admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ২৭ জুলাই, ২০২০ ৯:৪৯ অপরাহ্ণ
উপন্যাসের ঘরে’ নামের গ্রন্থটি প্রথমে হাতে আসার পর মনে হল উপন্যাসের ঘর –সেটি আবার কেমন কথা ! লেখক থাকেন লেখার ভেতরে l তাঁর অভিপ্রায়, প্রত্যাশা সবের খোঁজ থাকে এখানে l তাই খুব অর্বাচীন উল্লেখ হবে না যদি বলা যায় ‘অনিকেত’ লেখকের নিজেরও ঘরের খোঁজ এই উপন্যাস নামক সংরূপটির মধ্যে l ‘ উদার আকাশ ‘ প্রকাশনা থেকে 2020 কলকাতা বইমেলায় প্রকাশিত অধ্যাপক ও গবেষক ড. অনিকেত মহাপাত্রের ‘উপন্যাসের ঘরে’ গ্রন্থে ষোলোটি প্রবন্ধ রয়েছে l তথ্য, বিশ্লেষণ, ভাষা ব্যবহারের মুন্সিয়ানায় মুগ্ধ হতে হয় l নোটবই প্রবন্ধ লেখার এই সুবর্ণ সময়ে ড. মহাপাত্র অন্য পথের পথিক l যে উপন্যাসগুলি নিয়ে তিনি আলোচনা করেছেন তার অধিকাংশ কোনো সিলেবাসনির্ভরতার তোয়াক্কা করেনি l আর যে জটিল ও বিদগ্ধ বিশ্লেষণ রয়েছে তা গবেষকের উপযোগী l
অনিকেত মহাপাত্র উপন্যাস নিয়ে গবেষণা করেছেন l তার অনেক পূর্ব থেকে উপন্যাস আলোচনা ক্ষেত্রে আলোচক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন l দীর্ঘ দেড় দশক ধরে লেখা উল্লেখযোগ্য ষোলোটি প্রবন্ধ নিয়ে গ্রন্থটি বিন্যস্ত l এই গ্রন্থে রয়েছে কৃষ্ণকমল ভট্টাচাৰ্য, দামোদর মুখোপাধ্যায়, স্বর্ণকুমারী দেবী বাংলা উপন্যাসের প্রথম দিকের বিস্মৃত-প্রায় কথাকারেদের নিয়ে আলোচনা l তেমনই আছেন অমরেন্দ্র ঘোষের ‘চর কাশেম’ নিয়ে প্রবন্ধ lওপার বাংলার কথাকার আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘খোয়াবনামা’ নিয়ে গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ l বর্তমান সময়ের শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায় দের উপন্যাস নিয়ে আলোচনা l গ্রন্থ প্রকাশের পূর্বেই কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘ স্পর্শ ‘ নামের উপন্যাস নিয়ে অনিকেত মহাপাত্রের লেখাটি পড়েছিলেন ও মেইল মারফত তাঁর ভালোলাগার কথা জানিয়েছিলেন যা গ্রন্থের পার্শ্ব পটে উল্লিখিত l প্রায় দেড়শো বছরের বাংলা উপন্যাসের চালচিত্র কে অনিকেত মহাপাত্র ধরেছেন তাঁর এই “ উপন্যাসের ঘরে “ গ্রন্থে l জনপ্রিয় সাহিত্য বনাম গুণান্বিত সাহিত্যের দ্বান্দ্বিক বিষয়টিকে প্রাঞ্জলভাবে ব্যাখ্যা করেছেন তাঁর “বাঙালি পাঠকের আকাঙ্খা পূরণ :দামোদর মুখোপাধ্যায়ের লেখনী” প্রবন্ধে l এই ক্ষেত্রে প্রাবন্ধিক অনিকেত ভারতীয় ইংরেজি সাহিত্যের প্রেক্ষিতকে তুলে ধরেছেন l চেতন ভগত-এর ‘ফাইভ পয়েন্ট সামওয়ান’, ‘টু