাংক হস্তক্ষেপ করে না।
কোন ব্যাংকে কত টাকা ন্যূনতম ব্যালেন্স রাখতে হয়ঃ যেসব ব্যাংকে শিক্ষার্থী, কৃষক, পোশাক শ্রমিক – এমন বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহকদের সঞ্চয়ী হিসাবের ব্যবস্থা রয়েছে, তাদের অধিকাংশ ব্যাংকেই কোন টাকা লাগে না। এছাড়া পেশাজীবী কোন ব্যক্তির স্যালারি অ্যাকাউন্ট খুলতেও টাকা লাগে না। কিন্তু সঞ্চয়ী হিসাব খুলতে টাকা লাগে। তবে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোতে হিসাব খোলার সময় জমা রাখা টাকা একদিন পরেই আবার তুলে নেয়া যায়। নির্দিষ্ট কয়েকটি ব্যাংকে একটা নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা আবশ্যিকভাবে জমা রাখতে হয়। বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে সাধারণত সঞ্চয়ী হিসাব খুলতে ৫০০ টাকা লাগে।
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে ৫০০ টাকা থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত টাকা লাগে, যা ন্যূনতম ব্যালেন্স হিসেবে ব্যাংকে জমা থাকে। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ব্যাংকের মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংকে ঢাকার যেকোন শাখায় সঞ্চয়ী হিসাব খুলতে ৫০ হাজার টাকা এবং ঢাকার বাইরের শাখায় হিসাব খুলতে পাঁচ হাজার টাকা লাগে। আবার ইস্টার্ন ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংকে পাঁচ হাজার টাকা এবং এবি ব্যাংকে সঞ্চয়ী হিসাব খুলতে ১০ হাজার টাকা লাগে। এছাড়া বিদেশি ব্যাংকের মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে সঞ্চয়ী হিসাব খুলতে এক লাখ টাকা লাগবে। বাংলাদেশে এই মূহুর্তে রাষ্ট্রায়ত্ত, বাণিজ্যিক এবং বিশেষায়িত মিলে মোট ৬১টি ব্যাংক রয়েছে। ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সংখ্যা দশ কোটির মত। যদিও বাংলাদেশের বহু মানুষ এখনো আর্থিক লেনদেনের কাজটি প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে করেন না। বাংলাদেশে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় নেটওয়ার্ক ডাচ-বাংলা ব্যাংকের। এই মূহুর্তে সারা দেশে দশ হাজারের বেশি এটিএম বুথ রয়েছে, যার অর্ধেকের বেশি বুথ ডাচ-বাংলা ব্যাংকের।