admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ২২ জুন, ২০২১ ১:২৪ অপরাহ্ণ
ভারতের টিকার বিপরীতে বাংলাদেশের ইলিশ কূটনীতি! আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বেশ কিছু দিন ধরেই প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে যে, করোনার মহামারিকালে বিশ্ব রাজনীতিতে কূটনীতির অন্যতম হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে কোভিড-১৯ এর প্রতিষেধক বা ভ্যাকসিন অর্থাৎ টিকা। এক্ষেত্রে আঞ্চলিক কূটনীতিতে শুরু থেকেই এগিয়ে ছিল দিল্লি। কিন্তু পরবর্তীতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে দেশটির অবস্থাই নাজেহাল। ফলে দিল্লিকে টেক্কা দিয়ে টিকা কূটনীতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বেইজিং। চীনা টিকা প্রাপ্তির অবারিত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ওই সময় ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে ৩ কোটি ডোজ টিকা কেনার চুক্তি করে ঢাকা।
অগ্রিম অর্থও পরিশোধ করা হয়। কিন্তু দুই কিস্তিতে মাত্র ৭০ লাখ ডোজ টিকা পেয়েছেন বাংলাদেশ। চুক্তি অনুযায়ী দুই ধাপে ১ কোটি পাওয়ার কথা। এর পর কয়েক মাস হয়ে গেলেও দিল্লির রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার কারণে আর কোনো টিকা পায়নি ঢাকা। অবস্থা এতটাই খারাপ যে, প্রথম ডোজ নেওয়াদের মধ্যে এখনো প্রায় ১৬ লাখ মানুষ দ্বিতীয় ডোজ নিতে পারেনি। তাদের মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে।এই যখন অবস্থা তখন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং তার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহু বিজ্ঞাপিত ভারত-বাংলাদেশ সোনালি অধ্যায়-এর রং যথেষ্ট ফিকে হয়ে গেছে বলে এক প্রতিবেদনে মন্তব্য করেছে কলকাতাভিত্তিক আনন্দবাজার পত্রিকা।
নিজস্ব সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দিল্লির পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, আপাতত ভ্যাকসিনের আর একটি ডোজও পাঠানো সম্ভব নয়। তবে বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ আর চাপা থাকছে না বাংলাদেশে। আর সেই ক্ষোভের সরাসরি প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বাঙালির প্রিয় মাছ ইলিশ রপ্তানির ক্ষেত্রে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই ভারতে ইলিশ রপ্তানির ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও পূজা-পার্বণ বিশেষ করে, জামাইষষ্ঠীর সময়ে ছাড় দিয়েছে ঢাকা।
গত বছরও জামাইষষ্ঠীর সময় পশ্চিমবঙ্গে দুই হাজার টন ইলিশ রপ্তানির ছাড়পত্র দিয়েছিল শেখ হাসিনার সরকার। কিন্তু এ বছর পশ্চিমবঙ্গের মানুষের পাতে ছিল না পদ্মার ইলিশ। বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে আনন্দবাজার বলছে, তবে এমন সরলীকরণ করাটাও ঠিক হবে না যে, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী টিকা দেওয়া হয়নি বলেই এ বছর বন্ধ থাকলো ইলিশ রপ্তানি। কিন্তু এটাও ঠিক যে, ঢাকা ও দিল্লির মধ্যকার সম্পর্ক এতটাই আড়ষ্ট হয়ে গেছে যে, ইলিশ কূটনীতির আবহাওয়াটাই আর নেই।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের উত্থান-পতনে ইলিশ এক কূটনৈতিক প্রতীকও বটে। এর আগে পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্থলসীমান্ত চুক্তি সই করতে যখন ঢাকায় গিয়েছিলেন, তখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ইলিশ নিয়ে কিছুটা রসিকতার ঢংয়ে কথা হয়েছিল তার। খাবারের তালিকায় ইলিশের পঞ্চপদ দেখে ওই সময় মমতা বন্দোপাধ্যায় শেখ হাসিনাকে প্রশ্ন করেছিলেন, তারা কেন ইলিশ আটকে রেখেছেন? এর জবাবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, তিস্তার পানি এলেই সাঁতার কেটে মাছ ওপারে চলে যাবে!
আনন্দবাজার বলছে, বাংলাদেশ আপাতত তিস্তা চুক্তির সেই আবেগ সংযত রেখেছে। কিন্তু ঢাকার রাজনৈতিক সূত্র বলছে, বিগত এক বছরে পর পর এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে, যার কারণে শেখ হাসিনা সরকারের পক্ষে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী সেন্টিমেন্টকে সামলানো কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ‘ইচ্ছা না থাকলেও চীনের জন্য টিকার বাজার খুলে দিতে বাধ্য হচ্ছে ঢাকা’।
এতে আরো বলা হয়, ইতোমধ্যেই চীনের উপহার হিসেবে ১১ লাখ ডোজ করোনার টিকা ঢাকায় পৌঁছেছে। আরো ৩০ লাখ ডোজের দাম দেওয়া হয়ে গেছে। খুব শিগগিরই সেটাও ঢাকায় পৌঁছবে। বাংলাদেশি সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গেল মার্চে ঢাকা সফরেও ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি টিকার বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের শীর্ষ নেতৃত্বকে কথা দিয়েছিলেন। কিন্তু ভারতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ সব কিছু এলোমেলো করে দেয়। ফলে বাংলাদেশ, ভুটান ও শ্রীলঙ্কার মতো প্রতিবেশী দেশে টিকা রপ্তানি স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয় ভারত।
ঢাকা বলছে, ভারতের কাছ থেকে টিকার ব্যাপারে ওই সময় এতটাই জোরালো আশ্বাস পাওয়া গিয়েছিল যে, আগ্রহী চীনকেও তখন ফিরিয়ে দেওয়া হয়। অথচ এখন তাদের কাছেই হাত পাততে হচ্ছে এবং তাও আবার দর কষাকষি করে। আনন্দবাজার বলছে, সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দর ও বিমানবন্দর ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ। এর মাধ্যমে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে দেশটির অন্যান্য প্রান্ত থেকে পণ্য পাঠানো হচ্ছে। তার মানে, ভারতের ওই অঞ্চলে পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে যে যাত্রাপথ, তার একটা বড় অংশে বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ভূমিকা থাকছে।
ঢাকার রাজনৈতিক সূত্রের খবর হচ্ছে, বাংলাদেশের মানুষের মন যদি ভারতকে নিয়ে বিগড়ে থাকে, তাহলে তার নেতিবাচক প্রভাব এই সংযোগ প্রকল্পের ক্ষেত্রেও পড়তে পারে। শুধু যে করোনার টিকা দিতে না পারার বিষয়- এমনটি নয়, বরং কখনো ঘরোয়াভাবে এবং কখনো প্রকাশ্যে বাংলাদেশের আবেগকে আঘাত করার অভিযোগ উঠেছে ঢাকার পক্ষ থেকে।