স্টেটস’, ‘রেভোলুশন টোয়েন্টি টোয়েন্টি’ প্রভৃতি হট কেকের মত বিকোনো বইয়ের সঙ্গে আর এক ভারতীয় বংশোদ্ভূত সালমান রুশদি- এর ‘শালিমার দা ক্লাউন’ ‘ জোসেফ আন্তেন ‘ এর মত ধ্রুপদী ধারার বইয়ের তুলনা করেছেন l কিন্তু উভয় ধারার গুরুত্বকে অনবদ্য ভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন l এই ক্ষেত্রে দুটি উদাহরণের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে l
প্রথম : “রচনার সাহিত্য গুণের দিক থেকে ‘শালিমার দা ক্লাউন’ বা ‘জোসেফ আন্তেন’ অনেক উঁচুতে থাকতে পারে কিন্তু একটা বড় অংশের পাঠকের সঙ্গে সাহিত্যের যোগাযোগ কিন্তু ‘ওয়ান নাইট এট কলসেন্টার’, ‘রেভোলুশন 2020’এর মাধ্যমে l সেগুলি আম-পাঠক তাঁদের সাধারণ ইংরেজি জ্ঞান দিয়ে অবলীলায় পড়ে ফেলতে পারেন এবং তাঁদের আকাঙ্খা ও সাহিত্যবোধ তৃপ্ত হয় l”
দ্বিতীয় :”দামোদর মুখোপাধ্যায় আম-বাঙালির হাতে তুলে দিলেন সাহিত্যাগারের চাবি l যে বাঙালির রুচিতে বাধে বটতলার হলদেটে সাহিত্য ;আবার আলালের বা হুতোমেও সে খুশি নয় l অন্যদিকে বঙ্কিমচন্দ্রের লেখার মতো উচ্চতর সাহিত্যের আস্বাদনও তার পক্ষে কঠিন l এই ধরনের সাহিত্যকে আত্তীকরণ করতে গেলে যে ধারাবাহিক সাহিত্যানুশীলন দরকার তার অপারগতা অথচ অবসরে তাকিয়ায় হেলান দিয়ে সাহিত্যরস আস্বাদন করতে চায় যারা, তারাই দামোদরের পাঠক এবং অবশ্যই তারা সংখ্যায় বেশি l ”
এর পর আসব এই গ্রন্থের একটি প্রতিনিধিস্থানীয় প্রবন্ধের ব্যাপারে l ‘ স্বপ্নদ্রষ্টার আখ্যান —নবপর্যায়’ ; ব্যতিক্রমী উপন্যাস ‘ নব পর্যায় গ্রামবার্তা প্রকাশিকা ‘ এর নির্মাণ বিষয়ক আলোচনা l কথাসাহিত্যিক স্বপন পান্ডার এই উপন্যাস ইতিমধ্যে বহুচর্চিত, দু দুটো সংস্করণ প্রকাশিত l প্রথমে প্যাপিরাস ও পরে তালপাতা থেকে l কিন্তু তাঁর উপন্যাস নিয়ে এই ধরনের বিশ্লেষণ যেকোনো পাঠককে মুগ্ধ করবে l
প্রয়াত কথাসাহিত্যিক আফসার আমেদ – এর সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার প্রাপ্ত উপন্যাস ‘সেই নিখোঁজ মানুষটা’ নিয়ে এক মনোগ্রাহী আলোচনা আছে l আলোচনা প্রসঙ্গে অনায়াসে এনেছেন শাহ মুহম্মদ সগীর এর ‘ ইউসুফ -জোলেখা’ কাব্যের অনুষঙ্গ l এসেছে কাজী নজরুল ইসলাম এর উপন্যাস ‘বাঁধনহারা’র তুলনামূলক বিশ্লেষণ l
গ্রন্থটি পড়তে পড়তে পাঠক হিসেবে আমার যে বিষয়টি চোখে পড়েছে তা হল অহেতুক পন্ডিতি দেখানোর চেষ্টা কোথাও নেই, অথচ আলোচনা জ্ঞানগর্ভ l বইটি বাংলা উপন্যাস বিষয়ক আলোচনা সাহিত্যকে ঋদ্ধ করবে এই ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই l